দুর্ভাগ্যের বিষয় সেই কৃতী সাংসদ আজ আর বেঁচে নেই! বলা যায় অন্তত এরকম একজনের হাত থেকে দেশ এবং দেশের মানুষ মুক্তি পেয়েছে। কথায় বলে রতনে রতন চেনে। শুভ্রাংশও ঠিকঠাক লোকের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করেছিল।
সেদিনের সেই সাংসদ ছিলেন আজকের কলঙ্কিত রাজনীতির পাকা খেলোয়াড়! তিনি সরাসরি রাজনৈতিক জনাদেশ নিয়ে শাসন ক্ষমতায় আসেননি, অথচ বলা যায় জনাদেশেই এসেছিলেন! আমাদের গণতন্ত্রে সব সম্ভব! সংসদীয় নির্বাচনে শাসকদলের প্রার্থীকে খুব অল্প ভোটে হারিয়ে দেন এই নির্দল প্রার্থী। অপশাসন রুখতে বিরোধীজোট বিশেষ সম্প্রদায়ের এই নির্দল প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছিলেন। ভোটে জেতার পর বিরোধী গোষ্ঠীকে কলা দেখিয়ে এই সাংসদ শাসক দলকে তাঁর সমর্থন নগদ টাকায় বেচে দিলেন।
সাংসদ হবার আগেই ভোটে লড়ার জন্য বিনিয়োগের অর্থ, সুদে আসলে তুলে নিয়ে সংসদে এই রাজনীতির ব্যবসায়ী তাঁর খেলা শুরু করেছিলেন। কিন্তু জনাদেশ তো শাসকদলের বিপক্ষে ছিল! হোক না, তিনি তো নির্দল তাই মানুষ একজন নির্দল সাংসদকে বেছে নিয়েছেন! কোন দল নয়! এবার প্রশ্ন তিনি দল বদলালেন কেন ? সাধারণ মানুষের রায় তো শাসকদলের বিরুদ্ধে ছিল। শাসকদলের প্রার্থীকে এলাকার মানুষ চাননি স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান করেছিলেন! ঠিক! কিন্তু মানুষ কেন ভোট দেয় ? কোন চাহিদা থেকে ভোট দেয়? একজন যোগ্য প্রতিনিধিকে মানুষ বেছে নেয় যিনি তাঁদের কথা সাধারণ মানুষের দূঃখদূর্দশার কথা সংসদে তুলে ধরবেন! তাঁদের জন্যে উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারবেন। শাসকের বিরোধিতা করলে সাংসদ উন্নয়ন করবেন কী করে? তাই মানুষের স্বার্থে নির্দল হয়েও সরকারকে সমর্থন করেছেন, এতে অন্যায় কোথায়?
অকাট্য যুক্তি। কলিযুগে অন্যায্য কোনও কিছুতে কোনও অন্যায় নেই। নায্য কাজে বরং অন্যায় হয় আজকাল! এখন মূল লক্ষ্য হল পাঁচটা বছর হা-ঘরের মত টাকা খেতে হবে। আর ছিটেফোঁটা কাজের উদ্বোধন করতে হবে! খবরে ভেসে থাকতে হবে। তারপর পাঁচবছর বাদে সাংসদ পদ চলে গেলেও লোকজনের গালমন্দের সঙ্গে আজীবন মাসে মাসে মোটা টাকা পেনসন, এসি ফার্স্টক্লাসে নিখরচায় ভ্রমণ নামে বেনামে সরকারি পদ ও পদের খবরদারি! আরও আরও কতকিছু! আশ্চর্যের কথা সাধারণ মানুষ, যাঁদের জন্য এত কান্ড করে সংবিধান রচনা করা এবং আমাদের দেখভাল করার জন্য পৌনে ছ’শো প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করা হয়। সেই জনগণের একটা বড়ো অংশ কিন্তু এই জনপ্রতিনিধিদের ভাতা এবং সুযোগসুবিধে সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানেন না। আর আরও আশ্চর্যের, এই ক্রমবর্ধমান পেতে থাকা নিয়ে শাসক-বিরোধী কারও কোনও প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, ওয়েলে বসে পড়া, গান্ধীমূর্তির পাদদেশে বসে কাকের বিষ্ঠা থেকে দামী মাথাটা বাঁচিয়ে বিক্ষোভ জানানো, কানে মাথায় গালে মুখে কালো কাপড় বেঁধে রাখা কিছুই হয় না।
ধৃতিমান বলেছিল যে একমাত্র সিনেমায় ছাড়া ওই কুড়ি বছরের পুরনো কেসে শুভ্রাংশুকে অপরাধী সাব্যস্ত করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু শ্রেয়া নিশ্চিত এর ফলে তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা যেতে পারে যাতে আনন্দ পালের খুনের ক্ষেত্রে তার কাছ থেকে বা তার ভবিষ্যৎ কাজকর্মের ভুলভ্রান্তি থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়।
দিল্লি থেকে সারিতা একদিন হঠাৎ শ্রেয়াকে ফোন করে জানালেন, শুভ্রাংশুর স্ত্রী মৃতা নয়না মুখার্জির ছোটভাই নীলাঞ্জন ব্যানার্জির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে! দিদির মৃত্যুর সময় তার বয়স কম ছিল তবু সে চেষ্টা করেছিল কিন্তু পুলিশ কোনভাবেই তাকে সাহায্য করেনি। এই নীলাঞ্জন যদি তার দিদির মৃত্যুর ব্যাপারে আবার তদন্তের জন্য আবেদন জানায় তাহলে পুরনো কেসহিস্ট্রি নিয়ে নিশ্চয়ই নাড়াচাড়া হবে।
কিন্তু সাধারণ সংসারী নির্বিরোধী মানুষ পুলিশ কেস কাছারি এসবে ভীষণ ভয় পায়! এসবে ভরসাও নেই বিশ্বাসও নেই। কারণ আমাদের দেশের আইনব্যবস্থাকে ইউজার ফ্রেন্ডলি বা সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য সুবিধেজনক করে বানানো হয়নি। তাকে ভয়াল ভয়ঙ্কর করে রাখা হয়েছে। আইনের মন্দিরে মন্দিরে কালীঘাট বা তারাপীঠের মতো পাণ্ডাদের রমরমা, বাগে পেলেই খ্যাঁক করে ধরবে। দক্ষিনেশ্বর মন্দিরের মতো পাণ্ডাহীন আইনব্যবস্থা নয় যে আপনার ইচ্ছে হলে ডালা কিনবেন, না হলে ফুল আর ধূপ দিয়ে নিজে পুজো দেবেন, না হলে এমনি গিয়ে মাকে প্রণাম করবেন। দক্ষিণা ইচ্ছা হলে দেবেন, না হলে দেবেন না। আমাদের গোটা আইন ও বিচারব্যবস্থা পাণ্ডানির্ভর বলেই সাধারণ মানুষ হাড়েহাড়ে বোঝেন যে বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ আর কেসকাছারি হয়ে গেলে সেটা বাহাত্তর দশচক্রে ভগবান ভূত! সময় আর অর্থের অপচয় হবে কিন্তু মামলার নিষ্পত্তি হবে না! শুধু পাণ্ডা-সেবায়েতদের জানাশোনা লোকজন যারা দেবতার অন্নভোগের ভাগ পান, লাইন ভিড় এসব টপকে দেবতার গর্ভগৃহে টপাস করে গিয়ে ঝরে পড়তে জানেন তারা কেবল অকুতোভয়!
নীলাঞ্জনবাবুকে বুঝিয়ে সাহস দিতে সারিতা অনেক চেষ্টা করলেন। শ্রেয়া প্রায় দু-তিনবার কলকাতা থেকে ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বললেন। অনেক বোঝানোর পর আশ্বস্ত হয়ে নীলাঞ্জন ব্যানার্জি আদালতে তার দিদি শ্রীমতি নয়না মুখার্জির অস্বাভাবিক মৃত্যুর আবার তদন্ত করার আবেদন জমা দিলেন।
এসব করতে প্রায় দিনদশেক সময় গেল। শুভ্রাংশু মুখার্জির উপর নজর রাখা হয়েছিল, কিন্তু কোনওরকম সূত্র পাওয়া যায়নি। মনে করা হয়েছিল শুভ্রাংশু কোনওভাবে ঐশীর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। কিন্তু তা ঘটেনি। শ্রেয়া বুঝতে পারছে না কিভাবে এগোবে ? ঐশীর ফ্ল্যাটটা এবার তাকে ছেড়ে দিতে হবে। বলা আছে এক মাসের মধ্যেই একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এদিকে তদন্তে সেরকম কোন অগ্রগতি নেই। আদালতে নীলাঞ্জন ব্যানার্জির আবেদন গ্রাহ্য হতেই দিল্লি থেকে সারিতার সহকারি শুভ্রাংশুকে ফোন করলেন।—চলবে।
আনন্দ পাল হত্যা রহস্য পরবর্তী পর্ব প্রকাশিত হবে আগামী বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com