রবিবার ১৪ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথের সেজদা হেমেন্দ্রনাথের ছিল সাজানো সংসার। বেশ বড় পরিবার। অনেকগুলো সন্তান-সন্ততি, আট কন্যা ও তিন পুত্র। সকলেই কমবেশি কৃতী। সাহিত্যমুখী, অতীব বিজ্ঞানমনস্ক। কারও সংগীতে অনুরাগ, কারও রন্ধনে। প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী ছিলেন রন্ধন-পটিয়সী। পারিবারিক পত্রিকা ‘পুণ্য’তে রন্ধনবিদ্যা নিয়ে নিয়মিত লিখতেন তিনি। হেমেন্দ্র-পত্নী নীপময়ী ভালো ছবি আঁকতেন, রীতিমতো ওস্তাদের কাছে গান শিখতেন। হেমেন্দ্রনাথও ছিলেন ব্যতিক্রমী। চিন্তায়-চেতনায় এগিয়ে থাকা। স্ত্রী-স্বাধীনতার, স্ত্রী-শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে শুধু ভাবেননি, সক্রিয় ভূমিকাও নিয়েছিলেন।
হেমেন্দ্রনাথের কন্যাদের মধ্যে প্রায়জনই নানা গুণে গুণান্বিতা। এই গুণবতী কন্যারা পিতৃদেবকে বেশিদিন পাননি। অকালে, অসময়ে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। সেসময় কনিষ্ঠা কন্যা সুদক্ষিণা এক বছরের শিশু। পিতৃদেবকে একেবারেই পাননি। তাদের পিতৃদেব গৃহ-পরিবেশটি এমনভাবে তৈরি করে দিয়েছিলেন যে, তাঁর অবর্তমানে অষ্টম কন্যাটিও নির্বিঘ্নে বড়ো হয়েছেন। মূলত দাদা-দিদিদের আদর স্নেহে, আনন্দে বড়ো হয়েছিলেন সুদক্ষিণা দেবী।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৫: রবীন্দ্রনাথের বিয়ের রাতে মারা গিয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির জামাই

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-২৭: আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১০: ভুতুম প্যাঁচা

সুদক্ষিণা ছিলেন অন্য সকলের থেকেই আলাদা। যোগাযোগ হওয়ার পর ভিনভাষী অন্য প্রদেশের পাত্রের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতে কুণ্ঠিত হননি তিনি। উত্তরপ্রদেশের জ্বালাপ্রসাদ পান্ডের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। সেকালের বিচারে একটু বেশি বয়সেই বিবাহ হয়। জ্বালাপ্রসাদের সঙ্গে আর্যসমাজের যোগাযোগ ছিল। যোগাযোগ ছিল মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গেও। তিনিই বোধহয় এই বিয়ের সম্বন্ধ করেছিলেন। ঠাকুরবাড়িতে আন্তঃপ্রাদেশিক বিবাহ প্রথম হয়েছিল হেমেন্দ্রনাথেরই পরিবারে। দ্বিতীয়টিও তাঁরই পরিবারে হয়েছে। প্রথম বিবাহটি হয়েছিল প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর সঙ্গে অসমীয়া লেখক লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার।
কলকাতায় বৃষ্টি

নীপময়ী দেবী।

জ্বালাপ্রসাদের সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির কন্যার এই বিবাহ সে সময় অনেকেরই প্রশংসা কুড়িয়েছিল। প্রশংসাসূচক মন্তব্য সংবাদপত্রেও প্রকাশিত হয়। যেমন, ‘বেঙ্গলি’ নামের ইংরেজি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল ভূয়সী প্রশংসা। লেখা হয়, এই ধরনের বিবাহ জাতীয়তার গৌরব বৃদ্ধি করবে। জাতীয় ঐক্যের দিক থেকেও এই ধরনের বিবাহ সহায়ক বলে মনে করা হয়েছিল। এ ধরনের প্রয়াসের মধ্য দিয়ে নবজাগরণের আলোয় আলোকিত ঠাকুরবাড়ি উনিশ ও বিশ শতকের গোড়ায় দেশবাসীকে পথ দেখিয়েছে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৬: আমরা আসলে কাকে পুজো করছি? ঈশ্বরকে, নাকি রক্তমাখা অভ্যাসকে?

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৮: সকলের উপর মা সারদার ছিল সমান অধিকার

জ্বালাপ্রসাদের ছিল মস্ত জমিদারি। প্রভূত ভূসম্পত্তির অধিকারী। জোড়াসাঁকোর সুদক্ষিণা স্বামীর ঘর করতে গিয়েছিলেন সেই দূর উত্তরপ্রদেশে, প্রত্যন্ত গ্রামে। জ্বালাপ্রসাদ নিজের মতো করে তাঁর বাঙালি-বধূটিকে তৈরি করে নিয়েছিলেন। সাহেবসুবোদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, তাও শিখিয়েছিলেন। স্বামীর প্রশিক্ষণে ক্রমেই সুদক্ষিণা ইংরেজিতে কথা বলায় দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। জ্বালাপ্রসাদই শিখিয়েছিলেন কীভাবে ঘোড়ায় চড়তে হয়। সুদক্ষিণা ছিলেন অত্যন্ত সাহসিনী। স্বামীর কাছে ঘোড়ায় চড়ার কায়দাকানুন জেনে নেওয়ার পরই টগবগাবগ ঘোড়া ছুটিয়েছেন। ঘোড়া নিয়ে ঘোরাঘুরির সময় কখনও কখনও স্বামীও তাঁর সঙ্গী হয়েছেন। শুধু ঘোড়ায় চড়া নয়, জ্বালাপ্রসাদ শিখিয়েছিলেন বন্দুক ছোড়াও। বিপদ বলেকয়ে আসে না। ডাকাতের যথেষ্ট উৎপাত, তাই আত্মরক্ষার জন্য বন্দুক চালাতে পারা জরুরি। সুদক্ষিণার মনে এই বোধ জাগিয়ে তোলার পর বন্দুক ছোড়া শেখাতে জ্বালাপ্রসাদকে তেমন বেগ পেতে হয়নি। দ্রুত সুদক্ষিণা শিখে ফেলেছিলেন। ‘গুড়ুম’ শব্দে ঠিক-নিশানায় বন্দুক থেকে ছোড়া টোটা পৌঁছে গিয়েছে। বিজয়নীর হাসি ফুটেছে বাঙালিকন্যার মুখে। সুদক্ষিণা হাতির পিঠেও চড়তে পারতেন। ভয়ডর কী, জানতেন না তিনি।
কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ।

এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই যে, সুদক্ষিণা দেবী যুগের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন। এই অগ্রণী ভূমিকা তিনি নিতে পেরেছিলেন জ্বালাপ্রসাদের আন্তরিক উৎসাহে। জ্বালাপ্রসাদ ছিলেন আধুনিক মনের মানুষ, চেয়েছিলেন নারী-প্রগতি। নারী প্রগতির বাস্তবায়ন নিজের ঘরণীকে দিয়েই শুরু করেছিলেন তিনি।

জ্বালাপ্রসাদ ও সুদক্ষিণার জীবনে সব থেকেও ছিল হাহাকার। কোনও সন্তান ছিল না তাঁদের। জ্বালাপ্রসাদের পিঠে কার্বাঙ্কল হয়েছিল, দুর্ভোগ আর যন্ত্রণায় জেরবার হয়ে অকালে মারা গিয়েছিলেন। সুদক্ষিণার তখন বছর সাতাশ বয়েস। চরম শোকের মধ্যেও দায়িত্ব পালনে অবিচল থেকেছেন তিনি। চোখের জল মুছে দক্ষতার সঙ্গে সামলে ছিলেন উদ্ভূত পরিস্থিতি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৫: কতদিন পরে এলে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?

স্বামীর অকালপ্রয়াণের পর অনেকেই ভেবেছিল, দেখাশোনার অভাবে জ্বালাপ্রসাদের বিপুল সম্পত্তি, জমিদারি সব হাতছাড়া হয়ে যাবে। সন্তানহীনা নারীর কাছে স্বামীই ছিলেন একমাত্র অবলম্বন। সেই স্বামীকে হারিয়ে নিশ্চয়ই তিনি জীবন সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়বেন, হারিয়ে যাবেন হতাশার অন্ধকারে, অনেকেই এমন ভেবে নিয়েছিলেন। দুঃখ, যন্ত্রণা ও শোকের মাঝেই সুদক্ষিণার জেনে নিয়েছিলেন উজ্জীবনের মন্ত্র। শোকে মুহ্যমান না হয়ে স্বামীর যাবতীয় স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে তৎপর হয়েছেন সুদক্ষিণা। তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা ঋতেন্দ্রনাথের পুত্র বাসবেন্দ্রনাথের লেখায় আছে, ওই অঞ্চলের অনেকেই সুদক্ষিণা দেবীকে বিবাহ-প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেসব প্রস্তাব নির্দ্বিধায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বাসবেন্দ্রনাথ সাহসিনী সুদক্ষিণার সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপান্বিত জমিদারের দোর্দণ্ডপ্রতাপান্বিতা পত্নী।’ তাঁর লেখা থেকেই জানা যায়, ইংরেজের পুলিশও সুদক্ষিণা দেবীকে ভয় পেত। তাঁর সামনে টুঁ শব্দটি করত না।
কলকাতায় বৃষ্টি

সুদক্ষিণা দেবী।

এমনও শোনা যায়, সিপাহী বিদ্রোহের সময় কয়েকজন ইংরেজকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাদের প্রাণরক্ষা করেছিলেন জ্বালাপ্রসাদের পিতৃদেব। পরবর্তীকালের পদস্থ ইংরেজরা সে আখ্যান জানত, কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই মনে রেখেছিল।

সুদক্ষিণাকে ইংরেজরা এতটাই সমীহ করত যে তাঁকে দিয়েছিল ‘মহারানি’ উপাধি। সত্যিই তিনি ছিলেন এক অন্যরকম জমিদার। অসাধারণ ব্যক্তিত্বময়ী। ফলে ধারেকাছে কেউ ঘেঁষতে পারত না, নিজের মতো করেই কাজ করতে পারতেন সুদক্ষিণা। কখনও হাতির পিঠে চড়ে, কখনও বা ঘোড়ার পিঠে চড়ে গ্রামে-গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়াতেন। প্রজাদের সুবিধা-অসুবিধার খোঁজখবর নিতেন। ঘুরতেন হাতে বন্দুক নিয়ে। ফলে গুণ্ডা বদমাইশরা তাঁর থেকে শত যোজন দূরে থাকত। সুদক্ষিণা দেবী ডাকাতদেরও বশ করেছিলেন। কয়েকজন ডাকাতকে একত্রিত করে নিজের একটি ‘রক্ষীবাহিনী’ তৈরি করেছিলেন। তাদের হাতে ছিল তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব। সুদক্ষিণা দেবীর জমিদারি-অঞ্চলে শৃঙ্খলা ছিল, মানুষ খেয়েপরে নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করত। তাদের ‘রানিমা’ সবসময়ই পাশে থাকতেন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৮ : গরুর চোখে জল

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৫: ইন্দ্রধনু আর ‘ইন্দ্রাণী’

কত জনকল্যাণমূলক কাজ করেছিলেন সুদক্ষিণা, তা ভেবে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়। অনুন্নত সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নারীকল্যাণেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। অশিক্ষার অন্ধকার যদি নারীমনে জাঁকিয়ে বাসা বাঁধে, তাহলে সমাজের উন্নতি সম্ভব নয়, এই বাস্তব সত্যটি সুদক্ষিণা দেবী অনুভব করেছিলেন। তিনি জানতেন, এইসব ম্লান-মুখ আলোকিত করতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই নারীশিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। সব প্রজাই সুদক্ষিণা দেবীর কাছে ছিল সন্তানতুল্য। সকলের জন্যই ছিল ভাবনা-দুর্ভাবনা।

সুদক্ষিণা দেবীর ব্যস্ততার শেষ ছিল না। জমিদারির কাজ সামলানো, প্রজাদের পরিষেবা দেওয়ার ব্যাপারে কখনো কার্পণ্য দেখাননি। বরং তাঁর তৎপরতা ছিল প্রশ্নাতীত। সেসব সামলে সুদক্ষিণা সংগীতের কাছে আশ্রয় খুঁজতেন। উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরেও সংগীতের আসর বসাতেন । তিনি নিজেও সংগীতচর্চা করতেন। জমিদারি-দায়িত্ব বিশ্বস্ত কারও হাতে দিয়ে কখনও সখনও প্রিয়জনের সান্নিধ্যলাভের আশায় জোড়াসাঁকোয় চলে আসতেন। তাঁকে স্বাগত জানিয়ে বসত সংগীতের আসর। গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় গান গাইতেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

পারিবারিক পত্রিকা। এই পত্রিকায় সুদক্ষিণাও লিখেছেন।

জোড়াসাঁকোয় এলে সুদক্ষিণা দেবী বড় স্মৃতিকাতর হয়ে পড়তেন। এক অদ্ভুত ভালোলাগায় মন ভরে যেত। স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গ সুদক্ষিণা পোষ্যপুত্র গ্রহণ করেছিলেন। এক সময় সুদক্ষিণা ভেবেছিলেন জমিদারি ছেড়েছুড়ে কলকাতায় চলে আসবেন। স্মৃতি দিয়ে ঘেরা ঠাকুরবাড়ির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে শেষজীবন কাটাবেন। সেই ভাবনা সত্যি হয়ে ওঠেনি। সুদক্ষিণার ডাকনাম ছিল ‘পূর্ণিমা’। পূর্ণিমার জোছনা কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। সুদক্ষিণা দেবীর আকস্মিক প্রয়াণে গরিব প্রজাদের জীবনে অমাবস্যার অন্ধকার নেমে এসেছিল।
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content