
ছবি: সংগৃহীত।
অসমের গান বাজনার কথা বলতে গেলে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার প্রসঙ্গ যেমন আসে, তেমনি বলতে হয় বরাক উপত্যকার কথাও। দুই উপত্যকার মধ্যে সাংস্কৃতিক মিল, অমিল দুইই রয়েছে। অসমের বরাক উপত্যকা এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা নিজস্বতা নিয়েই রয়েছে। দুই উপত্যকার ভাষা, গান সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট পার্থক্য। কিন্তু একই সঙ্গে রয়েছে ঐক্য এবং মৈত্রীভাবও। আর বৈচিত্রপূর্ণতাই অসমকে করে তুলেছে অনন্যা।
বরাক উপত্যকায় লোকসঙ্গীতের বহুল প্রাধান্য দেখা যায়। বরাক উপত্যকায় বাঙালি, মণিপুরী এবং ডিমাসা এবং আরও অনেক ভাষাভাষীর লোক বসবাস করেন। তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব সংস্কৃতি, গান-বাজনা রয়েছে। তবে স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই এ অঞ্চলে বাঙলা ভাষার প্রাধান্য যথেষ্ট বেশি। এ অঞ্চলের বাংলা গানের কথা বলতে গেলে বলতে হয় ধামাইল গানের কথা। জন্ম, বিবাহ কিংবা যেকোনও শুভ অনুষ্ঠানেই এই ধামাইল গান গাওয়া হয়। সেই সঙ্গে এই গানের সঙ্গে দল বেঁধে হাতে তালি দিয়ে দিয়ে গোল হয়ে নাচাও হয়।
বরাক উপত্যকায় লোকসঙ্গীতের বহুল প্রাধান্য দেখা যায়। বরাক উপত্যকায় বাঙালি, মণিপুরী এবং ডিমাসা এবং আরও অনেক ভাষাভাষীর লোক বসবাস করেন। তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব সংস্কৃতি, গান-বাজনা রয়েছে। তবে স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই এ অঞ্চলে বাঙলা ভাষার প্রাধান্য যথেষ্ট বেশি। এ অঞ্চলের বাংলা গানের কথা বলতে গেলে বলতে হয় ধামাইল গানের কথা। জন্ম, বিবাহ কিংবা যেকোনও শুভ অনুষ্ঠানেই এই ধামাইল গান গাওয়া হয়। সেই সঙ্গে এই গানের সঙ্গে দল বেঁধে হাতে তালি দিয়ে দিয়ে গোল হয়ে নাচাও হয়।
বরাক উপত্যকায় লোকসাহিত্য নিয়ে বহুদিন ধরে চর্চা চলছে। এর সূত্রপাত হয়েছিল ‘শিক্ষাসেবক’পত্রিকার হাত ধরে, ১৩৩২ সনের শ্রাবণ মাসে। ১৭ বছর ধরে চলার পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। ওই পত্রিকায় লোকসাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিক উঠে এসেছিল। বাদ পড়েনি এ অঞ্চলের লোকসঙ্গীতের প্রসঙ্গও। ‘শিক্ষা সেবকের চতুর্থ বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যায় শীতলাং শা’র ৪টি গান সংকলিত হয়েছে। তার পরও বেশ কয়েকটি সংখ্যায় এ অঞ্চলের গান সংকলিত হয়েছে। কাছাড় বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতির পঞ্চম বার্ষিক সম্মেলনের স্মরণিকায় মাহবুবুল বারী রচিত,’ কাছাড় অঞ্চলের মুসলিম বিয়ের গান ‘শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধটিতে বরাক উপত্যকার মুসলমান সমাজের বিয়ের গানের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে আলোচনা করা হয়েছে।
বর ও কনেকে নিয়ে বিভিন্ন রীতিনীতির সময় গাওয়া হয়ে থাকা প্রচলিত গান, কিংবা কন্যা বিদায়ের সময় গাওয়া গানগুলি অসমের বরাক উপত্যকার লোকসঙ্গীতের অংশ বিশেষ। বিয়ের কনেকে সাজানোর সময় গাওয়া এমনি একটি গান—
“সাজ সুন্দরী কন্যা সাজ বিয়ার সাজে,
নবীন যুবতী কন্যা বড় ভালো লাগে।
কালো কেশে নিম টগরের ঢেউ দিব তুলিয়া।
রং রজ দিব তাতে স্বর্ণ আদল দিয়া।”
বর ও কনেকে নিয়ে বিভিন্ন রীতিনীতির সময় গাওয়া হয়ে থাকা প্রচলিত গান, কিংবা কন্যা বিদায়ের সময় গাওয়া গানগুলি অসমের বরাক উপত্যকার লোকসঙ্গীতের অংশ বিশেষ। বিয়ের কনেকে সাজানোর সময় গাওয়া এমনি একটি গান—
নবীন যুবতী কন্যা বড় ভালো লাগে।
কালো কেশে নিম টগরের ঢেউ দিব তুলিয়া।
রং রজ দিব তাতে স্বর্ণ আদল দিয়া।”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৯: জলমুরগি

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১১: স্বপ্নভূমি তিলজলা

অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬১: অসমের লোকনৃত্য

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৯: রাজসূয় মহাযজ্ঞের মাহাত্ম্য ও আধুনিকতা
বরাক উপত্যকায় বঙ্গভাষীর সংখ্যা বেশি। সুতরাং বরাক উপত্যকার লোকসঙ্গীত নিয়ে বলতে গেলে বাংলা লোকগানের প্রসঙ্গই আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অসমের এ অঞ্চলের বাংলা গানের কিছু বিশেতস্বও ‘আমাদের সমকাল ‘পত্রিকার পঞ্চমবর্ষের দ্বিতীয়-তৃতীয় সংখ্যায় অধ্যাপক অমলেন্দু ভট্টাচার্য’, কাছাড় জেলায় স্বদেশী লোকসংগীত’ নামক একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এ প্রবন্ধে এমন কিছু লোকোসঙ্গীতের উল্লেখ আছে যাতে ইংরেজ শাসন কালের ছবি ফুটে উঠেছে। ইংরেজ সরকারের শোষণ নীতি, স্বদেশী অন্দোলন, স্বাধীনতা গান্ধীজির অবদান ইত্যাদি বিষয়গুলি উঠে এসেছে। এ অঞ্চলের লোকসঙ্গীতে ‘বন্দেমাতরম’ শব্দটি সচেতন ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
“আইজ কেনে বঙ্গভূমে বন্দেমাতরম শুনি—
এমন মধুর মন্ত্র কেবা দিল আনি,
জল আনতে গিয়েছিলাম ঐ সুরধুনী,
তার তরঙ্গে শুনি বন্দেমাতরম ধ্বনি”
এমন মধুর মন্ত্র কেবা দিল আনি,
জল আনতে গিয়েছিলাম ঐ সুরধুনী,
তার তরঙ্গে শুনি বন্দেমাতরম ধ্বনি”
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৩: মাঝ-রাতে আশ্রমে একটি বালক কাঁদছিল কেন?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৬ : মায়ামৃগ
মোজফফরপুর বোমার মামলায় ক্ষুদিরাম বসু যে বোমা ব্যবহার করেছিলেন তা তৈরি করেছিলেন উল্লাস কর দত্ত এবং হেম চন্দ্র দাস। ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয় হবার পর বরাক সুরমার এক নাম না জানা কবি একটি গান রচনা করেন। অধ্যাপক অমলেন্দু ভট্টাচার্য সম্পূর্ণ গানটি সংগ্রহ করেন—
“ভুলিবে কি প্রাণান্তে, ও ভারতবাসী
বড় অবিচারে হইল দেখ ক্ষুদিরমের ফাঁসি।
মেদিনীপুর ভদ্রঘরে ক্ষুদিরামের জন্ম ধরে,
সে যে ছিল শান্ত শিষ্ট কর্মনিষ্ঠ, অতি মিস্টভাষী।
বয়স ছিল ষোলমাত্র,সে যে দেখতে যেন রাজপুত্র,
এমন সোনার চাঁদে দুষ্ট রাহু ফেলিলরে গ্রাসী।
মোজফফরপুর বোমার মামলায়, পড়িয়া ফিরিঙ্গির পাল্লায়,
সে যে চিরতরে কালসাগরে চলিলরে ভাসি।”
বড় অবিচারে হইল দেখ ক্ষুদিরমের ফাঁসি।
মেদিনীপুর ভদ্রঘরে ক্ষুদিরামের জন্ম ধরে,
সে যে ছিল শান্ত শিষ্ট কর্মনিষ্ঠ, অতি মিস্টভাষী।
বয়স ছিল ষোলমাত্র,সে যে দেখতে যেন রাজপুত্র,
এমন সোনার চাঁদে দুষ্ট রাহু ফেলিলরে গ্রাসী।
মোজফফরপুর বোমার মামলায়, পড়িয়া ফিরিঙ্গির পাল্লায়,
সে যে চিরতরে কালসাগরে চলিলরে ভাসি।”
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৭: আকাশ এখনও মেঘলা

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৬ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী?
বিভিন্ন আনন্দ অনুষ্ঠানে জল ভরার একটা রীতি আছে। মহিলা গান গেয়ে গেয়ে একত্রিত হয়ে জল ভরতে যান। এই জল ভরার গানেও স্বদেশ ভাবনা ফুটে উঠে এসেছে। জলভরার বেশির ভাগ গানে শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধার অভিসার বর্ণিত হয়েছে, এমন গানের মধ্যেও দেশ প্রেমের ভাবনা এ অঞ্চলের প্রচলিত বাংলা গানকে এক অন্য মর্যাদা প্রদান করেছে।
“নইব্য ভারত নারী চলছে সারি সারি
গাইছে সবে বন্দে মাতরম
যমুনার সলিলে মরিব ডুবিয়ে
বন্দেমাতরম বইলেরে
শ্যামরূপ সলিলে এ দেহ ডুবিলে শীতল হইবে প্রাণরে
চল চল সহচরী যমুনায় ভরিতে বারি…”
গাইছে সবে বন্দে মাতরম
যমুনার সলিলে মরিব ডুবিয়ে
বন্দেমাতরম বইলেরে
শ্যামরূপ সলিলে এ দেহ ডুবিলে শীতল হইবে প্রাণরে
চল চল সহচরী যমুনায় ভরিতে বারি…”
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৩: আঁধারে আছে আততায়ী

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৫: ছবিমুড়ার ভাস্কর্য ত্রিপুরার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ন সম্পদ
প্রত্যেক জায়গার নিজস্ব কিছু বিশেষত্ব থাকে। সেই জায়গার ভাষা, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক পরিসর সব কিছু নিয়েই তৈরি হয় সেই জায়গার বৈশিষ্ট। বৈচিত্রময় ভারতের অসমও বৈচিত্রে পরিপূর্ণ, তার এক জায়গার ভাষা সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য জায়গার ভাষা যেমন পার্থক্য রয়েছে তেমনি দেখতে পাওয়া যায় বিভিন্ন রকমের লোকসংস্কৃতি, লোকআচার আর শুনতে পাওয়া যায় বিভিন্ন রকমের লোকসঙ্গীতও।—চলবে।
* ড. শ্রাবণী দেবরায় গঙ্গোপাধ্যায় লেখক ও গবেষক, অসম।


















