রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথ তখন অসুস্থ। কবির অসুস্থতাকে ঘিরে প্রিয় মানুষজনের উদ্বিগ্নতার শেষ ছিল না। কবিকে কীভাবে ভালো রাখা যায়, তা নিয়ে সকলেই কম-বেশি ব্যস্ত। সেবায়, পরিচর্যায় যদি কবি একটু ভালো থাকেন, ভালো হয়ে ওঠেন, সে চেষ্টাই দিনভর চলে। নিজেদের দৈনন্দিন ব্যস্ততা, পারিবারিক জীবন— সব কিছু দূরে সরিয়ে রেখে কবিকে নিয়েই যত ভাবনা, চিন্তা-দুশ্চিন্তা।
রানী চন্দকে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত স্নেহ করতেন। সেদিন দুপুরে রানীর ওপরই ছিল কবিকে দেখাশোনার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব কখনও পালন করতেন প্রতিমা দেবী, কখনও-বা নির্মলকুমারী। প্রতিমা কবির পুত্রবধূ, রবীন্দ্রনাথের ‘মামনি’। নির্মলকুমারীকে কবি রানি চন্দের মতোই ভালোবাসতেন, স্নেহ করতেন। তিনি ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের স্ত্রী। রানী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের একান্ত সচিব অনিল চন্দের স্ত্রী।
কলকাতায় বৃষ্টি

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রানী তখন নিজের কর্মে অবিচল। সেদিন দুপুরের দায়িত্ব পেয়ে নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করছিলেন। তেমন কী আর কাজ! রবীন্দ্রনাথ হয়তো শুয়ে শুয়ে বললেন, ‘কলমটা দে, খাতাটা দে।’ আবার কখনও হয়তো শীত-শীত লাগছে, পা দুটো চাদর দিয়ে ঢেকে দিতে বলতেন। তেমন কিছু কাজ নয়, শুধু জেগে থাকা, গুরুদেবের পাশে বসে থাকা। কেউ পাশে থাকলে, দুটো কথা বললেও তো ভালোলাগে গুরুদেবের। অন্তত অসুস্থতার কথা ভুলে থাকতে পারেন। কেউ তাঁর পাশে নিজের কাজকম্ম বন্ধ করে বসে থাকলে, সেবা-শুশ্রূষা করলে, তা নিয়ে বিচলিত হন গুরুদেব। রানীকে একদিন বললেন, ‘আমার জন্য তোদের কত সময় নষ্ট হয়।’
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৭: আঁধারে ছিল আগন্তুক?

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক

একথা, সে কথা। নিজে যে আগের থেকে ভালো আছেন, সেটাও জানাতে ভুললেন না। রানীকে বলেছিলেন, চুপচাপ না বসে থেকে বই পড়ার জন্য, লেখার জন্য। আগেও এসব রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, রানী কী লিখবেন, তা তো নিজেও জানেন না। তাই গুরুদেবের কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন।

সেদিন আর রানী হাসেননি। নিজের অক্ষমতার কথা গুরুদেবকে জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে আরও জানিয়েছেন, অবনীন্দ্রনাথের কাছে কিছু গল্প শুনেছেন, পরিবারের গল্প, ঠাকুরবাড়ির গল্প, অবনীন্দ্রনাথের বেড়ে ওঠার গল্প, সেসব গল্পের তিনি কিছু নোটও রেখেছেন। রানী সেদিন গুরুদেবকে এইটুকু বলেই থামেননি, বলেছিলেন,’যদি দেখিয়ে দেন, তবে তা থেকে একটা লেখা তৈরি করতে পারি।’
কলকাতায় বৃষ্টি

রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রানী চন্দ।

গুরুদেব হেসেছিলেন। সে হাসির মধ্যে লুকিয়ে ছিল রানির প্রতি তাঁর আস্থা ও ভরসা। অবনীন্দ্রনাথ প্রতিদিন সকালে বিকেলে পাশের বাড়ি থেকে তাঁর ‘রবিকাকা’কে দেখতে আসতেন। কবি যে ঘরে শুয়ে থাকতেন, সে ঘরে যেতেন না, যে থাকতেন দেখাশোনার দায়িত্বে, তাঁর থেকে খোঁজখবর নিতেন।
‘ঘরে ঢোকেন না? প্রতিদিনই কেন বাইরে থেকে খবর নিয়ে চলে যান?’ রানীর এই প্রশ্নের উত্তরে অবনীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘রুগণ সিংহ বিছানায় পড়ে, ও আমি দেখতে পারব না।’ অবনীন্দ্রনাথ প্রতিদিনই আসতেন। রবিকাকার খবর নেওয়ার পর রানীকে একদিন শুনিয়েছিলেন কত না গল্প। সবই পারিবারিক স্মৃতি। সেসব মগ্ন হয়ে শুনেছিলেন রানী চন্দ। চোখে মুখে খেলে গিয়েছিল মুগ্ধতা। গল্প শুনিয়ে অবনীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন, ‘এগুলো মূল্যবান, নষ্ট কোরো না।’
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে

অবনীন্দ্রনাথের কথা, গুরুদেবের কথা রাখতে তো কলম হাতে তুলে নিতে হয়। কী করে লিখবেন তিনি! নিজেকেই তাঁর জিজ্ঞাসা। একটু ভাবতে না ভাবতেই মুশকিল আসান হয়ে যায়। গুরুদেবের ঘরে দেখভালের দায়িত্ব পালন করতে করতে শেষ-রাতে রানী চন্দের মনে হয়েছিল, যেমন যেমন অবনীন্দ্রনাথ বলেছেন, ঠিক তেমনভাবেই লিখে ফেলবেন। গুরুদেবের মাথার দিকে থাকত একটা নিভু-নিভু লণ্ঠন। লণ্ঠন-আলোয় রানী চন্দ লিখতে শুরু করলেন অবনীন্দ্রনাথের বলে যাওয়া সব গল্প। পরপর ক-দিন ধরে লেখার ফলে অনেকখানি লেখাও হয়ে গেল। লেখার পর রানী চন্দের মনে হয়েছিল, গল্পগুলো হারিয়ে যাবে না। অন্তত লিখে রাখা গেল। পরে সত্যিকারের লিখতে পারে, এমন কাউকে দিয়ে আরও ভালো করে লিখিয়ে নেওয়া যাবে।
কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ ও রানী চন্দ।

তেমনটি করার আর প্রয়োজন হল না। ক-দিন পরই রানী চন্দ নিজেকে আবিষ্কার করলেন। রবীন্দ্রনাথ জানতে পেরে রানী কী লিখেছেন, তা দেখতে চেয়েছিলেন। রানী চন্দ গুরুদেবের কথা অমান্য করবেন কী করে! দেখালেন সব লেখা। ক-পাতা পড়ার পরই তিনি ঘামছিলেন, তা দেখে রানীর আর বুঝতে অসুবিধা হয় না, গুরুদেব ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, অল্পতেই তিনি তখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

রানী চন্দ থামাতে চাইলেন। রবীন্দ্রনাথকে বললেন, ‘আবার পরে পড়বেন।’ রবীন্দ্রনাথ রানীর কথায় কান করলেন না। পাতার পর পাতা পড়ে চললেন। যতটা লেখা হয়েছিল, সবটুকু পড়ে তবেই থামলেন। পড়ারও তো ক্লান্তি আছে। তাঁকে বেশ ক্লান্ত, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। কপালে ঘাম, মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। রানী একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে

একটু পরেই সেই ভয় কোথায় উড়ে গেল। শুধুই রবীন্দ্রনাথের প্রশস্তি, প্রশংসা। রানীর লেখার প্রশংসা করলেন এই বলে,’আশ্চর্য রূপ দিয়েছ— ছবির পর ছবি ফুটিয়ে গেছে অবন।’ রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল, অবনীন্দ্রনাথ ঘটনার পর ঘটনা বলে যাচ্ছেন, তিনি শুনতে পাচ্ছেন, দেখতে পাচ্ছেন। চমৎকার লিখেছে রানী, এতে বদলানোর কিছু নেই। তখনই স্নেহের সুরে রানীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, অবনীন্দ্রনাথের থেকে আরও গল্প আদায় করার জন্য। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাইপোটিকে ভালো রকম জানতেন, এমন করে বলিয়ে না নিলে তাঁর পক্ষে আর লেখা হয়ে উঠবে না। বিলক্ষণ তা জানতেন বলেই রানীর লেখার কোণে অবনীন্দ্রনাথের উদ্দেশে দু-কথা লিখেও দিয়েছিলেন। হাতে পেয়ে অবনীন্দ্রনাথের সে কী আনন্দ! রানী চন্দ লিখেছেন, ‘যেমন ছোট ছেলে রঙিন খেলনা পেলে খপ করে নিয়ে মুঠোয় লুকোয়—টুকরো কাগজের চিঠিখানা তেমনি করেই নিয়ে নিলেন। বললেন, ‘রানী, এই চিঠি তোমাকে দেব না। এ যে রবিকা আমায় লিখেছেন —আমার চিঠি।’
কলকাতায় বৃষ্টি

'ঘরোয়া' প্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথের চিঠি।

রানী চন্দের লেখায় আছে, ‘সে একটা সময় গেছে আমার- সোনায়-মোড়া সময়। গুরুদেবের স্নেহ উপচে পড়ছে অবনীন্দ্রনাথের উপর। আমায় দিয়ে বলে পাঠালেন- অবনকে গিয়ে আমার নাম করে বলিস, আমি শুনতে চেয়েছি।

অবনীন্দ্রনাথ খুশিতে উছলে উঠছেন, রবিকা গল্প শুনে খুশি হয়েছেন, আরও শুনতে চাইছেন! বললেন, যত পার নিয়ে যাও, রবিকাকে গিয়ে শোনাও। আমি যেন দুজনের স্নেহ-ভালোবাসার বাহন হয়ে গিয়েছিলাম তখন।’
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

এরপর থেকে অবনীন্দ্রনাথ প্রায় রোজই জোড়াসাঁকোর ৫ নম্বর বাড়ি থেকে আসতেন ৬ নম্বর বাড়িতে। রানীকে শোনাতেন নিজের জীবনের গল্প। সকালে আসতেন, বিকেলে আসতেন। তিন-চার ঘণ্টা টানা বলে যেতেন নিজের জীবনের গল্প। রানী সেসব গল্প লিখে প্রথমে অবনীন্দ্রনাথকে শোনাতেন, তারপর রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথ পড়তে পড়তে কখনো হো-হো করে হাসতেন, আবার কখনো চোখের জল মুছতেন। রবীন্দ্রনাথের চোখে জল, রানী সেবারই প্রথম দেখেছিলেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, অবনীন্দ্রনাথের তুলিতে।

প্রথম দিনে অবশ্য পুরোটা পড়া হয়নি, গুরুদেব পরম প্রশান্তি নিয়ে পড়লেন টানা ক-দিন। মুগ্ধতা, পরিতৃপ্তি। রানীকে বললেন, ‘কী সুন্দর অবন সেকালের আমাকে তুলে ধরেছে। সবাই ভাবে আমি চিরকাল বাবুয়ানি করেই কাটিয়েছি পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে। কিন্তু কীসের ভেতর দিয়ে যে আমাকে আসতে হয়েছে, এই লেখাগুলোতে তা স্পষ্টরূপে ধরা পড়েছে।’

পড়ার পর গল্প লেখা কাগজগুলো তখনই রানী চন্দকে ফেরত দেননি গুরুদেব। পড়া কাগজগুলো কোলের ওপর রেখে বাঁ হাত দিয়ে চাপা দিয়ে রেখেছিলেন। খানিক পরেই ডেকেছিলেন রথীন্দ্রনাথকে। সেসব তাঁর হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘প্রেসে দাও।’

এইভাবেই লেখা হয়েছিল, ছাপা হয়েছিল অবনীন্দ্রনাথের ‘ঘরোয়া’। ‘ঘরোয়া’ শুধু নয়, অবনীন্দ্রনাথের আরও একটি বই শুনে শুনে লেখা। সেটি ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’। অবনীন্দ্রনাথের এই দুটি বইয়েরই অনুলিখন করেছিলেন রানী চন্দ।
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content