শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
অনেকদিন পরে এবার গ্রামে এল উল্লাস। তবে যতদিন পরেই আসুক, একইসঙ্গে ভালো লাগা আর মন খারাপ হয় তার। ভালো লাগা খুব স্বাভাবিক। নিজের শেকড়কে অস্বীকার করতে চায় না যারা, তাদের কাছে শেকড়ের কাছাকাছি আসাই পরম আনন্দের। যে-মাটিতে বেড়ে চোখ মেলেছে, বেড়ে উঠেছে, যে-মাটির কাছে জীবনের বিরাট এক সময়ের প্রতি মুহূর্ত ঋণী হয়ে আছে, তার কাছে এসে যারা আনন্দ পায় না, শান্তি পায় না, তাদের মতো পাষণ্ড আর কে আছে? উল্লাস সেইধরণের মানুষ নয়। গ্রামে আসা বরাবর তার কাছে আনন্দের। যদি এমন হত যে, তার গ্রামটা শহরের মোটামুটি কাছাকাছি, তাহলে সে গ্রামের বাড়ি থেকেই যাতায়াত করার চেষ্টা করতো। যদিও সে জানে তার পেশায় সেটা সম্ভব নয়। একে তার পেশা মূলত শহর-কেন্দ্রিক।

এমন নয় যে, গ্রামে কেউ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয় না, কিংবা ব্যাকপেইন ইত্যাদিতে ভোগে না। কিন্তু গ্রামের মানুষ ভাবতেই পারে না যে, টাকা খরচ করে কোন ম্যাসিওর এসে সেগুলির শুশ্রূষার দায়িত্ব নেবে। লোকে কষ্ট সহ্য করবে বরং, কিন্তু তাদের কাছে আপাত ‘তুচ্ছ’ এই অসুখের কোন গুরুত্বই নেই। শহরে উল্টো। তাও উল্লাস যদি সদরে কাজ করতে পারত, তাহলে তার আয় অনেক বেশি হতো। ইদানীং সে সদরেও কিছু ক্লায়েন্ট ধরেছে। সপ্তাহে তিন দিন সদরে যাচ্ছে আজকাল। সেখানে টাকা বেশি। ছোট শহরে সেইরকম ক্লায়েন্ট কোথায়? থাকলেও তারা তিনজনে মিলে যা দেয়, সদরে একজনকে সেই সার্ভিস দিলে তার চেয়ে বেশি টাকা পাওয়া যায়। কলকাতায় যেতে পারলে তো আরও ভালো। কিন্তু কলকাতায় এখনই যাওয়ার ইচ্ছা নেই তার। তাছাড়া যদি ওত দূরেই যেতে হয়, তাহলে সে দিল্লি বা হায়দ্রাবাদ কিংবা পুণে যাবে। সেখানে ম্যাসাজ আর ফিজিওথেরাপির বেশি ডিমান্ড।
কলকাতার লোকজন আজকের দিনে বসেও এই কাজকে ছোট বলে মনে করে। ভাবতে অবাক লাগলেও কথাটা সত্যি। অবশ্য তার কিছু কারণও আছে। বডি-ম্যাসাজের নামে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওথা ব্রথেল, স্পা-এর আড়ালে চলা মধুচক্রের কারবার এই পেশা সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের মনে ভুল ধারণা তৈরি করেছে। একা উল্লাস আর কীভাবেই বা বদলাতে পারবে মানুষের সেই ধারণা? দিল্লি, মুম্বই, পুণে—এসব জায়গায় আজকাল আর কেউ ম্যাসাজের কাজকে ছোট বলে মনে করে না। চার্জও হাই। কিন্তু সে-সব জায়গায় কোনদিন উল্লাস যেতে পারবে বলে আশা করে না, তবে স্বপ্ন দেখে। সে-যদি লেখাপড়াটা ভালো করে করতো! ইংরাজিতে যদি চোস্ত হত, তাহলে আর ভাবনা ছিল না।

প্রত্যন্ত বাংলার গ্রামীণ টানে কথাবার্তা বললে, হাই-সোস্যাইটিতে কে আর তাকে পাত্তা দেবে? তার চেয়ে যতদিন এখানেই থাকা যায়, কোনভাবে চলে যায়, ততদিন এখানেই থাকবে সে। একটাই আশার কথা, এখানে এখনও এই পেশায় প্রতিযোগিতা কম, কারণ ম্যাসিওরের সংখ্যা হাতেগোণা। মোটামুটি হাত ভালো হলে একজনের রেফারেন্সে অন্য আর-একটি কাজ পাওয়া যায়। তাছাড়া আজকাল অনেকেই সচেতন হচ্ছেন। শহরে বেশ কয়েকটি মাল্টিজিম গড়ে উঠেছে। তাদের মেম্বারদের অনেকে জিম-অ্যাডিক্টেড। তাদের ডিপ-টিস্যু ম্যাসাজ দরকার হয়। ফলে আস্তে-আস্তে পশার জমিয়ে তুলতে পারবে, এই আশাই রাখে উল্লাস।

গ্রামে এলে তার সেই ক’দিনের কাজগুলি করতে পারে না বলে, আয় হয় না। তার পেশায় তো আর মাস-মাইনের ব্যবস্থা নেই। বড়-বড় শহরে পার্মানেন্ট ম্যাসিওর থাকে, তাদের মাস-গেলে মোটা টাকা ইনকাম। কিন্তু এখানে কে আর মাসিক হিসেবে রাখবে? ফলে যে-ক’দিন গ্রামে থাকবে, সে ক’দিন তার ইনকাম বন্ধ। যদিও সেই কলকাতা থেকে আসা অফিসার বলেছেন, এই ক’দিন এখানে থেকে কাজ করার জন্য তার পেমেন্টের ব্যবস্থা তিনি করবেন এবং সেটা তার ম্যাসাজের কাজের চেয়ে বেশিই হবে, এই আশা তাকে দিয়েছেন তিনি। লোকটি সত্যিই মাটির মানুষ। এমন দেবদূতের মতো দেখতে, যেমন ফিজিক, তেমনই ভালো মানুষ। তার মতো মফস্‌সলের ম্যাসিওরকে দেখেও নাক-সিঁটকাননি। খুব সহজভাবেই কথা বলেছেন। ভালো লেগে গিয়েছিল বলেই উল্লাস এই ঝুঁকির কাজে রাজি হয়েছে। কে জানে এটাই তার কপালে লেখা ছিল হয়তো।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৬: আমরা আসলে কাকে পুজো করছি? ঈশ্বরকে, নাকি রক্তমাখা অভ্যাসকে?

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৫: রবীন্দ্রনাথের বিয়ের রাতে মারা গিয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির জামাই

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৪: সে-যে কেবলই যাতনাময়

প্রতিবার গ্রামে আসবার সময় উল্লাস ভাবে, এবার হয়তো গ্রামে পৌঁছেই নতুন কোন কাজ কিংবা বদল দেখতে পাবে সে। কিন্তু বার-বার হতাশ হয়, এবারেও হয়েছে। যদিও মাস তিন-চারেকের ব্যবধানে এলে কতটাই বা বদল তার চোখে পড়বে, হবেই বা কতটা, তাও প্রশাসন যদি চায়, তাহলে কী না হতে পারে? উত্তাল নদীর উপর রাতারাতি ব্রিজ তৈরি করে আর্মিরা, শুনেছে সে, আর এখানে সড়কগুলি মোরাম ফেলে একটু ভদ্রস্থ করে তোলা যায় না? খারাপ হয়ে যাওয়া পানীয় জলের কলগুলিকে সারানো যায় না? পুকুর সংস্কার করা যায় না? একশো দিনের কাজের প্রকল্পের কাজ প্রায় বন্ধ। এ-ওকে দোষ দিচ্ছে, এ-ওর ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছে।

আদতে উল্লাস জানে, সব দলই প্রায় সমান। রাজনৈতিক উন্নয়ন মুখে যতটা হয়, কাজে ততটা হয় না। হলে আর গ্রামগুলি যেই আঁধারে পড়ে ছিল, সেই আঁধারেই পড়ে থাকত না। মাঝেমধ্যে ভাবে সে, তার হাতে যদি যাদুর তুলি থাকত, তাহলে সে এক নিমেষে বিদেশের গ্রামের ঝকঝকে ছবির মতো তার নিজের গ্রামটিকেও পিকচার পোস্টকার্ড বানিয়ে দিতো। এ-কথা মনে পড়ায় সে হাসল একটু।
মঙ্গল ওঝা তার দিকে খরচোখে তাকিয়ে বলল, “কী রে, হাসছিস ক্যানে?”
সে বসে আছে মঙ্গল ওঝার ঘরের দাওয়ায়। ঘরটা পিশাচপাহাড় নামক টিলার যেদিকে কালাদেওর গুহা ও মন্দির, ঠিক তার অন্যদিকে। অন্যদিক মানে রাস্তার এপাশ ওপাশ নয়, টিলার এপাশ-ওপাশ। রোজ অনেকখানি পথ পেরিয়ে এলে তবেই মন্দিরে পৌঁছানো যায়। এখন অবশ্য মঙ্গল ওঝার বাইক হয়েছে, ফলে আধ ঘণ্টখানেক লাগে, কী তার একটু বেশি। আগে মঙ্গল ওঝার বাবা হেঁটেই আসতেন রোজ, হেঁটেই ফিরতেন দু’বেলা। আগেকার দিনের মানুষের মধ্যে সততা ছিল, শারীরিক সামর্থও কম ছিল না। এখনকার মানুষের মধ্যে আর সেই-সব গুণ-শক্তি-সততা কোথায়?

মঙ্গল ওঝার বাড়িতে তাকে আসতেই হতো। গ্রামের সাম্প্রতিক হালচাল কেমন, কিছু হয়েছে কি-না, এ-সব ব্যাপারে মঙ্গল ওঝা একেবারে গেজেটের কাজ করে। সব খবর তার কানে এসে পৌঁছয় এবং লোকে তাকে সে-সব জিজ্ঞাসা করলে সে খুশিই হয়। এই যেমন আজ উল্লাস মাহাতো এসে তাকে শারীরিক কুশল প্রশ্ন করায় সে খুব খুশি হয়েছে। এই যে উল্লাসের মতো বর্তমানে শহরবাসী লোকজনও যে তার ব্যাপারে ভাবে, তাকে সমীহ করে, এটা মঙ্গলের মনে একপ্রকার আত্মপ্রসাদের ভাব জাগায়।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৭ : পাঠশালা-ক্লাসরুম

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৮: সকলের উপর মা সারদার ছিল সমান অধিকার

আজকেও উল্লাস দুপুর-দুপুর নাগাদ এসেছে খবর পেয়েছে মঙ্গল। তারপর বাড়িতে চাট্টি মুখে দিয়েই যে তার কাছে এসেছে প্রণাম করার জন্য, এই ভক্তি তো আজকাল কমেই আসছে। মঙ্গলের বাবার যে-দাপট ছিল, তার আর সেই দাপট কোথায়? তা-ও পঞ্চায়েত-প্রধান, বিডিও সাহেব আছেন, ভক্তিশ্রদ্ধা করেন বলে এখনও সে কিছু বললে গ্রামের মানুষ ভয়ে হোক বা ভক্তিতে হোক, শোনে। কিন্তু তাঁরা যদি কোনও কারণে পাশ থেকে সরে যান, তাহলে আর দেখতে হবে না মঙ্গলকে। কালাদেওর মন্দিরে ঝাঁপ ফেলতে হবে।

পেন্নাম-টেন্নাম করে কুশল-মঙ্গল সমাচার সব নিয়ে উল্লাস যখন বলল, “আসছি যখন টুকুন বসি? হ্যাঁ?”
তা বিকেলে মন্দিরে পূজা দিতে যেতে মঙ্গলের এখন আধা ঘণ্টা-এক ঘণ্টা দেরি আছে। এতদিন পরে এসেছে উল্লাস, একটু না-হয় বসল। তারও দু’চারটে শহরের নতুন কথা জানা হবে।
উল্লাসকে হাসতে দেখে, মঙ্গল অবাক হয়েছিল। কারণ নেই হাসে কেন? মাথা খারাপ হল না-কি?” উল্লাসকে সে-কথা জিজ্ঞাসা করতেই উল্লাস বলল, “না না, সে-সব কিছু না বড় স্যাঙাত। আমি মনে-মনে ভাবছিলাম, যদি একটা যাদুকাঠি থাকত, তাহলে এক মন্তর পড়ে এই গ্রামকে বিলেত-আমেরিকার গ্রামের মতো করে দেওয়া যেত!”
“ওঃ! যত্ত-সব পাগলামি তুর। ওরকম মন্তর যদি থাকত আমাদের জানা, প্রত্যেকেই নিজেদের অবস্থা বদলে ফেলতাম কি-না তুই বল!”
“তা নিতাম। কিন্তু ওরকম মন্তর নেই জানি, মিথ্যে-মিথ্যে আছে ভেবে আনন্দ পাই একটু এই-আর-কি!” উল্লাস যেন সাফাই দিলো।
“তা তুর ডলাইমলাইয়ের বেওসা কেমন চলছে রে?”
“ভালো নয় ওঝা!” তারা গ্রামের ছেলে-বুড়ো সক্কলে মঙ্গল ওঝাকে কেবল “ওঝা” বলে সম্বোধন করে।
“ক্যানে রে? কী হল আবার?”
“শহরে এখন আত্র-ক’জন ডলাইমলাইয়ের লোক এসেছে, তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছি না ওঝা! সপ্তাহে আগে যতটুকু কামাতাম, এখন সেই কামাইতে ভাগ বসাচ্ছে আরও চার-পাঁচজন। তারপর তুমিই বল, যা জোটে, তাতে নিজে খাবো কী, বাড়িতেই বা পাঠাব কী?”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৯: কোটরে প্যাঁচা

“তবে তো তুর দমে মুশকিল!” মঙ্গল ওঝা বলে।
“মুশকিল বলে মুশকিল! দেখছ না ওই জন্যই তো আজকাল কতদিন পর-পর গ্রামে আসি। এবারেও আসা হত না, নেহাৎ মা অনেক করে ডাকছিল, সেজন্য এলাম!”
“বুঝতে পারছি। কলকাত্তা চলে যা না। সেখানে তো কাজের অভাব নেই!”
“কে বলেছে নেই? কত হাজার লোক বেকার বসে আছে সেখানে জানো? পেটে ভাত নেই, মাথার উপর ফুটো চালাও নেই, পরনে পরবার মতো ভালো কাপড়চোপড়ও নেই। ওখেনে কেউ যায়?”
“কেন? আমাদের হুইসেল আর তার ছেল্যা তো কলকাত্তায় থাকে। তাদের কাছে তো শুনি, সেখানে রাতদিন কেবল বিয়েবাড়ির মতো আলো জ্বলতিছে আর নিভতিছে!”
“ও-সব বাইরের দেখনদারি ওঝা। ভিতরে-ভিতরে যে কত অন্ধকার, তা কেউ জানলো না!” একটা ছদ্ম-দীর্ঘশ্বাস ফেলল উল্লাস।
“ওহ্। তা যাক্‌ কী-আর করবি বল? কপালে যা লিখা থাকে, তা কেউ খণ্ডাতে পারে না উল্লাস, কেউ না!”
“আচ্ছা ওঝা, একটু বড় করে কালাদেওকে পূজা চড়ালে কেমন হয়?”
“কে চড়াবে?” একটু যেন অবাক হয়েই প্রশ্ন করে মঙ্গল।
“আমি গো আমি। ভাবছি আমিই তাঁর থানে পূজা চড়াবো। কালাদেও সন্তুষ্ট হলে যদি কপাল ফেরে!”
“ও-সব দু’টাকা-পাঁচ টাকার পূজায় কালাদেও কী-আর আশীর্বাদ করবেন ভাবছিস তু?”
“দু’টাকা-পাঁচ টাকার পূজা কে বলেছে ? জোড়া মুরগি কিনে আনব হাট থেইক্যে। সেই সঙ্গে তুকেও একশো তাকা দেবো। পূজার অন্য খরচ আলাদা।”
“তুর কি লটারি লেগেছে না-কি? এত টাকা খরচ করবি যে, কোথায় পাবি?”
“কেন? এই ক’মাসে যা ইনকাম করেছি, তা দিয়েই পূজা দিই। কালাদেও সন্তুষ্ট হলে ঠিক ও-টাকা দ্বিগুণ হয়ে হাতে ফিরবে !”
“তা বটে। কালাদেওর অসাধ্যি আর কী-ই বা আছে? তা কবে দিবি পূজা?” লোভে চক্‌চক করে ওঠে মঙ্গল ওঝার মুখ।
“আছি তো ক’দিন। ইয়ার ভিতরেই একদিন দিয়ে দুবো। তুমাকে বলবো, চিন্তা নাই!”
“একদিন হাতে রেখে বলিস। বড় করে পূজা দিবি যখন তখন তার জোগাড়যন্তর করতেও তো সময় লাগবে। আর যদি বলিস কুন দিন দিলে ভালো, তাহলে বলব, কৃষ্ণপক্ষ শুরু হয়েছে, থাকতে-থাকতেই দিয়ে দে। ফল ভালো পাবি !”
“বেশ। তা গ্রামের খবরটবর কী ওঝা? শহরে তো কালাদেওকে নিয়ে খুব হইচই হচ্ছে!”
“হঁ, শুনেছি। তা হলে আমি কী করব? কালাদেও রুষ্ট হয়েছেন। তাঁর সহ্যের সীমা উয়ারা ছাড়িয়ে গিয়েছে, তাই তো তিনি শাস্তি দিচ্ছেন। তুর-আমার কী-ই বা করার আছে বল!”
“হ্যাঁ, সেটাই আমি সবাইকে বলি। তুরা বেচাল হোস্‌ বলেই তাঁকে শাস্তি দিতে বেরয়ে আসতে হয়!”
“এক্কেরে ঠিক কথা কইছিস তুই। তুরা থাক না তুদের ঠাকুরদেওতাদের লিয়ে। কালাদেও তাঁর নিজের মহাল নিয়ে থাকেন, সিখানে এত আনাগোণা কি ভালো ? কালাদেও নির্জনে থাকতে ভালোবাসেন, এত হইচই, এত ট্যুরিস্টপার্টি তাঁর সহ্য হবে ক্যানে ?”
“সেটাই তো! আচ্ছা ওঝা, কালাদেও যে এই বেরুচ্ছেন ঘন-ঘন, শহরে গিয়ে শাস্তি দিচ্ছেন যাদের মনে করছেন শাস্তি দেওয়ার মতো, তা তুমি তাকে দেখনি?”
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-২৭: আকাশ এখনও মেঘলা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭১: পুষ্পধনু

উল্লাসের প্রশ্ন শুনে মঙ্গল যেন ছিটকে উঠল, “এ তুই কেমন ম্লেচ্ছদের ভাষা বুলছিস উল্লাস? কালাদেও বেরুন রেতের বেলা, তখন কারুর মন্দিরের আশেপাশে থাকার কথা?”
“না তুমি তো তার পূজারী, তাই…! তাছাড়া দু’একটি ঘটনায় কালাদেওকে ঠিক সন্ধ্যের মুখে দেখা গেছে, তাই বলছিলাম আর-কি!”
“তুই জানিস না, ও-নিয়ম তাঁর প্রজাদের জন্য যেমন, পূজারীদের জন্যও এক। আমি যেমন সন্ধ্যে নামার মুখে চলে আসতাম, এখনও তা-ই আসি। আর তিনি যদি সকালেও বেরুতে চান, কিছু করতে চান, তা-কি আমাদের চোখের সামনে দিয়ে করবেন? কালাদেও চাইলে দেখা দিতে পারেন, কালাদেও চাইলে বাতাসে মিশে থেকেও এখানে-ওখানে ঘোরাফেরা করতে পারেন। সব তাঁর মর্জি। তুই কী ভাবিস, রেতের বেলায় কালাদেও তাঁর তালুক-মুলুক দেখতে বেরোন না? বেরোন, বেরোন। কিন্তু তুই-আমি টের পাই না। এ-গ্রামে, আর আশেপাশের কয়েকটা গ্রামে রেতের বেলায় কারুর বেরনো নিষিদ্ধ কেন? সেই জন্যই তো! ভুলে গিয়েছিস?”
“আরে না না, ভুলে যাবো কেন? ওঝা, তুমি ভুলে যাও এই গ্রামেই আমি জন্মেছি, বড় হয়েছি। অ-সব কথা ভোলা যায়? আসলে আমি বলতে চাইছিলাম, তুমি খুব সৌভাগ্যবান। কোনদিন হয়তো একটু দেরি করে বেরিয়েছ, আর তাঁর দেখা পেয়ে গেলে!”
“তুই কি ওই ধান্দায় এসেছিস এখেনে? খবরদার বলছি উল্লাস, কালাদেও রুষ্ট হলে তোর বেওয়সাপাতি তো দূরের কথা, তোকে আস্ত রাখবেন না!”
“আরে না না, আমি তো কথার কথা বললাম। আমাদের সাধ্যি কী যে সন্ধ্যের পরে কালাদেওর থানের দিকে যাই? আমার পূজা দিয়ে আশীর্বাদ নেওয়ার কথা, সেটাই পেলে হবে!”
উল্লাসের এই কথায় মঙ্গলের রাগ একটু পড়ে। বলে, “এখন আয়, আমি বেরবো।”
“তুমি রাগ করলে ওঝা ? আমি কিন্তু অমনি বলছিলাম। কোন কথা ভেবে বলি নাই!”
“নাহ্‌, রাগ করব কেন? তুই কী সব বড় পূজা দিবি বলছিলি, সত্যিই কি দিবি?”
“হ্যাঁ। মিথ্যে বলব কেন? তাড়াতাড়িই তোমাকে জানাবো, কাল-পরশুর ভিতর!”
“বেশ। এখন আয়, আমি মন্দিরে যাবো।” —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content