
মা সারদা।
মা সারদার অসুস্থতার খবর শুনে সকল ভক্তসন্তানেরা দূর থেকে ছুটে আসছে আর শ্রীমাকে দেখে তাদের মন বিষণ্ণ হয়ে উঠছে। তখন তাঁকে দর্শন ও প্রণাম করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেবল বিশেষ পরিচিতরাই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারবে, এমনটাই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে তাঁর সেবক ও সেবিকাদের। সকলেই শ্রীমার সুস্থতা চান, তাই কেউই নিয়ম লঙ্ঘন করতে চান না।
শ্রীমার অসুখের সংবাদ শুনে দূরদেশ থেকে শ্রীমার সন্তান সারদেশানন্দ এসেছেন। তিনি সকলের পরিচিত বলে শ্রীমার ঘরে গিয়ে কুশল জিজ্ঞাসা করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন। কখনও যদি শ্রীমা ডাকেন তো দুটো কথা হয়। ভয়ে ভয়ে তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন, যাতে শ্রীমার কষ্ট না হয়। অসুখের সময় প্রণাম করতে নেই, তাই তাঁর শ্রীমাকে প্রণামও করা হয় না। বড়জোর হাতজোর করে প্রণাম করেন। শ্রীমার মুখের প্রসন্নতা আগের মতোই আছে। সকলেরই আশা তিনি সেরে উঠবেন। অসুখের ধরন, চিকিৎসার সফলতা চিন্তা করে, বিশেষ করে শ্রীমার দেহের নিস্পৃহভাব আর রাধুর প্রতি তাঁর উদাসীনতা ভক্তের মনে আশঙ্কার সৃষ্টি করে। যে রাধিকে না দেখে তিনি থাকতে পারেন না, এখন সে কাছে এলে তাকে সরে যেতে বলেন।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৬: দীনদুখিনীর জননী সারদা

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৫: অধিকার নয়, অবস্থানই বলে দেয় জায়গা কার– মালিকের? না দখলদারের?

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬২: আলাস্কা ঘুরে দেখার জন্য গাড়ি ভাড়া পাওয়া দুষ্কর
রাধুর সজল চোখ দেখে ভক্তের মনে সহানুভূতি জাগে। তিনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, ‘মন তুলে নিয়েছি, আর নয়’। ভক্তসন্তান ভাবে একবার প্রাণ খুলে যদি শ্রীমার সঙ্গে কথা বলা যেত। সাক্ষাৎভাবে তাঁর সেবা পর্যন্ত করা হল না। তবে শ্রীমাকে সে একথা জানতে দিলনা। মনে মনে ভাবল যে এত খারাপ কাজ করেছি, তার জন্যই আজ শ্রীমাকে এই দুঃখকষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। সে মনে মনে অনুতাপ করে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা জানায, ‘ক্ষমা কর, প্রভো, দাসের প্রতি অনেক কৃপা করেছ, এখন শুধু মাকে সুস্থ করে দাও। আরও কিছুকাল অন্তত আমাদের মাতৃহারা করিও না’।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৩: তত্ত্বতালাশ

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২২: রামের পাদুকাগ্রহণের মাহাত্ম্য, ভরত কী রামের ছায়াশ্রিত প্রশাসক?
শ্রীমার বিছানার কাছেই ঠাকুরের সিংহাসন পাতা। সেখানে ঠাকুর ও মা দু’জনকেই নিজের মনোবেদনা প্রকাশ করে রোজ প্রার্থনা করেন। কয়েকদিন পর শ্রীমার সেবিকা অন্য কাজে গেলে শ্রীমাও অপেক্ষায় ছিলেন তাকে ছুটি দেবার জন্য। চিকিৎসকের পরামর্শে দুপুরে পথ্য পাওয়ার পর একঘণ্টা বিশ্রাম ও নিদ্রার নির্দেশ আছে। সেই জন্য তিনি বিছানায় তাকিয়া ঠেসান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছেন। সেবিকা পাখা ভক্তের হাতে দিয়ে চলে গেলে সে শ্রীমার শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে হাওয়া করতে লাগল আর শ্রীমা মাঝে মাঝে দু’একটি কথা বলছিলেন। তাঁর তন্দ্রার ভাব আসছে দেখে তিনি সন্তানের সঙ্গে কথা বলে ঘুম দূর করতে লাগলেন।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৮: লক্ষ্মী প্যাঁচা
অনেকদিন পর খাওয়ার পর নিস্তব্ধ দুপুরে ভক্তটি নিজে থেকে তাঁর সঙ্গে কোন কথা না বললেও শ্রীমা নিজে থেকে তার সঙ্গে কথা বলায় আজ ভক্তের মন পরিতৃপ্ত হয়ে উঠল। সারা জীবনের মতো ঘরোয়া কথা আস্তে আস্তে বলতে লাগল ভক্তটি। সে আজ শ্রীমার খুব কাছে দাঁড়ালেও বিশেষ সাবধানে আছে, যাতে তাঁর দেহস্পর্শ না হয়। শ্রীমা নানা কথা বলার পর নিজের অসুখের কথা তুলে বলেন যে, এত চিকিৎসায় কোন ফল হচ্ছে না। সন্তান তখন শিশুর মতো বুঝিয়ে বলছেন যে, ঠাকুরের কৃপায় সেরে যাবে, ভাবনা নেই। তবে শ্রীমার চোখেমুখে অসুখের জন্য একটুও কষ্টের লেশ নেই। শরীরের উপর শ্রীমার একেবারেই মন নেই দেখে সন্তানের মনে ভাবনা ও দুঃখ হল। কিন্তু সে মনের ভাব শ্রীমাকে বুঝতে দিতে চাইল না।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৬: জয় বাবা ফেলুনাথ: রুকুর অন্দরমহল

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-১১: ভাগ্যের ফেরে হাস্যকর ‘লাখ টাকা’
শ্রীমা তার মুখের দিকে চেয়ে সকরুণ দৃষ্টিতে বললেন, ‘দ্যাখো, ডুব হচ্ছে’, বলেই পায়ের পাতায় আঙুলের ডগা টিপে দেখালেন, একটু ডুব হল। ভক্তসন্তান সেই ডুবের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকলে শ্রীমা বললেন, ‘দ্যাখো, তোমার নিজের আঙুল দিয়ে’। সে স্পর্শ করতে চায় না, তিনি বলছেন, তাই সাহস করে একটু ডগা ঠেকাল। তিনি জোরে টিপে দেখতে বললেন। তাই আর ভালো করে না দেখে উপায় নেই। শ্রীমার নিজের দেহের যেন কোন বোধ নেই। সন্তান দেখে বুঝতে পারল, শ্রীমার শরীরের রক্তহীনতা। দিনে দিনে যে তা বেড়ে সব অন্ধকার হয়ে যাবে তা সে স্পষ্ট বুঝতে পারল। ঘণ্টাখানেক বাদে শ্রীমা ঘুমিয়ে পড়লে সন্তান কাছে দাঁড়িয়ে হাওয়া করতে লাগল আর মাছি তাড়াতে লাগল।—চলবে।
* আলোকের ঝর্ণাধারায় (sarada-devi): ড. মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় (Dr. Mousumi Chattopadhyay), অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, বেথুন কলেজ।


















