
মণিহারা ছবির একটি দৃশ্য।
আজ বাইশে শ্রাবণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। রবীন্দ্রজন্ম-শতবর্ষে নির্মিত চলচ্চিত্র “মণিহারা”র কিছু দৃশ্য থাকল আজ। চলচ্চিত্রের দৃশ্যভাষায় বাঙ্ময় হয়ে ওঠা কিছু মুহূর্তের অধিবাস্তবতার নেপথ্যে জেগে থাকা দুর্জ্ঞেয় মনোলোকে আজ যাওয়া যাক। সেই মরজগৎ দেহাতীত অতীন্দ্রিয় অনুভূতির যূথীগন্ধে অশান্ত হয়, সেখানে করুণসুরে বিচ্ছেদের সুর বাজে।
ফণিভূষণের বাসভবনের করিডরের যাতায়াতের পথ ও সংলগ্ন সজ্জিত শয়নকক্ষটি চলচ্চিত্র জুড়ে নির্বাক কিছু সঙ্কেত রচনা করতে করতে সিনেমার চরিত্র হয়ে ওঠে ক্রমশ। ছবিটিতে আবহসঙ্গীত এক অপূর্ব ঘোরলাগা অপার্থিব পরিবেশ রচনা করতে থাকে অনুজ্জ্বল আবছা ধোঁয়াটে দৃশ্যায়ন। অন্ধকার এই ছবিতে সুষমামণ্ডিত, আলো আর আঁধারের মাঝে থাকা নানা শেডস ছবি জুড়ে ঘুরতে থাকে। তার অন্তর্লীন বক্তব্যটি অনুরণিত হতে থাকে “বাজে করুণসুরে” গানটিতে। ছমছমে শিহরণ জাগে।
ফণিভূষণের বাসভবনের করিডরের যাতায়াতের পথ ও সংলগ্ন সজ্জিত শয়নকক্ষটি চলচ্চিত্র জুড়ে নির্বাক কিছু সঙ্কেত রচনা করতে করতে সিনেমার চরিত্র হয়ে ওঠে ক্রমশ। ছবিটিতে আবহসঙ্গীত এক অপূর্ব ঘোরলাগা অপার্থিব পরিবেশ রচনা করতে থাকে অনুজ্জ্বল আবছা ধোঁয়াটে দৃশ্যায়ন। অন্ধকার এই ছবিতে সুষমামণ্ডিত, আলো আর আঁধারের মাঝে থাকা নানা শেডস ছবি জুড়ে ঘুরতে থাকে। তার অন্তর্লীন বক্তব্যটি অনুরণিত হতে থাকে “বাজে করুণসুরে” গানটিতে। ছমছমে শিহরণ জাগে।
ফণিভূষণের স্ত্রী মণিমালিকা অলঙ্কারের প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত। তার আসক্তি প্রায় বিকারতুল্য। ফণিভূষণ দুর্বলচিত্তের পুরুষ। মণিমালিকার ঘোর সন্দেহ ছিল ব্যবসায়িক দুর্বিপাকে ফণিভূষণ তার গয়নার ভাণ্ডারের দখল নিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ফণিভূষণ অর্থের ব্যবস্থা করতে গেল। আশ্বাস দিয়েছিল, টাকার জোগাড় হলে সে একটি নতুন গয়না আনবে। ফণিভূষণ গয়না নিয়ে ফিরলো বটে, কিন্তু তার আগেই মণিমালিকা তার সকল গয়না নিয়ে গৃহত্যাগ করল। এই নিরুদ্দেশ যাত্রায় নিয়তি তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে গেল। দর্শক স্মরণ করবেন সেই পূর্বশ্রুত সঙ্গীত: “এ মম পান্থচিত চঞ্চল / জানি না কী উদ্দেশে”… ফণিভূষণ মহাদেব চির উদাসীন, ত্রিগুণাতীত, চিরভিখারী। তিনিই আবার অতুল ঐশ্বর্যময়। তাঁর কণ্ঠে এই মণিমালিকার মণিহার সাজে? ব্যক্তি ফণিভূষণের নিরুচ্চার ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষার পাশে মণিমালিকার মণিমাণিক্যপ্রিয় বস্তুবাদ। তাদের নাম জাগিয়ে তোলে আরেক ছবি। ফণীর মাথায় মণি ও মণিহারা ফণীর অনুষঙ্গ। সাপের মাথায় মণির অস্তিত্ব যেমন মনোগত, তেমনই ফণিভূষণের জীবনে মণিমালিকার উপস্থিতি। এই বিশ্লেষণ চলচ্চিত্রের প্রেক্ষিতে, রবীন্দ্রনাথের প্রসিদ্ধ ছোটগল্পটির প্রেক্ষাপটে নয়।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৮ : গরুর চোখে জল

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক
মণিমালিকার অন্তর্ধানের মুহূর্ত। নানা অতৃপ্ত বিভঙ্গের মূর্তিশোভিত সেই জমিদারবাড়ির করিডরের আলোগুলি যেন গভীর রাত্রির রহস্যঘন নির্জন অন্ধকারকেই বাড়িয়ে তোলে কেবল। এরপর পর্দা জুড়ে নেমে আসে অন্ধকার। তারপর আবার দৃশ্য ফুটে ওঠে। ঘোরলাগা কুয়াশার মতো আলোয় দেখা যায় সেই করিডর। প্রবেশ করে ফণিভূষণ। তার শয়নকক্ষে সকালের চাপা ফ্যাকাশে আলো, রাতের সেজবাতি জ্বলছে। পাওয়া যায় না মণিমালিকাকে। ঘরে ছড়িয়ে পড়ে থাকা শৌখিন ছড়ি, তাস, শূন্য গয়নার বাক্স থেকে ফণিভূষণের জেগে ওঠা আশঙ্কা ও ক্রমশঃ তার মধ্যে জেগে ওঠা অশান্তি দেখা যায়। সে দৌড়ে বেরিয়ে যায় কুয়াশামাখা করিডরের পথে। নেপথ্যে দ্রিম দ্রিম হৃদাঘাতের ধ্বনি। ক্রমশঃ ধীরে, অতি ধীরে নির্মিত হতে থাকে সংশয়মুখর পরাবাস্তবতার ভাষ্য।
পরের দৃশ্যে রাতের আলোয় বিভ্রান্ত ফণিভূষণকে দেখা যায়। পাশে গোলটেবিলের মধ্যে জ্বলতে থাকা সেজবাতিটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফণিভূষণ তখন মণিমালিকার প্রত্যাবর্তনের অটুট আশায় বিভোর। এখানেই তার মনোবিকলন। সেজবাতিটি যেন অসীম কালো সাগরে লাইটহাউস হয়ে জ্বলে। ক্রমে তার চোখ যায় সদ্য কেনা নেকলেসের বাক্সে। হাতে তুলে নেয় বাক্সটি। নেপথ্যে ঝড়ের আওয়াজ শোনা যায়, একটু হাওয়াও এসে শরীর ছুঁয়ে যায় যেন। সে বাক্স খুলে দেখে। নেপথ্যে উচ্চ খিলখিল হাসি শোনা যায়। সে চমকে ওঠে। এও তার মনোবিকার। স্মৃতিপথ বেয়ে মণিমালিকার সত্তাটি যেন জেগে উঠতে চায়। ফণিভূষণ অসংলগ্ন আচরণে বেরিয়ে আসে পাশের সেই করিডরে। সেখানে ভৃত্য অপেক্ষায়। করিডরের আলো ও অন্ধকারে নানা মহার্ঘ্য জড় শিল্পবস্তু যেন সপ্রাণ, সবাক। পুরো সময়টা জুড়ে ক্যামেরার চোখ ফণিভূষণের মাথার ওপরে জেগে থাকা ছাদ ও কড়িকাঠের সাদা কালো শুষ্ক খটখটে হাড়ের মতো চিত্রকল্প জাগিয়ে তুলতে চায়। আবহসঙ্গীতে রহস্য ও দ্বন্দ্বের যুগলরূপ জেগে উঠতে থাকে।
পরের দৃশ্যে রাতের আলোয় বিভ্রান্ত ফণিভূষণকে দেখা যায়। পাশে গোলটেবিলের মধ্যে জ্বলতে থাকা সেজবাতিটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফণিভূষণ তখন মণিমালিকার প্রত্যাবর্তনের অটুট আশায় বিভোর। এখানেই তার মনোবিকলন। সেজবাতিটি যেন অসীম কালো সাগরে লাইটহাউস হয়ে জ্বলে। ক্রমে তার চোখ যায় সদ্য কেনা নেকলেসের বাক্সে। হাতে তুলে নেয় বাক্সটি। নেপথ্যে ঝড়ের আওয়াজ শোনা যায়, একটু হাওয়াও এসে শরীর ছুঁয়ে যায় যেন। সে বাক্স খুলে দেখে। নেপথ্যে উচ্চ খিলখিল হাসি শোনা যায়। সে চমকে ওঠে। এও তার মনোবিকার। স্মৃতিপথ বেয়ে মণিমালিকার সত্তাটি যেন জেগে উঠতে চায়। ফণিভূষণ অসংলগ্ন আচরণে বেরিয়ে আসে পাশের সেই করিডরে। সেখানে ভৃত্য অপেক্ষায়। করিডরের আলো ও অন্ধকারে নানা মহার্ঘ্য জড় শিল্পবস্তু যেন সপ্রাণ, সবাক। পুরো সময়টা জুড়ে ক্যামেরার চোখ ফণিভূষণের মাথার ওপরে জেগে থাকা ছাদ ও কড়িকাঠের সাদা কালো শুষ্ক খটখটে হাড়ের মতো চিত্রকল্প জাগিয়ে তুলতে চায়। আবহসঙ্গীতে রহস্য ও দ্বন্দ্বের যুগলরূপ জেগে উঠতে থাকে।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭১: ত্রিপুরার রাজসভা আলোকিত করেছিলেন পণ্ডিত চন্দ্রোদয় ভট্টাচার্য

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৬: মিটিং
ফণিভূষণ এখন বিছানায় আধশোয়া। চোখের চশমা খুলে রাখে। মুড়ে রাখে হাতের বই। নেপথ্যে শেয়ালের কান্না। রাত গভীর। এবার যেন মায়ালোক নেমে আসবে ধরার বুকে। সব কেতাবি থিওরিকে বীক্ষণযন্ত্রের নিচে রেখে পড়ার দিন শেষ হল বুঝি। পাশে তার আশার আলোকস্তম্ভ, সেজবাতি। পাশের টেবিলে ফটোফ্রেমে বাঁধানো মণিমালিকার আবক্ষচিত্র ইঙ্গিতবাহী। ছবির পাশে সুদৃশ্য টেবিলক্লকে সময় রাত দশটা কুড়ি, ঘড়িতে ছোট ছোট চারটি পেন্ডুলাম একবার সময়ের অনুকূলে, একবার প্রতিকূলে ঘোরে। বোঝা যায়, বিশেষ কোনও মুহূর্তের পরিসর প্রস্তুত হচ্ছে। যা যৌক্তিক, আবার যুক্তির অতীত-ও বটে। সেই করিডরটি আবার দেখা যায়। অন্ধকার ও সামান্য আলোয় এখন তা অপার্থিব। বারবার এই করিডরের ফিরে আসা হয়তো জীবনের যাওয়া-আসার শূন্যপথের, চলে যাওয়া আর প্রত্যাবর্তনের সংশয়দীর্ণ ক্ষেত্রটিকেই ভুলতে দিতে চায় না। ক্যামেরা এখন অনেকটাই যেন নেমে এসেছে মাটির কাছাকাছি। কারোর ধরাতলে নেমে আসার দ্যোতনা হয়তো জেগে ওঠে।
সুপ্ত ফণিভূষণের তন্দ্রার ঘোর ছুটে যায় নুপূরের শব্দে, কে যেন এসে দাঁড়ায় বুঝি! শয়নে স্বপনে ফণিভূষণ যে প্রতীক্ষায় বাঁচে এ তারই চিত্রকল্প। তার মনোবিকলন আরও গভীর, স্পষ্ট। সে ছুটে যায়। শয়নকক্ষের দ্বার খোলে। সেই দরজার ওপর তখন বিপরীতে থাকা জাফরির ঘেরাটোপের মধ্য দিয়ে আসা নরম আলোমাখা বিচিত্র সচল ছায়া। মনে হতে পারে, দরজাটি বুঝি জীবন্ত হয়ে উঠতে চায়। মনে হতে পারে, দরজার ওপারেই যেন এক অপার্থিব লোকান্তরের অপেক্ষা।
সুপ্ত ফণিভূষণের তন্দ্রার ঘোর ছুটে যায় নুপূরের শব্দে, কে যেন এসে দাঁড়ায় বুঝি! শয়নে স্বপনে ফণিভূষণ যে প্রতীক্ষায় বাঁচে এ তারই চিত্রকল্প। তার মনোবিকলন আরও গভীর, স্পষ্ট। সে ছুটে যায়। শয়নকক্ষের দ্বার খোলে। সেই দরজার ওপর তখন বিপরীতে থাকা জাফরির ঘেরাটোপের মধ্য দিয়ে আসা নরম আলোমাখা বিচিত্র সচল ছায়া। মনে হতে পারে, দরজাটি বুঝি জীবন্ত হয়ে উঠতে চায়। মনে হতে পারে, দরজার ওপারেই যেন এক অপার্থিব লোকান্তরের অপেক্ষা।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে
দরজা খুলে আবারও সেই করিডর। অসংলগ্ন পদক্ষেপে মণিহারা ফণীটি তার আকাঙ্ক্ষিত অলীক স্বপ্নের পিছনে ধাওয়া করে যেন, ফিরেও আসে। চারপাশে গভীর রাত, উজ্জ্বল আলোর পাশে জেগে থাকা অন্ধকার আর অসংখ্য বিচিত্র নিষ্প্রাণ স্তম্ভ ও মূর্তির মাঝে নিঃসঙ্গ ফণিভূষণ কী যেন খোঁজে পাগলের মতো। বিস্মিত ভৃত্যটিকে দেখা যায়। দর্শক যেন রুদ্ধশ্বাসে কীসের অপেক্ষা করেন। তাঁর হয়তো মনে পড়ে চরণগুলি “বাজে করুণ সুরে হায় দূরে/ তব চরণতলচুম্বিত পন্থবীণা… যূথীগন্ধ অশান্ত সমীরে/ ধায় উতলা উচ্ছ্বাসে,/ তেমনি চিত্ত উদাসী রে/ নিদারুণ বিচ্ছেদের নিশীথে।” নেপথ্যে দ্রিমি দ্রিমি হৃদাঘাতের ধ্বনি, অপার্থিব রহস্যের সুর বাজে।
খানিক পরের দৃশ্য, পরের দিনের পূর্ণিমার রাত। আবারও সেজবাতির পাশে ফণিভূষণের অশান্ত ইতস্তত পাদচারণা, তার বদ্ধমূল পাগলপারা আশা যেন রুদ্ধ অন্দরে ছটফট করে কীসের প্রতীক্ষায়। পাশের টেবিলে নেকলেসের বাক্সটা রেখে সে বিছানায় যায়। সে কি টোপের মতো ব্যবহার করে অলঙ্কারটিকে? সেই দূরবিসারী অন্ধকারাচ্ছন্ন লুপ্তপ্রায় চেতনার মতো পড়ে থাকা প্রসারিত করিডর দেখা যায় আবার। ক্যামেরা নিচের দিকে নেমে আসতে থাকে। করিডরের দুপাশের অন্দরসাজ ঊর্ধ্বগামী হয়। আসা যাওয়া, উত্তরণ অবতরণের অনুষঙ্গ জেগে ওঠে আবার। ক্রমে ক্রমে সচল হয় যেন ক্যামেরার চোখ, আলোর প্রেক্ষাপটে পর্দাজোড়া প্রাসাদের অন্ধকার, জ্যোত্স্নায় ভেসে যাওয়া বাগান পার হয় নুপূরের ধ্বনি, করিডরের শেষপ্রান্তে থাকা দরজা সচল হয়, সচল সতর্ক হয় বিছানায় জেগে থাকা ফণিভূষণ।
খানিক পরের দৃশ্য, পরের দিনের পূর্ণিমার রাত। আবারও সেজবাতির পাশে ফণিভূষণের অশান্ত ইতস্তত পাদচারণা, তার বদ্ধমূল পাগলপারা আশা যেন রুদ্ধ অন্দরে ছটফট করে কীসের প্রতীক্ষায়। পাশের টেবিলে নেকলেসের বাক্সটা রেখে সে বিছানায় যায়। সে কি টোপের মতো ব্যবহার করে অলঙ্কারটিকে? সেই দূরবিসারী অন্ধকারাচ্ছন্ন লুপ্তপ্রায় চেতনার মতো পড়ে থাকা প্রসারিত করিডর দেখা যায় আবার। ক্যামেরা নিচের দিকে নেমে আসতে থাকে। করিডরের দুপাশের অন্দরসাজ ঊর্ধ্বগামী হয়। আসা যাওয়া, উত্তরণ অবতরণের অনুষঙ্গ জেগে ওঠে আবার। ক্রমে ক্রমে সচল হয় যেন ক্যামেরার চোখ, আলোর প্রেক্ষাপটে পর্দাজোড়া প্রাসাদের অন্ধকার, জ্যোত্স্নায় ভেসে যাওয়া বাগান পার হয় নুপূরের ধ্বনি, করিডরের শেষপ্রান্তে থাকা দরজা সচল হয়, সচল সতর্ক হয় বিছানায় জেগে থাকা ফণিভূষণ।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
ক্রমে নুপূরনিক্বণ করিডর পার হয়ে হয়ে শয়নকক্ষের দরজায় থমকায়। তারপর প্রবেশ করে। যেন মৃত্যু জেগে ওঠে। ফণিভূষণ তারই অপেক্ষায়। দরজায় থমকে থাকা জাফরির নক্সামাখা আলো আঁধারির কম্পমান ছায়া সম্ভব-অসম্ভবের জগৎ পার হয় যেন। ফণিভূষণের উদগ্র প্রতীক্ষা, নেপথ্যে ঝড়ের ধ্বনি, দরজা খোলার ক্যাঁচ্ শব্দ, সময়ের বিপরীতে ঘুরতে থাকা টেবিলক্লকের পেন্ডুলাম, আয়নায় এসবের প্রতিচ্ছবি, ঘড়িতে বারোটা বাজার আবছা আভাস, ছায়ামূর্তি– সব মিলিয়ে অলৌকিক এক মুহূর্তের জন্ম হয়। এগুলি সত্য না ভ্রম সেই তর্ক বৃথা। কারণ নায়ক ফণিভূষণ মনোবিকলনের শিকার, গল্পের কথক গঞ্জিকাসেবী। শয়ন কক্ষের আলো আঁধারির পথে সে আসে। রুদ্ধবাক্ দর্শক সেই ঘরের বিষণ্ণ অন্ধকার দেখেন, সেই সেজবাতির ম্লান আলো দেখা যায়। এ ছবি আশা পূরণের নাকি শূন্যতার সেই ইঙ্গিতময় প্রশ্নটুকু জাগে। ক্যামেরা আরও এগিয়ে আসে। এখন সেজবাজি উজ্জ্বলতর, সম্মুখবর্তিনী মূর্তিমতী আশা। নেপথ্যসঙ্গীত উচ্চকিত দ্রুততর হয়, শোনা যায় অশরীরী খিলখিল হাসি, ফণিভূষণের আর্তনাদ, দেখা যায় কঙ্কালের রত্নালঙ্কারশোভিত হাত ছিনিয়ে নেয় নেকলেস।
এসব সত্য না বিভ্রম, ইতিহাস না গাঁজাখুরি সে তর্ক বৃথা। এখানে জেগে আছে কেবল প্রয়াণের রহস্যঘেরা ছায়াপথ, হারানোর বেদনা, জীবন ও জীবনাতিরিক্ত অনন্ত জিজ্ঞাসাটুকু। আর জেগে থাকে ওই করিডর, বারবার তার আসা যাওয়ায় চলচ্চিত্রের নাটকীয় দ্বন্দ্বমাখা ইঙ্গিতটুকু রসজ্ঞ দর্শক বুঝে নিতে পারেন। —চলবে।
এসব সত্য না বিভ্রম, ইতিহাস না গাঁজাখুরি সে তর্ক বৃথা। এখানে জেগে আছে কেবল প্রয়াণের রহস্যঘেরা ছায়াপথ, হারানোর বেদনা, জীবন ও জীবনাতিরিক্ত অনন্ত জিজ্ঞাসাটুকু। আর জেগে থাকে ওই করিডর, বারবার তার আসা যাওয়ায় চলচ্চিত্রের নাটকীয় দ্বন্দ্বমাখা ইঙ্গিতটুকু রসজ্ঞ দর্শক বুঝে নিতে পারেন। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















