
মা সারদা।
মানুষ নয়, পশু, পাখি, বেড়াল, কুকুর, এরাও জানত মা সারদার ভালবাসার মহিমা। একবার ছোট্ট রাধু শ্রীমার বাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে একটা বাচ্চা বেড়াল নিচে ফেলে দিলে, তাই দেখে শ্রীমার অস্থির অবস্থা। এক সেবক তাঁর অবস্থা দেখে ছুটে গিয়ে বেড়ালছানাটিকে কোলে করে তুলে আনল। শ্রীমা তখন তাকে কোলে শুইয়ে গরম দুধ খাওয়ালেন আর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। সবাই জয়রামবাটির বেড়ালটাকে ‘মায়ের বেড়াল’ বলত। আর সেই সুযোগে সে দুষ্টুমি করে বেড়াত।
একদিন সবাই শ্রীমার কাছে এসে বেড়ালটার বিরুদ্ধে নালিশ জানাল। শ্রীমা আর কি করবেন, হাতে একটা লাঠি নিয়ে বেড়ালটাকে মারতে গেলেন। আর সেই বেড়ালটা সঙ্গে সঙ্গে শ্রীমার দুটো পা জড়িয়ে ধরে পড়ে রইল। মা সারদার হাতের লাঠি হাতেই রয়ে গেল। তাঁর পোষা টিয়া পাখিটাও জানত যে নিজের প্রাপ্য কিভাবে তাঁর কাছ থেকে আদায় করা যায়। শ্রীমা খাওয়ার পর পান চিবোতে চিবোতে খাঁচার কাছে যখন যেতেন, তখন সে ‘মা মা’ বলে শোরগোল করত। তারপর শ্রীমা তাঁর মুখের পানের একটুখানি জিবের ডগায় রেখে খাঁচার কাছে এগিয়ে আসতেন। আর টিয়াপাখিটা টপ করে সেটি তুলে নিয়ে দারুণ নাচতে আরম্ভ করত।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৭: অসুস্থ মা সারদার জন্য ভক্তদের উদ্বেগ

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৫: অধিকার নয়, অবস্থানই বলে দেয় জায়গা কার– মালিকের? না দখলদারের?

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-২৭: আকাশ এখনও মেঘলা
একই রকমভাবে কুকুর, গরু, সবাই তাঁর ভালবাসার সমান ভাগীদার ছিল। মা সারদার শরীর যখন রোগে ভুগে ভেঙে পড়েছে, তখন শরৎ মহারাজ তাঁকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে আসেন। সেই সময় গ্রামের মানুষ তাঁকে যেন অন্তিম দর্শনের জন্য বাড়ির উঠোনে এসে জড় হয়েছে। সকলে নির্বাক, শুধু চোখে তাদের জল। তারা হাতজোড় করে শ্রীমাকে আবার ফিরে আসার জন্য আকূতি জানাচ্ছে। মা সারদা পায়ে হেঁটে আগে সিংহবাহিনীর মন্দিরে গেলেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৪: সে-যে কেবলই যাতনাময়

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৫: রবীন্দ্রনাথের বিয়ের রাতে মারা গিয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির জামাই
গরুরগাড়িতে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে নলিনী, মাকু, রাধু ও তার মা, মন্দাকিনী, ভাই বরদা সব সঙ্গে যাচ্ছে। মা সারদা কষ্ট করে ধুঁকতে ধুঁকতে হেঁটে কালী মাড়ো, সুন্দরনারায়ণমন্দির, পুণ্যিপুকুর, বিশ্বাস, মণ্ডল, ঘোষ আর সামুইদের বাড়ি, গোয়াল, ঢেঁকিঘর, আটচালা, ধানের মরাই পেরিয়ে এসে পালকিতে ওঠেন। সুবাসিনী দাঁড়িয়ে হাতে শ্রীমার প্রিয় গুলের ডিবে, ছ্যাঁচা পান আর জল। হরি তাঁর পা ধুইয়ে দিল। তিনি তাঁর চাদরটা হরিকে দিলেন আর সকলের উদ্দেশে হাতটা সামান্য তুললেন। পড়ে রইল তাঁর শূন্য বাড়ি, আর জয়রামবাটির প্রকৃতি। যোগীনমা আর গোলাপমা তাঁকে দেখে চমকে উঠলেন। কালিপড়া চোখে কোল বসে গেছে, শীর্ণদেহ। সেই লালপেড়ে শাড়ি পরা, সরুহাতে সোনার রুলি সেই বালা, শীর্ণগলায় ঢলঢল করছে রুদ্রাক্ষের মালা।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৭ : পাঠশালা-ক্লাসরুম

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৯: কোটরে প্যাঁচা
তবে মুখের হাসি এখনও অমলিন। গোলাপমা তাঁকে দেখে দুচোখে জল নিয়ে বলেন যে তারা কি মাকেই নিয়ে এলে? তিনি যখন অসুস্থ, তখন দক্ষিণেশ্বর থেকে লক্ষ্মী আর রামলাল আসেন শ্রীমার সঙ্গে দেখা করতে। তবে শ্রীমার থেকেও তাদের চিন্তা ঠাকুরের বাড়ি বেলুড়মঠের ট্রাস্টিদের হাতে চলে যাবে বলে। তারা দুজনেই শ্রীমাকে প্রণাম করে তাঁর শরীরের অবস্থার জন্য ভাইদের বৌ ও তাদের মেয়েদের দায়ী করল। তারপর রামলাল আসল কথা শ্রীমাকে বলল যে, তাদের খুড়োর ঘরের একমাত্র ওয়ারিশন শ্রীমা। তিনি বলে দিলেই সেই ঘর আর ট্রাস্টিদের হাতে যাবে না।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৩: বিশ্বামিত্রের তপশ্চর্যায় বিঘ্নসৃষ্টিকারী দেবরাজ ইন্দ্র ও মেনকার কাহিনি কি আধুনিক যুগের সঙ্গে

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক
বৈষয়িক আলোচনাতে শ্রীমা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন। তাঁর আর ভাল লাগছিল না। লক্ষ্মী বলছিল যে, মঠের এখন এলাহি ব্যাপার। বিদেশ থেকে প্রচুর টাকা আসছে। কিছু জমি ভক্তদের কাছ থেকে কিনে তাদের ঘরবাড়ি তৈরি করে দিলে সেখানেই তারা পুজো আর্চা করবে, ঠাকুরের বংশ বলে কথা। শান্ত গলায় শ্রীমা বললেন যে, তিনি শরৎ মহারাজকে বলে দেবেন যাতে কামারপুকুরে তাদের কোনো অসুবিধা না হয় তা যেন ছেলেরা দেখে আর গৃহদেবতা তাদের হাতেই থাকবে। রামলাল আর লক্ষ্মী মা সারদার এই আশ্বাসেই বুঝে গেল যে, তাদের বংশপরম্পরার ব্যবস্থা হয়ে গেল।—চলবে।
* আলোকের ঝর্ণাধারায় (sarada-devi): ড. মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় (Dr. Mousumi Chattopadhyay), অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, বেথুন কলেজ।


















