
ছবি: প্রতীকী।
অতুলনীয় তেজস্বী দুই ভাই, রাম ও ভরত। চিত্রকূটপর্বতে তাঁদের রোমহর্ষক মহামিলনের সাক্ষ্য রইলেন উপস্থিত মহর্ষিবৃন্দ। অন্তরালে অদৃশ্য অবস্থায় মুনিবৃন্দ ও সিদ্ধপুরুষ ঋষিশ্রেষ্ঠগণ কুকুৎস্থকুলোদ্ভব মহৎ দুই ভাইয়ের প্রশংসা করতে লাগলেন — ধন্য রাজা দশরথ। ধর্মবিদ, ধর্ম যাঁদের শক্তিপ্রকাশের স্থান, এমন দুই পুত্রের তিনি পিতা। ঋষিগণ জানালেন, দু’জনের পারস্পরিক আলাপচারিতা শুনে তাঁরা পরম পরিতৃপ্ত হয়েছেন। ঋষিগণ দশানন রাবণের আশু বিনাশের ইচ্ছায়, শ্রেষ্ঠ রাজপুরুষ ভরতকে বললেন, মহাপ্রাজ্ঞ, উদারমনা, মহাযশস্বী, সৎকুলজাত ভরত, যদি পিতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন তবে তাঁর রামের বাক্য মান্য করা উচিত।
ঋষিদের অভিলাষ রাম পিতৃঋণ হতে মুক্ত হন। কারণ, দেবী কৈকেয়ীর ঋণ হতে মুক্ত হয়ে রাজা দশরথের স্বর্গপ্রাপ্তি সম্ভব হয়েছে। মহর্ষি, গন্ধর্ব ও রাজর্ষিগণ এমন ইচ্ছা প্রকাশ করে স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করলেন। প্রিয়দর্শন রাম এই সব বাক্যে আপ্লুত হয়ে হৃষ্টবদনে সমবেত ঋষিদের সম্মান প্রদর্শন করলেন। শঙ্কিত ভরত, ব্যস্ত হয়ে করজোড়ে রামের উদ্দশে বলতে লাগলেন, কাকুৎস্থ রামের, কুলধর্মানুসারে এই ধর্মরক্ষণ এবং জননী কৈকেয়ীর প্রার্থনা পূরণ করা কর্তব্য। ভরত এককভাবে এই সুবিশাল রাজ্যরক্ষণে অসমর্থ। তিনি অনুগত পুরবাসী ও জনপদবাসীদের মনোরঞ্জনের অক্ষমতাও জানালেন। কৃষক যেমন মেঘের প্রতীক্ষায় থাকে, ঠিক তেমনই জ্ঞাতি, যোদ্ধা, মিত্র ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা রামের প্রতীক্ষায় রয়েছেন।
ঋষিদের অভিলাষ রাম পিতৃঋণ হতে মুক্ত হন। কারণ, দেবী কৈকেয়ীর ঋণ হতে মুক্ত হয়ে রাজা দশরথের স্বর্গপ্রাপ্তি সম্ভব হয়েছে। মহর্ষি, গন্ধর্ব ও রাজর্ষিগণ এমন ইচ্ছা প্রকাশ করে স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করলেন। প্রিয়দর্শন রাম এই সব বাক্যে আপ্লুত হয়ে হৃষ্টবদনে সমবেত ঋষিদের সম্মান প্রদর্শন করলেন। শঙ্কিত ভরত, ব্যস্ত হয়ে করজোড়ে রামের উদ্দশে বলতে লাগলেন, কাকুৎস্থ রামের, কুলধর্মানুসারে এই ধর্মরক্ষণ এবং জননী কৈকেয়ীর প্রার্থনা পূরণ করা কর্তব্য। ভরত এককভাবে এই সুবিশাল রাজ্যরক্ষণে অসমর্থ। তিনি অনুগত পুরবাসী ও জনপদবাসীদের মনোরঞ্জনের অক্ষমতাও জানালেন। কৃষক যেমন মেঘের প্রতীক্ষায় থাকে, ঠিক তেমনই জ্ঞাতি, যোদ্ধা, মিত্র ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা রামের প্রতীক্ষায় রয়েছেন।
ভরতের অনুরোধ, ইদং রাজ্যং মহাপ্রাজ্ঞ স্থাপয় প্রতিপদ্য হি। শক্তিমান্ স হি কাকুৎস্থ লোকস্য পরিপালনে।। কারণ রামের এই পৃথিবীপরিপালনের সামর্থ্য আছে। এমন কথা বলতে বলতে রামের চরণে পতিত ভরত, বার বার প্রিয়বচনে প্রার্থনা জানাতে লাগলেন। পদ্মপত্রতুল্য নয়ন, শ্যামবর্ণ, ভরতকে কোলে টেনে নিয়ে, রাম, মত্তহংসের স্বরে বলতে লাগলেন, তোমার নিজ স্বভাবজ রাজোচিত বিনয়বশত যে বুদ্ধি, তাঁর সাহায্যে তুমি বাছা পৃথিবী রক্ষা করতে সক্ষম। আগতা ত্বামিয়ং বুদ্ধিঃ স্বজা বৈনয়িকী চ যা। ভৃশমুৎসহসে তাত রক্ষিতুং পৃথিবীমপি।। ভরতের প্রতি গভীর আস্থা জ্ঞাপন করলেন রাম। অমাত্য, সুহৃৎ, বুদ্ধিমান মন্ত্রীদের সঙ্গে সকল বিষয়ে মন্ত্রণা করে, ভরত, মহৎ কাজ সম্পন্ন করুন। গভীর আত্মপ্রত্যয়ী রাম ঘোষণা করলেন, চাঁদ যদি লক্ষ্মীহীন হয়, হিমালয় যদি হিমশীতলতা পরিত্যাগ করে, সমুদ্র যদি বেলাভূমি অতিক্রম করে তবুও আমি পিতার কাছে কৃত প্রতিজ্ঞা নষ্ট হতে দেব না। লক্ষ্মীশ্চন্দ্রাদপেয়াদ্বা হিমবান্ বা হিমং ত্যজেৎ। অতীয়াৎ সাগরো বেলাং ন প্রতিজ্ঞামহং পিতুঃ।। ভরতের প্রতি রামের অনুরোধ, মা কৈকেয়ী, অতি আসক্তির কারণে বা লোভবশত, ভরতের জন্য যা কিছু করেছেন, ভরত যেন সেগুলি মনে না রাখেন, মায়ের আসনেই যেন জননী কৈকেয়ী অধিষ্ঠিত থাকেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২১: পরিবেশ শুধু প্রাকৃতিক বাতাবরণ নয়, এর প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পৃক্ত

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৪: যুদ্ধ করতে সব সময় পেশীশক্তি নয়, দরকার বিশ্বাসের গল্পও

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬১: রাস্তায় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেলে দুর্গতির কোনও সীমা থাকবে না
সূর্যসম তেজস্বী কৌশল্যাপুত্র রামকে প্রতিপদের চাঁদের মতো সুদর্শন ভরত বললেন, স্বর্ণময় এই পাদুকা দুটিতে পদযুগল স্থাপন করুন। এরাই যে সকল লোকের যোগ ও ক্ষেমের রক্ষক। পুরুষোত্তম রাম, পাদুকাদুটিতে পা রাখলেন।পরক্ষণেই পাদুকাদ্বয় হতে পা-দুটি মুক্ত করে, সেগুলি ভরতকে অর্পণ করলেন। পাদুকাদুটিতে প্রণাম করে, ভরত রঘুনন্দন রামকে বললেন, জটাবল্কলধারী ভরত চতুর্দশ বৎসর যাবৎ ফলমূল ভক্ষণ করবেন। তিনি রামের অপেক্ষায় নগরের বাইরে বাস করবেন।ভরত জানালেন,আপনার পাদুকাযুগলে রাজতন্ত্র অর্পণ করলাম। তবাগমনাকাঙ্ক্ষন্ বসন্ বৈ নগরাদ্বহিঃ। তব পাদুকয়োর্ন্যস্য রাজতন্ত্রং পরন্তপ। চতুর্দশ বৎসর সম্পূর্ণ হওয়ার পরে, সেই দিনই যদি রামকে দেখতে না পান তবে ভরত আগুনে প্রবেশ করবেন। “তথেতি” তাই হবে বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রাম, ভরত ও শত্রুঘ্নকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে বললেন, রামসীতার দিব্য রইল, ভরত, যেন মা কৈকেয়ীকে রক্ষা করেন, তাঁর প্রতি ক্রোধের প্রকাশ যেন না থাকে। এই কথা বলে সাশ্রুনয়নে রাম, ভাই ভরতকে বিদায় দিলেন। ধর্মজ্ঞ ভরত অলঙ্কৃত ও উজ্জ্বল পাদুকাদুটি গ্রহণ করে, রাঘব রামচন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করলেন। ভরত, গজশ্রেষ্ঠর মস্তকে দুটি পাদুকা রাখলেন। হিমালয় পর্বততুল্য স্বধর্মে অবিচল রঘুকুলতিলক রাম,যথাক্রমে সমবেত জনগণ, গুরুগণ, মন্ত্রীবর্গ, প্রজাবৃন্দ ও অনুজদ্বয়কে সসম্মানে বিদায় দিলেন। বাষ্পরুদ্ধকণ্ঠে তাঁকে আমন্ত্রণ করতে অসমর্থ সকল মায়েদের অভিবাদন করে, রাম, কাঁদতে কাঁদতে নিজের কুটীরে প্রবেশ করলেন।
সন্তুষ্ট ভরত, তখন পাদুকাদ্বয় মস্তকে ধারণ করে, শত্রুঘ্নের সঙ্গে রথে আরোহণ করলেন। বশিষ্ঠ, বামদেব, দৃঢ়ব্রত জাবালী, মন্ত্রণাভিজ্ঞ, মাননীয় মন্ত্রিগণ চললেন আগে আগে। তাঁরা পূর্বাভিমুখে প্রবহমানা, মনোরমা, মন্দাকিনী অভিমুখে যাত্রা করলেন। ভরত, মহাপর্বত চিত্রকূট প্রদক্ষিণকালীন বিবিধ রম্য সহস্র ধাতু দেখতে দেখতে চিত্রকূটের পাশে সৈন্যদল-সহ অগ্রসর হলেন। অদূরে ভরদ্বাজমুনির বর্তমান বাসস্থানটি দেখতে পেলেন। রঘুনন্দন বুদ্ধিমান ভরত সেই আশ্রমে রথ হতে অবতরণ করে মহর্ষি ভরদ্বাজের পদবন্দনা করলেন।
সন্তুষ্ট ভরত, তখন পাদুকাদ্বয় মস্তকে ধারণ করে, শত্রুঘ্নের সঙ্গে রথে আরোহণ করলেন। বশিষ্ঠ, বামদেব, দৃঢ়ব্রত জাবালী, মন্ত্রণাভিজ্ঞ, মাননীয় মন্ত্রিগণ চললেন আগে আগে। তাঁরা পূর্বাভিমুখে প্রবহমানা, মনোরমা, মন্দাকিনী অভিমুখে যাত্রা করলেন। ভরত, মহাপর্বত চিত্রকূট প্রদক্ষিণকালীন বিবিধ রম্য সহস্র ধাতু দেখতে দেখতে চিত্রকূটের পাশে সৈন্যদল-সহ অগ্রসর হলেন। অদূরে ভরদ্বাজমুনির বর্তমান বাসস্থানটি দেখতে পেলেন। রঘুনন্দন বুদ্ধিমান ভরত সেই আশ্রমে রথ হতে অবতরণ করে মহর্ষি ভরদ্বাজের পদবন্দনা করলেন।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২২: য পলায়তি, স জীবতি
সন্তুষ্ট ঋষি ভরদ্বাজ জানতে চাইলেন ভরতের কাজ সম্পন্ন হয়েছে? রামের সঙ্গে মিলন হয়েছে তো? ধর্মপরায়ণ ভরত, প্রজ্ঞাবান মহর্ষির প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে জানালেন, ভরত ও গুরু বশিষ্ঠের বহু অনুরোধ সত্ত্বেও দৃঢ়তায় শক্তিমান রাম, পরম প্রীত হয়ে বশিষ্ঠকে জানিয়েছেন, পিতার কাছে কৃত সেই চতুর্দশ বৎসরের (বনবাসের) প্রতিজ্ঞা তিনি যথাযথভাবে পালন করবেন। মহাপ্রাজ্ঞ, বাক্যবিদ, বশিষ্ঠ, রাঘব রামের বচনের প্রত্যুত্তরে বললেন, এই স্বর্ণমণ্ডিত দুটি পাদুকা প্রদান কর। হে মহাপ্রাজ্ঞ, তুমি অযোধ্যার যোগক্ষেমসাধক হও। এতে প্রযচ্ছ সংহৃষ্টঃ পাদুকে হেমভূষিতে। অযোধ্যায়াং মহাপ্রাজ্ঞ যোগক্ষেমকরো ভব।।
গুরুদেব বশিষ্ঠের প্রস্তাবানুসারে রাম পূর্বদিকে স্থিত হয়ে রাজ্যের কারণে সুবর্ণখচিত পাদুকাদ্বয় দান করলেন। ভরত নিজের ফিরে যাওয়ার কারণ বর্ণনা করে বললেন, নিবৃত্তোঽহমনুজ্ঞাতো রামেণ সুমহাত্মনা। অযোধ্যামেব গচ্ছামি গৃহীত্বা পাদুকে শুভে।। আমি সুমহান রামের অনুমতিক্রমে, নিবৃত্ত হয়েছি। শুভ পাদুকাযুগল গ্রহণ করে ফিরে চলেছি অযোধ্যায়। ভরদ্বাজ মুনি, মহাত্মা ভরতের এই সুবচন শুনে বললেন, সচ্চরিত্র মানুষদের মধ্যে তুমি নরশ্রেষ্ঠ, নিম্নগামী জলের মতোই তুমি বিনত, তোমার এই আর্যসম্মত সদাচরণ মোটেই বিচিত্র নয়। নৈতচ্চিত্রং নরব্যাঘ্রে শীলবৃত্তবিদাং বরে। যদার্য্যং ত্বয়ি তিষ্ঠেত্তু নিম্নোৎসৃষ্টমিবোদকম্।। ভরদ্বাজ মুনির মতানুসারে, ভরতের মতো এমন ধর্মাত্মা ও ধর্মবৎসল পুত্র আছে বলেই পিতা দশরথ ঋণমুক্ত হয়েছেন।
অঞ্জলিবদ্ধ, ভরত, ভরদ্বাজমুনির দুটি চরণ জড়িয়ে ধরে তাঁর অনুমতিলাভের জন্যে উদ্যোগী হলেন। অতঃপর মহর্ষি ভরদ্বাজকে বারবার প্রদক্ষিণ করে, মন্ত্রিগণ-সহ শ্রীমান ভরত, অযোধ্যার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। ভরতের অনুসরণরত, যানবাহন, শকট, হস্তী, অশ্বসমন্বিত বিশাল সেনাবাহিনী আবার ফিরে চলল। তারপরে তাঁরা তরঙ্গসঙ্কুলা মনোহারিণী যমুনা নদী অতিক্রম করে কল্যাণসলিলা গঙ্গানদী আবারও দেখতে পেলেন।সসৈন্যে,স্বপরিজনসহ রমণীয়জলপূর্ণা গঙ্গা উত্তীর্ণ হয়ে ভরত সুন্দর শৃঙ্গবেরপুরে প্রবেশ করলেন।সেখান হতে তিনি অযোধ্যা নগরী দেখতে পেলেন।পিতা ও ভ্রাতা পরিত্যাগ করছেন যে নগর সেই অযোধ্যানগরী দর্শন করে, দুঃখজ্বালায় দগ্ধ, ভরত, সারথিকে বললেন— হে সারথি, আপনি দেখুন, বিধ্বস্তা, যেন শূন্যতায় ভরা, নিরানন্দময়ী, দীনদশায় উপনীতা, নিস্তব্ধ অযোধ্যার শোভা আর নেই। সারথে পশ্য বিধ্বস্তা অযোধ্যা ন প্রকাশতে। নিরাকারা নিরানন্দা দীনা প্রতিহতস্বনা।।
গুরুদেব বশিষ্ঠের প্রস্তাবানুসারে রাম পূর্বদিকে স্থিত হয়ে রাজ্যের কারণে সুবর্ণখচিত পাদুকাদ্বয় দান করলেন। ভরত নিজের ফিরে যাওয়ার কারণ বর্ণনা করে বললেন, নিবৃত্তোঽহমনুজ্ঞাতো রামেণ সুমহাত্মনা। অযোধ্যামেব গচ্ছামি গৃহীত্বা পাদুকে শুভে।। আমি সুমহান রামের অনুমতিক্রমে, নিবৃত্ত হয়েছি। শুভ পাদুকাযুগল গ্রহণ করে ফিরে চলেছি অযোধ্যায়। ভরদ্বাজ মুনি, মহাত্মা ভরতের এই সুবচন শুনে বললেন, সচ্চরিত্র মানুষদের মধ্যে তুমি নরশ্রেষ্ঠ, নিম্নগামী জলের মতোই তুমি বিনত, তোমার এই আর্যসম্মত সদাচরণ মোটেই বিচিত্র নয়। নৈতচ্চিত্রং নরব্যাঘ্রে শীলবৃত্তবিদাং বরে। যদার্য্যং ত্বয়ি তিষ্ঠেত্তু নিম্নোৎসৃষ্টমিবোদকম্।। ভরদ্বাজ মুনির মতানুসারে, ভরতের মতো এমন ধর্মাত্মা ও ধর্মবৎসল পুত্র আছে বলেই পিতা দশরথ ঋণমুক্ত হয়েছেন।
অঞ্জলিবদ্ধ, ভরত, ভরদ্বাজমুনির দুটি চরণ জড়িয়ে ধরে তাঁর অনুমতিলাভের জন্যে উদ্যোগী হলেন। অতঃপর মহর্ষি ভরদ্বাজকে বারবার প্রদক্ষিণ করে, মন্ত্রিগণ-সহ শ্রীমান ভরত, অযোধ্যার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। ভরতের অনুসরণরত, যানবাহন, শকট, হস্তী, অশ্বসমন্বিত বিশাল সেনাবাহিনী আবার ফিরে চলল। তারপরে তাঁরা তরঙ্গসঙ্কুলা মনোহারিণী যমুনা নদী অতিক্রম করে কল্যাণসলিলা গঙ্গানদী আবারও দেখতে পেলেন।সসৈন্যে,স্বপরিজনসহ রমণীয়জলপূর্ণা গঙ্গা উত্তীর্ণ হয়ে ভরত সুন্দর শৃঙ্গবেরপুরে প্রবেশ করলেন।সেখান হতে তিনি অযোধ্যা নগরী দেখতে পেলেন।পিতা ও ভ্রাতা পরিত্যাগ করছেন যে নগর সেই অযোধ্যানগরী দর্শন করে, দুঃখজ্বালায় দগ্ধ, ভরত, সারথিকে বললেন— হে সারথি, আপনি দেখুন, বিধ্বস্তা, যেন শূন্যতায় ভরা, নিরানন্দময়ী, দীনদশায় উপনীতা, নিস্তব্ধ অযোধ্যার শোভা আর নেই। সারথে পশ্য বিধ্বস্তা অযোধ্যা ন প্রকাশতে। নিরাকারা নিরানন্দা দীনা প্রতিহতস্বনা।।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৫: সমাপ্তি: শেষ হয়ে হইল না শেষ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৭: আমুর বাজ
বহু দুরূহ পথ পাড়ি দিয়ে ভরত চিত্রকূটপর্বতে রামের সঙ্গে মিলিত হলেন। ভরতের প্রতি সন্দিগ্ধ লক্ষ্মণের অমূলক সন্দেহ, তাঁর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করবার পরিকল্পনা এককথায় নিরসন করে রাম বলেছিলেন, যদ্ দ্রব্যং বান্ধবানাং বা মিত্রাণাং বা ক্ষয়ে ভবেৎ। নাহং তং প্রতিগৃহ্ণীয়াং ভক্ষ্যান্ বিষকৃতানিব। তাঁর কাছে বন্ধুবর্গ, মিত্রগণের বিনাশের মূল্যে লব্ধবস্তু, বিষবৎ গ্রহণযোগ্য নয়। ভরতের জীবনের মূল্যে অযোধ্যার রাজ্যপাট বিষের মতো পরিত্যাজ্য। পিতৃসত্যরক্ষা ও সেই সঙ্গে ভ্রাতৃত্ববোধের ঐক্য বজায় রাখাও রামের লক্ষ্য। শুধুমাত্র বাচিক দায়বদ্ধতাপালনের ঘোষণা নয়,রাম তাঁর আচরণে এই কথার সত্যতা প্রমাণ করেছেন। রাম ও ভরতের বহু প্রতীক্ষিত মিলনের ফল, ভরতের পক্ষে সদর্থক হল না। ভরত, রামকে অযোধ্যায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হলেন। দুই ভাইয়ের কথোপকথন ও তাঁদের গুরুগণের জ্ঞানগর্ভ উপদেশাবলী, শুভাকাঙ্খীদের পরামর্শদান, রাজনীতির প্রেক্ষিতে তাত্ত্বিক ও দার্শনিক নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নতুন দিগ্দর্শন, যুক্তির প্রত্যুত্তরে অকাট্যযুক্তির অবতারণা, তর্কের নতুন উদ্ভাস, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির বাচিক কথোপকথনের অপরিসীম মুন্সীয়ানার পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে। অবশেষে রামের সঙ্গে যুক্তিতর্কে পরাজিত ভরত নতিস্বীকার করেছেন। তিনি এই বিশাল রাজত্বশাসনের অসামর্থ্যজনিত অক্ষমতার কথা জানিয়েছেন। রাম কিন্তু তাঁর বনবাসের প্রতিজ্ঞার অটল, অনড়, থেকেছেন। বিমাতা কৈকেয়ীর প্রতি কোন বিদ্বেষ, ঘৃণা নেই তাঁর। রাম স্থিরনিশ্চিত প্রত্যয়ে ভরতের প্রতি তাঁর আস্থা জ্ঞাপন করেছেন, পরক্ষণেই অতি দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন, অনেক অসম্ভব দৃষ্টান্ত বাস্তবে সম্ভব হলেও হতে পারে কিন্তু পিতার কাছে কৃত তাঁর প্রতিজ্ঞাভঙ্গ কোনও মতেই সম্ভব নয়। অগত্যা ভরত, স্বর্ণময় পাদুকাদুটি রামের চরণপ্রান্তে এগিয়ে দিয়েছেন। বনবাসজীবনে অভ্যস্ত রামের স্বর্ণমণ্ডিত পাদুকা, বাহুল্যমাত্র। ভরতের উদ্দেশ্য বোধ হয়, ভাবি অযোধ্যারাজ রামের পবিত্র স্পর্শধন্য পাদুকাদুটিগ্রহণ। রাম স্পর্শ করে,দুটি পাদুকা তুলে দিয়েছেন ভরতের হাতে। ভরত সসম্মানে গজরাজের পিঠে পাদুকাদুটি স্থাপন করে অযোধ্যার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন। ভরত রামের বনবাস জীবনের কোন স্মৃতিচিহ্ন নয়, সঙ্গে নিলেন রামের স্বর্ণখচিত রাজকীয় পাদুকাদুটি। কেন?
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৪: যুদ্ধ করতে সব সময় পেশীশক্তি নয়, দরকার বিশ্বাসের গল্পও

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৫: মা সারদার সাধুভক্তি
ভরত রাজ্য শাসন করবেন নামসর্বস্ব শাসকরূপে। তাঁর মনে বিরাজমান যোগ্য উত্তরাধিকারী জ্যেষ্ঠ রাম,যাঁর অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব ও রাজ্যশাসনের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। রামের পাদস্পর্শধন্য পাদুকাদুটি যেন রামের প্রতি ভরতের নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রতীক। কিংবা ভরত যখন গজপৃষ্ঠে পাদুকাযুগল স্থাপিত করে ফিরে চললেন অযোধ্যায়, তাঁর আচরণে হয়তো এই বার্তাই নিহিত ছিল — এখন থেকে অযোধ্যার প্রশাসন, রামের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলবে।কারণ পাদুকাদুটি যে সফল প্রশাসক রামের। বনবাসী রামের উপস্থিতির ছায়া প্রজাদের সুরক্ষার বাতাবরণটি সৃষ্টি করবে। ভরত করজোড়ে স্বীকার করেছেন, এতে হি সর্ব্বলোকস্য যোগক্ষেমং বিধাস্যতঃ। এই পাদুকাদুটি সমস্ত লোকের যোগ (অলব্ধবস্তুর লাভ) ও ক্ষেমের (লব্ধবস্তুর রক্ষণ) সাধক হবে। ভরতের বিনম্রতা, জ্যেষ্ঠর প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধাবোধ, রাজ্যশাসনে ঔদাসীন্য, পিতৃদত্তরাজত্বের উত্তরাধিকার যোগ্যপদে ফিরিয়ে দেওয়া, ধর্মবোধ, নৈতিকতা, যুক্তিবোধ, আদর্শনিষ্ঠতা প্রভৃতির নিরিখে কখনও কখনও তাঁকে রামের ছায়া বলে মনে হয়। নৈতিকতায় তিনি যেন কখনও কখনও রামকে ছাপিয়ে উঠেছেন।
পিতার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ভরত যখন পিতা ও মাতার সমালোচনায় সোচ্চার হয়েছেন, তখন যেন তিনি কাব্যের নয়,একজন লৌকিকজীবনের সাধারণ চরিত্রমাত্র হয়ে উঠেছেন। রাম কিন্তু বিপরীতমুখী, তাঁর পিতৃভক্তি শর্তহীন। এ ছাড়াও, বিমাতার প্রতি দায়বদ্ধতাপালনের অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে আটপৌড়ে জীবনের আদর্শনিষ্ঠতার পরশ। মাতরং রক্ষ কৈকেয়ীং মা রোষং কুরু তাং প্রতি। যেন বড় ভাই ছোটভাইকে বলছেন,বাছা মা কৈকেয়ীকে রক্ষা করিস, রাগ করিস না যেন। গার্হস্থ্যজীবনের পরিসরের দ্বন্দ্বময় স্বার্থমগ্ন পৃথিবীর কোলাহল রামচন্দ্রকে স্পর্শ করে না। তিনি আত্মমগ্ন, স্বার্থহীন, বনবাসজীবনে, প্রতিজ্ঞাপালনের আনন্দে বিভোর,নিজসিদ্ধান্তরক্ষায় কঠোর অথচ স্নেহের প্রকাশে কোমলতায় পরিপূর্ণ এক জ্যেষ্ঠ। জীবনের টানাপোড়েন তাঁকে ঋদ্ধ করে, বিচলিত করে তোলে না।
ভরতের মধ্যে আছে এক প্রতিবাদী সত্তা অথচ যাঁর প্রতিবাদ সংবেদনশীলতার আবেদনে হৃদয়স্পর্শী। ধর্মবোধ তাঁর চরিত্রকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে। এমন চরিত্র ঘরোয়া পরিমণ্ডলে বিরল নয়। মাঝে মাঝে, ভরত, রামের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন। লক্ষ্মণ রামের ছায়াসঙ্গী হয়েছেন আর ভরত? তিনি যেন রামের অনুপস্থিতিতে অযোধ্যার রাজসিংহাসনে রামের ছত্রছায়ায় প্রশাসক হয়ে রামের শূন্যস্থান পূর্ণ করেছেন।
দলগত মতাদর্শের ভিত্তিতে পৃথক, বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত, ভারতীয় প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে নয়, কিন্তু পারিবারিক পরিসরে হয়তো আজও নিঃস্বার্থ জ্যেষ্ঠ রাম ও তাঁর অনুগত শ্রদ্ধাশীল অনুজদের উদাহরণ বিরল নয়।—চলবে।
পিতার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ভরত যখন পিতা ও মাতার সমালোচনায় সোচ্চার হয়েছেন, তখন যেন তিনি কাব্যের নয়,একজন লৌকিকজীবনের সাধারণ চরিত্রমাত্র হয়ে উঠেছেন। রাম কিন্তু বিপরীতমুখী, তাঁর পিতৃভক্তি শর্তহীন। এ ছাড়াও, বিমাতার প্রতি দায়বদ্ধতাপালনের অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে আটপৌড়ে জীবনের আদর্শনিষ্ঠতার পরশ। মাতরং রক্ষ কৈকেয়ীং মা রোষং কুরু তাং প্রতি। যেন বড় ভাই ছোটভাইকে বলছেন,বাছা মা কৈকেয়ীকে রক্ষা করিস, রাগ করিস না যেন। গার্হস্থ্যজীবনের পরিসরের দ্বন্দ্বময় স্বার্থমগ্ন পৃথিবীর কোলাহল রামচন্দ্রকে স্পর্শ করে না। তিনি আত্মমগ্ন, স্বার্থহীন, বনবাসজীবনে, প্রতিজ্ঞাপালনের আনন্দে বিভোর,নিজসিদ্ধান্তরক্ষায় কঠোর অথচ স্নেহের প্রকাশে কোমলতায় পরিপূর্ণ এক জ্যেষ্ঠ। জীবনের টানাপোড়েন তাঁকে ঋদ্ধ করে, বিচলিত করে তোলে না।
ভরতের মধ্যে আছে এক প্রতিবাদী সত্তা অথচ যাঁর প্রতিবাদ সংবেদনশীলতার আবেদনে হৃদয়স্পর্শী। ধর্মবোধ তাঁর চরিত্রকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে। এমন চরিত্র ঘরোয়া পরিমণ্ডলে বিরল নয়। মাঝে মাঝে, ভরত, রামের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন। লক্ষ্মণ রামের ছায়াসঙ্গী হয়েছেন আর ভরত? তিনি যেন রামের অনুপস্থিতিতে অযোধ্যার রাজসিংহাসনে রামের ছত্রছায়ায় প্রশাসক হয়ে রামের শূন্যস্থান পূর্ণ করেছেন।
দলগত মতাদর্শের ভিত্তিতে পৃথক, বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত, ভারতীয় প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে নয়, কিন্তু পারিবারিক পরিসরে হয়তো আজও নিঃস্বার্থ জ্যেষ্ঠ রাম ও তাঁর অনুগত শ্রদ্ধাশীল অনুজদের উদাহরণ বিরল নয়।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















