উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রত্নভূমি হচ্ছে ঊনকোটি। এখানে পাহাড়ে ছড়িয়ে আছে পাথরের বিগ্রহ, আছে পাহাড়ের গায়ে পাথরে খোদিত নানা দেবদেবীর মূর্তি। ভাবতে অবাক লাগে কারা কোন কালে এরকম নিঝুম অরণ্যে পাথর কেটে তৈরি করেছিল আশ্চর্য সব ভাস্কর্য। এর পিছনে ছিল কোনও রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতা? সঠিক ইতিহাস অনাবিষ্কৃত বলেই ঊনকোটি যেন রহস্যাবৃত।
ত্রিপুরার বর্তমান উনকোটি জেলাসদর কৈলাসহর থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার দূরে ঊনকোটি। পাঁচ বা ছয় দশক আগেও পথ ছিল দুর্গম। অনেক ছড়া, জঙ্গল পেরিয়ে হাঁটা পথে ঊনকোটি পৌঁছতে হতো। তারপর সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হতো পাহাড়ের উপরে। এখন অবশ্য চিত্রটা পাল্টে গিয়েছে। কৈলাসহর-ধর্মনগর সড়ক থেকে একটা শাখা পথ চলে গিয়েছে পীঠভূমির বুক অব্দি। ঊনকোটির সেকালের দুর্গমতা আজ ইতিহাস। পাহাড়ে ছড়িয়ে আছে নানা দেবদেবীর মূর্তি। চূড়ায় রয়েছে উমা-মহেশ্বর, বিষ্ণু, গণেশ, হনুমান প্রভৃতি বিগ্রহ। পাহাড়ের গায়ে খোদিত ভাস্কর্যের মধ্যে শিবের মূর্তি উল্লেখযোগ্য। এই শিব উনকোটিশ্বর কালভৈরব বলে খ্যাত।
ঊনকোটির চতুর্মুখ মূর্তি সকলের পরিচিত। অবশ্য চতুর্থ দিকের মুখটি অনেক আগেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, উনকোটি পাল যুগের শৈবতীর্থ। আবার অনেকে বলেছেন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানব গোষ্ঠীর অবদান রয়েছে ঊনকোটিতে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, উনকোটির বিগ্রহ সৃষ্টি শুরু হয় অষ্টম-নবম শতাব্দীতে। পরবর্তী নানা সময়ে যুক্ত হয়েছে আরও শিল্পকর্ম।
ঊনকোটির বিগ্রহ নিয়ে বিশিষ্ট পুরাতত্ত্ববিদরা অনেক কথা বলেছেন। বিজয়কুমার দেববর্মণ বলেছেন, ‘…পর্বতগাত্র খোদিত মুখমূর্তি সমূহে তান্ত্রিক প্রভাব সুস্পষ্ট এবং এই রাজ্যের তদানীন্তন রাজাদের কুলদেবতা চতুর্দ্দশ দেবতাবৃন্দের প্রতীক মুখমূর্তির সঙ্গে এর সাযুজ্য পরিলক্ষিত হয়।’ পাহাড়ের গায়ে খোদিত বিশালাকার মূর্তিগুলো সম্পর্কে রত্না দাস বলেছেন, ‘…মনে হয় ঊনকোটির শিল্পধারা একান্তই স্হানীয়। তাই এতে ভারতের মূল শিল্পরীতি অপেক্ষা মঙ্গোলিয় শিল্পের প্রভাবই বেশি।’
বিপ্রদাস পালিত বলেছেন, ‘ঊনকোটিতে দুই রকমের স্হাপনা। মঙ্গোলিয় অভিব্যক্তিতে গড়া পাহাড়ের পৃষ্ঠে খোদিত শিব, ধনুর্দর, রথের চাকা, যুদ্ধের দৃশ্য ও বিবিধ প্যানেল। অপর দিকে প্রাচীন যুগের ব্রাহ্মণ্য রীতিতে গড়ে উঠা দেবালয় ভিত্তিক পর্বত চূড়ায় প্রাপ্ত অনেক দেব-দেবী সমূহ-যা মূলত শিব কেন্দ্রিক।’
‘রাজমালা’তে মহাভারতের সময়কাল থেকে ত্রিপুরার রাজাদের কথা উল্লেখ থাকলেও উনকোটির বিগ্রহ সৃষ্টি সম্পর্কে কিছুই নেই। অবশ্য প্রাচীনকালে মাণিক্য রাজার ঊনকোটি পরিদর্শনের কথা রয়েছে ‘রাজমালা’তে। বিজয় মাণিক্যের (১৫৩২-৬৩ খ্রিঃ) উনকোটি পরিদর্শন সম্পর্কে রাজমালা’য় বলা হয়েছে—
‘কত দিন পরে রাজা ঊনকোটী গেল।
এক ঊনকোটী লিঙ্গ তথাতে দেখিল।।’
বিগ্রহ সমূহ সৃষ্টির কথা না থাকলেও ‘রাজমালা’য় কিন্তু সুপ্রাচীন কালের ঊনকোটির পীঠ মাহাত্ম্যের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। যেমন—
‘বিমার হইল রাজা তাহার তনয়।
তার পুত্র কুমার পরেতে রাজা হয়।।
কিরাত আলয়ে আছে ছাম্বুলনগর।
সেই রাজ্যে গিয়াছিল শিবভক্তি তর।।
সুবড়াই খুঙ্গ নামে মহাদেব স্হান।
করিল প্রণতি ভক্তি সেই ভাগ্যবান।।
ঊনকোটি ও সন্নিহিত কৈলাসহর অঞ্চলের প্রাচীন নাম ছাম্বুলনগর বলে ধারণা করা হয়েছে। সুদূর অতীতে ত্রিপুরার শিবভক্তি পরায়ন নৃপতি কুমার সেখানে গিয়েছিলেন বলে ‘রাজমালা’য় উল্লেখ রয়েছে। ঊনকোটিতে একদা সুপ্রাচীন কালের এক মন্দিরের অস্তিত্বের কথাও জানা যায়। শতাব্দীকাল আগেও দেখা গিয়েছে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। শতাধিক বছর আগে পণ্ডিত চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদ ”শ্রীশ্রী যুতের কৈলাসহর পরিভ্রমণ” পুস্তিকায় লিখেছেন, ‘শৃঙ্গাগ্রে প্রস্তর ও ইষ্টকরাশি প্রকীর্ণাবস্হায় ইতস্ততঃ পড়িয়া রহিয়াছে। কোন কালে ঐ স্হানে যে প্রস্তর ও ইষ্টক নির্ম্মিত মন্দির ছিল, তাহা বেশ অনুমিত হয়। একটি মন্দির যে অতি অল্পদিন পূর্ব্বে নষ্ট হইয়াছে, তাহা স্পষ্টই বুঝতে পারা যায়।…’ কারা কখন এই সব মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন কোথাও তার উল্লেখ নেই। তবে পণ্ডিত চন্দ্রোদয় অনুমান করেছেন ত্রিপুরার রাজাগণই এই সব মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। কারণ রাজাদের অনেকে পুণ্য সঞ্চয়ে ঊনকোটি পরিদর্শন করেছিলেন।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com