শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

অকালরাবী অর্থাৎ যথাকালে যে রব করে না, ডাকে না। এই কাহিনি এক মোরগের। অকালে গৃহীত উদ্যোগ বৃথা হয়। অযথার্থ সতর্কবাণী, বৃথাভাষণ কিংবা যথাকালে নির্বিকার অনুদ্যোগ নিষ্ফল হয়ে থাকে। রাজনীতিশাস্ত্রে এর যাথার্থ্য উপলব্ধি করা যায়। কালজ্ঞান কূটনীতিজ্ঞ সুশাসকের প্রজ্ঞার পরিচায়ক। রাজাকে হতে হয় “যথার্হদণ্ড” কিংবা “যথাকালপ্রবোধী”। অকালরাবী কুক্কুটের কাহিনি সেই যথাকালজ্ঞানের উপদেশ দেয়।

সামাজিক অভিজ্ঞতা অকালপ্রসূত অথবা অকালসম্বদ্ধ বিষয়কে ব্যতিক্রমী কিংবা অকার্যকর, অপরিণত আখ্যা দেয়। তার সত্যাসত্যের নির্ণয়ের জটিল আবর্তের উপস্থাপন এ কাহিনির লক্ষ্য নয়। যা ব্যতিক্রম, তা নিয়মের অধীন হয় না। এই কাহিনি অনুসরণীয় কিছু নীতি ও নিয়মের উপলব্ধির সঙ্গেই অন্বিত। প্রথমে কাহিনিটি দেখে নেওয়া যাক।

সেই জন্মে বোধিসত্ত্ব উদীচ্য-ব্রাহ্মণকুলে জন্মেছেন। তখন বারাণসীর রাজা ব্রহ্মদত্ত। ক্রমে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক হলেন, হলেন সর্ববিদ্যানিষ্ণাত এক সুবিখ্যাত অধ্যাপক। তাঁর পাঁচশ’ শিষ্য ছিল। সেই শিষ্যদলের একটি কালজ্ঞ কুক্কুট ছিল। সেই মোরগ যথাকালে ডাকতো, সেই ডাক শুনে শিষ্যদের নিদ্রাভঙ্গ হলে তারা যথাকালে পাঠে মনোযোগ দিতো। এভাবেই কাল অতিবাহিত হচ্ছিল। একদিন সেই কুক্কুটটি মারা গেল। তখন আরেকটি মোরগের সন্ধান শুরু হল। এক শিষ্য শ্মশানবনে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে একটি মোরগ দেখতে পেল। তাকে ধরে এনে খাঁচায় বন্দি করে রেখে দিল সে।
এই মোরগটি শ্মশানের পরিবেশে বেড়ে উঠেছিল। তাই সমাজ-জীবনে যে কালজ্ঞান সামাজিক জীবের থাকে বা থাকা উচিত তা সেই কুক্কুটের ছিল না। সে দেখেছে মৃতদের, দেখেছে তার শোকার্ত পরিজনদের। সেখানে যেন সময়ের গতি রুদ্ধ, অথবা তা মহাকালের রূপে অনন্ত। তাই অহোরাত্র, পূর্বাহ্ন-সায়াহ্নের ভেদজ্ঞান তার হয়ে ওঠেনি তেমন। কখনও গভীর নিশিরাতে, কখনও বা উষাকালে সে ডেকে উঠতো। তাকে অনুসরণ করে গভীর রজনীতে শিষ্যদের নিদ্রাভঙ্গ হতো। তারা পাঠ আরম্ভ করতো বটে, কিন্তু প্রবল নিদ্রাভাব তাদের আচ্ছন্ন করে রাখতো, প্রাতঃকালের পূর্বেই তারা ক্লান্ত হয়ে পড়তো, তাদের লক্ষ্যপূরণ হতো না।

আবার, প্রত্যুষকাল অতিক্রান্ত হলে প্রভাতের পরে মোরগটি যখন ডাকতো তখন আর পাঠের সময় থাকতো না। এই কুক্কুটের খামখেয়াল, তার অযথার্থ কালজ্ঞান শিষ্যদের লব্ধকাম হতে দিচ্ছিল না। শিষ্যের দল এই কুক্কুটের অকালরবে ব্যর্থকাম ও বিফলমনোরথ হতে হতে ক্রমে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। একদিন কুক্কুটটিকে হত্যা করে তারা আচার্যের কাছে এই বার্তা উপস্থাপিত করলো। সম্ভবত, মোরগের এই আচরণের কারণ তাদের অজ্ঞাত ছিল অথবা এ বিষয়ে তাদের কিছু অনুসন্ধিৎসাও ছিল।
আরও পড়ুন:

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৪: বিড়াল জাতক : অতি চালাকের?

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৬৪: আকাশ এখনও মেঘলা

আচার্য তাদের জানালেন যে এই কুক্কুটটির শিক্ষা অযথার্থ, কারণ তার বৃদ্ধি ঘটেছে অযত্নে, প্রকৃষ্ট পরিচর্যার অভাব থেকে গিয়েছিল তার জীবনে। মাতা-পিতা অথবা আচার্যের যথাযথ সান্নিধ্যরহিত সেই মোরগটির কাল ও অকালের জ্ঞান জন্মায়নি। তাই তার এমন পরিণতি।

অকালরাবী, অকালজ্ঞ মোরগটির অকালমৃত্যু পাঠকের অনুসন্ধিৎসা জাগতে পারে। জাতকমালার কাহিনি ও বোধিসত্ত্বের উল্লেখের পাশেই হিংসা, বধ ও প্রাণিহত্যার মধ্য দিয়ে নীতির প্রতিষ্ঠা কি সমীচীন বা সমীচীন নয় এ তর্ক এখানে বৃথা মনে হয়। কারণ, কালাধীন জীবনের অনিবার্য পরিণতি মৃত্যু ও জীবনকালব্যাপী অপরিহার্য কর্মপ্রণোদনার বিশিষ্ট তাত্পর্যের পাশে কালজ্ঞানের তত্ত্বের প্রতিষ্ঠায় প্রাণিবধ এখানে প্রতীকমাত্র বলেই মনে হয়। তাছাড়া, বোধিসত্ত্ব তখনও বোধিলাভ করে বুদ্ধত্ব অর্জন করেননি।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০০ : স্থানীয়রা দিনে কৃষি কাজ করতেন, আর রাতে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতেন বিপ্লবীরা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৫: নৈতিকতার নিরিখে, মল্লযুদ্ধে জরাসন্ধবধ, আজও প্রাসঙ্গিক কেন?

এই কাহিনির তাত্পর্য ঠিক কী? যথার্থ পালন ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে প্রকৃত জীবনবোধ, সামাজিক বোধ ও অবিচল আদর্শ জন্ম নেয়। এর অভাবেই অশিক্ষিত, অবিনীত মোরগ তাই যখন তখন ডেকে ওঠে। কিন্তু তার কুক্কুটরবের যথাকালটি হল প্রত্যুষ। এটি সামাজিক অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। তার ব্যত্যয়ে শিষ্যের দল বিব্রত হয়েছে। নিয়মের অন্ধ অনুসরণ বা অনুকরণ নয়, যা জীবনের সাপেক্ষে যথার্থ ও সত্য, তা-ই কর্তব্য। সেই কর্তব্যকর্ম সমাজ ও জীবনবোধের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু পরিত্যজ্য, অননুষ্ঠেয় বা উল্লঙ্ঘনীয় হতে পারে না। যথাকালে কর্ম সম্পাদনের তাত্পর্য এখানেই।

গুণবান আচার্যের ধীমান শিষ্যরা সেই যথাকর্তব্যের অনুষ্ঠানের পথে সংঘটিত ব্যাঘাতে বিচলিত হয়েছে কিন্তু মোরগটি নিয়মের উল্লঙ্ঘনে কিছুমাত্র বিচলিত হয়নি। জ্ঞান ও অজ্ঞানের পার্থক্য এখানেই। জ্ঞান সত্যোপলব্ধি ঘটায়, উপলব্ধির পথে উত্তরণের মূলে যে অনুভব বা বোধের উদ্ভাস অপরিহার্য অজ্ঞান তাকেই আচ্ছন্ন রাখে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৬: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— সবুজ কাছিম

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!

জীবনের প্রণোদনায় মানুষ কর্মচ্যুত হয় না বটে, তবে যথাকর্তব্যের অনুষ্ঠানের পথে যে কাজটি যখন করা উচিত ঠিক সেই সময়েই সেই কাজটি করে ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রেরণা বা উদ্যোগের অভাব প্রায়শঃই দেখা যায়। এমন অকালকর্ম সাধু হলেও নিষ্ফল। এমন অকালকর্ম জীবনকে পূর্ণ করে না, পূর্ণ হতে দেয় না, বরং, বিপদ ডেকেও আনতে পারে। যখন যে কাজটি করা প্রয়োজন তখন সেটি না করলে যেমন ব্যাঘাত ঘটে, তেমন-ই অকালে সেই কর্মটি করলে হিতে বিপরীত ঘটে যায়। অপরিণামদর্শী মোরগের জীবনে সেটিই ঘটেছে।

জীবনে কর্মের উদ্যোগ অপরিহার্য বটে, তবে তার সঙ্গে কালজ্ঞানটিও আবশ্যক। যথাকর্তব্যের অনুষ্ঠান রাজা, শাসক থেকে সাধারণ রাষ্ট্রবাসী কিংবা সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী সকলের জন্যই অনিবার্য। যথাকালে যথাকর্তব্যের পরিপালনে অভ্যুদয়, অকালে অকর্মের অনুষ্ঠানে বিপন্নতা, এই হল এই কাহিনির প্রকৃত তত্ত্ব।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক পর্ব-১৬২ : আঁধারে আলো

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

কালে কালে রাষ্ট্রের স্বরূপ ও চরিত্র বদলায়। বদলে যায় জীবনের লক্ষ্য, জীবনবোধ ও তার আদর্শ। সমাজ ও মানুষের আকাঙ্ক্ষার জগতে অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন আসে। জীবন সুপ্ত বোধকে জাগিয়ে তোলার প্রেরণা দিতে থাকে আমরণ। নিদ্রাভঙ্গ কিংবা কর্মারম্ভের জন্য যথাকালীন শয্যাত্যাগেই সেই গড়ে ওঠা, বেড়ে ওঠার, পরিণতির তাত্পর্য শেষ হয়ে যায় না, তা গিয়ে মেশে অন্তর্লোকের জাগরণে।

নিশীথরাতের প্রহরী যখন গৃহস্থকে সতর্ক করে যায় সাবধান থাকার জন্য সেখানেও যেমন এই কালজ্ঞানের তাত্পর্য থেকে যায়, তেমনই তা থেকে যায় “জেগে ঘুমানোর” সমাজতত্ত্বে, থাকে যথাকালীন নীরবতা, নিরপেক্ষতা কিংবা সক্রিয়তায়। আজ অ্যালার্ম ঘড়ি যাকে যথাকালে জাগিয়ে দেয়, তার কাছে এই মোরগের গল্প অকিঞ্চিৎকর হতে পারে, কিন্তু অহেতুক নয়। এই “যথাকালটি” ঠিক কী, তা আপেক্ষিক কীনা তা নিয়ে বিতর্ক বা সংশয় হয়তো থেকে যায়, সমাজতত্ত্বের তথ্যে জীববিদ্যার নিয়ম হয়তো মেলে না, সামাজিক মানুষের অভিজ্ঞতা ও বোধের সঙ্গে ব্যতিক্রমীর, উন্মার্গগামীর কিংবা “অন্য পথের পথিকের” জীবনাদর্শের ব্যবধান থেকে যায়, তবুও… নিয়মের রাজত্ব ও স্বতন্ত্র যাপনের মাঝে মুক্ত আকাশের নিচে লক্ষ্যে-অলক্ষ্যে দণ্ডায়মান থাকে মহাজীবন। এই কাহিনি জীবনের একান্ত পরিসর ও বৃহত্তর সম্ভাবনার পাশেই বর্তমান অযথার্থ যা কিছু, তাকে উপলব্ধি ও অতিক্রমের ব্যঞ্জনাটি বহন করে।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content