রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

রাম, স্থির করলেন, বনবাসের নির্ধারিত সময়ের অবশিষ্টাংশ, সজ্জনকল্যাণে নিয়োজিতপ্রাণ মহর্ষি অগস্ত্যের আশ্রমে বাস করবেন। রামের নির্দেশানুসারে, অনুজ লক্ষ্মণ মহর্ষির আশ্রমের এক শিষ্যকে বললেন, রাজা দশরথো নাম জ্যেষ্ঠস্তস্য সুতো বলী। রামঃ প্রাপ্তো মুনিং দ্রষ্টুং ভার্য্যয়া সহ সীতয়া।।

রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র বলশালী রাম, মুনির দর্শনের আশায়, স্ত্রী সীতার সঙ্গে উপস্থিত হয়েছেন। লক্ষ্মণ আত্মপরিচয় দিলেন, আশ্রমবাসীগণ শুনে থাকবেন, তিনি রামানুজ লক্ষ্মণ, রামের হিতসাধক, অনুগত ভক্ত। পিতার আদেশানুসারে, তাঁরা এই ভয়াবহ অরণ্যে প্রবেশ করেছেন। তাঁরা সকলে ভগবান অগস্ত্যের দর্শনপ্রার্থী। মহর্ষিকে এই সংবাদ জানানো হোক। দ্রষ্টুমিচ্ছামহে সর্বে ভগবন্তং নিবেদ্যতাম্। তপস্বী, অগ্নিশালায় প্রবেশ করে, তপোবলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মুনিশ্রেষ্ঠ অগস্ত্যকে রামের আগমনবার্তা নিবেদন করলেন। লক্ষ্মণের কথানুসারে আরও জানালেন, দ্রষ্টুং ভবন্তমায়াতৌ শুশ্রূতার্থমরিন্দমৌ। যদত্রানন্তরং তত্ত্বমাজ্ঞাপয়িতুমর্হসি।।

আপনার সাক্ষাৎপ্রার্থী অরিন্দম দুই ভাই, আপনার সেবা করতে ইচ্ছুক হয়ে এসেছেন। এই বিষয়ে যা করণীয় সেই বিষয়ে আদেশ করুন। রাম, লক্ষ্মণ সীতা উপস্থিত হয়েছেন, জেনে মহর্ষি বললেন, সৌভাগ্যক্রমে রাম, বহুকাল পরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। মহর্ষি মনে মনে তাঁর আগমনের আকাঙ্খা করছিলেন। সত্বর পত্নী ও ভাইসহ রামকে স্বাগত জানিয়ে নিয়ে আসা হোক। এতক্ষণ কেন তাঁকে নিয়ে আসা হয়নি। গম্যতাং সৎকৃতো রামঃ সভার্য্যঃ সহলক্ষ্মণঃ। প্রবেশ্যতাং সমীপং মে কিময়ং ন প্রবেশিতঃ। শিষ্য, মুনিকে প্রণতি জানিয়ে তৎক্ষণাৎ লক্ষ্মণকে বললেন, রাম কে? যিনি মুনির দর্শন করতে এসেছেন, তিনি স্বয়ং প্রবেশ করুন। কোঽসৌ রামো মুনিং দ্রষ্টুমেতু প্রবিশতু স্বয়ম্।

শিষ্য সসম্মানে রামকে আশ্রমে নিয়ে গেলেন। শান্ত হরিণসঙ্কুল আশ্রমের শোভা দেখতে দেখতে রাম আশ্রমে প্রবেশ করলেন। তিনি সেখানে যথাক্রমে দেখলেন ব্রহ্মা, অগ্নি, বিষ্ণু, ইন্দ্র, সূর্য, চন্দ্র, ভগদেব, কুবের, ধাতা, বিধাতা, বায়ু, পাশধারী মহান বরুণ, গায়ত্রী, বসু, বাসুকি, গরুড়, কার্তিক ও ধর্মের স্থান। শিষ্যপরিবৃত অগস্ত্যমুনি বেড়িয়ে এলেন। রাম দেখলেন, মুনিগণের মধ্যে অগ্রগণ্য দীপ্ততেজবিশিষ্ট অগস্ত্যমুনিকে তিনি লক্ষ্মীশ্রীবর্ধক লক্ষ্মণকে বললেন, ঔদার্যের প্রতিমূর্তি, তপস্যার আশ্রয়, ভগবান অগস্ত্যঋষি স্বয়ং বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। এই বলে, মহাবাহু রাম, সূর্যসম অগস্ত্যমুনির চরণ বন্দনা করলেন। প্রণামান্তে রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা, জোড়হাতে দাঁড়ালেন।
মহর্ষি অগস্ত্য,রামকে মহাসমাদরে গ্রহণ করলেন। তিনি আসন, জল প্রভৃতি দান করলেন, তাঁকে কুশল প্রশ্ন করে, বললেন আস্যতামিতি। বসো। অগস্ত্যমুনি তাঁর অগ্নিতে আহুতি দান করলেন। তিনি, বানপ্রস্থের ধর্মানুসারে, অতিথিদের অর্ঘ্য দান করে, ভোজ্য দান করলেন। করজোড়ে প্রণত রামকে, ঋষি বললেন, তপস্বী যদি অতিথির প্রতি যোগ্য ব্যবহারের অন্যথা করেন, তবে তিনি মিথ্যাসাক্ষীর মতো পরলোকে নিজের মাংস নিজেই ভোজন করতে বাধ্য হন। রাম সব লোকের ধার্মিক রাজা ও মহারথ। তাঁকে পূজনীয় ও মান্যনীয় প্রিয় অতিথিরূপে মহর্ষি অগস্ত্য পেয়েছেন। এই কথা বলে, মহর্ষি রামকে ফলমূল ও অন্য সব অর্ঘ্যসহ ইচ্ছামতো বন্দনা করে বললেন, হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, এই সোনা ও হীরায় বিভূষিত অলৌকিক বিরাট, বিষ্ণুধনু, বিশ্বকর্মানির্মিত।সূর্যতুল্য ব্রহ্মদত্ত এই অব্যর্থ শর এবং অক্ষয় তীক্ষ্ণবাণপূর্ণ দুটি তূণী, ইন্দ্র আমায় দিয়েছিলেন। অমোঘঃ সূর্যসঙ্কাশো ব্রহ্মদত্তঃ শরোত্তমঃ। দত্তৌ মম মহেন্দ্রেণ তূণী চাক্ষয্যসায়কৌ।।

শাণিত বাণদুটি আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে, সোনায় মোড়ানো এই তরবারি রূপার কোশে ভরা আছে। মহর্ষি ধনুকটির ঐতিহ্য বর্ণনা করলেন, পুরাকালে বিষ্ণু, এই ধনুক দিয়ে যুদ্ধে, অসংখ্য মহা-অসুরদের বধ করে, দেবতাদের দীপ্তশ্রী লাভ করেছিলেন। ঋষি অগস্ত্যর প্রস্তাব, ইন্দ্র যেমন জয়ের জন্য বজ্র ধারণ করেন তেমনই হে মানদ, সেই ধনুক, তূণী, শর এবং খড়্গ জয়ের জন্যে গ্রহণ কর। তদ্ধনুস্তৌ চ তূণী চ শরং খড়্গঞ্চ মানদ। জয়ায় প্রতিগৃহ্ণীষ্ব বজ্রং বজ্রধরো যথা।। এই কথা বলে, মহাতেজস্বী ভগবান অগস্ত্য, রামকে শ্রেষ্ঠ সমস্ত অস্ত্র দান করে, আবারও বলতে শুরু করলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৩: জরাসন্ধের ঔদ্ধত্য ও কৃষ্ণের ভূমিকা যুধিষ্ঠিরকৃত রাজসূয় যজ্ঞের প্রাসঙ্গিক সূচনা

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫১: আকাশ এখনও মেঘলা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৮: অপারেশন হেলথ সেন্টার

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৩: খাটাস

মহর্ষি রামকে আশীর্বাদ করলেন। জানালেন, রাম ও লক্ষ্মণ তাঁকে প্রণাম করতে সীতাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, ঋষি অগস্ত্য তাঁদের প্রতি প্রীত হয়েছেন। পথশ্রমের ক্লান্তি তাঁদের কষ্ট দিচ্ছে, মৈথিলী জনকতনয়াও স্পষ্টত উৎকণ্ঠিতা হয়েছেন। এই সুকুমারী কন্যার দুঃখের সঙ্গে পরিচয় নেই, তিনি স্বামীপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অরণ্যে এসেছেন। মহর্ষি অগস্ত্য রামকে অনুরোধ করলেন, হে রাম, সীতা যাতে এখানে আনন্দে থাকেন তেমন ব্যবস্থা কর। সে তোমাকে অনুগমন করে দুঃসাধ্য কাজ করেছে। যথৈষা রমতে রাম ইহ সীতা তথা কুরু। দুষ্করং কৃতবত্যেষা বনে ত্বামভিগচ্ছতী।।

নারীস্বভাব ব্যাখ্যা করলেন মহর্ষি। সৃষ্টির আদিকাল হতে স্ত্রীলোকদের স্বভাব হল, সুখের সময়ে তাঁরা স্বামীর অনুরাগিনী হন, বিপদের সময়ে ত্যাগ করেন। মহিলারা বিদ্যুতের চাঞ্চল্য, অস্ত্রের তীক্ষ্ণতা, গরুড় ও বায়ুর দ্রুততা অনুসরণ করে থাকেন। রামের স্ত্রী এই সব দোষমুক্ত। দেবতাদের মধ্যে অরুন্ধতীর মতোই তিনি প্রশংসনীয়া ও প্রখ্যাতা। অরিন্দম রাম, লক্ষ্মণ ও বৈদেহী-সহ এই অঞ্চলে বসবাস করবেন, তাই এই জায়গাটি অলঙ্কৃত হল। মুনির কথা শুনে,রাঘব রাম,হাত জোড় করে, অগ্নিতুল্য দীপ্যমান ঋষিকে সবিনয়ে বললেন, তাঁদের গুরুপ্রতিম মুনিশ্রেষ্ঠ, ভাই-সহ সস্ত্রীক রামের গুণে সন্তুষ্ট হয়েছেন, এই কারণে রাম ধন্য, অনুগৃহীত হয়েছেন। এখন রামের অনুরোধ, মহর্ষি, জল যেখানে সুলভ ও বহু কানন রয়েছে যেখানে, এমন জায়গাটির নির্দেশ দিন যেখানে আশ্রম নির্মাণ করে, রাম সুখে বাস করতে পারেন। রামের কথা শুনে, ধর্মাত্মা মুনিবর অগস্ত্য এক মুহূর্ত ধ্যানস্থ থেকে পরে মঙ্গলময় কথা বললেন। এখান থেকে দুই যোজন দূরে, বহু ফলমূল এবং জল যেখানে সহজলভ্য, হরিণসঙ্কুল, পঞ্চবটী নামে খ্যাত এমন একটি জায়গা আছে। সৌমিত্রি লক্ষ্মণসহ তুমি সেখানে গিয়ে, আশ্রম নির্মাণ করে, পিতৃবাক্য যথাযথ পালন করে, সানন্দে বাস কর। ইতো দ্বিযোজনে তাত বহুমূলফলোদকঃ। দেশো বহুমৃগঃ শ্রীমান্ পঞ্চবট্যভিবিশ্রুত।। তত্র গত্বাশ্রমপদং কৃত্বা সৌমিত্রিণা সহ। রমস্ব ত্বং পিতুর্বাক্যং যথোক্তমনুপালয়ন্।।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

মহর্ষি জানালেন, নিষ্পাপ রামের প্রতি স্নেহবশত তপোবলে ইতিমধ্যেই দশরথ সংক্রান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হয়েছেন। রাম এই তপোবনে বাস করায়, মহর্ষি, তপস্যার প্রভাবে রামের মনোগত সঙ্কল্প জেনেছেন। তাই ঋষির পরামর্শ—তাই আমি তোমাকে বলছি, তুমি পঞ্চবটীতে যাও। মনোরম সেই বনভূমি। সীতা সেখানে আনন্দে থাকবেন। অতশ্চ ত্বামহং ব্রূমি গচ্ছ পঞ্চবটীমিতি। স হি রম্যো বনদ্দেশো মৈথিলী তত্র রংস্যতে।। গোদাবরীতীরে প্রশংসনীয় সেই জায়গাটি বেশি দূরে নয়, মৈথিলী সেখানে আনন্দ পাবেন। সেখানে পর্যাপ্ত ফলমূল রয়েছে। বহু বিহঙ্গে সমাকীর্ণ, নির্জন, পুণ্য ও তেমনই রমণীয় এই স্থানটি। মহর্ষির বিবেচনায়, রাম সদাচারী, তিনি আত্মরক্ষায় সক্ষম। এ ছাড়াও রাম, এমন আশ্রমে বসবাসকালীন, তাপসদের রক্ষা করতে পারবেন। ভবানপি সদাচারঃ শক্তশ্চ পরিরক্ষণে। অপি চাত্র বসন্ রাম তাপসান্ পালয়িষ্যসি।। মাননীয় অগস্ত্য নির্দেশ দিলেন,বীর রাম,ওই যে দৃশ্যমান, মহার্ঘ্য, মধুকতরুরাজি, তাঁরই উত্তরাভিমুখে যেতে যেতে একটি বটগাছের কাছে উপস্থিত হবেন। সেখানে একটি জমিতে উঠে দেখবেন, একটি পর্বতের অল্প দূরেই আছে নিত্য প্রস্ফুটিত ফুলে পরিপূর্ণ পঞ্চবটী নামে বনটি। অগস্ত্যমুনির এই কথা শুনে, রাম, লক্ষ্মণের সঙ্গে সত্যবাদী ঋষিকে সসম্মানে চরণ বন্দনা করলেন। তাঁরা মহর্ষির অনুমতি নিয়ে, সীতা-সহ পঞ্চবটীতে চললেন। যুদ্ধে যাঁরা কখনও কাতর হন না, এমন রাজপুত্র দু’জন, ধনুক তুলে নিলেন, পিঠে বেঁধে নিলেন তূণ, মহর্ষির নির্দেশানুযায়ী পথ ধরে, তাঁরা একাগ্রচিত্তে রওনা দিলেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৫: অকৃতজ্ঞ-জাতক : কৃতঘ্ন

মহামতি অগস্ত্যর আশ্রমে সমাগত, রাম, সঙ্গে আছেন ভাই লক্ষ্মণ ও স্ত্রী সীতা। মহর্ষি অগস্ত্য, তপস্যার শক্তিতে প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। তিনি অশুভ শক্তির প্রতীক ইল্বলরূপধারী রাক্ষসদের উদরস্থ করে হজম করেছিলেন। রাক্ষস বাতাপির দুরভিসন্ধিমূলক মারণাস্ত্রটিকে নিশ্চিহ্ন করেছিলেন। এমন যিনি মহর্ষি অগস্ত্য তিনি রাক্ষসনিধনের কৃতিত্বের অধিকারী। আত্মশক্তিতে বলীয়ান মহর্ষির কাছে সচল (রাক্ষস), অচল (প্রাকৃতিক শক্তি, বিন্ধ্যপর্বত) যে কোনও শক্তিই পরাজিত হতে বাধ্য হয়েছে। রাম মহর্ষির শক্তিমত্তাসম্বন্ধে সম্পূর্ণ অবহিত। রাম জানেন, নিগৃহ্য তরসা মৃত্যুং লোকানাং হিতকাম্যয়া। দক্ষিণা দিক্কৃতা যেন শরণ্যা পুণ্যকর্মণা।। সাক্ষাৎ মৃত্যুতুল্য রাক্ষসদের শায়েস্তা করে তিনি দক্ষিণ দিকটি আশ্রয়যোগ্য করেছিলেন। রাক্ষসরা তাঁর ভয়ে ভীত, সন্ত্রস্ত হয়ে সেই দিকটিতে পদার্পণ পর্যন্ত করে না, শত্রুতা তো করেই না, শুধু ভয়ে ভয়ে দূর হতে নিরীক্ষণ করে মাত্র। রাম জানেন, মহর্ষির প্রতিপত্তিময় প্রভাবে বনাঞ্চলের এই দিকগুলি এখন “নির্ব্বৈরাঃ প্রশান্তাঃ রজনীচরাঃ” শত্রুহীন, শান্ত হয়েছে নিশাচর রাক্ষসরা। বিন্ধ্যপর্বত তাঁর উন্নত মহিমার সামনে মাথানত করেছিল। ঔদ্ধত্যের গর্বকে খর্ব করতে তাঁর আত্মত্যাগ চিরন্তন ‘অগস্ত্যযাত্রা’র মতো প্রবাদের উৎস হয়ে ওঠেছে। জনগণের পূজিত, সজ্জনদের হিতে রত অগস্ত্যমুনির প্রতি গভীর আস্থাশীল রাম, স্থির করেছিলেন, বনবাসজীবনের অবশিষ্টাংশ তাঁর আশ্রমে অতিবাহিত করবেন। কারণ, তিনিই তাঁদের কল্যাণ সাধনে সক্ষম হবেন। মহর্ষি অগস্ত্য মনে মনে রামের আগমনের প্রতীক্ষা করছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, দিষ্ট্যা রামশ্চিরস্যাদ্য দ্রষ্টুং মাং সমুপাগতঃ। মনসা কাঙ্খিতং হ্যস্য ময়াপ্যাগমনং প্রতি।। সৌভাগ্যক্রমে রাম, বহুকাল পরে আমার দর্শনার্থী হয়েছে, আমিও যে এর আগমনের অপেক্ষায় ছিলাম। বহু প্রতীক্ষিত প্রিয় অতিথি রামের সঙ্গে মিলনের পরেই মহর্ষি রামকে সাদরে আতিথ্য দান করেছেন। সম্মানিত অতিথিকে, ইন্দ্রের প্রদত্ত উপহারসামগ্রী, অলঙ্কৃত বিরাট বিষ্ণুধনু, ব্রহ্মদত্ত নামে অব্যর্থ শর ও অক্ষয়বাণযুক্ত তূণীর দান করে সম্মানিত করলেন মহর্ষি। বনবাসী ঋষি যোগ্য বীরকে তাঁর অস্ত্রসম্ভার দান করেছিলেন। মহর্ষির তপশ্চর্যার শক্তি অশুভ অসুরশক্তিকে পরাজিত করতে যথেষ্ট তাই অস্ত্রের যথাযোগ্য ব্যবহার যাতে হয়, সেই কথা ভেবেই হয়তো মহর্ষি রামকে অস্ত্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। রামের মাধ্যমে, বিষ্ণুর অসুরবিজয়ের মাহাত্ম্যমণ্ডিত উজ্জ্বল ধনুকটি যেন আবারও রাক্ষসজয়ের ঐতিহ্য বজায় রাখে—এটিই হয়তো মহর্ষির অভিপ্সীত ছিল।বস্তুত সকল দূরদর্শী মহান ব্যক্তিত্বের মনোগত ইচ্ছা হয়তো তাঁদের অধিগত যা কিছু, সেগুলির ওপরে যোগ্য উত্তরাধিকারীর স্বত্ত্বপ্রতিষ্ঠা।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৫: পরবাস প্রস্তুতি (এক)

অগস্ত্যমুনির আশ্রমে সীতার উপস্থিতি, স্বামীর সঙ্গে একত্রে সীতার কষ্টকর বনবাসযাপন ও সীতার ভূমিকা, এক অন্য মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। মহর্ষি জানেন, বনবাসের কষ্ট ভোগ করছেন সীতা। সহধর্মিনী সীতা প্রকৃত অর্থেই রামের সুখদুঃখের সর্বক্ষণের সঙ্গিনী হয়েছেন। তাই বনবাসের ক্লেশময় ক্লান্তিকর জীবনে স্ত্রীর মনের আনন্দ অক্ষুণ্ণ রাখা, স্বামীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—এ কথা রামকে মনে করিয়ে দিয়েছেন ঋষি। সীতা রাজকীয় সুখ পরিত্যাগ করে স্বামীর সহগামিনী হয়েছেন, মহর্ষির এই কথা যেন সীতার আত্মত্যাগের যোগ্য স্বীকৃতি। তবে পরমুহূর্তে নারীচরিত্রসম্বন্ধে মহর্ষির সার্বিক মূল্যায়ন, পৃথিবীজুড়ে নারীদের চিরন্তন অবমূল্যায়ন বলেই মনে হয়। নারীরা অস্ত্রের মতো তীক্ষ্ণ, গরুড় ও বায়ুর মতো দ্রুতগামী এগুলি প্রশংসার অর্থে মেনে নেওয়া যায়। বিদ্যুতের মতো চঞ্চল, এই চঞ্চলতাবিশেষণটি সদর্থক ও নঞর্থক দুভাবেই হয়তো গ্রহণ করা যেতে পারে। চাঞ্চল্য যদি অস্থিরতার প্রতীক হয় তবে নারীদের এই বিশেষণটি হয়তো ব্যক্তিত্ববিশেষের বৈশিষ্ট্যমাত্র। সব নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কিন্তু চাঞ্চল্য যদি নিশ্চল অবস্থার বিপরীত শব্দ হয় তবে বহমান জীবনের গতিশীলতা বজায় রাখতে চাঞ্চল্য হয়তো প্রয়োজন। কোন অর্থটি গ্রহণযোগ্য? সেটি হয়তো পাঠকবর্গের বিচার্যবিষয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

রাম,মনস্থ করেছিলেন, বনবাসের শেষ পর্যায়ে অগস্ত্যমুনির আশ্রমেই বাস করবেন। মহর্ষির আশীর্বাদধন্য, আতিথ্যে আপ্যায়িত রাম, প্রার্থনা করলেন অন্য একটি বাসযোগ্য স্থান, যেখানে তিনি সুখে বসবাস করতে পারেন। মুনি ধ্যানস্থ হলেন, বুঝি তিনি রামের এই মত পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কেন? সেটি হয়তো জানতে পারলেন। মহর্ষি স্বীকার করেছেন, হৃদয়স্থঞ্চ তে চ্ছন্দো বিজ্ঞাতং তপসা ময়া। ইহ বাসং প্রতিজ্ঞায় ময়া সহ তপোবনে।। মহর্ষির সান্নিধ্যে তপোবনবাসের অভিপ্রেত সঙ্কল্প করে, রামের কেন এই মতান্তর, সেটা তিনি তপোবলে জেনেছেন। তিনি রামকে পঞ্চবটীতে বাসের নির্দেশ দিয়েছেন। আমলকী, অশ্বত্থ, অশোক, বট ও বেল এই পাঁচ প্রকার গাছ পঞ্চবট নামে অভিহিত। এই পঞ্চবট যেখানে রয়েছে গোদাবরী নদীতীরে রমণীয় নির্জন পবিত্র সেই স্থানটি পঞ্চবটী। রামের মত পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে, রামের মুনিগণের কাছে বনভূমি রাক্ষসমুক্ত করার অঙ্গীকার। মহর্ষি অগস্ত্য, তাঁর আত্মশক্তিবলে রাক্ষসদের দমন করতে সক্ষম। রাম নিরীহ মুনিরের অভয় দান করেছিলেন, উপদ্রুত বনাঞ্চলে রাক্ষস বধ করে দণ্ডকারণ্যবাসী মুনিদের নিশ্চিন্ত করবেন। মহর্ষির অগস্ত্যর আশ্রমে, সেই সুযোগ নেই। তাই তিনি উপদ্রুত বনাঞ্চলে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। বস্তুত মহান ব্যক্তিদের জীবনে একযোগে বহু উদ্দেশ্য সাধক মহৎ অনেক পরিকল্পনা থাকে। রামের পিতৃশর্তপালনহেতু বনবাসযাপনে একটি ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞা পূরণ হয়েছে তবে সেটি নিঃসন্দেহে পিতৃভক্তির উদাহরণমূলক দৃষ্টান্ত। তবে হয়তো রামের বনবাসের বৃহত্তর উদ্দেশ্য ছিল বহু মহান ঋষিদের সংসর্গে আত্মশক্তির উদ্বোধন এবং ক্ষত্রিয়তুল্য রাজোচিত কর্তব্যপালন। সেই কর্তব্য হল, নিরীহ এবং মহান একযোগে সকলকে নির্ভয় জীবনদান। মহান ব্যক্তিত্বদের জীবন শুধু পৃথিবীতে “আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে” নয়, তাঁদের জীবন মানবকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ। এই পঞ্চবটীর অরণ্যে রামের দ্বন্দ্ববিক্ষোভময় জীবনের আরেকটি পটপরিবর্তনের সূচনা, এখানেই রাক্ষসদের সঙ্গে মুখোমুখি সঙ্ঘাতের ফলে রামের ব্যক্তিগত জীবনেও বিপুল পরিবর্তনের শুরু। রাম, অনায়াসে মহর্ষি অগস্ত্যের স্নেহচ্ছায়ায় নিশ্চিন্তে অরণ্যবাসের অবশিষ্টাংশ অতিবাহিত করতে পারতেন। তিনি তা করলেন না। দায়বদ্ধতা, তাঁকে নিশ্চিন্ত জীবনের স্বস্তি উপভোগ করতে দেয়নি কোনওদিন। পিতার প্রতিজ্ঞাপূরণে স্বেচ্ছানির্বাসন, অন্তঃপুরের রাজনীতি তাঁকে তাঁর নির্দিষ্ট বৃত্তচ্যুত করলেও তিনি অরণ্যে, মাননীয় ঋষিদের সান্নিধ্যে অপরিসীম আশীর্বাদ লাভ করেছেন। অযোধ্যার ভাবি রাজা, বনভূমি রাক্ষসকবলমুক্ত করবার জন্যে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে যেন রাজকীয় দায়বদ্ধতাপালনের অনুশীলন শুরু করলেন। সকলের জীবনেই একটা উদ্দেশ্য থাকে, সেই লক্ষ্য মহৎ বা সাধারণ, যাই হোক না কেন, তা না হলে জীবন অর্থহীন হয়ে ওঠে। লক্ষ্যে পৌঁছনোর চেষ্টায়, মানুষের নিজের অজান্তেই স্বঘোষিত যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। রামের বনবাস, তাঁর নির্লিপ্ত জীবনসংগ্রাম যেন এক লক্ষ্যপূরণের উদাহরণ। তাঁর জীবনাদর্শে বোধ হয় এই সত্য লুকিয়ে আছে যে কোনও কষ্টকরযাপনেও আছে আনন্দের খোঁজ। রামের বনবাস বোধ হয় এই শিক্ষাই দেয়, যত কষ্ট হোক না,জীবনে লক্ষ্য সম্পূর্ণ করার মধ্যে যথার্থ সুখ ও আনন্দের সন্ধান পাওয়া যায়।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content