
বাসায় ভুতুম প্যাঁচা। ছবি: সংগৃহীত।
খাসা তোর চ্যাঁচানি।
শুনে শুনে আনমন
নাচে মোর প্রাণমন।” (প্যাঁচা আর প্যাঁচানি / সুকুমার রায়)
প্যাঁচার চ্যাঁচানি শুনে প্যাঁচানির প্রাণ নেচে উঠলেও সাধারণ মানুষের কিন্তু বুক ধুকপুক করে ওঠে ভয়ে। কারণ প্যাঁচার ডাক। রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে যখন ‘তু-হু-হু’ কিংবা ‘বুম বুম’ শব্দে প্যাঁচা ডেকে ওঠে তখন গা ছমছম করে ওঠে। তার ওপর এদের মুখের গড়ন পাখিদের মতো নয়। মাথাটা চেহারার চেয়ে অনেক বড়। চ্যাপ্টা মুখমন্ডল। আর ড্যাবা-ড্যাবা দুটো চোখ মানুষের চোখের মতো থাকে মুখমন্ডলের সামনে। আবার এদের ঘোরাফেরা রাতের আঁধারে। সব মিলিয়ে প্যাঁচা মানেই যেন ভয়। আর এজন্যই অধিকাংশ দেশে ও ধর্মীয় সংস্কারে প্যাঁচাকে অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অধিকাংশ হিন্দু ও ইহুদি মনে করে প্যাঁচা দেখলে বা এর ডাক শুনলে বিপদ আসে। প্রাচীন মায়া সভ্যতায় মৃত্যুর দেবতা হুনাহুয়ার মাথাও দেখানো হয়েছে প্যাঁচার মতো।
প্যাঁচারা পাখি হলেও এদের অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা পক্ষিজগতে বিরল। এদের মাথার গড়নের কথা তো আগেই বলেছি। এবার বলি চোখের কথা। অক্ষিকোটর থেকে চোখ দুটো অনেকটা সামনে বেরিয়ে থাকে গ্রেভস রোগে আক্রান্ত রোগীর চোখের মতো। তার ওপর এদের চোখ ফিক্সড, অর্থাৎ আমাদের মতো ডাইনে-বামে বা উপর-নিচে ঘোরাতে পারে না। কিন্তু তাতে কুছ পরোয়া নেই। মাথা বেঁকিয়ে ডাইনে-বামে, উপর-নিচে এমনকি পিছনেও দেখতে পারে। এ জন্য প্যাঁচার দিকে তাকিয়ে কেউ যখন মাথা নাড়ায় তখন তা দেখার জন্য প্যাঁচাকে মাথা দোলাতে হয়। আর আমরা মনে করি প্যাঁচা আমাদের ভেংচি কাটছে! এরা মাথাকে একদিকে ১৩৫০ ঘোরাতে পারে। অর্থাৎ ডাইনে-বামে মিলিয়ে মোট ২৭০০ মাথা ঘোরে। মানুষ পারে না, কিন্তু প্যাঁচা এটা পারে কারণ এদের ঘাড়ে ১৪টি কশেরুকা আছে যা মাথাকে পিছনে ঘোরাতে সাহায্য করে। মানুষ বা অন্য পাখিদের বেলায় ঘাড়ে থাকে সাতটি কশেরুকা।
প্যাঁচার দৃষ্টি আবার আমাদের মতো দ্বিনেত্র (Binocular vision) অর্থাৎ দুটো চোখ দিয়ে একটা বস্তুকেই দেখে। রাতের আঁধারেও এদের দৃষ্টিশক্তি প্রবল, কারণ এদের রেটিনাতে মৃদু আলোতে অনুভূতিশীল রড কোশের (Rod cell) আধিক্য। আবার উজ্জ্বল আলোর অনুভূতি গ্রহণে সক্ষম কোন কোশ (Cone cell) খুব কম থাকায় দিনের বেলা এরা দেখতে পায় না। এদের চোখে রেটিনায় ট্যাপেটাম লুসিডাম নামে একটা স্তর থাকে। এর কাজ হল আলোকসুবেদী রড কোশ যে আলোর অনুভূতি গ্রহণ করে তার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এই ট্যাপেটাম লুসিডাম থাকার জন্যই রাতের বেলায় অন্ধকারে চোখ জ্বল জ্বল করে। এদের চোখের চারিদিকে বৃত্তাকারে পালক সাজানো থাকে। একে বলে ফেসিয়াল ডিস্ক। এই ফেসিয়াল ডিস্ক সামান্যতম আলোকেও চোখের মধ্যে প্রতিফলিত হতে সাহায্য করে। আর একটা মজার ব্যপার হল, প্যাঁচার চোখ দূরবদ্ধদৃষ্টিসম্পন্ন (Hypermetropia), অর্থাৎ কাছের জিনিস দেখতে পায় না। তাই শিকার ধরার পর তাকে যে দু’চোখ ভরে দেখে দেখে উপভোগ করে খাবে সে উপায় নেই! চঞ্চুর সাহায্যে ও নখরে অবস্থিত একপ্রকার পালকের সাহায্যে এরা শিকারকে অনুভব করে।
একটু আগেই বলেছি যে প্যাঁচা ২৭০০ পর্যন্ত ঘাড় ঘোরাতে পারে। কিন্তু এভাবে কোনও প্রাণী ঘাড় ঘোরাতে গেলে যে বিপদটা সবার আগে হতে পারে তা হল ঘাড় দিয়ে যেসব ধমনি হৃৎপিন্ড থেকে মাথায় রক্ত বয়ে আনে সেগুলোতে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা ছিঁড়ে যেতে পারে। আর তা হলে মৃত্যু অনিবার্য। প্যাঁচার কিন্তু কিছুই হয় না, কারণ তার আছে বিশেষ ব্যবস্থা। এদের মাথায় রয়েছে বিশেষ রক্ত-ভান্ডার। ঘাড় ঘোরানোর সময় ঘাড়ের ধমনিতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে ওই রক্ত-ভান্ডারের রক্ত তখন মস্তিষ্ক ও চোখে রক্ত প্রবাহ অব্যাহত রাখে। তাছাড়া বিকল্প রক্তবাহও থাকে অন্যপথে মাথা ও চোখে রক্তের সরবরাহের জন্য। আরও একটা ব্যবস্থা আছে। টান পড়ে যাতে রক্তবাহ ছিঁড়ে না যায় সেজন্য। এদের ঘাড়ের রক্তবাহের বাইরে বাতাসপূর্ণ একপ্রকার গদি থাকে যা দ্রুত মাথা ঘোরানোর সময় রক্তবাহের উপর টান পড়তে দেয় না।
একটু আগেই বলেছি যে প্যাঁচা ২৭০০ পর্যন্ত ঘাড় ঘোরাতে পারে। কিন্তু এভাবে কোনও প্রাণী ঘাড় ঘোরাতে গেলে যে বিপদটা সবার আগে হতে পারে তা হল ঘাড় দিয়ে যেসব ধমনি হৃৎপিন্ড থেকে মাথায় রক্ত বয়ে আনে সেগুলোতে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা ছিঁড়ে যেতে পারে। আর তা হলে মৃত্যু অনিবার্য। প্যাঁচার কিন্তু কিছুই হয় না, কারণ তার আছে বিশেষ ব্যবস্থা। এদের মাথায় রয়েছে বিশেষ রক্ত-ভান্ডার। ঘাড় ঘোরানোর সময় ঘাড়ের ধমনিতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে ওই রক্ত-ভান্ডারের রক্ত তখন মস্তিষ্ক ও চোখে রক্ত প্রবাহ অব্যাহত রাখে। তাছাড়া বিকল্প রক্তবাহও থাকে অন্যপথে মাথা ও চোখে রক্তের সরবরাহের জন্য। আরও একটা ব্যবস্থা আছে। টান পড়ে যাতে রক্তবাহ ছিঁড়ে না যায় সেজন্য। এদের ঘাড়ের রক্তবাহের বাইরে বাতাসপূর্ণ একপ্রকার গদি থাকে যা দ্রুত মাথা ঘোরানোর সময় রক্তবাহের উপর টান পড়তে দেয় না।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৯: কোটরে প্যাঁচা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৫: রবীন্দ্রনাথের বিয়ের রাতে মারা গিয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির জামাই

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৭ : পাঠশালা-ক্লাসরুম
প্যাঁচার শ্রবণশক্তিও অসামান্য। শুধু শব্দ শুনে জমাট অন্ধকারেও এরা অব্যর্থ নিশানায় শিকার করতে পারে। আর এ কাজে ওই ফেসিয়াল ডিস্ক সাহায্য করে। অতি মৃদু শব্দও ফেসিয়াল ডিস্কে প্রতিফলিত হয়ে কর্ণকুহরে প্রবেশ করে। এদের চোখের ঠিক পেছনে অবস্থিত দুটি কানের গড়ন কিন্তু হুবহু একরকম নয়। আর এর ফলে এরা একই শব্দ একটু আগে-পরে দু’বার শোনে। এতে শিকারের অবস্থান নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা যায়।
এবারে আসা যাক বৈচিত্র্যময় পায়ের গড়নে। এদের পায়ে অন্যান্য পাখির মতো চারটে আঙুল আছে—তিনটে সামনে ও একটা পেছনে। তবে সামনের একটা আঙুলকে প্রয়োজনমতো সামনে বা পেছনে ঘোরাতে পারে। গাছের ডালকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার সময় ওই আঙুলটি পিছনে ঘুরে যায়। আর ওদের আঙুলের নিচে নরম পালক থাকে। সম্ভবত শিকার যাতে কামড়ে দিতে না পারে এবং পা’কে গরম রাখতে পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা। তাছাড়া এই পালক অনুভূতি গ্রহণেও সাহায্য করে।
প্যাঁচার উড্ডয়ন পালক অন্য পাখিদের তুলনায় ঠাস বুননের হয় না। দুটো উড্ডয়ন পালকের মাঝে ফাঁক অপেক্ষাকৃত বেশি থাকায় ডানা ঝাপটানোর সময় কিছুটা বাতাস বেরিয়ে যেতে পারে। তাছাড়া এদের উড্ডয়ন পালক অনেক নরম হয় ও এর সামনে বিশেষ হুকের মতো গঠন থাকে যা সাইলেন্সারের কাজ করে। এই কারণে প্যাঁচা যখন ওড়ে তখন কোনও শব্দ পাওয়া যায় না।
এবারে আসা যাক বৈচিত্র্যময় পায়ের গড়নে। এদের পায়ে অন্যান্য পাখির মতো চারটে আঙুল আছে—তিনটে সামনে ও একটা পেছনে। তবে সামনের একটা আঙুলকে প্রয়োজনমতো সামনে বা পেছনে ঘোরাতে পারে। গাছের ডালকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার সময় ওই আঙুলটি পিছনে ঘুরে যায়। আর ওদের আঙুলের নিচে নরম পালক থাকে। সম্ভবত শিকার যাতে কামড়ে দিতে না পারে এবং পা’কে গরম রাখতে পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা। তাছাড়া এই পালক অনুভূতি গ্রহণেও সাহায্য করে।
প্যাঁচার উড্ডয়ন পালক অন্য পাখিদের তুলনায় ঠাস বুননের হয় না। দুটো উড্ডয়ন পালকের মাঝে ফাঁক অপেক্ষাকৃত বেশি থাকায় ডানা ঝাপটানোর সময় কিছুটা বাতাস বেরিয়ে যেতে পারে। তাছাড়া এদের উড্ডয়ন পালক অনেক নরম হয় ও এর সামনে বিশেষ হুকের মতো গঠন থাকে যা সাইলেন্সারের কাজ করে। এই কারণে প্যাঁচা যখন ওড়ে তখন কোনও শব্দ পাওয়া যায় না।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৬: আমরা আসলে কাকে পুজো করছি? ঈশ্বরকে, নাকি রক্তমাখা অভ্যাসকে?

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৮: সকলের উপর মা সারদার ছিল সমান অধিকার
প্যাঁচার হজম ক্ষমতাও অন্য পাখিদের মতো নয়। এরা শিকারের পুষ্টিসমৃদ্ধ অংশটুকুই পরিপাক করতে পারে। সাধারণ পাখির তুলনায় এদের পাকস্থলির পাচকরস কম আম্লিক হওয়ায় শিকারের হাড়, দাঁত, নখ, লোম ইত্যাদি পরিপাক হয় না। তাই প্যাঁচাদের মলের সাথে এই সব বর্জ্য দানার আকারে বেরিয়ে আসে।
এ তো গেল প্যাঁচাদের সাধারণ বৃত্তান্ত। আমাদের সুন্দরবন এলাকায় লক্ষ্মী প্যাঁচা আর কোটরে প্যাঁচার সঙ্গে আমার তো বটেই, প্রায় অধিকাংশ সুন্দরবনবাসীর পরিচয় আছে। কিন্তু এখানে আরও একরকম প্যাঁচা রয়েছে —ভুতুম প্যাঁচা। সত্যি বলতে কি, এর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় গানে। অন্নদাশংকর রায়ের লেখা বিখ্যাত কবিতা আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গান হয়ে প্রায়শই রেডিওতে বাজতে শুনতাম। আমাদের ছেলেবেলার ভীষণ জনপ্রিয় গান।
“ময়নার মা ময়নামতী,
ময়না তোমার কই?
ময়না গেছে কুটুম বাড়ি
গাছের ডালে ওই।
কুটুম কুটুম কুটুম
নামটি যে তার ভুতুম
আঁধার রাতের চৌকিদার
দিনে বলে, শুতুম।
ভুতুম যাবে শ্বশুর বাড়ি
আনতে যাবে কী?
চোখগুলো তার ছানাবড়া
চৌকিদারের ঝি।”
এ তো গেল প্যাঁচাদের সাধারণ বৃত্তান্ত। আমাদের সুন্দরবন এলাকায় লক্ষ্মী প্যাঁচা আর কোটরে প্যাঁচার সঙ্গে আমার তো বটেই, প্রায় অধিকাংশ সুন্দরবনবাসীর পরিচয় আছে। কিন্তু এখানে আরও একরকম প্যাঁচা রয়েছে —ভুতুম প্যাঁচা। সত্যি বলতে কি, এর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় গানে। অন্নদাশংকর রায়ের লেখা বিখ্যাত কবিতা আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গান হয়ে প্রায়শই রেডিওতে বাজতে শুনতাম। আমাদের ছেলেবেলার ভীষণ জনপ্রিয় গান।
ময়না তোমার কই?
ময়না গেছে কুটুম বাড়ি
গাছের ডালে ওই।
কুটুম কুটুম কুটুম
নামটি যে তার ভুতুম
আঁধার রাতের চৌকিদার
দিনে বলে, শুতুম।
ভুতুম যাবে শ্বশুর বাড়ি
আনতে যাবে কী?
চোখগুলো তার ছানাবড়া
চৌকিদারের ঝি।”
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৫: কতদিন পরে এলে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?
চার-পাঁচ দশক আগে পর্যন্ত জন্মগ্রহণ করা প্রায় সমস্ত বাঙালি এই গানের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু ভুতুম প্যাঁচা? হলপ করে বলতে পারি খুব কম সুন্দরবনবাসী তথা বাঙালি ভুতুম প্যাঁচা দেখেছে।
সুন্দরবন তথা বাংলায় তো বটেই প্রায় সারা ভারতেই ভুতুম প্যাঁচার বাস। এদের গায়ের রং পাটকিলে-বাদামি এবং প্রিয় খাদ্য মাছ হওয়ায় এদের ইংরেজিতে বলে ‘Brown Fish Owl’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Bubo zeylonensis বা Ketupa zeylonensis’। অনেকে মনে করেন ভুতুম প্যাঁচা আর হুতোম প্যাঁচা এক। নাম দুটোর মধ্যে ছন্দের মিল আছে বলে মনে হয়। ওরা জাতভাই, কিন্তু একই নয়। হুতোম প্যাঁচার বাস ভারতে কেবল হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চলে। ওদের ইংরেজিতে নাম ‘Great Horned Owl’ এবং বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Bubo bubo’। ওদের রং আর আকার অনেকটা এক। আর সবচেয়ে বড়ো মিল হল, উভয়ের কানের পাশে কালচে রঙের দুটো উঁচু ঝুঁটি যা সাধারণত ‘শিং’ হিসেবেই কথিত। তাই হুতোমের ইংরেজি নামের সঙ্গে ‘হর্নড’ শব্দটি রয়েছে। অবশ্য হুতোমের তুলনায় ভুতুমের ‘শিং’ বেশ ছোট বলে ওদের নামের সঙ্গে ‘হর্নড’ শব্দ নেই। ভুতুম প্যাঁচা আকারে বেশ বড়ো হয়। লম্বায় প্রায় ৫৬ সেমি, আর ওজন ১.১ কেজি থেকে ১.৩ কেজি। পুরুষ প্যাঁচার দৈর্ঘ্য ও ওজন স্ত্রী প্যাঁচার থেকে কম।
সুন্দরবন তথা বাংলায় তো বটেই প্রায় সারা ভারতেই ভুতুম প্যাঁচার বাস। এদের গায়ের রং পাটকিলে-বাদামি এবং প্রিয় খাদ্য মাছ হওয়ায় এদের ইংরেজিতে বলে ‘Brown Fish Owl’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Bubo zeylonensis বা Ketupa zeylonensis’। অনেকে মনে করেন ভুতুম প্যাঁচা আর হুতোম প্যাঁচা এক। নাম দুটোর মধ্যে ছন্দের মিল আছে বলে মনে হয়। ওরা জাতভাই, কিন্তু একই নয়। হুতোম প্যাঁচার বাস ভারতে কেবল হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চলে। ওদের ইংরেজিতে নাম ‘Great Horned Owl’ এবং বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Bubo bubo’। ওদের রং আর আকার অনেকটা এক। আর সবচেয়ে বড়ো মিল হল, উভয়ের কানের পাশে কালচে রঙের দুটো উঁচু ঝুঁটি যা সাধারণত ‘শিং’ হিসেবেই কথিত। তাই হুতোমের ইংরেজি নামের সঙ্গে ‘হর্নড’ শব্দটি রয়েছে। অবশ্য হুতোমের তুলনায় ভুতুমের ‘শিং’ বেশ ছোট বলে ওদের নামের সঙ্গে ‘হর্নড’ শব্দ নেই। ভুতুম প্যাঁচা আকারে বেশ বড়ো হয়। লম্বায় প্রায় ৫৬ সেমি, আর ওজন ১.১ কেজি থেকে ১.৩ কেজি। পুরুষ প্যাঁচার দৈর্ঘ্য ও ওজন স্ত্রী প্যাঁচার থেকে কম।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-২৭: আকাশ এখনও মেঘলা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭১: পুষ্পধনু
আগেই বলেছি, এদের পিঠের রঙ পাটকিলে-বাদামি। তার উপর আছে লম্বা কালো ডোরা। পেট সাদা এবং তার উপর ছিট। ঘাড় ও গলায় সাদা ছোপ। সোনালি-হলুদ রঙের চোখ ও পালকহীন ফ্যাকাশে হলুদ রঙের আঙুল। এদের কানের দু’পাশে পালক এমনভাবে প্রসারিত থাকে যে দেখে মনে হবে মাথার দু’পাশে দুটো শিং গজিয়েছে। এদের পালক কিন্তু অন্য প্যাঁচাদের মতো নরম হয় না। লক্ষ্মী প্যাঁচার মুখমন্ডলের প্রান্ত বরাবর যেমন পালকের সারি থাকে এদের তা নেই। এই ধরণের গঠন প্রতিফলিত শব্দের তীব্রতা বাড়িয়ে খুব মৃদু শব্দকে শনাক্ত করতে পারে। যেহেতু ভুতুমের তা নেই তাই মনে হয় এদের শব্দ উপলব্ধি করা খুব জরুরি নয়। এদের লেজ খাটো হলেও ডানার ব্যাপ্তি অনেক বেশি। তাছাড়া ডানার পালকের গঠন অন্য প্যাঁচাদের থেকে কিছুটা ভিন্ন হওয়ায় ডানা সঞ্চালন করলে শব্দ হয়।
এরা সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় থাকে। দিনের বেলাটা ঘন বাঁশ ঝোপে বাঁশের উপর বা ঘন পাতাবহুল গাছের ডালে বসে কাটায়। সন্ধ্যে হওয়ার আগে এরা শিকারের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। মেঘলা দিনে এদের দিনের বেলাও উড়তে দেখা যায়। প্রিয় শিকার মাছ। সেজন্য এদের আস্তানা মূলত পুকুর, হ্রদ, খাল, নদী ইত্যাদির আশেপাশে। এছাড়া কাঁকড়া, ব্যাঙ, ইঁদুর, সরীসৃপ, পাখি ইত্যদিও খায়। এরা জলের উপর থেকে পায়ের নখরের সাহায্যে শিকারকে তুলে নেয়। ভুতুমের পায়ের আঙুলের তলা বেশ অমসৃণ হওয়ায় পিচ্ছিল মাছকেও সহজে শিকার করতে পারে।
নভেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে এদের প্রজনন ঋতু। স্ত্রী ভুতুম প্যাঁচা বট, অশ্বত্থ, আম, শাল ইত্যাদির মতো কোনও বড় গাছে কোনও বড়ো আকারের পাখির কাঠি দিয়ে বানানো ছেড়ে যাওয়া বাসাতে একটা বা দুটো গোলাকার ডিম পাড়ে। কখনও কখনও গাছের গুঁড়ির গায়ে থাকা গর্তে এবং পুরোনো মন্দির বা বাড়ির ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও ডিম পাড়ে। সাধারণত ৩৮ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। ক্রমশঃ ফ্যাকাশে-সাদা পালকে বাচ্চাদের শরীর ঢাকা পড়ে। সাত সপ্তাহ পর বাচ্চারা উড়তে সক্ষম হয়। দু’বছর বয়স পর্যন্ত এদের পালকের রঙ পূর্ণবয়স্ক ভুতুমদের থেকে কিছুটা ফ্যাকাশে হয়।
এরা সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় থাকে। দিনের বেলাটা ঘন বাঁশ ঝোপে বাঁশের উপর বা ঘন পাতাবহুল গাছের ডালে বসে কাটায়। সন্ধ্যে হওয়ার আগে এরা শিকারের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। মেঘলা দিনে এদের দিনের বেলাও উড়তে দেখা যায়। প্রিয় শিকার মাছ। সেজন্য এদের আস্তানা মূলত পুকুর, হ্রদ, খাল, নদী ইত্যাদির আশেপাশে। এছাড়া কাঁকড়া, ব্যাঙ, ইঁদুর, সরীসৃপ, পাখি ইত্যদিও খায়। এরা জলের উপর থেকে পায়ের নখরের সাহায্যে শিকারকে তুলে নেয়। ভুতুমের পায়ের আঙুলের তলা বেশ অমসৃণ হওয়ায় পিচ্ছিল মাছকেও সহজে শিকার করতে পারে।
নভেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে এদের প্রজনন ঋতু। স্ত্রী ভুতুম প্যাঁচা বট, অশ্বত্থ, আম, শাল ইত্যাদির মতো কোনও বড় গাছে কোনও বড়ো আকারের পাখির কাঠি দিয়ে বানানো ছেড়ে যাওয়া বাসাতে একটা বা দুটো গোলাকার ডিম পাড়ে। কখনও কখনও গাছের গুঁড়ির গায়ে থাকা গর্তে এবং পুরোনো মন্দির বা বাড়ির ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও ডিম পাড়ে। সাধারণত ৩৮ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। ক্রমশঃ ফ্যাকাশে-সাদা পালকে বাচ্চাদের শরীর ঢাকা পড়ে। সাত সপ্তাহ পর বাচ্চারা উড়তে সক্ষম হয়। দু’বছর বয়স পর্যন্ত এদের পালকের রঙ পূর্ণবয়স্ক ভুতুমদের থেকে কিছুটা ফ্যাকাশে হয়।

পোড়ো বাড়িতে ভুতুম প্যাঁচার আশ্রয়। ছবি: সংগৃহীত।
এদের আওয়াজ খুব তীক্ষ্ণ— ‘তু-হু-হুউউ’ বা ‘বুম-বুম’ শব্দ করে ডাকে। ছোটবেলায় বাঁশবাগানের দিক থেকে এই শব্দ প্রায়ই শুনতাম। আমরা এই শব্দের সাথে অভ্যস্ত ছিলাম বলে তেমন কিছু মনে হত না কিন্তু বাইরের কোনও অতিথি বাড়িতে রাত্রিবাস করলে ওই শব্দ শুনে রীতিমতো ভয়ে শিহরিত হত।
উত্তর ভারতে এখনও ভুতুম প্যাঁচাকে অশুভ শক্তির প্রতীক বলে অনেকে বিশ্বাস করে। আর তাই দীপাবলীর রাতে ফাঁদ পেতে প্রচুর ভুতুম প্যাঁচা শিকার করে বলি দেওয়া হয়। এ নাকি তন্ত্রসাধনার এক রীতি! এভাবে ভুতুম প্যাঁচা যদি ক্রমাগত অন্ধবিশ্বাসের বলি হতে থাকে তবে ওদের বিলুপ্তি হবে কেবল সময়ের অপেক্ষা। তবে সুন্দরবন অঞ্চলে ভুতুমদের নিয়ে এমন কোনও অন্ধবিশ্বাস দেখিনি বা শুনিনি। ভুতুম প্যাঁচার গল্প আমি ছোটোবেলা থেকে অনেক শুনেছি, কিন্তু স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পেয়েছি খুব কম।
আমাদের গ্রামের পুকুর পাড়ে ছিল বিশাল বাঁশ ঝাড়। সঙ্গে তাল, খেজুর, নারকেল, চালতা, তেঁতুল, পেয়ারা, বেল, মাদার ইত্যাদি গাছের ঠাসাঠাসি। ফলে পুকুরের পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ পাড় ভর দুপুরেও প্রায়ান্ধকার হয়ে থাকত। সেখানেই বিকেলের দিকে পুকুরের দিকে ঝুঁকে পড়া বাঁশ গাছে ও পেয়ারা গাছে পাতার আড়ালে ওদের কয়েকবার বসে থাকতে দেখেছি। হয়তো সন্ধ্যে হলেই পুকুরে মাছ ধরবে। বসতি এলাকায় আগের থেকে কম পাওয়া গেলেও সুন্দরবনের জঙ্গল এলাকাতে ওদের এখন যথেষ্ট সংখ্যায় দেখা যায়। তাই আইইউসিএন (IUCN)-এর বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় ওরা নেই। প্রকৃতির এই সুন্দর প্রাণীটা যেন চিরকাল আমাদের ‘কুটুম’ হয়েই থাকতে পারে।—চলবে।
উত্তর ভারতে এখনও ভুতুম প্যাঁচাকে অশুভ শক্তির প্রতীক বলে অনেকে বিশ্বাস করে। আর তাই দীপাবলীর রাতে ফাঁদ পেতে প্রচুর ভুতুম প্যাঁচা শিকার করে বলি দেওয়া হয়। এ নাকি তন্ত্রসাধনার এক রীতি! এভাবে ভুতুম প্যাঁচা যদি ক্রমাগত অন্ধবিশ্বাসের বলি হতে থাকে তবে ওদের বিলুপ্তি হবে কেবল সময়ের অপেক্ষা। তবে সুন্দরবন অঞ্চলে ভুতুমদের নিয়ে এমন কোনও অন্ধবিশ্বাস দেখিনি বা শুনিনি। ভুতুম প্যাঁচার গল্প আমি ছোটোবেলা থেকে অনেক শুনেছি, কিন্তু স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পেয়েছি খুব কম।
আমাদের গ্রামের পুকুর পাড়ে ছিল বিশাল বাঁশ ঝাড়। সঙ্গে তাল, খেজুর, নারকেল, চালতা, তেঁতুল, পেয়ারা, বেল, মাদার ইত্যাদি গাছের ঠাসাঠাসি। ফলে পুকুরের পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ পাড় ভর দুপুরেও প্রায়ান্ধকার হয়ে থাকত। সেখানেই বিকেলের দিকে পুকুরের দিকে ঝুঁকে পড়া বাঁশ গাছে ও পেয়ারা গাছে পাতার আড়ালে ওদের কয়েকবার বসে থাকতে দেখেছি। হয়তো সন্ধ্যে হলেই পুকুরে মাছ ধরবে। বসতি এলাকায় আগের থেকে কম পাওয়া গেলেও সুন্দরবনের জঙ্গল এলাকাতে ওদের এখন যথেষ্ট সংখ্যায় দেখা যায়। তাই আইইউসিএন (IUCN)-এর বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় ওরা নেই। প্রকৃতির এই সুন্দর প্রাণীটা যেন চিরকাল আমাদের ‘কুটুম’ হয়েই থাকতে পারে।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















