মঙ্গলবার ৯ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
আদিনাথ দাশগুপ্ত ডায়মন্ড হারবারে নিজস্ব নিঃসঙ্গতার পথ দিয়ে হেঁটে যখন তখন পৌঁছে যেতে পারেন প্রাকভূমে। কখনও ফরিদপুর, কখনও কলকাতা। ইদানিং কলকাতার স্মৃতিই তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ডায়মন্ড হারবারের নির্জন কক্ষে চোখ বন্ধ করলেই তিনি স্পষ্ট নিজেকে দেখতে পান মধ্য কলকাতার ত্রিতল গৃহের আভিজাত্যে। আর দেখতে পান নিজের খণ্ডিত সত্তায়।

কিন্তু শহরবাসের শেষ অঙ্কের দিনগুলো প্রমাদ গুনেই কাটতো আদিনাথের। কীসের ভয়! একদিন ডেকে পাঠিয়েছিলেন বড় ছেলেকে। নিজের ঘরে। ভালো লাগছিল না। পূর্ববঙ্গের ডাকসাইটে উকিল কলকাতার ডিএল রায় স্ট্রিটের তেতলা বাড়ির হাওয়ায় হাওয়ায় বিপদের গন্ধ পাচ্ছিলেন। ভাবছিলেন কেন তাঁকে চলে যেতে হচ্ছে! আবার ভাবছেন বিপদ আবার কী! রইলই তো ছেলেরা।
পিসতুতো ভাই অমূল্য বাড়ি দেখে রেখেছে। বড় বাড়ি। অসুবিধা হবার কথা নয়। তবু বুকের ভিতর বালির বাঁধ ভাঙছিল। সেই একই যন্ত্রণা। একাকিত্বের। আলাদা হয়ে যাবার। জ্যেষ্ঠ পুত্রের কাছ থেকে বিদায় নিতে হবে পুনর্বার। আবার তাঁর জন্য নির্ধারিত হল অন্যবাস। দেবব্রত তাঁর বড় ছেলে। কেন যেন আদিনাথের জীবনের একমাত্র সম্বল। ঢেউয়ের ধাক্কায় ঝুপঝুপ করে ভাঙছিল তীরভূমি। অশনি সংকেতময় সেই ভাঙনের শব্দ এখনও কানে বাজে। ভিতরের বদ্ধ দীর্ঘশ্বাস বুক ফুঁড়ে বাইরে বেরোনোর আগে তাই আর একটিবার বলে দেখতে চাইছিলেন তাঁর খোকাকে। দেবব্রতকে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৪: রাঙা মেঘের বেলাভূমি

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— গন্ধগোকুল

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৬: কবির টুপি, কবির জোব্বা

আদিনাথ বলতে চাইছিলেন, এখান ছেড়ে না গেলেও যদি চলে! কেন যেন মনে হচ্ছিল রামের স্বাস্থ্য রক্ষায় ডায়মন্ড হারবারে যাত্রার ব্যবস্থা নিছক অজুহাত। মনে হচ্ছিল চির-নির্বাসন। স্ত্রী এবং সন্তানরা তাঁর সঙ্গে থাকবে ঠিকই, কিন্তু তারা আদিনাথের হৃদয়ের কত শতাংশ অধিকার করে রাখতে পেরেছে? বিশেষ করে, রাম! কোথাও কি এক ফোঁটা জায়গা খালি আছে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র রামচন্দ্রের জন্য! নেই! নেই! রামের থাকা না থাকায় সত্যিই কিছু যায় আসে না।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১১৪: ডেসডিমোনার রুমাল / ১৩

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৫: অকৃতজ্ঞ-জাতক : কৃতঘ্ন

ইস! কী ভাবছেন আদিনাথ! এতখানি অবহেলা ওই অসুস্থ সন্তানের প্রতি! তাঁর আত্মজ! ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছেয়, তাঁর ঔরসজাত তো বটে! হ্যাঁ, ঠিকই, অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু তাতে রামের দোষ কোথায়! সবচেয়ে বড় কথা, সুনীতির অপরাধ কী? চল্লিশ বছরের পূর্ণ পুরুষ আদিনাথ পনেরো বছরের কিশোরীকে বিবাহ করেছিলেন স্বেচ্ছায়। সেই অ-কালবেলা থেকে আজ পর্যন্ত সুনীতির সমর্পণে তো কোনও দ্বিধা ছিল না। কোনও কালেই না। অথচ এখনও নিজেকে দেবব্রত শিবব্রতর পিতা হিসাবে অন্য উচ্চতায় ভাবেন আদিনাথ। হে ঈশ্বর! এমনটা সত্যিই তিনি ভাবেন। কিন্তু বিধাতার পরিহাস! দেবুর সঙ্গ ত্যাগ করতেই হল তাঁকে। সাধারণদের সঙ্গে মিশে ছাড়তে হল তাঁরই স্বনির্মিত বাস্তু।
—বাবা আসবো?
দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন দেবব্রত। আদিনাথ একটু সময় অপলকে তাকিয়ে ছিলেন ছেলের দিকে। সুঠাম। গৌর কান্তি। শান্ত। টানা টানা চোখ। রাজপুরুষ যেন। ইন্দুমতী আর আদিনাথের কত বিভোর স্বপ্নময় আনন্দের সন্তান। মাথা নেড়ে ভিতরে ডাকলেন। বিছানার ধারের গুটোনো চাদর টুকু টেনে ইঙ্গিত করলেন পাশে বসতে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৩: জরাসন্ধের ঔদ্ধত্য ও কৃষ্ণের ভূমিকা যুধিষ্ঠিরকৃত রাজসূয় যজ্ঞের প্রাসঙ্গিক সূচনা

দশভুজা, অন্য লড়াই: এই স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করিনি

অপেক্ষমান বাদল হওয়ার গন্ধ নিয়ে অপেক্ষা করছিল কয়েকটা নিশ্চুপ মুহূর্ত। আদিনাথ গুছিয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে। বেশ স্পষ্ট গলায় বললেন—
—খোকা আমাগো এখানকার পাট ক’দিনের লাইগ্যা উঠাইতে হইব?
দেবব্রত প্রস্তুত হয়ে এসেছিলেন। প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর মিলল।
—কী বলছেন বাবা। পাট উঠবে বলছেন কেন! ডায়মন্ড হারবারে যাবার ব্যাপারে বলছেন?
মাথা নেড়ে নীরবে সম্মতি জানালেন আদিনাথ। স্মিত হাসিতে মুখ ভরে গিয়েছিল দেবব্রতর।
—বাবা এ আপনার গৃহ। আপনার ইচ্ছায় আমরা সকলে চলি। রামের শরীর যে জায়গায় পৌঁছেছে তাতে বুঝতে পারছি অবস্থা সুবিধার নয়। ডাঃ বিধান রায়কে এনেও তো দেখালাম। আরও কয়েকজন ডাক্তারের সঙ্গে ওর রিপোর্ট নিয়ে আমার কথা হয়েছে। প্রত্যেকেই কিন্তু বলছেন চেঞ্জ এর ব্যাপারটা হলে ভালো। বিশেষ করে সমুদ্রের ধারে কোনও জায়গা। এবার আপনি যেমন ভালো বুঝবেন। রাঙা কাকাকে বলেছিলাম। ডায়মন্ড হারবারে রাঙা কাকার নিজস্ব একটা বাড়ি আছে। আপনি তো জানেন। তাছাড়া কাকার আরেকজন বন্ধু আছেন। তাঁদের বাড়িটা আরও বড়। সমুদ্র থেকে আধ কিলোমিটারের মধ্যে। সে বাড়ি ফাঁকাই পড়ে আছে। আপনি সম্মতি দিলে লোকজন দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিয়ে রাখবেন ওঁরা। বিন্দুমাত্র অসুবিধা হবার কথা নয়।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৭: মধ্যরাতের অভিযান

স্তব্ধ হয়ে শুনছেন আদিনাথ। বুদ্ধির সুড়ঙ্গ দিয়ে কথাগুলোকে নিরপেক্ষভাবে ওঠানামা করালে কোনও গতিতেই এই কথোপকথনের অন্তরালে বিপদের গন্ধ পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় না উৎখাত করাবার কোনও সংকেত। তাছাড়া দেবু থাকতে তাঁর সঙ্গে এমন অন্যায় করবে কে?
এবার আদিনাথের প্রসন্ন মুখ।
—ওসব কথা ছাড়ান দাও। তোমার অফিসের খবর কী কও দেহি? কথাই তো হয় না তোমার লগে।
—অফিস একদম ঠিক আছে বাবা আপনার আশীর্বাদে। শুধু প্রেশার আছে। তবে আপনার কাছ থেকে শিখেছি কাজের প্রেশার না থাকলে মানুষ কর্মযোদ্ধা হয় না। আলস্য রাখি না বাবা। সর্বদা কাজের মধ্যে থাকি।
—বাহ্ বাহ্!
—আর বাবা আপনাকে আর একটা কথা আমার জানানো হয়নি। আমি ভাবছি একটা নিউজ পেপার প্রকাশ করব, ইংরেজিতে।
—কও কী!
চমৎকৃত হন আদিনাথ।
—কীভাবে করবা। সে তো ভারি কঠিন কাম। উপরন্তু প্রচুর কানেকশনস, ইনভেস্টমেন্ট ইত্যাদিও লাগে!
—হয়ে যাবে বাবা। সমস্ত বন্দোবস্ত ধরে নিন এক পক্ষে হয়েই আছে। কংগ্রেসের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়েছে।
—তাই বুঝি? যেমন?
—জগজীবন রাম। মুজিবর রহমান। আর বিধান রায় তো আছেনই।

আদিনাথের দক্ষিণ হস্ত নিজের অজান্তেই গভীর স্নেহে উঠে এসেছে জ্যেষ্ঠ পুত্রের মাথায়। গর্বে গর্বে ফাঁকা বুকখানা ভরে গিয়েছিল তাঁর। বলেছিলেন—
—এভাবেই আগায়া চলো বাবা সম্মুখের দিকে। পিছু ফেরা তাকাইবা ক্যাবল সুখ স্মৃতির টানে। মধুর সম্পর্কের বন্ধনের টানে। পশ্চাৎ জুইড়্যা আন্ধার। সেই আন্ধার হইতে মুখ ফিরাইয়া রাখো। নতুবা সম্মুখের আলোর দিকে হাঁটতে পারবা না বাবা।—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content