সোমবার ৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

মহর্ষি নারদ, ইন্দ্রপ্রস্থে, সদ্য সিংহাসনে অধিষ্ঠিত নবীন রাজা যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করলেন, রাজার বেদাধ্যয়নে সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে কী? রাজার ধনার্জন সফল হয়েছে তো? পত্নীসাহচর্যে সাফল্য আছে কী? শাস্ত্রজ্ঞানলাভ সফল হয়েছে কি না?

প্রশ্নচ্ছলে প্রত্যুত্তর নয়, রাজা যুধিষ্ঠির মহাজ্ঞানী মহর্ষির কাছে জানতে চাইলেন, বেদাধ্যয়নে সাফল্যলাভ হয় কীভাবে? ধনের সম্পূর্ণ সফলতা কোথায়? পত্নীদের বা সাফল্য কিভাবে সম্ভব? শাস্ত্রজ্ঞানে সাফল্য আসে কেমন করে? মহর্ষি ব্যাখ্যা করলেন, অগ্নিহোত্রযাগ সম্পন্ন করাতেই আছে বেদাধ্যয়নের সাফল্য। দানের ফললাভ হয় ধনভোগ ও ধনদানের মাধ্যমে। রতিসুখদান ও পুত্রলাভের সাফল্যের নিয়ামক হলেন পত্নী। শাস্ত্রজ্ঞানের ফল হল সচ্চরিত্র ও সদ্ব্যবহার।

মহর্ষি আবার ফিরে গেলেন তাঁর প্রশ্নপর্বে। এবারে, ধার্মিক যুধিষ্ঠিরের প্রতি তাঁর জিজ্ঞাসা, যুধিষ্ঠিরের শুল্কসংগ্রহকারী কর্মচারীবৃন্দ লাভের জন্যে দূরদেশ হতে আগত বণিকদের থেকে সংগৃহীত যথানির্দিষ্ট শুল্ক রাজার কাছে জমা দেন তো? কর্মচারীদের ছলনায় প্রতারিত না হয়ে মাননীয় বণিকগণ, নগরে ও রাষ্ট্রে পণ্যসামগ্রী আনতে পারেন তো? রাজা, যাঁরা কর্মজ্ঞানী সেই সঙ্গে ধর্ম ও অর্থবিষয়ে জ্ঞানী এমন বৃদ্ধদের ধর্ম ও অর্থবিষয়ক সঙ্গত বক্তব্য সর্বদাই শ্রবণ করেন কী? কখনও রাজা, শ্রেষ্ঠ কৃষিপণ্যক্ষেত্রগুলিতে গোবৎস ফুল ও ফল উৎপন্ন হলে ধর্মকাজের কারণে, ব্রাহ্মণদের ঘি ও মধুযুক্ত ভোজ্য দান করেন? রাজা, শিল্পীদের শিল্পোপকরণ এবং পূর্বনির্ধারিত চারমাসের অগ্রিম বেতনের কিছু কম বেতন নিয়মিত নিশ্চিতভাবে প্রদান করেন তো? তিনি, শিল্পীদের কৃত সামগ্রী স্বয়ং দেখেন কী? দেখে, শিল্পকর্তাদের সভামধ্যে সসম্মানে প্রশংসা করেন তো? তাঁদের পারিতোষিকদান করে পুরস্কৃত করেন তো রাজা? রাজা স্বয়ং, হস্তিশাস্ত্রবিষয়ক তেমনই অশ্বশাস্ত্রবিষয়ক ও রথশাস্ত্রজ্ঞান মাঝে মাঝে সংক্ষিপ্ত সূত্রাকারে মনে করেন তো?রাজপুরীতে ধনুর্বেদের সূত্র ও উৎকৃষ্ট নগরসম্বন্ধীয় যন্ত্রবিষয়ক জ্ঞানের চর্চা বজায় আছে?সব অস্ত্রসমূহ,ব্রাহ্মণদের আচরণীয় অভিচারকর্ম, শত্রুদের উদ্বেগজনক বিষপ্রয়োগকৌশল সম্বন্ধে রাজা অবহিত আছেন তো? কখনও কখনও অগ্নির ও বাঘ প্রভৃতি হিংস্র জন্তুর ভয় হতে এবং রোগ ও ক্ষোভজনিত ভয় হতে রাজা, সম্পূর্ণ রাষ্ট্রকে রক্ষা করেন তো? অন্ধ, মূক,পঙ্গু ও অন্য কোন বিকলাঙ্গ, বন্ধুহীন, প্রব্রজ্যা নিয়েছেন যাঁরা,তাঁদের প্রতি,রাজা পিতৃতুল্য রক্ষকের ভূমিকায় আছেন কী? নিদ্রা, আলস্য, ভয়, ক্রোধ, মৃদুভাব, দীর্ঘসূত্রতা—রাজা, এগুলি দূর করেছেন কী? দ্বিজবর মহর্ষির কথা শুনে কুরুশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির সন্তুষ্টমনে পদতলে অভিবাদন করে দেবতুল্য নারদমুনিকে বললেন, আপনার যথোক্ত উপদেশানুসারে আমি কাজ করব। এর ফলে আমার বুদ্ধি পরিণত হবে। এবং করিষ্যামি যথা ত্বয়োক্তং প্রজ্ঞা হি মে ভূয় এবভিবৃদ্ধা। উক্ত্বা তথা চৈব চকার রাজা লেভে মহীং সাগরমেখলাঞ্চ।। যুধিষ্ঠির মহর্ষির উপদেশানুসারে সেইভাবে কাজ করে সমুদ্র মেখলা যার, এমন সমগ্র পৃথিবী লাভ করেছিলেন। মহর্ষি নারদ ঘোষণা করলেন, এমনভাবে চতুর্বর্ণের রক্ষণাবেক্ষণ করেন যে রাজা, তিনি এই পৃথিবীতে অত্যন্ত সুখে বিচরণ করে, ইন্দ্রতুল্য মর্যাদা লাভ করতে পারেন।
নারদ তাঁর ভাষণ শেষ করলেন। তারপরেই ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ব্রহ্মর্ষি নারদকে পূজা করে তাঁর অনুমতিক্রমে প্রত্যুত্তর দিলেন। যুধিষ্ঠির জানালেন, মহর্ষি ধর্মসঙ্গত ন্যায্য কথা বলেছেন, নিজের যথাযথ সাধ্যানুসারে ন্যায়সঙ্গতভাবে যুধিষ্ঠির সেগুলি পালন করবেন। পূর্বতন রাজারা, যে কাজ যেমনভাবে সম্পন্ন করেছেন সেগুলি যাতে যথাযথ ন্যায়সঙ্গত ও উদ্দেশ্যসিদ্ধির সহায়ক হয়ে ওঠে সেভাবেই তাঁরা সেগুলি সম্পন্ন করেছেন। নিঃসন্দেহে সেগুলি কারণযুক্ত ও প্রয়োজনসিদ্ধির নিয়ামক হয়েছে। যুধিষ্ঠিরের মত হল, তাঁরাও তাঁদের নির্দেশিত সৎপথের যাত্রী হতে ইচ্ছুক। সংযতেন্দ্রিয় সেই রাজারা যেথায় গিয়েছেন সেখানে যাবার সামর্থ্য তাঁর নিজের নেই। নারদের এই কথায় সম্মান প্রদর্শন করে, ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির,যথাসময়ে উপস্থিত হয়েছে বিবেচনা করলেন। রাজাদের মধ্যে মহাদ্যুতিতুল্য ধর্মজ্ঞ যুধিষ্ঠির সর্বলোকে বিচরণকারী মুনিকে সুখাসনে উপবিষ্ট দেখে, বললেন, মহর্ষি নারদ স্বয়ং, মনের তুল্য গতিশীল। তিনি বহুলোকে বিচরণ করেছেন।সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার নির্মিত বহু কিছু তিনি দেখেছেন। তাই, সদ্য ময়দানবনির্মিত আশ্চর্য সুন্দর সভায় আসীন যুধিষ্ঠিরের জিজ্ঞাসা, এইরকম বা এর থেকেও উত্তম সভা ঋষি দেখেছেন কি না। ব্রহ্মর্ষি নারদ যুধিষ্ঠিরের কথা শুনে মধুরস্বরে উত্তর দিলেন,নরলোকে এমন মণিখচিত সভা তিনি এর আগে দেখেননি। তবে তিনি নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ যে কয়টি সভা দেখেছেন, সেগুলি বর্ণনা করবেন। এই বলে মহর্ষি নারদ পিতৃরাজ যম, বরুণ, ইন্দ্র, কুবের এবং ব্রহ্মার স্বর্গীয় সভার অপূর্ব সৌন্দর্যরাজি বর্ণনা করলেন। পরিশেষে অসীম কৌতূহলী যুধিষ্ঠির ভাইদের সঙ্গে মিলিত হয়ে এই সভাগুলি ও ব্রহ্মার দিব্য সভার আশ্চর্য বিবরণ অবাক বিস্ময়ে শুনতে লাগলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪২: শূকরজাতক: কাপুরুষ? মহাপুরুষ?

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৫: আকাশ এখনও মেঘলা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪১: ঘটি চেয়ে বঁটি

সেই সভার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে সভাসীন অতিলৌকিক চরিত্ররা। শুধু দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় আছেন একমাত্র রাজর্ষি হরিশ্চন্দ্র। যুধিষ্ঠির বিস্ময় প্রকাশ করলেন,রাজর্ষি হরিশ্চন্দ্র কি এমন কাজ বা তপস্যা করেছেন যে তিনি ইন্দ্রের সঙ্গে এক সভায় অধিষ্ঠিত হওয়ার (একাসনের) স্পর্ধা দেখিয়েছেন? যুধিষ্ঠিরের পরবর্তী প্রশ্ন, মহর্ষি, পিতৃলোকে অবস্থানরত পিতা পাণ্ডুর দেখা পেয়েছিলেন কীভাবে? কীভাবেই বা তাঁর সঙ্গে মিলিত হলেন তিনি?

মহর্ষি নারদ, রাজর্ষি হরিশ্চন্দ্রের মাহাত্ম্যবিষয়ে বক্তব্য শুরু করলেন। রাজা হরিশ্চন্দ্র, পৃথিবীর ভূপতিদের সম্রাট ছিলেন। তাঁর শাসনাধীন রাজারা নতমস্তকে তাঁকে স্বীকার করেছিলেন। স্বর্ণমণ্ডিত বিজয়রথারূঢ়, রাজা হরিশ্চন্দ্র, অস্ত্রবলে সপ্ত দ্বীপ (জম্বুদ্বীপ, কুশদ্বীপ, শাক, ক্রৌঞ্চ, শাল্মলী, গোমেদ, পুষ্কর নামে সপ্ত দ্বীপ) জয় করেছিলেন। তিনি গিরি, বন, কানন-সহ সমগ্র পৃথিবী জয় করে, রাজসূয় মহাযজ্ঞানুষ্ঠান সম্পন্ন করেছিলেন। তাঁর আজ্ঞাধীন রাজগণ, যজ্ঞে ধনসমূহ আহরণ করে আনতেন, ব্রাহ্মণগণ আহূত ব্রাহ্মণদের পরিবেষ্টন করে থাকতেন। নরেন্দ্র হরিশ্চন্দ্র,সেই যজ্ঞে, যাজকগণের প্রার্থিত ধনের থেকেও পাঁচ গুণ বেশি ধন প্রীতিসহকারে প্রদান করেছিলেন। তিনি, যথাকালে নানা দিক হতে সমাগত ব্রাহ্মণদের মধুর কথায় সন্তুষ্ট করে,পর্যাপ্ত ধন দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন। নানাবিধ খাদ্য ও পানীয়, রত্নসমূহ দানে যথেচ্ছভাবে আপ্যায়িত হয়ে,তুষ্ট ব্রাহ্মণগণ রাজার যশ কীর্তন করতে লাগলেন। অন্য রাজাদের তুলনায় রাজা হরিশ্চন্দ্রের তেজ ও যশের বৃদ্ধি হল। মহর্ষি নারদ, যুধিষ্ঠিরকে জানালেন, এই কারণ হেতু রাজা হরিশ্চন্দ্র সহস্র রাজার থেকেও বিশিষ্ট স্থানে বিরাজ করতে লাগলেন। রাজা হরিশ্চন্দ্র, সেই মহাযজ্ঞ সম্পন্ন করে, সাম্রাজ্যে অভিষিক্ত হলেন এবং শোভা বিস্তার করলেন। রাজসূয় যজ্ঞের এমন মাহাত্ম্য, যে রাজারা রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠান করেন,তাঁরাই ইন্দ্রের সঙ্গে (সহাবস্থানের) আনন্দ অনুভব করে থাকেন। যাঁরা যুদ্ধে হতে পলায়ন না করে নিহত হন, তাঁরাও ইন্দ্রালয়ে (অবস্থান জনিত)আনন্দ লাভ করেন। কঠোর তপস্যা করে যাঁদের দেহান্ত হয় তাঁরাও দৈবশোভামণ্ডিত হয়ে একই স্থান লাভ করেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৩: আঁধারে আছে আততায়ী

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১০: চাঁদের ওপিঠে কালো

মহর্ষি আরও জানালেন, হরিশ্চন্দ্রের এমন শ্রীবৃদ্ধি দেখে বিস্মিত যুধিষ্ঠিরের পিতা পাণ্ডু, ধরাধামে আগত নারদকে প্রণাম করে বলে পাঠিয়েছেন, সমর্থোঽসি মহীং জেতুং ভ্রাতরস্তে বশে স্থিতাঃ। রাজসূয়ং ক্রতুশ্রেষ্ঠমাহরস্বেতি ভারত!।। হে ভরতবংশীয়, তোমার পৃথিবীজয়ের সামর্থ্য আছে। ভায়েরা তোমার অনুগত।তুমি যজ্ঞের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, রাজসূয় যজ্ঞের অনুষ্ঠান কর। পাণ্ডু আরও নির্দেশ দিয়েছেন, পুত্র যুধিষ্ঠির, হরিশ্চন্দ্রতুল্য রাজসূয় যজ্ঞ সম্পন্ন করলে, পাণ্ডু নিজে ইন্দ্রসভালঙ্কৃত করে বহু বৎসর সুখানুভব করতে পারবেন। মহর্ষি নারদ, পাণ্ডুরাজাকে কথা দিলেন, তিনি পৃথিবীলোকে গিয়ে পাণ্ডুপুত্রকে পিতার এই সদিচ্ছাবিষয়ে জানাবেন। যুধিষ্ঠিরের কাছে, মহর্ষির অনুরোধ, তস্য ত্বং পুরুষব্যাঘ্র! সঙ্কল্পং কুরু পাণ্ডব!। গন্তাসি ত্বং মহেন্দ্রস্য পূর্ব্বৈঃ সহ সলোকতাম্।। হে পুরুষশ্রেষ্ঠ পাণ্ডুপুত্র, আপনি (পিতার) এই প্রতিজ্ঞা সম্পূর্ণ করুন। তাহলে আপনিও পূর্বপুরুষদের সঙ্গে ইন্দ্রের সম,লোকে যেতে পারবেন। নারদমুনির উপদেশ—এই রাজসূয়যাগ বহু বিঘ্নপূর্ণ। যজ্ঞনষ্টকারী ব্রহ্মরাক্ষসরা এর ছিদ্র অন্বেষণে সদা তৎপর। এর ক্ষতিকারক দিকগুলি হল, যুদ্ধ, ক্ষত্রিয়বিনাশ এবং পৃথিবীর অপচয়। এগুলির অল্পমাত্রই, ক্ষয়াবহ কারণ হতে পারে। এই সব চিন্তা করে রাজশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির যেন (এই বিষয়ে) উচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যুধিষ্ঠির, চতুর্বর্ণের রক্ষণাবেক্ষণে সতর্ক হন। সমৃদ্ধ হন,আনন্দে থাকুন এবং অর্থদান করে ব্রাহ্মণদের তুষ্ট রাখুন। মহর্ষি নারদ, যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তর, বিশদভাবে বর্ণনা করে, দ্বারকানগরীতে প্রস্থানের উদ্দেশ্যে বিদায় নিলেন। তিনি ঋষিগণ পরিবৃত হয়ে প্রস্থান করলেন। অতঃপর ভাইদের সঙ্গে পৃথাপুত্র যুধিষ্ঠির, যজ্ঞের মধ্যে সর্বোত্তম, রাজসূয়যজ্ঞবিষয়ে পরামর্শ শুরু করলেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৫ : অবাক পৃথিবী

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৬ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী?

ইন্দ্রপ্রস্থে ময়দানবনির্মিত সভাগৃহে সমাগত মহর্ষি নারদের প্রশ্নচ্ছলে জ্ঞানঋদ্ধ বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে, রাজা যুধিষ্ঠির যে প্রশ্নগুলি করলেন তার উত্তরে মহর্ষির ব্যাখ্যা নিঃসন্দেহে যুক্তিপূর্ণ ও তত্ত্বজ্ঞানের প্রকাশক। অগ্নিহোত্রযাগ সম্পন্ন করাতেই, আছে বেদাধ্যয়নের সাফল্য। যজ্ঞে অগ্নিতে আহুতিপ্রদানের মধ্যে আত্মোৎসর্গ বা নিজের প্রিয়বস্তু উৎসর্গের ভাবনা নিহিত রয়েছে।তাই বেদজ্ঞানের চরিতার্থতা বোধ হয় অধীতবিদ্যা উৎসর্গের মধ্যে। ধন শুধু নিজের ভোগস্পৃহা সম্পাদনের জন্য নয়। ধনদানের মধ্যে রয়েছে ধনার্জনের সম্পূর্ণতার মহত্ত্ব। মহর্ষির কথিত পত্নীসঙ্গের সাফল্যের মাপকাঠি সে যুগের নারীদের অবস্থানগত মূল্যায়নের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।

শুধু গৃহগণ্ডীতে আবদ্ধা নারীমাত্রই ছিলেন পুরুষের শারীরিক চাহিদা মেটানোর ও পুত্রোৎপাদনের যান্ত্রিক সহবাসের সঙ্গিনীমাত্র। মহর্ষির মতে, শাস্ত্রজ্ঞানের ফল সচ্চরিত্র ও সদ্ব্যবহার। একটি মানুষের চারিত্রিক গঠন ও সদ্ব্যবহারের সাফল্য বোধ হয় কিছুটা হলেও পরম্পরাগত উত্তরাধিকার এবং পারিবারিক পরিমণ্ডলের প্রভাব রয়েছে, সেটিতেও তথাকথিত পারিবারিক ঐতিহ্যগত শাস্ত্রজ্ঞানের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। মহর্ষির বক্তব্য, নারীদের অবস্থানগত দিকটি ছাড়া,বেদজ্ঞানের প্রাসঙ্গিকতা যুগোপযোগী নিশ্চয়ই কারণ সব জ্ঞানের উৎস বেদ। ধনের সাফল্যের মাপকাঠি, উদারতার প্রকাশ,এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সচ্চরিত্র ও সদ্ব্যবহার গড়ে ওঠার কারণ যথাযথ শিক্ষা,সে শিক্ষার উৎস মহাভারতীয় সংস্কৃতিতে ছিল শাস্ত্রজ্ঞান, অধুনা পুঁথিগত বিদ্যাশিক্ষার সঙ্গে হয়তো আছে উত্তরাধিকারসূত্রে অধিগত পারিবারিক ব্যবহারের পরিমণ্ডল ও সংস্কার। যুগভেদে সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়, হয় মানসিকতার ঔদার্যের পরিসরের বিস্তার। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, শাস্ত্রজ্ঞান এই সবকিছুর কারণ। ভাষাগত দূরত্বের জন্যে হয়তো তার প্রভাব স্বীকৃত হয় না, তবে আধুনিক শিক্ষা হয়তো তারই পরিশীলিত যুগোপযোগী রূপ।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৩: ত্রিপুরা : ঊনকোটির বহু মূর্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৭: জৌরালি

মহর্ষির পরবর্তী প্রশ্নগুলিতে রয়েছে,আধুনিক করসংগ্রহের স্বচ্ছতাবিষয়ক নীতিজ্ঞানের প্রতিফলন। এ ছাড়াও অন্য উপদেশগুলি—রাজার একক কোন সিদ্ধান্ত নয়, গুরুত্ব অনুযায়ী ধর্ম, অর্থ ও কর্মবিষয়ে অভিজ্ঞদের পরামর্শগ্রহণ সর্বদা প্রয়োজন, রাজার দানধর্ম, শিল্পীদের যথাযথ অগ্রিম পারিশ্রমিকদান, শিল্পীদের শিল্পসামগ্রীর সপ্রশংস পারিতোষিকদান, যুদ্ধবিদ্যার বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক শাস্ত্রবিষয়ে জ্ঞানলাভ, বিরুদ্ধবাদীদের হিংসাত্মক নাশকতামূলক কার্যসম্বন্ধে যথাযথ অবহিত হওয়া, আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়, হিংস্রজন্তুর আক্রমণ ও রোগ ও ক্ষোভজনিত বিপদের প্রতিরোধের ব্যবস্থাপনা, বিশেষভাবে সক্ষমদের পিতৃতুল্য প্রতিপালকের ভূমিকা, বর্জনীয় ত্রুটিগুলির নির্দেশ প্রভৃতি প্রশ্নচ্ছলে প্রদত্ত উপদেশগুলি যে কোনও আধুনিক প্রশাসনের দিকদর্শন ও অত্যন্ত আধুনিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচায়ক বলেই মনে হয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

রাজর্ষি হরিশ্চন্দ্রের প্রসঙ্গ রাজসূয়যজ্ঞের যাথার্থ্য ও গুরুত্ব প্রতিপাদনের জন্যে প্রয়োজন ছিল। রাজার একচ্ছত্র সার্বভৌমিকতা ও প্রতিপত্তিপ্রতিষ্ঠা ও অপরাপর নৃপতিদের নতিস্বীকার প্রভৃতি বিষয় রাজসূয়যজ্ঞের অনুষঙ্গ। নতুন রাজ্যে, সদ্য সিংহাসনে অধিষ্ঠিত রাজা যুধিষ্ঠির। তাঁর হয়তো সেই মুহূর্তে বিরুদ্ধবাদীদের কাছে আত্মশক্তিপ্রতিষ্ঠার একটি প্রদর্শনী প্রয়োজন ছিল। সভাসম্পর্কিত আলোচনা ছাপিয়ে, ইন্দ্রের সভাসীন হরিশ্চন্দ্রের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব উপস্থাপনা যেন শুধু রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠানে কৃতকার্য রাজা হরিশ্চন্দ্রের সাফল্য প্রতিপাদনের প্রয়োজনে না রাজসূয়যজ্ঞের গুরুত্ব প্রমাণের তাগিদে, এই সন্দেহ দেখা দেয়। এই কারণেই রাজা পাণ্ডুর প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন মহর্ষি নারদ। রাজার একচ্ছত্র আধিপত্যপ্রতিষ্ঠা রাজতন্ত্রের মতোই আধুনিক যে কোনও রাষ্ট্রের কাঙ্খিত লক্ষ্য। তাই মহাভারতেও এই অধিকারপ্রতিষ্ঠার নিয়ামক ছিল রাজসূয়যজ্ঞ। রাজসূয়যজ্ঞের ক্ষতিকারক দিকগুলি জীবনের অপচয়, পৃথিবীর ক্ষয়, শক্তির অপব্যবহার।এখন যজ্ঞ নেই, আছে হুঙ্কার, আগ্রাসন, নৃশংস প্রাণঘাতী অস্ত্রসম্ভারের নির্লজ্জ প্রদর্শনী। আরও এক সাজ সাজ রবের মহাসমারোহ যার নাম যুদ্ধের হুঙ্কার। তবুও অধিকারপ্রতিষ্ঠার এই যুদ্ধের আবহ,রাজসূয়যজ্ঞের তথাকথিত অনুষঙ্গ কী মহান শক্তিমানেরা উপেক্ষা করতে পারেন? পারেন না তো, রাজা যুধিষ্ঠির বিরুদ্ধশক্তিকে অবদমিত করার লক্ষ্যে শুরু করলেন রাজসূয় নামক মহাযজ্ঞের আয়োজন। তাঁর সেই উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল নিশ্চয়ই। আধুনিক বৃহৎ শক্তিগুলি, পৃথিবীর প্রাণশক্তির অপচয়প্রতিরোধে রাজসূয়যজ্ঞের আধুনিক অনুষঙ্গগুলি বর্জন করতে পারেন কী?—চলবে।

* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content