রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: সংগৃহীত।

তারপর অনেকটা দিন স্নিগ্ধা চুপচাপ ছিল। তবে সে আর বাপের বাড়ি ফিরে যায়নি। তৃপ্তির মনের মধ্যে স্নিগ্ধার সন্দেহটা কানের পিছনে চুলের মধ্যে একটা ব্যথা না হওয়া ছোট্ট ফুসকুড়ির মতো রয়ে গেল। এর মধ্যে অতনুর জন্ম হল। সংসারে খুশির হাওয়া। নাতির মুখ দেখে ঠাকুমা, পিসিরা সকলের মনে খুব আনন্দ। তৃপ্তি যত্ন করে ছেলেকে বড় করতে লাগল। অতনুর বাবা দুলাল সেন স্থানীয় জুটমিলের শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ নেতা থেকে পার্টিতে লোকালকমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠল। জুটমিল কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারল দুলালের ক্ষমতার যথেষ্ট বৃদ্ধি হয়েছে।
পার্টিতে একটা নির্দিষ্ট আদর্শের গণ্ডি থাকলেও বহুদিন ধরেই বহু ট্রেড ইউনিয়ন নেতাই যে যার ক্ষমতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন দরে নিজেদের বিক্রির পণ্য করে ফেলে সস্তা হয়ে গিয়েছেন। এই জন্যই গল্পে নাটকে সিনেমায় অসৎ ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে গড়া হয়! যেমন আমাদের খুব চেনা শান্তিপুরি শাড়ি লম্বাটে কাগজের রোলের মতো ভাঁজ করে শাড়িরই ফালি টুকরো দিয়ে বেঁধে রাখার বিশেষ রীতি আছে যাতেভাঁজ করে বাঁধার পরেও শাড়ির পাড় আর আঁচলের নকশা-গুটি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এই বিশেষ ধরণের ভাঁজের নাম ‘গুটি ভাঁজ’!
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৫: কতদিন পরে এলে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৬: ঠাকুরবাড়ির কন্যা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বন্দুক উঁচিয়ে জমিদারি-কাজে বের হতেন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক

কর্তৃপক্ষের কাছে দুলালকে নিয়ে আর একটা ভয়ানক সমস্যা হল মানুষটা কার্বন স্টিলের মতো শক্ত আর সৎ! অফিস-কাছারিতে রাজনৈতিক দলে সমাজে বা সংসারেও এই ধরনের কঠিন ও শক্ত মানুষ খুব সমস্যা তৈরি করে। এদের কিছুতেই বাগে আনা যায় না! দুলালের ক্ষেত্রেও জুটমিলের মালিকপক্ষের কাছে সে বড় একটা সমস্যা!
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৯: মা সারদার কাছের সেবিকাবৃন্দ

পাট ব্যবসার সেই পুরনো রমরমা আর নেই। বেশিরভাগ জুটমিলগুলো দেনার দায় ধুঁকছে। বহুদিন ধরে শ্রমিকদের বকেয়া মাইনে বাকি। মালিকরা গঙ্গার ধারের সেই বিশাল জুটমিলের জমি প্রোমোটারকে বেচে দিল। প্রোমোটার জুটমিলের যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দিয়ে সেখানে সুবিশাল হোটেল তৈরি করবে। খুব স্বাভাবিকভাবে শ্রমিক ইউনিয়ন বাধা দিল। রাজনৈতিক দলগুলোও কিছুদিন সঙ্গ দিলেও শেষমেশ মালিকপক্ষ তাদের সঙ্গে রফা করে ফেলল। কিন্তু দুলাল সেনের মতো সৎ নিষ্ঠাবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্য মালিকপক্ষ কিছুতেই জমির দখল নিয়ে তাদের কাজ শুরু করতে পারছিল না। দুলালকে নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়েও যখন কিছু লাভ হল না, তখন তারা অন্য রাস্তা নিল।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬৯: চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম কারিগর ছিলেন অম্বিকা চক্রবর্তী

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?

অতনু বেড়ে উঠছে। পড়াশোনায় সে খুবই মেধাবী। দুলাল বলে ছেলেটা আমার নয়, আমার বাবার মেধা পেয়েছে! জীবনসংগ্রাম সবসময় সাইন কার্ভের ধরণে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে। ইংরেজিতে একে বলে সাইনোসয়ডাল ওয়েভ। তার যাত্রাপথের একদিকে উঁচুতে ভালো, নিচুতে মন্দ আর মাঝের সরলরেখা বরাবর মোটামুটি জীবন! উচ্চবিত্তরা আরও ভোগ করতে চায়, তাদের চাহিদা তাদের লোভ সীমাহীন। নিম্নবিত্তরা জলের একেবারে তলা থেকে দম বন্ধ করে হাওয়ার বুড়বুড়ি কাটতে কাটতে জলের ওপরে আসতে চায়। আর যারা মধ্যবিত্ত তারা সব সময় মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকে বিপদআপদ যেন না হয়, জীবনটা যেন মোটামুটি কেটে যায়।
ছেলে অতনু আর প্রায় ‘২৪ ঘণ্টাই ব্যস্ত’ স্বামী দুলালকে নিয়ে এই মধ্যপন্থা আঁকড়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল তৃপ্তি।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৮ : গরুর চোখে জল

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৫: ইন্দ্রধনু আর ‘ইন্দ্রাণী’

কিন্তু সংসারে পরপর কতগুলো অঘটন ঘটে গেল! দুলালের মা বয়সজনিতকারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন! কলঘরের মেঝেতে শ্যাওলা পড়েছিল। অনেকদিন ধরেই লক্ষ্য পড়েছে দুলালের। একটু যে সময় করে ব্লিচিং পাউডার ঢেলে ঘষে দেবে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। দুলালের মা একদিন মাঝরাতে একা একা নিচের কলঘরে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গেলেন। ‘মাগো’ চিৎকারটা দোতলায় ঘুমিয়ে থাকা তৃপ্তির কানে পৌঁছেছিল। ঠেলেঠুলে দুলালকে ঘুম থেকে তুলে নিচে এসে কলঘরের টিনের দরজা ভেঙে যখন মাকে উদ্ধার করা হল। তখন তিনি অচৈতন্য। মেঝেতে পড়ে মাথার পিছনদিকটা ফেটে গিয়েছে। অনেকটা রক্ত বেরিয়েছে। কলঘরের ছাইরঙা মেঝেতে জলে মেশা রক্তের আঁকিবুঁকি। —চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩খণ্ড)’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content