বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

খরগোশ ও হাতিদের কাহিনি শেষ হলে চারদিকে নেমে আসে এক গভীর নিস্তব্ধতা। সবাই চুপ। নীরবতা ভাঙলো সেই ধূর্ত কাকটিই। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে প্রতিটি চাল দেখেছেন সে দূর থেকে। পাখিদের দিকে তাকিয়েই সে বুঝে নিল তাদের মনের অবস্থা। তারপর এক জলদ গম্ভীর কণ্ঠে কথা বলে ওঠে, “তোমরা এখন বুঝলে তো আমি কেন বলছি যে আমাদের রাজা গরুড়, বৈনতেয়—যিনি নিজ গরিমায় প্রায় চন্দ্রদেবতার সমতুল্য। তাঁর নামেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে? তিনি সক্রিয় থাকুন বা না-থাকুন, তাঁর নামটাই অনেক সময় ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক যেমন ওই খরগোশেরা করল। নিজেরা দুর্বল, ছোট, নিরস্ত্র, কিন্তু বুদ্ধির ফণায় তারা হাতিদের মতো গর্জনকারী শত্রুকেও সরিয়ে দিল কেবল চন্দ্রদেবতার নাম বলে।”

পাখিরা স্তব্ধ। কাক আবার বলল, “তবে এটাও মাথায় রেখো— শুধু নাম নয়, নামের পিছনে থাকতে হয় আস্থা। রাজার চরিত্রই স্থির করে তার নামের ওজন। তাই কোনও রাজা যদি নিছক অলস, বিলাসী, আত্মকেন্দ্রিক, কিংবা মৃগয়ার নেশায় মত্ত হয়— যার মুখে মধু, আর পিঠে ছুরি। তবে সে রাজা নামেই কেবল রাজা, গরিমায় নয়। কারণ রাজা যদি ভীতু, বিশ্বাসভঙ্গকারী বা বিচারহীন হন, তবে শুধু জনগণ নয়, একদিন পশুপাখিরাও তার বিরুদ্ধে মুখ ফিরিয়ে নেয়।”
তখন কাক একটু থেমে বলল, “তোমরা তো জানো সেই গল্প— এক চড়াই আর এক খরগোশ নিজেদের ক্ষোভ নিয়ে গিয়েছিল এমন এক রাজার দরবারে, যে বাইরে শান্ত কিন্তু ভিতরে শঠ। সেই রাজা বিচারের নামে যা করেছিল, তাতে দুই পক্ষই প্রাণ হারায়।
পাখিরা বলল, “কথমেতৎ”ভীতুএই ঘটনাটা ঠিক কিরকম?
সেই কাকটি আবার বলতে শুরু করল—
 

০৩: খরগোশ আর চড়াই পাখির গল্প

অনেকদিন আগে জঙ্গলের প্রান্তে, এক সুবৃহৎ পুরোনো গাছের ডালে ছিল আমার বাস। আমার আশেপাশে পাখিদেরও ছোট্ট এক জগৎ গড়ে উঠেছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল কপিঞ্জল। এক নির্ভেজাল হৃদয়ের চড়াই পাখি। সেই গাছটা ছিল যেন আমাদের ছায়া-মাখা এক ছোট্ট পৃথিবী, আর আমরা ছিলাম তার ছায়াতলে বেঁচে থাকা একেকটা গল্প।
প্রতিদিন সূর্য অস্ত যেত, আমাদের দু’জনের কাছে সেটাই ছিল দিনশেষের একান্ত সময়। দিগন্ত ছুঁয়ে আগুনের মতো রং ছড়িয়ে যখন গোধূলি নামত, তখন আমি আর বন্ধু ছিল কপিঞ্জল। আমরা দু’জনে ফিরে আসতাম গাছের শাখায় — ক্লান্ত কিন্তু তৃপ্ত। সেই সব সন্ধ্যায় গল্প চলত অবিরাম। দেবর্ষি নারদের কাহিনি, প্রাচীন ব্রহ্মর্ষিদের জ্ঞান, কিংবা দিনভর ঘুরে দেখা কোনও অদ্ভুত ঘটনার রোমাঞ্চ— সব কিছুই ভাগ করে নিতাম একে অপরের সঙ্গে। এমনই মধুর ছিল দিনগুলো। যেন প্রতিটি সন্ধ্যা ছিল একটি ছোট্ট উৎসব, এবং কপিঞ্জল তার প্রাণভরে গান গাইত।
কিন্তু একদিন…
কপিঞ্জল বলল, “শালীধানের একটা জমি পেয়েছি অনেক দূরে, কিছু বন্ধুদের সঙ্গে ওদিকে যাচ্ছি। সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসব।” সে গেলো। কিন্তু ফিরল না।

সূর্য অস্ত গেল, চাঁদ উঠল, জঙ্গল নিস্তব্ধ হয়ে এলো— কিন্তু আমার চোখ রইল সেই পথের দিকে। অপেক্ষা দীর্ঘ হতে থাকল। সময় গড়াতে থাকল। একসময় মনের মধ্যে সেই ভয়ংকর চিন্তা ভিড় করতে শুরু করল, যা কারও প্রিয়জন ফিরে না এলে আসে— “তাহলে কি কিছু একটা ঘটে গিয়েছে?”

আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৪: যুদ্ধ করতে সব সময় পেশীশক্তি নয়, দরকার বিশ্বাসের গল্পও

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৩: তত্ত্বতালাশ

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬২: আলাস্কা ঘুরে দেখার জন্য গাড়ি ভাড়া পাওয়া দুষ্কর

স্নেহ বড় দুর্বলতা বটে, আর দুর্বলতা মানেই হাজার দুশ্চিন্তার দরজা খুলে যাওয়া। আমি ভাবতে লাগলাম, “ব্যাধের জালে ধরা পড়ল না তো? কোনো শিকারির শিকার হলো? হয়তো কোনও খাঁচায় বন্দি? না হলে কপিঞ্জল কখনও ফিরতে দেরি করে না…”
তাকে ছাড়া সন্ধ্যা অসম্পূর্ণ। আমি জানতাম, আমিই ছিলাম তার একমাত্র আপন, আর সে ছিল আমার সন্ধ্যার গান। সেদিন বুঝেছিলাম— যাদের আমরা আপন ভাবি, তাদের না-ফেরার অপেক্ষা কেমন এক গভীর শূন্যতায় পরিণত হয়।
এইভাবেই একে একে দিন গড়িয়ে গেল। প্রতিদিন সূর্য ডোবে, সন্ধ্যার পাখিরা ডাকে, গাছের পাতা জুড়ে নীরবতা নামে— কিন্তু কপিঞ্জল আর ফেরে না।
আমি অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। হৃদয়ের সেই আশার আলো— যে আলোয় প্রতি সন্ধ্যায় ওর গান ভেসে আসত— তা ক্রমশ নিভে যাচ্ছিল।
একসময়, আমি মনে মনে মেনে নিলাম— কপিঞ্জল আর ফিরবে না।
ঠিক সেই সময়, এক সন্ধ্যায়, যখন ঝিরঝির বাতাসে গাছটা মাথা দুলিয়ে বলছিল, “সব কিছুই বদলায়,” আমি দেখলাম এক খরগোশ এসেছে। সে কপিঞ্জলের ফেলে যাওয়া ফাঁকা কোটরের পাশে এসে থামলো, গন্ধ নিলো, চারপাশ দেখে নিলো— তারপর তার ছোট্ট শরীরটা গুটিয়ে সে সেখানেই বসে পড়ল।
তার নাম ছিল শীঘ্রগ।
আমি তাকে বাধা দিইনি।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৬: জয় বাবা ফেলুনাথ: রুকুর অন্দরমহল

হয়তো তখন আমার ভিতরে কপিঞ্জলের জন্য প্রতীক্ষাটাও ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল।
আমি ভাবলাম, ফাঁকা জায়গা তো আর চিরকাল ফাঁকাই থাকে না।
কিন্তু ঠিক তারপরেই একদিন, এক বিস্ময় নিয়ে ফিরে এলো কপিঞ্জল।
একদিন খুব ভোরবেলায়, যখন দিগন্তে আলোর রেখা উঠছে, আমি শুনলাম সেই চেনা ডাক—সেই শব্দ, যার জন্য কতদিন কান পেতে ছিলাম। এগিয়ে গিয়ে দেখলাম—সেই কপিঞ্জল!
আরও মোটা হয়েছে সে, পালক ঝকঝক করছে—শালিধান খেয়ে শরীর-মন যেন উৎফুল্ল।
পণ্ডিতেরা ঠিকই বলেন, আমরা শরীরধারীরা স্বর্গেও যত না শান্তি পাই, তার চেয়েও বেশি সুখ পাই যখন ফিরে আসি দারিদ্র অবস্থায় অতিবাহিত করা নিজের সেই পুরোনো বাসায়, নিজের শহরে, সেই আপনজনের পাশে।
সত্যি বলতে, চোখধাঁধানো রাজপ্রাসাদ, খাদ্যের প্রাচুর্য বা স্বর্গীয় পরিবেশেও যে শান্তি মেলে না,
সেই আত্মিক আরাম শুধু সেই জায়গাতেই পাওয়া যায়—যেখানে আমাদের চেনা পরিবেশ আর চেনা মানুষ আশেপাশে আমাদের ঘিরে থাকে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২২: রামের পাদুকাগ্রহণের মাহাত্ম্য, ভরত কী রামের ছায়াশ্রিত প্রশাসক?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৮: লক্ষ্মী প্যাঁচা

এদিকে কপিঞ্জল তার বহু পুরোনো সেই বাসায় ফিরে এসে দেখে সেখানে তার জন্য আর কোনো জায়গা নেই! নিজের কোটরে ঢুকতেই দেখে, সেখানে বাসা বেঁধেছে এক খরগোশ—শীঘ্রগ। চোখ কপালে উঠে গেল তার!
“এইটা তো আমার বাসা! এখানে তুই এলি কী করে? তৎ শীঘ্রং নিষ্ক্রম্যতাম্‌ — এখনই ওখান থেকে বেরিয়ে আয়।” — ধমকে উঠল কপিঞ্জল। তার স্বর কাঁপছিল রাগে, আর গলায় ফুটে উঠছিল মালিকানা হারানোর যন্ত্রণা।
কিন্তু খরগোশটি শান্ত গলায় জবাব দিল, “আপনার রাগটা বুঝি, কিন্তু দয়া করে আমার কথাটা একটু শুনুন—এটা এখন আর আপনার ঘর নয়। আপনি যখন ছিলেন না, তখন এই ঘর ফাঁকা পড়ে ছিল। আমি এসেছি, থেকেছি, যত্ন নিয়েছি, এবং এটাকে আপন ঘর বানিয়ে নিয়েছি। আপনি বলছেন এটা আপনার ঘর—কিন্তু একটা জায়গার ওপর অধিকার কি কেবল মালিকানায় থাকে? নাকি ভালোবাসা, যত্ন আর বাসস্থানের প্রয়োজনেই সেটা জন্ম নেয়? শাস্ত্রে বলে—
বাপীকূপতডাগানাং দেবালযকুজন্মতাম্‌।
উত্সর্গাৎ পরতঃ স্বাম্যমপি কর্তুং ন শক্যতে।। (কাকোলূকীযম্‌ ৯৩)

অর্থাৎ প্রতিষ্ঠা করবার পর থেকেই দীঘি, কুঁয়ো, সপদ্মসরোবর, দেবমন্দির বা বৃক্ষ। এই সমস্ত বস্তুতে কারো আর ব্যক্তিগত অধিকার থাকে না। অর্থাৎ যিনি এগুলো প্রতিষ্ঠা করেন সেগুলো উত্সর্গ করে দেওয়ার পরে এগুলো সব সমাজের হয়ে যায়। ধর্মশাস্ত্রে আছে, যিনি দশ বছর ধরে কোনো ক্ষেত ভোগ করেন, সেক্ষেত্রে কোনও সাক্ষী বা মালিকানা হস্তান্তর সম্পর্কিত কোনও প্রমাণের দরকার হয় না। এতদিন ধরে নির্বিবাদে সে সেখানে বসবাস করছে। এইটাই তার ভোগ নামক প্রমাণ।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৬: দীনদুখিনীর জননী সারদা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-২৬: যিনি নিরূপমা তিনিই ‘অনুপমা’

শাস্ত্রের ভাষায় একে বলে “ভূক্তিপ্রমাণ”। খরগোশ এবার গলাটা একটু দৃঢ় করে বললো “আপনি যদি সত্যিই ফিরে আসতে চাইতেন, তাহলে এতদিন কেন আসেননি? আমি এখানে বসবাস করছি দীর্ঘদিন ধরে, কেউ আমাকে সরায়নি, কেউ আপত্তি করেনি। এখন আপনি ফিরে এসে শুধু পুরোনো স্মৃতির জোরে দাবি করছেন—তাতে তো বর্তমান বাস্তব বদলায় না। অন্য কেউ, এমন কি আসল মালিক দাবী করলেও সেটা ভোগ করছেন যিনি তারই নিজের ক্ষেত্র বলেই মানা হয়। কারণ সেটার আসল মালিকের উচিত ছিল যখন সেই ব্যক্তি সেটা ভোগ করতে শুরু করেছে তখন থেকেই আপত্তি করা বা ধর্মস্থীয় বা আজকের ভাষায় যাকে আমরা কোর্ট বলি সেখানে গিয়ে সেই ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো। মনুষ্যসমাজের এই নিয়ম মুনিরাও মেনে চলেন। পশু-পাখিদের ক্ষেত্রেও কোনো জায়গায় তার ততক্ষণই স্বত্ব বা অধিকার থাকে যতক্ষণ সে সেখানে অবস্থান করে। তাই আমি এখন এখানে থাকি, আপনি না। সুতরাং তন্মম এতৎ গৃহং, ন তব —তাই এটা এখন আমার বাড়ি আপনার না।
কপিঞ্জল স্তব্ধ হয়ে গেল।—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content