
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
এই দোষ-গুণগুলির বৈশিষ্ট্য মানুষমাত্রেই অবগত থাকে, আশৈশব গড়ে ওঠা জীবনচর্যায়। কিন্তু দোষ ও গুণগুলি যুগপত্ মানুষের মধ্যে বর্তমান থাকে, স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। সতর্কতা কিংবা সামাজিক বোধ ও দেশ-কালের প্রভাব ক্রিয়াশীল হলেও মনুষ্যজীবন কেবল দোষে, কেবল গুণে দোষী বা গুণী না হয়ে তার মিশ্ররূপেই গড়ে ওঠে, এটিই যথার্থ, যুক্তিসঙ্গত ও সত্য বলেই মনে করা যায়। এই দোষ, বা গুণগুলির অভ্যাস ও প্রকাশ কখনও ইচ্ছাধীন, কখনও বা অনিচ্ছাকৃত। মানুষ কখনও তাকে উপলব্ধি করে, কখনও অনুভব করতে পারে না। কখনও উপলব্ধি বিচলিত করে, উত্তীর্ণ করে। কখনও কখনও করে না। মানুষের মানসিক ও চারিত্রিক আধার, জীবনদর্শন ও অহংবোধ এমন ভিন্নতার কারণ। সেই কারণে মানুষের চরিত্রবৈশিষ্ট্য বিচিত্রগামী, জটিল, দ্বন্দ্বজর্জর ও পরিবর্তমান ও আপেক্ষিকতায় আক্রান্ত। কেউ ন্যায়নিষ্ঠ, কেউ প্রতারণাকুশল, কেউ ছদ্মসৌজন্যে কপটাচারী, কেউ বুদ্ধিমান, কেউ ধূর্ত চতুর, কেউ মূঢ়, কেউ কিংকর্তব্যবিমূঢ়, কেউ অলস, কেউ উদ্যমী, কেউ কেউ অজ্ঞেয়, তারা যে ঠিক কী তা অবিসংবাদী নয়। আজকের জাতকমালার কাহিনি সেই ক্ষেত্রটিকেই নির্দেশ করে।
শূকর সিংহটিকে দেখে, সিংহের আচরণের মর্মার্থ বুঝতে না পেরে ভাবল, সিংহটি তাকে ভয় পেয়েছে। তাকে দেখেই পালিয়ে যাচ্ছে। অতএব, যুদ্ধং দেহি। এসো যুদ্ধ করি, সিংহটিকে যুদ্ধে না হারালেই নয় আজ। শূকরের এই মনোভাবটিকে ভ্রান্তি নয়, বলা উচিত মূঢ়তা। সে মূর্খ, বাস্তব জ্ঞানহীন, আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মগর্বে উদ্ধত। দৈনন্দিন জীবনে এমন মানুষ বিরল তো নয়-ই, বরং অনায়াসলভ্য, কখনও কখনও তারা প্রবল, কখনও আত্মপ্রচারপ্রিয়, কখনও বাক্-সর্বস্ব, নিষ্কর্মা অথবা নিষ্ক্রিয়। এই পর্যায়ে মূর্খতার থেকেও দোষাবহ আত্মকেন্দ্রিক আচ্ছন্নতা, অহংসর্বস্ব পণ্ডিতন্মন্য মনোভাব। দেখা যাক এরপর কী হয়।

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪১: সহ্যজাতক : সুখ অসুখ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৭: কেমন আছেন সুনীতি, নদীর নরম ছেড়ে সমুদ্রের নুনে!

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৭: ডেসডিমোনার রুমাল/৬

উত্তম কথাচিত্র,পর্ব-৭২ : গলি থেকে রাজপথ

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৫: সুন্দরবনের পাখি: বিলের বালুবাটান
শূকরটি যথার্থ নির্বোধ ছিল। তবে একথা শুনে এখন সেও ভীত হয়ে পড়ল। তার আচ্ছন্ন চেতনা এখন পরিচ্ছন্ন হল। মনুষ্যসমাজে এমন মানুষ অসংখ্য যারা নিজের বুদ্ধির ওপর ভরসা করতে পারে না। তারা অপরের বুদ্ধিতে চালিত হয়, বিনষ্ট হয়, কখনও রক্ষা পায়, কখনও অন্ধ আবেগ ত্যাগ করে সচেতন হয়। এরপর কি হল? কী করে পরিত্রাণ পাবে শূকরটি?
শূকর জ্ঞাতিবন্ধুদের সেকথাই জানতে চেয়েছিল। এখন উপায় কি তবে? জ্ঞাতিরা বুদ্ধি দিল, তপস্বীদের মলত্যাগভূমিতে যাও, বিষ্ঠার ওপর সাতদিন বেশ করে গড়াগড়ি দাও, রোদে ভাল করে শুকিয়ে নাও। নির্ধারিত দিন এলে শিশিরে গা ভিজিয়ে সিংহ আসার আগেই পৌঁছে যাও, মেপে নাও হাওয়া কোন দিক থেকে কোন দিকে বয়ে যাচ্ছে, নিজের স্থান নির্বাচন করে দাঁড়াও, এমন ভাবে দাঁড়াও যাতে হাওয়া তোমার দিক থেকে সিংহের দিকে যায়। ব্যস, এতেই হবে। সিংহরা বড় শুচিতাপ্রিয়, তোমাকে সে স্পর্শ করবে না। পরাজয় স্বীকার করবে, তোমার জয় হবে। শূকরটিও তা-ই করল। সিংহ এসে পরিস্থিতি উপলব্ধি করে হেসে বলল, সৌম্য শূকর, বেশ উপায় গ্রহণ করেছো। এমন কৌশল অবলম্বন না করলে আজ তোমার শেষ দিন হতো। কিন্তু এখন আমি নিরুপায়। তোমার গায়ে মুখ বা হাত দেওয়ার সাধ্যি আমার নেই, তোমার সর্বশরীর মললিপ্ত, দুর্গন্ধে টেকা যাচ্ছে না। সুতরাং তুমি জিতলে, আমার পরাজয় হল। এই বলে সিংহ ফিরে গেল, আহার করল, জল খেল, তারপর গুহায় প্রবেশ করল।

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮২: ত্রিপুরা : উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রত্নভূমি ঊনকোটি
তবে আপাতদৃষ্টিতে যা জয়, তা হয়তো বিপরীত। সেই জয়ে যে গর্বিত হবে সে মূঢ়, আবার পরাজয় যে সর্বদা গ্লানি আনে এমনটাও নয়।
শূকরের ক্ষেত্রে তা-ই দেখা গেল। সে সিংহকে পরাজিত করেছে এই ভেবে আস্ফালন করতে লাগল। কিন্তু তার জ্ঞাতিবন্ধুরা বুঝল যে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে নিমেষেই। তারা সিংহের খাদ্যে পরিণত হতে পারে ভবিষ্যতে। তাই তারা ভয়ে সেই স্থান ত্যাগ করে পালিয়ে গেল।

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪১: কারুর কেউ নই-কো আমি…

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!
রাষ্ট্রশক্তির বলা বলের দৃষ্টিকোণেও এই প্রতিটি পর্যায় প্রাসঙ্গিক। যুদ্ধের প্রয়াস, সামর্থ্যের অনুধাবন, অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত ও পরাজয়ের আশঙ্কা, কপটতার আশ্রয়ে নিন্দিত অনৈতিক জয়লাভ, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পশ্চাদপসরণ ও ভাবী অনিষ্টের বীজন্যাস – সবকটি ক্ষেত্র নৈতিক জয়-পরাজয়, বলাবল, আদর্শ ও বাস্তবের দ্বন্দ্বটিকে তুলে ধরে। শূকরটি জয়ী না হয়েও জয়ী। বিজয়ী হয়েও হয়তো পরাভূত। এমন রাষ্ট্রশক্তির আস্ফালন যেমন সত্য, তেমন-ই স্থিতধী রাষ্ট্রবোধ ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাও বিরল নয়। বোধিসত্ত্বরূপী সিংহের বিবেচনা ও অবিমৃষ্যকারী, অন্ধ আবেগসর্বস্ব শূকরের কাহিনি সেই শিক্ষাই দেয়।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















