রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

বোধিসত্ত্ব তখন জেতবনে অবস্থান করে শিষ্যদের নানা উপদেশ দিতেন। উপদেশকালে হাঁচি হলে শিষ্যরা মহা কোলাহল করে “জীবতু” ইত্যাদি বলে উঠতেন। বোধিসত্ত্ব তখন জানালেন যে এসব অমূলক, আয়ুর্বৃদ্ধি কিংবা আয়ুক্ষয়ের সঙ্গে এর যোগ নেই। অনর্থক বাধায় বিনয়ভঙ্গ ঘটে। এরপর পাপের ভয়ে ভিক্ষুরা নীরব হয়ে গেলেন। তাদের কখনও হাঁচি হলে নগরের অধিবাসীরা “জীব, জীব” আশীর্বাদ করলেও ভিক্ষুরা তাদের-ও চিরজীবী হওয়ার প্রত্যভিবাদন করতেন না। তাতে নাগরিকগণ ভিক্ষুদের অমার্জিত মনে করা শুরু করল। ক্রমে ক্রমে বোধিসত্ত্ব সেকথা জানতে পেরে অনুমতি দিলেন। গৃহস্থরা মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হন, সুতরাং তাঁদের শুভাকাঙ্ক্ষার প্রত্যুত্তরে শুভাকাঙ্ক্ষা জানানোই কর্তব্য। কিন্তু এই লোকাচারের উত্স কি? বোধিসত্ত্ব তখন বর্ণনা করলেন পূর্বকথা।
সেই জন্মে বোধিসত্ত্ব বারাণসী রাজ্যের এক ব্রাহ্মণকুলে জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁর পিতার নাম গর্গ। তিনি পৌরোহিত্য নয়, বরং পণ্যদ্রব্য কেনাবেচা করে জীবিকানির্বাহ করতেন। বোধিসত্ত্ব যখন ষোল বছরের, তখন একদিন বৃ্দ্ধ গর্গ মাথায় ঘটের ভার নিয়ে সপুত্র গ্রামে গ্রামে, নিগমে নিগমে বিক্রয় করতে করতে বারাণসী নগরে এলেন। তাঁরা দিনের বেলা নগরের দৌবারিকের গৃহে অন্নপাক করে আহার সম্পন্ন করলেন বটে, কিন্তু রাত্রিবাসের স্থান পেলেন না। অবেলায় এসে পড়া আগন্তুকরা থাকে কোথায়? কী করা যায়?
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৫ : অবাক পৃথিবী

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪২: শূকরজাতক: কাপুরুষ? মহাপুরুষ?

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৫: আকাশ এখনও মেঘলা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪১: ঘটি চেয়ে বঁটি

নাগরিকদের তাঁরা প্রশ্ন করেন, উত্তরে জানতে পারেন যে নগরের বাইরে একটা বাড়ি আছে। কিন্তু সেখানে একটা যক্ষ থাকে, সুতরাং সেই বাড়িকে নিরাপদ বলা যায় না বোধহয়। তবে ইচ্ছে করলে থাকা যায় বৈকী! বোধিসত্ত্ব অভয় দেন পিতাকে। চলুন তো বাবা! ভয় পাবেন না। আমি ওই যক্ষকে দমন করে আপনার অনুগত করে দেব। দুজনে সেই যক্ষপুরীতে এলেন, বৃ্দ্ধ একটি বেদীতে শয়ন করলেন আর বোধিসত্ত্ব তাঁর পদসেবা করতে থাকলেন।

যক্ষটি সেই বাড়ির কাঠের খুঁটির ওপরে বাস করতো। বারো বছর কুবেরের সেবা করে সে এই অধিকার লাভ করেছিল। এই বাড়িতে যারা প্রবেশ করবে তারা সকলেই তার ভক্ষ্য, কেবল তাদের কেউ হাঁচলে যদি কেউ “জীব” বলে, প্রত্যুত্তরে যে হাঁচি দিয়েছে, সেও যদি “জীব” বলে, তারাই কেবল অবধ্য। এই হল নিয়ম।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৩: আঁধারে আছে আততায়ী

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১০: চাঁদের ওপিঠে কালো

সেই মতো, ওপর থেকে যক্ষ অদৃশ্য সূক্ষ্ম চূর্ণদ্রব্য ছড়ালো এবং তার প্রভাবে বৃ্দ্ধ গর্গ হাঁচলেন। বোধিসত্ত্ব কিন্তু হাঁচি শুনেও নীরব থাকলেন। তখন যক্ষটি ওপর থেকে খুঁটি বেয়ে নেমে এল। বোধিসত্ত্ব তখন যক্ষকে দেখে উপলব্ধি করলেন কী ঘটতে চলেছে। মনে মনে ভাবলেন, শুনেছি বটে হাঁচি শুনলে “জীব” বলতে হয়। এই যক্ষটিই পিতাকে হাঁচিয়েছে এবং লোকশ্রুতি অনুসারে এই যক্ষটি হত্যাকারী। এখন তাই তিনি পিতার শতাধিক বর্ষব্যাপী দুরাচার যক্ষের গ্রাসহীন “জীবন” কামনা করলেন উচ্চস্বরে। যক্ষটি থেমে গেল। “জীব” শব্দটি যে বলে ফেলেছে সে অবধ্য। সুতরাং এখন সে অগ্রসর হল পিতার দিকে। পিতা গর্গ-ও বোধিসত্ত্বের মতোই সব উপলব্ধি করে পুত্রের শতাধিক বর্ষব্যাপী কীর্তিময় “জীবন” কামনা করলেন। যক্ষটি নিবৃত্ত হল।

আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৬ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী?

এখন বোধিসত্ত্ব তাঁকে প্রশ্ন করে জানলেন সে কেন এখানে থাকে, কাদের খায়, কাদের খায় না। জীব-প্রতিজীবাদীদের যক্ষ হত্যা করে না জেনে বোধিসত্ত্ব তাকে জানালেন যে, পূর্বজন্মের দুষ্কর্মের জন্য বর্তমান জন্মে যক্ষ এমন পরহিংসক ও পাপাচারী। এজন্ম-ও যদি এমন অন্যায়ে কাটে, তাহলে জন্মান্তরে ক্রমাবনতি ঘটবে। অন্ধকার থেকে গভীরতর তমোলোকে প্রবেশ ঘটবে ক্রমে ক্রমে। তাই এই জন্মে এখন-ই দুষ্কর্ম ত্যাগ করতে হবে। ত্যাগ করতে হবে প্রাণিহিংসা। যক্ষের মনে ভয় জন্ম নিল। পাপের ভয়, নরকগমনের ভয়। বোধিসত্ত্ব পঞ্চশীলে তাকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। যক্ষটি আজ্ঞাবহ বালকভৃত্য বা প্রেষণকারকের মতো অনুগত হল উপদেশের গুণে।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৩: ত্রিপুরা : ঊনকোটির বহু মূর্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৭: জৌরালি

নগরের লোক পরদিন একটা অদ্ভুত খবর শুনল, জানল, দেখল। তারা যক্ষটিকে দেখে জানল যে, সে হিংসা ত্যাগ করে বালক বোধিসত্ত্বের আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হয়েছে। রাজার কানে গেল সেই কথা। রাজা বোধিসত্ত্বকে সেনাপতির পদ দিলেন। যে ভীষণ যক্ষকে আজ্ঞাবহ করে কথার যাদুমন্ত্রে, সে যে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ও কৌশলী সুরক্ষায় কৃতকর্ম হবে তা আশা করাই যায়। পিতা গর্গকে রাজা বিশেষ সম্মানে ভূষিত করলেন। আর সেই যক্ষকে দিলেন শুল্কসংগ্রাহকের পদ। তাকে বলে দিলেন, বোধিসত্ত্বের উপদেশ অনুসারেই চলতে। রাজ্যের অভ্যুদয় ও যোগক্ষেম যে শুল্কনির্ভর তা তো বলাবাহুল্য। এই যক্ষ নীতিনিষ্ঠ। কারণ কুবেরের দেওয়া শর্ত সে লঙ্ঘন করেনি। তবে তখন সে বিপথগামী ছিল। সে এখন অন্যায় কাজ ভুলে যদি সৎকর্মে আত্মনিয়োগ করে, তাহলে তার স্বাভাবিক নীতিনিষ্ঠতা তাকে লব্ধপ্রতিষ্ঠ করবে। এই কাহিনিতে বালক বোধিসত্ত্বের যে প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের কথা বলে তা কাহিনিকে চিত্তাকর্ষক করেছে কেবল। হাঁচিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত এই কাহিনিতে প্রাচীন লোকবিশ্বাস, তার সারবত্তা কিংবা অসারতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কাহিনি শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস নয়, ন্যায়নিষ্ঠ কর্মকে তার লক্ষ্য করেছে। কর্ম মানুষকে উত্তীর্ণ করে। যিনি ন্যায়পরায়ণ, তিনি যেমন উত্তীর্ণ হন, তেমন-ই নীতি ও আদর্শের অনুগামী উন্মার্গগামীও যোগ্য নেতার নেতৃত্বে সুপথে আসেন, ন্যায়নিষ্ঠাই তাঁকে উত্তীর্ণ করে। জাতকমালার এই কাহিনিটি পাঠককে সেই সত্যের-ই সম্মুখীন করবে।—চলবে।

* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content