শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
অসমের বরাক উপত্যকার গান বাজনার কথা বলতে গেলে মনে পড়ে যায় মনসা মঙ্গলের কথা। শ্রাবণের আকাশে মেঘের ঘন ঘটা আর ঘরে ঘরে মনসামঙ্গল এ দুই নিয়েই যেন বর্ষাকালের বরাক উপত্যকা। কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর, ‘মনসামঙ্গল’ কবিতাটিতে এ উপত্যকার মানুষের অনুভূতির আবেগের সঙ্গে পদ্মপুরারের নিবিড় সম্পর্কের ছবিটি ফুটে উঠেছে। পদ্মপুরাণের গানের সঙ্গে ওঝা নাচও হয়। তবে সব গানে ওঝা নাচ হয় না। এখন ওঝা নাচের শিল্পীদের সংখ্যাও যথেষ্ট কম। তবে ওঝা নৃত্য এখনও কম বেশি হয়ে থাকে।
বরাক উপত্যকার বাংলা গানের কথা বলতে গেলে ভট্ট সঙ্গীতের কথাও বলতে হয়। ভট্ট সঙ্গীত বড় মজার বিষয়। বলা যেতে পারে, এক ধরনের সাংবাদিকতা। মূলত কোথাও কোনও বড় রকমের ঘটনা ঘটলে ভট্ট সঙ্গীতের গায়কেরা তা গানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ঘটনাটির আদ্য পান্ত বর্ণনা করতেন। কোথাও ভূমিকম্প হলে, আগ্নিকাণ্ড হলে কিংবা চুরি ডাকাতির ঘটনাও তাঁরা নিখুদ ভাবে বর্ণনা করতেন গানের মাধ্যমে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৭ : রাজা সাজা

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৩: ডায়মন্ড হারবার, গৌরীর হারিয়ে যাবার দিন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪১: যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের সিদ্ধান্তে কেন কৃষ্ণের অনুমোদন প্রয়োজন?

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৪: কবি-কন্যার প্রিয় বান্ধবী

শোনা যায়, শিলচরের আদালতের প্রাঙ্গণে কিংবা ফাটক বাজারে এই ভট্ট কবিরা দোতরা বাজিয়ে গান করতেন। ভট্ট সঙ্গীতের কবিরা ছিলেন ধর্ম নিরপেক্ষ এবং একদিকে যেমন বিভিন্ন সামাজিক ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেছেন, তেমনি সমাজের সাধারণ মানুষের জন্যও নীতিমুলক বার্তাও শুনিয়েছেন। তাঁরা গানের শুরুতেই শ্রোতাদের যথাযোগ্য সম্মান জানিয়ে বলতেন, “মুসলিমকে ছালাম বলি হিন্দুকে প্রণাম।”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩১: সুন্দরবনের এক অনন্য প্রাণীসম্পদ গাড়োল

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৮: আকাশ এখনও মেঘলা

ড. অমলেন্দু ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘বরাক উপত্যকার ভট্ট সঙ্গীত’ বইটির ভূমিকা অংশে অধ্যাপক অমলেন্দু ভট্টাচার্য ভট্ট শব্দটির উদ্ভব, অর্থ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। সেই আলোচনা থেকেই জানা যায় ভট্ট একটি সংস্কৃত শব্দ। এই ভট্ট শব্দের অর্থ হচ্ছে বংশানুক্রমিক ভাবে স্তুতিপাঠক। ভট্ট সঙ্গীতের রচয়িতাদের মধ্যে রামকুমার নন্দীর মজুমদার এক জন প্রমুখ কবি। বলতে হয় কবি মহম্মদ আলাউদ্দিন খাঁ এর কথাও। ১৯৬১ সালের অসমের শিলচরের ভাষা আন্দোলনের নিখুদ ছবি ফুটে উঠেছে তাঁর রচনায়। ভট্ট সঙ্গীতের মাধ্যমে এই ভাষা শহিদের নাম এবং সমস্ত ঘটনা গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেক ভট্ট কবিরা মাতৃভাষা আন্দোলনের বর্ণনা করেছেন। একটি ভট্ট সঙ্গীতে পাই—
“মাতৃভাষার মর্যাদায়
উনিশে মে কাছাড় জেলায়
এগার জন প্রাণ সপিল।
হায় বিধি রে কিবা হৈল
দুই নয়নে অশ্রু বহে যায় ।।”
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৬: বক্সনগরে আবিষ্কৃত হয়েছে বৌদ্ধ স্তুপ, চৈত্যগৃহ ও একটি মঠ

দশভুজা, সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৪৬: ঠাকুরবাড়ির লক্ষ্মী মেয়ে

বরাক উপত্যকার লোকসংগীত নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বরাকের বারোমাসী গান নিয়েও বলতে হয়। এই বারমাসী গানে একটি সাধারণ নায়িকার বারোমাসের সুখ-দুঃখের গল্প ফুটে ওঠে। লোকসাহিত্যের গবেষক অমলেন্দু ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত বই, “বরাক উপত্যকার বারমাসী গান” বইটির ভূমিকা অংশে ড. অমলেন্দু ভট্টাচার্য বলেছেন, “বারোমাসি গানগুলিকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়—লৌকিক বারমাসী ও সাহিত্যিক বারমাসী।” ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে বারমাসী গান পাওয়া যায়। বারোমাসী গানগুলিতে অনেক সময় বৃষ্টি কিংবা খরার কথাও উল্লেখ করা হয়ে থাকে। অনেক রকমের সংস্কারও জড়িয়ে রয়েছে এই বারোমাসী গানগুলিকে কেন্দ্র করে। যেমন অসমের গোয়ালপাড়া অঞ্চলে প্রচলিত ‘পিয়াবারমাসী’ শুনলে নাকী গর্ভবতী নারীর পুত্র সন্তান হয়। কিছু বারমাসী গান বরাক উপত্যকায় কার্তিক পুজোর সময় মেয়েরা বিশেষ করে যে নব বধূরা পুজো করবেন তাঁরা বারমাসী গান গেয়ে থাকেন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৭ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: দেখা হবে চন্দনের বনে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৬: সেফ শেলটার

এ অঞ্চলের গ্রাম জীবনের নানান দিক উঠে এসেছে এই বারমাসী গানগুলিতে। “শান্তির বারমাসী”তে শান্তি নামক একটি মেয়র গল্প বলা হয়েছে। শান্তির খুব ছোট বেলায় বিয়ে হয়ে যায়, কিন্তু স্বামী বাণিজ্য করতে দূরে চলে যাওয়ায় সে বাপের বাড়ি ফিরে আসে। স্বামীর চেহারা শান্তির আর মনে নেই। এ দিকে বহু বছর পর তার স্বামী ফিরে এসে নিজের পরিচয় গোপন রেখে গোটা একটি বছর ধরে শান্তির সতীত্বের পরীক্ষা নিয়েছেন। বারোমাসের বিভিন্ন বিষয়গুলি তাদের কথোপকথনে উঠে এসেছে। বৈশাখে নালিতা অর্থাৎ পাট শাক রান্না করা থেকে শুরু করে অগ্রহায়ণ মাসে কৃষকের ফসল কেটে ঘরে তোলা ইত্যাদি বিষয় গুলি ফুটে উঠেছে। আষাঢ় মাসে সদাগর শান্তিকে বলে—
“অরে আষাঢ় মাসেতে শান্তি গাঙে নয়া পানি।
আমার নায়ে আও খেলাই উজান ভাটি।।”
শান্তি তখন উত্তর দেয় ,
“ অরে তুমার নায়ে তুমি রে সাধু আমার নায়ে আমি।
ঐ নায়ের কাণ্ডারী আছইন আমার সুয়ামী।।”


ঠিক একই ভাবে রয়েছে রাধার বারমাসী, সীতার বারমাসী, কমলার বারমাসীতেও কাহিনিকে কেন্দ্র করে বারমাসের বর্ণনা কিংবা বারো মাসের সুখ দুঃখের ঘটনা ফুটে ওঠেছে। এই বারমাসী গানগুলিতে এ অঞ্চলের উপভাষার প্রাধান্য লক্ষিত হয়। বরাক উপত্যকার লোক সাহিত্যের সম্ভার যথেষ্ট সমৃদ্ধ। লোকগানেরও একটি বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। তবে এই গান গুলির গায়কদের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। সুতরাং নতুন প্রজন্মকেই এগিয়ে আসতে হবে বাংলা ভাষার এই রত্ন গুলিকে সংরক্ষিত করে রাখার।—চলবে।

* ড. শ্রাবণী দেবরায় গঙ্গোপাধ্যায় লেখক ও গবেষক, অসম।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content