কবি-লেখক মানেই তেমন সৌন্দর্য সচেতন নন, পোশাক-আশাক নিয়ে ভাবেন না, খানিক এলোমেলো, অবিন্যস্ত- অনেকেরই এমন ধারণা, তাঁরা স্বভাব-উদাসীন, খামখেয়ালি, কেউ-বা বোহেমিয়ান। এমন ভাবনা কতটা ভ্রান্ত, তা অন্তত রবীন্দ্রনাথের দিকে তাকিয়ে বোঝা যায়। সব ক্ষেত্রেই তিনি স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল, অন্য কারও সঙ্গে মেলানো যায় না। পোশাকআশাক, সাজসজ্জা নিয়ে তিনি নিজের মতো করে ভেবেছেন। সে ভাবনার মধ্যে মৌলিকতা ছিল, নিজস্বতা ছিল। শুধু পোশাক নিয়েই নয়, কোন রঙের পোশাক পরবেন, তা নিয়েও ভাবনার অন্ত ছিল না। আমরা জোব্বা-পোশাকেই রবীন্দ্রনাথকে ভাবতে, কল্পনা করতে অভ্যস্ত। প্রথম জীবনে তিনি ধুতি পরতেন, পাঞ্জাবি পরতেন। গলায় থাকত সিল্কের চাদর। কখনও ঘরোয়া পোশাকে গায়ে জামা না পরে, ধুতির সঙ্গে ব্যবহার করতেন চাদর। ট্রাউজারও পরতেন। খুব ছোটবেলায় পোশাক কী পরবেন, তা নিয়ে ভাবার একেবারেই অবকাশ ছিল না। সেসব ভাবতেন বাড়ির বড়রা। এমনও হয়েছে, শীতের সকালে একখানা সুতির জামা আর ইজের পরে হি-হি করে কেঁপেছেন। কাঠ-কয়লার আগুনে তাত নিয়ে শীতের হাত থেকে কোনোরকমে নিজেকে রক্ষা করেছেন।
ছেলেবেলায়, যৌবনে রবীন্দ্রনাথ যে খুব বেশি পোশাক সচেতন ছিলেন, তা নয়। এই সচেতনতা তৈরি হয়েছে মধ্য-বয়সে। মাঝেমধ্যে তিনি টুপিও পরতেন। বাহারি টুপি। সুতির বা ভেলভেটের। কখনও ঘন রঙের মোটা সিল্কের টুপি। রানি চন্দ সান্নিধ্য পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের, অত্যন্ত স্নেহ করতেন তাঁকে। ‘গুরুদেব’ নামে একটি বইয়ে সেই সান্নিধ্য-অভিজ্ঞতার কথা তিনি লিখেওছেন। সে বইতে আছে, ‘সে টুপি অন্য কারো টুপির সঙ্গে মেলে না। একেবারে আলাদা। আকারে অনেক বড়ো, নরম। মাথায় পরলে উপরের অংশটা আপনা হতে নানান ভাঁজে নেমে পড়ত। বড়ো সুন্দর লাগত দেখতে। সে টুপি যেন একমাত্র গুরুদেবকেই মানাত। তিনি অনেকবার অনেক রকম করে তৈরি করার পর এ টুপির আবিষ্কার করেছিলেন।’
রানি চন্দের লেখা থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ উৎসব-অনুষ্ঠানে গরদের ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন। পাজামা বা সিল্কের লুঙ্গিও পরতেন। এ ধরনের পোশাক কবি পরতেন সাধারণত বাইরে গেলে। সব সময় পরতেন সুতির লুঙ্গি, সঙ্গে ঢিলে হাতার পাঞ্জাবি। তার ওপর লম্বা জোব্বা। বাইরে বেরোলে কখনও-সখনও দুটো জোব্বাও পরতেন। ভেতরে পরা জোব্বার বুকের ওপর আড়াআড়ি করে কোমরে বোতাম আঁটা থাকত। ওপরে পড়া জোব্বার গলা থেকে পা পর্যন্ত সবটাই থাকত খোলা। রানি চন্দের মনে হত, ‘যেন গায়ে আলগা হয়ে ঝুলতে থাকত জোব্বাটা।’
একই রংয়ের একঘেয়ে জোব্বা পরতেন না রবীন্দ্রনাথ। নানান রঙের, রং-বাহারি জোব্বা ছিল তাঁর। কালো, ঘননীল, খয়রি বাদামি, কমলা, গেরুয়া, বাসন্তী— কত রঙের জোব্বাই না পরতেন কবি। যেটা পরতেন, সেটাই মানাত তাঁকে। এই যে এত রংয়ের জোব্বা, যেটা যখন মন চাইত, সেটাই পরে ফেলতেন, তা নয়। দিন-মাস মেনে কবির পোশাকের রং বদলে যেত। রানি চন্দ শীত যাই-যাই এক বিকেলে দেখেছিলেন, বাসন্তী রঙের এক জোব্বা পরে ঘরের বাইরে বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ। খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল তাঁকে। বেলাশেষের আলো পড়ে পোশাকের রং আরও ঝলমলিয়ে উঠেছিল। এভাবে সেজেগুজে বসে থাকতে দেখে রানি গুরুদেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘এই সময়ে, এই সাজে যে?’
রবীন্দ্রনাথ প্রশ্নের উত্তরে হেসে বলেছিলেন, ‘বসন্তের আসার সময় হল যে, আমি যদি তাকে ডেকে না আনি, কে আনবে বল্? তাই তো বাসন্তী রঙে সেজে বসন্তকে আহ্বান করছি।’ এইটুকু বলেই থামেননি কবি, কৌতুক মিশিয়ে বলেছেন, ‘দেখলি নে, একটু আগে এক পলকের জন্য দখিনহাওয়া পরশ বুলিয়ে গেল। লিখছিলাম, উঠে জোব্বা বদলে নিলাম।’
এই রকমই রংবাহারি জোব্বা পরে হয়তো কবি বসে আছেন। কেউ উচ্ছ্বাস দেখিয়ে ‘বাঃ’ বললে ভারি খুশি হতেন। তাঁকে খুশি করার জন্যে যে ওই প্রশংসা, তা নয়। রঙিন জোব্বায় তাঁকে দেখলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এমন প্রশংসাসূচক শব্দ মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসত। তাঁর এই জোব্বা পরা নিয়ে এক মজাদার অভিজ্ঞতার কথা রানি চন্দ শুনিয়েছেন। দারুণ গরম পড়েছিল সেবার। গ্ৰীষ্মের দাবদাহ। ন-টা বাজতে না বাজতেই দরজা-জানলা বন্ধ করে দিচ্ছিল সকলে। একটু স্বস্তি পাওয়ার জন্য কত রকমের ব্যবস্থাই না রাখা হচ্ছিল! হাতের কাছে রাখা হচ্ছিল হাতপাখা, ছিল পর্যাপ্ত ঠাণ্ডা জল। প্রবল গরমে ঘরের মেঝেও তেতে উঠছিল। তাই মাঝেমধ্যেই মেঝেতে জল ছেটানো হচ্ছিল। গরমের হাত থেকে একটু স্বস্তি পাওয়ার জন্য বুদ্ধি খাটিয়ে এমন কত ব্যবস্থাই না করা হয়েছিল! প্রখর গ্রীষ্মে চারপাশের ছবিটা এইরকমই ছিল। যে ঘরে বসে রবীন্দ্রনাথ লিখতেন, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সে ঘরে তখন উল্টো ছবি। সে দৃশ্য দেখার জন্য রানি চন্দ তৈরি ছিলেন না। দেখে হতবাক হয়েছেন, উত্তপ্ত দুপুরেও কবির ঘরের দরজা-জানলা খোলা। হু-হু করে গরম হাওয়া ঢুকছে। তপ্ত হাওয়ায় শরীর ঝলসে যাচ্ছে। এইরকম দাবদাহে রবীন্দ্রনাথ মোটা কাপড়ের জোব্বা পরে লিখছেন, এ দৃশ্য দেখে রানি আঁতকে উঠে বলেছিলেন, ‘গরম লাগে না আপনার?’ রানির প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ হেসেছিলেন। হেসে বলেছিলেন, ‘তোমার যেমন বুদ্ধি! গরম না লাগবার জন্যই তো মোটা জোব্বা গায়ে দিয়েছি!’
কবি কেন ঘরদোর খুলে রেখেছেন, তা জেনে একটু অবাকই হয়েছিলেন রানি চন্দ। শুধু তো ঘরদোর খুলে রাখা নয়, ওই গরমে মোটা কাপড়ের জোব্বা পরে ঘামতে ঘামতে লিখছেন কবি, সত্যিটা ভাবা যায় না! আসলে গরমে রবীন্দ্রনাথের একটুও কষ্ট হত না। বরাবরই গরম সহ্য করার অসীম ক্ষমতা তাঁর। গরমকে পাত্তা দিতেন না একেবারেই। তাই সহজ গলায় রানিকে প্রশ্ন করতে পেরেছিলেন। জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘গরম লাগে কেন? গরম হাওয়াটা গায়ে এসে লাগে বলেই তো?’
রানির উত্তরের প্রতীক্ষা না করে গরম থেকে বাঁচার সহজ উপায় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন নিজের মতো করে। অনায়াস দক্ষতায় যেন মুহূর্তে সমস্যার সমাধান। রানিকে বলেছিলেন,’মোটা কাপড় দিয়ে গা-টা ঢেকে দাও। তাহলে গরম হাওয়াটা আর গায়ে লাগবে না।’ এসব বলে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দিয়েছিলেন সুপরামর্শ। বলেছিলেন, ‘এখন বুঝছো তো মোটা জোব্বা পরেছি কেন! তুমিও একটা মোটা কাপড় গায়ে দাও।’ কবির সেই সহাস্য সুপরামর্শ রানি মেনে নিয়েছিলেন কিনা, তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। রানি চন্দ তা জানাননি তাঁর স্মৃতিচর্চায়।
গ্রীষ্মকাল রবীন্দ্রনাথের অপছন্দের ছিল না। জীবনের বেলাশেষে অবশ্য গরম একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। শান্তিনিকেতনে গরম একটু বেশিই পড়ে। বৃদ্ধ-বয়সে গ্রীষ্মের দাবদাহে সেখানে থাকতে রবীন্দ্রনাথের বেশ কষ্ট হত। তারপরও আশ্রম আঁকড়ে থাকতেই তাঁর ভালোলাগত। যতই গরম পড়ুক, আশ্রম ছেড়ে কোথাও যেতে চাইতেন না। বলতেন, ‘ক-টা দিন তো! দেখতে দেখতে কেটে যাবে।’ কবির কথা অচিরেই সত্য হয়ে উঠত। মেঘ ছেয়ে যেত সারা আকাশে। শুরু হত গুরুগুরু গর্জন। তারপরই ঝমঝমিয়ে বর্ষা। রবীন্দ্রনাথ বর্ষার জন্য হা-পিত্যেশ করে থাকতেন।
বাদল দিনে, বর্ষায় কবি পরতেন গাঢ় নীল রঙের জোব্বা। বর্ষা ছিল তাঁর প্রিয় ঋতু। বর্ষা মানেই আকাশে মেঘ। আর সে কারণেই মেঘের রঙের, গাঢ় নীল রঙের জোব্বা পরতেন কবি।
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com