কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

আজকের কাহিনিটি গল্পসাহিত্যে বিশেষ প্রসিদ্ধ। লোভী, অসত্ কিন্তু মুখোশপরা জীবের সঙ্গে যথার্থ শক্তিমান, প্রাজ্ঞের দ্বন্দ্বে অশুভের জয়ই তো মানুষ বরাবর চেয়েছে। বাস্তব যাই হোক, মনের অবচেতনায় সেই আকাঙ্ক্ষাটি হয়তো সমাজমানসে থেকে যায়। তার প্রতিফলন পড়ে তার সাহিত্যে, নৈতিক আদর্শের ভাবলোকটিতেও। জাতকমালার আজকের কাহিনিটিতে আছে এক বকধার্মিক, তার প্রতারণার শিকার হয় কারা আর কেই বা সেই জাল ছিন্ন করে, শত্রুকেও নিধন করে চিরাচরিত “শান্তির ললিতবাণী”র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সফল হয়?

বোধিসত্ত্ব সেই জন্মে এক বনভূমির পদ্মসরোবরের তীরে এক বৃক্ষের অধিদেবতা হয়ে অধিষ্ঠান করছেন। কাছেই একটি সরোবরে অনেক মাছ ছিল। গ্রীষ্মকালে সেই সরোবরের জল কমে যেত। একটি বক এমনই একটি দিনে মনে মনে দুরভিসন্ধি নিয়ে সরোবরের জলে চিন্তাবিষ্ট হয়ে বসে আছে দেখা গেল।
মাছের ঝাঁক সেই বকের কাছে এসে জানতে চায়, “ও মশাই! এত চিন্তা কীসের?”
“চিন্তা তো বাপু তোমাদের নিয়েই।”
“আমাদের জন্য! কী এত চিন্তা আপনার?”
“বাছারা! গরম তো বেজায়, পুকুরের জল কীরকম তলানিতে ঠেকেছে দেখছো না! খাবার-দাবারের অভাব হবে বেজায়। তখন তোমরা মাছেরা কী করবে বলো তো, এত ভেবে আমার ঘুম ছুটেছে।”
“তাহলে আমরা কী করব এখন!”
“দেখো, আমাকে যদি বিশ্বাস করতে পারো তো বলি। এক কাজ করা যাক না হয়। কাছেই একটা মনোরম পদ্মসরোবর আছে। সেখানে পাঁচটি রঙের পদ্ম ফোটে। যাবে? আমি চঞ্চু করে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিতে পারি কিন্তু।”

ঠিকই তো। এত গরমে মানুষের পাশে মানুষ, মাছের পাশে, সুখে দুঃখে বক না থাকলে কে থাকবে? এভাবেই সামাজিক ব্যাখ্যায় সরল বিশ্বাসী জীব গাধা, সদা নিয়ন্ত্রিত আহাম্মক হল গরু, সেয়ানা ধূর্ত শেয়াল কিংবা অবিবেচক স্থূলবুদ্ধির জীব বাঁদর ইত্যাদি। তবে এদের চরিত্রবৈশিষ্ট্য-ও আপেক্ষিক, কখনও কখনও এরাই অতীব বুদ্ধিমান, মুশকিল আসান। আজকের গল্পে মাছগুলিকে সরল, বোকা বলা যাবে না, তারা অভিজ্ঞ, কিন্তু বিচক্ষণ নয়, বিশ্বাসে তাদের আস্থা আছে, তারা প্রমাণেও আস্থাশীল। কিন্তু তঞ্চকতায় বিষাক্ত বিশ্বাস ও দুষ্ট প্রমাণকে উপেক্ষা বা অতিক্রম করার বুদ্ধি তাদের ছিল না। ছিল না জল ও দুধকে পৃথক্ করার মানসিক সক্ষমতা। তাই বিপদ ঘনিয়ে আসে।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩২: কপোত-জাতক: বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৫: অধিকার নয়, অবস্থানই বলে দেয় জায়গা কার– মালিকের? না দখলদারের?

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৪: সে-যে কেবলই যাতনাম

মাছেরা বককে জিজ্ঞাসা করে, “দেখুন মশাই! আদিকাল থেকে মাছেদের বিপদে কোনও বক পাশে দাঁড়িয়েছে এমন কোনও নজির নেই। একটি একটি করে মাছ উদরসাৎ করার মনোবাসনা করেছেন, তাই না?”

“না হে না। আমাকে বিশ্বাস করলে তোমাদের খাব কেন শুধু শুধু? ওই সরোবর আছে কীনা সেটাই তোমাদের সন্দেহ তো! তাহলে তোমাদের মধ্য থেকে একটা মাছকে আমার কাছে দাও। সে দেখে এসে জানাক সত্যিটা, তাহলেই তো হল নাকি?”

মাছেরা মনে মনে ভাবলো, তারপর এক প্রকাণ্ড মাছকে এনে হাজির করল। তারা মনে মনে ভাবলো এই যে, এই মাছের কাছে বক জলে স্থলে কোথাও আত্মরক্ষা করতে পারবে না। বক সেই মাছকে নিয়ে সেই বিশাল সরোবরে ছেড়ে দিল, তারপর আবার যথাস্থানে হাজির করালো। মাছটিও জ্ঞাতিদের সেই মনোরম সরোবরের শোভা-সৌন্দর্যের বর্ণনা দিল। একথা শুনে সকল মাছ সেই অপরূপ জলাশয়ে আগে যাওয়ার জন্য ব্যগ্র হল, “ও মশাই! কী অদ্ভুত উপায়কৌশল আপনার, আমরা যাব, আমরা যাব, আমাদের পৌঁছে দিন।”

তা বক তাদের পৌঁছে দিল বৈকী! পৌঁছে দিল একেবারে লোকান্তরে। একটি একটি করে মাছ নিয়ে যায়, সরোবর দেখিয়ে পাশেই এক বৃক্ষের ডালে বসে তাদের আছড়ে মারে, মাংসটুকু খেয়ে কাঁটা ফেলে দেয় গাছের নিচে। এমন করে করে সকল মাছ প্রতারিত হল। সেই সরোবরে একটিও মাছ থাকল না। ভাবছেন, গল্পে কি শুধু খলনায়কটিই আছে? হিরো কোথায়? এবার হিরোর প্রবেশ, দেখুন কী হয়।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৪: দিগম্বরী দেবী : ঠাকুরবাড়ির সেরা সুন্দরী

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৩: বিশ্বামিত্রের তপশ্চর্যায় বিঘ্নসৃষ্টিকারী দেবরাজ ইন্দ্র ও মেনকার কাহিনি কি আধুনিক যুগের সঙ্গে

সেই জলাশয়ে শেষ পর্যন্ত একটা কাঁকড়া পড়ে রইল। বকের লোভ বেড়ে গিয়েছিল। সে ভাবলো, কাঁকড়াটাই বা বাকি থাকে কেন। সরোবরের ধারে গিয়ে বলল, “ ও ভাই কর্কট! তোমার সকল বন্ধুদের তো পদ্মপুকুরে রেখে এলাম। সেখানে তারা পরম আনন্দে ব্রহ্মাস্বাদ লাভ করছে।তুমি এখানে একা একা পড়ে আছো কেন? চলো চলো হে, দেরি করো না।”

“আমাকে কীভাবে নিয়ে যাবে?”
“কেন, ঠোঁটে করে।”
“না, থাক। পড়ে গেলে আমার একটি হাড়-ও আর আস্ত থাকবে না। তুমি আমাকে পথেই ফেলে দেবে। আমি তোমার সঙ্গে যাব না।”
“অতো ভয় কীসের? ম্যায় হুঁ না! শক্ত করে ধরে থাকবো, ভয় নেই।”

কাঁকড়া মনে মনে ভাবলো, এই বক অতিশয় ধূর্ত। এতো দরদ সন্দেহের বৈকী! মনে হয়, মাছগুলিকে এ জলে ছাড়েনি। আমাকে যদি পুকুরে ছেড়ে দেয় তো বেশ, না হলে ওর গলা কেটে নেব।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৭ : পাঠশালা-ক্লাসরুম

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৯: কোটরে প্যাঁচা

সে মনে মনে কৌশল ভেবে নিয়ে বলল, “ও মামা, আমি তোমার গলা জড়িয়ে যাব। তুমি ঠোঁটে করে এত কষ্ট পেয়ে আমাকে ধরে রাখতে পারবে না। আমরা কাঁকড়ার জাত, আমার এই দাঁড়া দিয়ে তোমার গলা জড়িয়ে নির্ভয়ে আরামে চলে যাব, তোমার-আমার কোনও কষ্ট হবে না।”

বলাবাহুল্য, বক কাঁকড়ার দুরভিসন্ধি বুঝলো না। সে একইভাবে কাঁকড়াকে প্রতারিত করতে চাইল। সরোবর দেখিয়ে গাছের দিকে উড়ে চললে কাঁকড়া বলল, “মামাগো! জল তো ও পাশে, তুমি এদিকে কোথায় চললে?”

“ওরে আমার সাধের ভাগ্নে, হতচ্ছাড়া! আমি তোর পিতৃদেবের আমার কোন্ জন্মের চাকর যে তোকে ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে বেড়াব! হতভাগা! ওই দেখতে পাচ্ছিস গাছের গোড়ায় কাঁটার রাশি? তোর-ও ওই দশা হবে রে ব্যাটা।”

“মাছগুলো বোকা ছিলো গো, তাই মরেছে। আমাকে তুমি তেমন করতে পারবে না। আজ মরবি তুই। তুমি একটি আস্ত ও নিরেট গাধা, চোরের ওপর বাটপাড়িটা ধরতে পারোনি। আজ তোমার গলা কাটবো। মরতে হলে দুজনে মরবো, তবে তোর গলাটা কেটেই মরবো।” এই বলে কাঁকড়া সন্নার মতো দাঁড়াদুটো দিয়ে বকের গলা টিপে ধরল, বক মুখ বিকৃত করে আর্তনাদ করতে লাগলো, তার দুচোখ জলে ভরে গেল। তার প্রাণ এসে গলায় ঠেকল।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৭: অসুস্থ মা সারদার জন্য ভক্তদের উদ্বেগ

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক

তখন বক প্রাণভয়ে বলল, “প্রভু! আমার প্রাণরক্ষা করুন। আমি আপনাকে খাব না, দয়া করে আমাকে মারবেন না।”

কাঁকড়া বলল “বেশ, তবে আমাকে আগে ওই সরোবরের তীরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দাও, তবেই প্রাণে বাঁচবে।”
সেই কথামতো বক কাঁকড়াকে পদ্ম-সরোবরের জলের ধারে নিয়ে গেল, ছেড়ে দিলো কাদার মধ্যে। কাদা থেকে জলে প্রবেশের আগের মুহূর্তেই, তীক্ষণধার কাটারি দিয়ে কুমুদের নাল কাটার কৌশলে, তৎপরতায়, কাঁকড়াটি অনায়াস দক্ষতায় বকের কোমল কণ্ঠদেশ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে জলের গভীরে হারিয়ে গেল।

এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে সেই বৃক্ষের অধিদেবতা বোধিসত্ত্ব “সাধু! সাধু!” বলে হর্ষধ্বনি করলেন।

যারা প্রবঞ্চনাকুশল, তাদের নিরবচ্ছিন্ন সুখ হয় না। এই কাহিনি সেই আদর্শের কথাই বলে। তবে রাজনীতির এই জটিল আবর্ত নির্মম। তার টিকে থাকার আদর্শ অন্যতর। জীবনের রক্ষায় এই রাজনীতিটি প্রণিধানযোগ্য, যেখানে মার্জনা নেই। আদর্শবাদী শাস্ত্র হয়তো বকের জীবনদান করতো। কিন্তু জীবনের বাস্তব পাঠ অন্য কথা বলে। বকের এমন পরিণতি তাই অস্বাভাবিক নয়। জাতকমালার এই কাহিনিটিতে সেই সত্যদর্শনের ব্যঞ্জনাটি নিহিত আছে।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content