মঙ্গলবার ৯ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

একটানা ধর্মকথা শুনিয়ে, তীক্ষ্ণ দাঁতের সেই সাধুবেশী বিড়ালটি শেষমেশ বলেই ফেলল,“ভয় পেয়ো না, আমি তোমাদের খেতে আসিনি, তন্ন অহং ভক্ষযিষ্যামি। বরং আমি তোমাদের এই বিবাদের বিচার করব, জয়-পরাজয় নির্ধারণ করব। তবে একটা কথা আছে, এখন আমি বয়সে একটু বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছি। আগের মতো কান ভালো কাজ করে না। তোমাদের কথাবার্তা ঠিকঠাক বুঝতে পারি না যদি দূরে থাকো। তাই একটু কাছে এসো, আমি ভালো করে শুনি তোমাদের দ্বন্দ্বটা কী নিয়ে। বোঝার পর নিরপেক্ষভাবে বিচার করব যাতে কোনও অন্যায় না হয়। আমি তো এখন তপস্বী, ভুল বিচার করলে পরলোকে আমার বিপদ হবে!”
এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল খরগোশ আর কপিঞ্জল। এখন তারা একটু কৌতূহলী হল।
বিড়াল আবার বলতে শুরু করল — এবার ধর্মীয় উদ্ধৃতিসহ!

“শোনো, শাস্ত্রেও বলা হয়েছে — কারও প্রতি পক্ষপাত, লোভ, রাগ, ভয়, এমনকি আত্মীয়তা থেকেও যদি কেউ বিচারক হয়ে ভুল রায় দেয়, তাহলে সে নরকগামী হয়। ভাবো একবার! পশু নিয়ে ঝগড়ায় যদি কেউ অন্যায় বিচার করে, তাহলে তার ঘাড়ে পাঁচজন মানুষ হত্যার পাপ চাপে। গরু নিয়ে হলে দশজন! কন্যাসন্তানের ব্যাপারে অনুচিত রায় দিলে একশো পুরুষ হত্যার পাপ, আর কোনো পুরুষের বিষয়ে বিচারভ্রষ্ট হলে সেটা একেবারে হাজার জন মানুষ মারার সমান পাপ!”
এটুকু বলার পর বিড়ালটি আরেকটু নাটকীয় হয়ে উঠল — “সেই বিচারক, যে সত্য জেনে তা বলার সাহস রাখে না, তার তো আর ন্যায়ালয়ে থাকারই অধিকার নেই! তাই বলছি, আমার কানের কাছে এসো, স্পষ্ট করে বলো তোমাদের অভিযোগ— তস্মাৎ বিশ্রব্ধং মম কর্ণোপান্তিকে
নিবেদযত।”
ধর্মগম্ভীরতা, শাস্ত্রের ভয় আর সাধুসুলভ শান্তির ছায়ায় বিভোর খরগোশ আর কপিঞ্জল। এক মুহূর্তেই ভুলে গেল তারা কার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেই ভণ্ড বেড়ালটায় কথায় তারা দু’জন এমনভাবে মজলো যে গিয়ে একে বারে তার কোলে চেপে বসলো।
আর তারপর? ঠিক যেভাবে পরিকল্পনা ছিল।

তপস্বী বিড়ালটি মুখের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো তীক্ষ্ণ দুটো দাঁত। দু’জনের পায়ের সামনেটা প্রথমে সে চিবিয়ে খেলো আর তারপর তাদের দু’জনের গলার দিকটা এমনভাবে কামড়ে ধরল, যেন ‘বিচার’ শব্দটিই আর উচ্চারণ করতে না পারে।
খরগোশ আর কপিঞ্জল, দুজনেই ওই সাধুবেশী শিকারির খাদ্য হয়ে গেল।

৩য় কাহিনি সমাপ্ত

আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৬: আমরা আসলে কাকে পুজো করছি? ঈশ্বরকে, নাকি রক্তমাখা অভ্যাসকে?

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-২৭: আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১০: ভুতুম প্যাঁচা

গল্পটা শেষ করে কাকটি তার ঠান্ডা কণ্ঠে বলল, “এই জন্যই তো আমি বলেছিলাম—যে শাসক নিজেই অসৎ, তার কাছে ন্যায়-বিচার পাওয়ার আশা করাটাই ভুল। শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না। যে কথায় কথায় ধর্ম টেনে আনছে বাশাস্ত্রের উদ্ধৃতি দিচ্ছে— তার এই আচমকা ধার্মিকতা আসলে কোনো মোহজাল কি না, সেটাও দেখা দরকার। এটাও খেয়াল রাখা দরকার যে সেই ধর্মের বাণী এমন সুন্দর ভাবে বলছে তার দাঁতটা আসলে কতটা ধারালো?”

পঞ্চতন্ত্রকার আসলে বলতে চেয়েছেন, আমাদের চারপাশে অনেকেই আছে যারা আসলে ধর্মের নামে ব্যবসা করে, ভণ্ডামি করে। তারা অধিকাংশই কথায় খুবমিঠে, পোশাকে সাধু, আর মুখে সারাক্ষণ ধর্মকথা। কিন্তু মনটা তাদের ঠিক কী চাইছে, সেটা আমাদের বুঝতে হবে। কারণ, শাস্ত্র তো সবাই মুখস্থ করতে পারে, কিন্তু শাস্ত্রের সত্য আর মনুষ্যত্ব একসঙ্গে লালন করতে পারে কয়জন? তাই এই গল্পটা শুধু একটা পশুদের গল্প নয়—এ এক প্রখর রাজনৈতিক সতর্কবার্তা। ধর্মকে যিনি ব্যবহার করেন শুধুই নিজের স্বার্থে, যিনি অন্যের বিশ্বাসকে ভাঙিয়ে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি সত্যিকারের ধার্মিক নন। তার বিচার হোক সমাজের বিবেকের চোখে, প্রতিটি মানুষের সচেতন বোধে। ধর্ম যদি সত্য হয়, তবে প্রশ্ন করা থেকেই শুরু হোক তার প্রতি শ্রদ্ধা।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৫: রবীন্দ্রনাথের বিয়ের রাতে মারা গিয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির জামাই

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৮: সকলের উপর মা সারদার ছিল সমান অধিকার

কাকটি গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,“আশ্চর্যের বিষয়টা হলো দিনের আলোতে যে পেঁচাটা চোখে কিছুই দেখে না, তাকেই তোমরা আবার রাজা বানাবার উদ্যোগ নিয়েছো! একটু ভাবো, রাতের অন্ধকারে যদি এই পেঁচাটা তোমাদের কাউকে মেরে ফেলে বা চুপিসারে তোমাদের শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলায়—তোমরা সেটা জানবে কীভাবে? কারণ ও তো রাতে স্পষ্ট দেখতে পায়। তোমরা তো রাতে কিছুই দেখতে পাও না।এবার সেই পেঁচাটিকে রাত্রির অন্ধকারে চোখে-চোখে রাখতে না পারলে দেখবে সেই শশক আর ওই কপিঞ্জলের মতো তোমাদেরও একে একে যমলোকে রওনা হতে হবে!কিন্তু মুশকিলটা হলো তোমাদের তো চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেও কিছু বুঝবে না! আমি আমার কথা পরিষ্কার করে বলে দিলাম। এখন তোমাদের ইচ্ছে—চাইলে শুনো, না চাইলে মাথা ঠুকে শেখো। বিচার তো এখন তোমাদের হাতেই। এবং জ্ঞাত্বা যদুচিতং তদ্বিধেয়ম্‌ অতঃপরম্।”
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৫: কতদিন পরে এলে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?

কাকের যুক্তিপূর্ণ ও দৃঢ় কথাগুলি শুনে পাখিদের মধ্যে একটা সাড়া পড়ে গেল। সবাই একসঙ্গে বলল, “এ একেবারে ঠিক কথাই বলেছে, সাধু অনেনাভিহিতম্‌।একেবারে যুক্তিসঙ্গত কথা। আপাতত এই অভিষেককার্যটি স্থগিত রাখা হোক। পরে সুবিধেমতো আরেকদিন আলোচনা করা যাবে।”

সিদ্ধান্তে পৌঁছে সবাই সেখান থেকে নিজ নিজ গন্তব্যে উড়ে গেল। ভদ্রাসনে বসে রইলো তখন কেবলসেই পেঁচাটি, যার রাজ্যাভিষেক হওয়ার কথা ছিল আর তার পাশে তার স্ত্রী কৃকালিকা। পেঁচাটির তখন ধৈর্যের শেষ সীমা! সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠল,“আরে! কী হলো এটা? সবাই কোথায় গেল? আমার অভিষেক তো এখনও হলো না! কই, কেউ আছে? কে কোথায় গেল? কেন কিছুই হচ্ছে না?— কঃ কোঽত্র ভো! কিমদ্যাপি ন ক্রিয়তে মম অভিষেকঃ?”

তার এমন বিভ্রান্ত প্রশ্নে স্ত্রী কৃকালিকা শান্তভাবে বলল, “হে প্রিয়, তোমার অভিষেকটা তো ওই কাকটার জন্যেই আটকে গেছে। ওর কথায় সবাই একেবারে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। এখন শুধু ওই কাকটাই এখানে দাঁড়িয়ে আছে। আমার মতে, আমাদেরও এবার ফিরে যাওয়া উচিত। এখানে আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই।”
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৮ : গরুর চোখে জল

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৫: ইন্দ্রধনু আর ‘ইন্দ্রাণী’

স্ত্রীর মুখে এই স্পষ্ট কথা শুনে পেঁচাটা হতাশ আর রাগে কাঁপতে কাঁপতে কাকটির দিকে তাকিয়ে বলল,“ওরে দুর্জন! আমি তো তোর কোনও ক্ষতি করিনি। তাহলে আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তুই এমনভাবে বাধা দিলি কেন? শুনে রাখ, আজ থেকে তোতে আর আমাকে কোনওদিন আর মিলবে না। আমাদের দুই বংশের মধ্যে চিরকালীন শত্রুতা রইল—এই মুহূর্ত থেকেই!—
তত্‍ অদ্য প্রভৃতি সান্বযম্‌ আবযোর্বৈরং সঞ্জাতম্‌।”
তারপর অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে সে বলল,
রোহতি সায়কৈর্বিদ্ধং ছিন্নং রোহতি চাসিনা।
বচো দুরুক্তং বীভত্সং ন প্ররোহতি বাক্‌ক্ষয়ম্‌।। (কাকোলূকীযম্‌, ১১১)


বাণের জন্য শরীরের সৃষ্ট ক্ষতও একদিন সেরে যায়, তলোয়ারের আঘাতও শুকিয়ে যায় একদিন। কিন্তু একটা বিষাক্ত কথা হৃদয়ে যে ক্ষত তৈরি করে,তা কখনও শুকোয় না। তাই মানুষের কখনও কাউকে খারাপ বা ঘৃণাস্পদ কথা বলা উচিত নয়।”

এই বলে পেঁচাটি তার স্ত্রী কৃকালিকাকে নিয়ে নিজের বাসস্থানে ফিরে গেল। রাজা হওয়ার স্বপ্ন সে দেখেছিল, কিন্তু তা ভেঙে গেল সভার মাঝখানেই। রাজা সে আর হতে পারল না। কিন্তু সেইদিন থেকেই কাক আর পেঁচা—এই দু’ই প্রজাতির মধ্যে শুরু হলো এক গভীর বৈরিতা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আজও বয়ে চলেছে। কাক আর পেঁচা—একজনের গতি দিনের বেলায়, আরেক জনের রাতে অন্ধকারে—দুজনের পথ আর কখনও এক না।—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content