রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
অপুর প্রসঙ্গ এলেই পথের পাঁচালী থেকে অপরাজিত হয়ে অপুর সংসার হয়ে… অপুর চলার অনন্ত পথ চলতেই থাকে। এই প্রসঙ্গ এলেই আসে চলমান রেলগাড়ির কথা, এবং সেই আইকনিক দৃশ্য। কিন্তু অপুর যাত্রাপথ জুড়ে বেশ কয়েকবার চলমান রেলগাড়ি এসেছে। এই পথ, চলমান রেলগাড়ি গতি ও বিপুল সম্ভাবনার ব্যঞ্জনা নিয়ে উপন্যাস থেকে সিনেমায় এসেছে। অপুর চলার পথ যতো এগিয়েছে, ততোই রেলগাড়ির সঙ্গে তার নৈকট্য বেড়েছে। একদিন বনজঙ্গল ভেঙে যে রেলগাড়ি দেখতে ছুটতে হয়েছিল দিদির সঙ্গে সেই রেলগাড়ির লাইনের পাশেই কোনও বাড়িতে অপু সংসার পাতে।
তবে সে তো অনেক পরের কথা। মাঝে রেলগাড়ি করে যাওয়া আসা, বৃহত্তর নগরজীবনে পদপাত। দারিদ্র্যে ভরা জীবনে বৃহত্তর, মহত্তর কিছুর আকাঙ্ক্ষা ও জ্বলে ওঠা জ্ঞানের আলোকে সঙ্গী করে বিরামহীন এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গেই টেলিগ্রাফের ধ্বনি, চলমান ট্রেন, ট্রেনযাত্রা ইত্যাদির অনুষঙ্গ ‘চরৈবেতি’র মূল সুরটিকে ধরে রাখে। অনন্ত পথ কিংবা সমান্তরাল রেললাইনের দুটি প্রান্তের মিলন কখনও হয় না। তাই অপু কখনও ফেরে না তার জন্মভূমির গ্রামে। বরং দেশ-দেশান্তর থেকে মহানগরে উপনীত হয় ক্রমে ক্রমে। কথক ঠাকুর হরিহর রায়ের ছেলে অপুর ভবিষ্যত্ যজন-যাজনের ঘূর্ণিপাকে আটকে থাকে না। পঞ্জিকাকে সে সূর্যোদয়ের সময় দেখার কাজে লাগায়। ভোর ভোর উঠে যাত্রা করে কলকাতার দিকে ট্রেনে চড়ে। কলেজে সমকালীন পাশ্চাত্ত্যজ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত বিজ্ঞানশিক্ষায় তার মেধা ও মনন জারিত হয়। তখন গ্রামে তার মন টেকে না। কাশী থেকে ফিরে সর্বজয়া ও অপু যে গ্রামে আশ্রয় পায়, সেখানে বাল্য পার করে করে কৈশোরবেলাও তার কাটতে বসে। মা সর্বজয়া সেখানে নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে কাটাতে ইহলোকের মায়া কাটায়। আজকের নির্বাচিত অংশটি এই পর্বের।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৭ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: দেখা হবে চন্দনের বনে

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— গন্ধগোকুল

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৬: কবির টুপি, কবির জোব্বা

অপরাজিত-তে এই অপু খানিক আত্মকেন্দ্রিক যেন, যে কলেজে, পড়াশোনায় বিশেষ আগ্রহী, মায়ের সঙ্গ, গ্রামের একঘেয়ে জীবন তার কাছে নিতান্তই গৌণ তখন। অথচ সর্বজয়া পুত্রের কাঙ্ক্ষিত নৈমিত্তিক উপস্থিতির জন্য সতৃষ্ণ থাকে। তৃষ্ণার্ত সেই মাতৃহৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তার দেহাবসান ঘটে।

এই পর্বের দৃশ্যায়নের একটি পর্যায়ে মা ও ছেলের শেষবেলার, শেষ রাত্রি ও শেষ দিনের কাটানো ছিন্ন ছিন্ন মুহূর্তগুলি পর পর সাজানো থাকে ছবিতে। নিদ্রিত পুত্রের যাথাকালে নিদ্রাভঙ্গে বিলম্ব করে সর্বজয়া, ইচ্ছে করেই, চলে যাওয়ার আগের সময়টিকে তার মাতৃহৃদয় যেন প্রলম্বিত করতে চায়। মা ও ছেলের এই নৈকট্য, সখ্য, অভিমান কিংবা দূরত্বের মাঝে থাকে ট্রেনযাত্রা। বাঁধা নিরলস সময়ের অমোঘ হয়ে ওঠাটাই বুঝি ফুটে উঠতে থাকে একটু একটু করে। অপু যথারীতি প্রস্তুত হয়, মা তার বাক্স গুছিয়ে দিয়েছে। বাক্স-বিছানা হাতে তুলে দেয় মা। অপু বলে ওঠে, চললাম। এও এক প্রথা ভাঙা। তারপরেই সর্বজয়া যখন বাক্সের চাবি গমনোন্মুখ অপুর হাতে তুলে দেয়, নির্নিমেষে চেয়ে থাকে পুত্রের চলে যাওয়ার পথের দিকে তখন হয়তো বা রসজ্ঞ দর্শক ওই প্রথাভাঙা ‘চললাম’ ও চাবিকাঠির অনুষঙ্গে বিচ্ছেদের সুর শুনতে পান। জীবনের বাক্স, শৈশব-বাল্য-কৈশোরের স্মৃতিময় মেদুর মঞ্জুষার উত্তরাধিকার, ওই চাবিকাঠিটি ক্ষণিক ব্যবধানে হাতে তুলে দেওয়ার অনায়াস আকস্মিকতার মধ্য দিয়েই পরিচালক দর্শককে মনোযোগী করতে চান তাঁর অভীষ্টে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৫: পরবাস প্রস্তুতি (এক)

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৫: অকৃতজ্ঞ-জাতক : কৃতঘ্ন

আর ক’দিন থেকে যাওয়ার জন্য মায়ের পূর্ব-আবেদন অনুযোগ ইত্যাদি উপেক্ষা করেই সেদিন অপু যথারীতি বেরিয়ে পড়ে। সর্বজয়ার বাধা দেয় না, বাক্স-বিছানা গুছিয়ে হাতে তুলে দেয়। অপু দ্রুতপায়ে স্টেশনে আসে, টিকিট কেটে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করে। ট্রেন আসার মুহূর্তে তার ভাবান্তর দেখা যায়। সে ফিরে আসে। সর্বজয়া জানল, ট্রেন চলে গিয়েছে, সে খানিক আক্ষেপ করে পড়াশোনার ক্ষতির আশঙ্কায়। কিন্তু মনে মনে প্রসন্ন হয়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৩: জরাসন্ধের ঔদ্ধত্য ও কৃষ্ণের ভূমিকা যুধিষ্ঠিরকৃত রাজসূয় যজ্ঞের প্রাসঙ্গিক সূচনা

দশভুজা, অন্য লড়াই: এই স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করিনি

অপুর সঙ্গে সর্বজয়ার দেখা হয়নি আর কখনও। অপু রিপন কলেজের পড়াশোনা ও পার্টটাইম প্রেসের কাজের নাগরিক জীবনে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। বাড়ি ফেরার জন্য মায়ের পাঠানো চিঠির জবাব দেয় না। সে জানতে পারে না ঘোরতর অসুস্থতার সংবাদ। শেষে একখানি জরুরি চিঠি পেয়ে গ্রামে ফেরে বটে, তবে সর্বজয়া তখন আর নেই।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৭: মধ্যরাতের অভিযান

যেমনটা ঘটেছিল স্ত্রী অপর্ণার ক্ষেত্রেও, সেখানেও ঘরের পাশেই রেলগাড়ির চলাচলের সুর। যেমনটা ঘটেছিল দিদি দুর্গার বিয়োগে, সেও সুস্থ হয়ে রেলগাড়ি দেখার একান্ত বাসনা পোষণ করতো। অপুর জীবন ছুঁয়ে যাওয়া মৃত্যুগুলি ঘিরে রেলগাড়ির অনুষঙ্গ আবর্তিত হয়। মা সর্বজয়ার সঙ্গে চিরবিচ্ছেদের মুহূর্তগুলিও ঘনীভূত হচ্ছিল রেলগাড়ির চলে যাওয়ার মিথ্যা আশাবাদের ছলনায়। রেলগাড়ির চলে যাওয়া সেই আসন্ন বিচ্ছেদের সূত্রটিকেই যেন স্পষ্ট করতে চায় চিত্রভাষায়। অপুর এই উল্টো পথে হেঁটে মাতৃসকাশে সাময়িক অবস্থিতি যে একান্তই বেমানান, এই ক্ষণিক সুখ যে ভাবী কোনও বিপর্যয়ের পথটিকেই প্রশস্ত করছে যেন এই আশঙ্কা জেগে উঠতে পারে দর্শকের মনে। দুর্গা রেলগাড়ি দেখতে চেয়েছিল, দেখা তার হয়ে ওঠেনি। সেই ধ্রুব বিচ্ছেদের ভার অপু বহন করেছে আজীবন। মায়ের আকুতি, কর্মজগতের আহ্বান ও মাঝে বহমান রেলযাত্রা ও অপুর আকস্মিক প্রথাভাঙা এই প্রত্যাবর্তনের অনুষঙ্গে তবে কি সেদিন চরৈবেতির মন্ত্রে দীক্ষিত অপুর পথের দেবতা মৃদু হেসেছিলেন খানিক?—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content