একঝলকে
● মুক্তির তারিখ : ০১/০১/১৯৬০
● ছবি : মায়ামৃগ
● পরিচালনা : চিত্ত বসু
● ছবির নায়িকা: সন্ধ্যা রায়
● প্রেক্ষাগৃহ : রাধা, পূর্ণ ও প্রাচী
● মুক্তির তারিখ : ০১/০১/১৯৬০
সিনেমার সঙ্গে একটা গোটা দশকের দাম্পত্যে ঘটে যাওয়া বছরগুলোর স্মৃতি-বিস্মৃতিকে মূলধন করে উত্তম কুমারের ফিল্মোগ্রাফিতে ১৯৬০-র দশক শুরু হল। আজকের মতো সে যুগেও একটি বছর, আরেকটি বছরে গিয়ে বিদায় সম্ভাষণ গ্রহণ করত। সে যুগেও পরিবর্তনের আবহাওয়া খুঁজে পাওয়া যেত।
হয়তো আজকের মতো, এত দ্রুতগামী বিশ্ব ছিল না। মানুষের মনোজাগতিক অবস্থান ছিল হেসে খেলে আনন্দে স্থিতি-গতির যুগ্ম সত্তার অধীনে। কিন্তু পরিবর্তন ধীরে ধীরে সভ্যতার কোণায় কোণায় নিজের সমস্ত ছাপই ফেলতে ফেলতে যেত।
উত্তমবাবুও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।
আজকের আলোচ্য ‘মায়ামৃগ’ ছবিটি যদি আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করি, সেখানে ভালো ভাবে দেখতে পাবো এ ছবির পরতে পরতে ইতিহাস। তাহলে আমাদের উদ্দেশ্য কি ভূগোলের পর ইতিহাস-কে নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা, না একটি বিশেষ যুগের উত্তরণ হওয়ার কিছু লক্ষণ খুঁজে পাওয়া। যেটা আজকের দিনে হবে তারই নির্মেদ মূল্যায়ন।
আসলে নায়ক থেকে মহানায়ক হবার যে সোপানগুলো সারা জীবনে উনি পার করেছিলেন। তার প্রকৃত অনুসন্ধান অগ্রন্থিতই থেকে গিয়েছে। প্রযোজকের বিনিয়োগ করা অর্থ, উত্তমমেধায় লাভ -লোকসানের বাঁকা চাউনিতে ঘর ভরিয়ে দিয়েছে, উত্তম কুমারের প্রাপ্য শেষ হয়ে গিয়েছে।
আবার পুঁজিবাদী অর্থনীতির দাবাখেলায় যে মনিমুক্তোগুলো দামি হিসাবে সভ্যতার কোষাগারে সঞ্চিত থাকে উত্তম কুমারের অভিনীত ছবিগুলো সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। সহৃদয় পাঠকগণ হয়তো মনে করবেন উত্তম কুমারের ফুলবেলপাতা চয়নই বোধহয় বর্তমান প্রতিবেদকের কাজ। ধারণা একেবারেই ভুল। উদ্দেশ্য, তা নয়।
একটা ছবির প্রেক্ষিত আলোচনা করতে গেলে সবার আগে দরকার হয় সময়কে পড়ার মতো মানসিক গঠন। উত্তমবাবু যে সময়ে দাঁড়িয়ে ‘মায়ামৃগ’ করছেন আর যে সময় দাঁড়িয়ে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-তে অভিনয় করছেন। দুটোরই সময়ের দাবি আলাদা। উনিই একমাত্র ছবির জগতের সেই ক্ষনজন্মা প্রাণপুরুষ যিনি, সময়ের দাবিকে সময়মতো পড়তে পেরেছিলেন। তাই অমরত্ব তাঁর হাতে ধরা দিয়েছে।
১৯৬০-এর দশকে বাঙালি দর্শকদের মনন, যে ঘূর্ণাবর্তে আবর্তিত হচ্ছিল সেখানে রোমান্টিক নায়ক শুভ্র চরিত্র বাদ দিয়ে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করার মতো বুকের পাটা সেসময় কিন্তু খুব কম অভিনেতারই ছিল। যেখানে তিনি আবার উত্তম কুমার আমরা ছবিটার সুলুকসন্ধানে যদি বিপ্রতীপ সমালোচনায় যাই অর্থাৎ কিনা ছবির শুভ্র চরিত্র উত্তমকুমার আর নামহীন পার্শ্বচরিত্রে বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়। পাঠকগণ ভেবে দেখুন। বিষয়টা কেমন দাঁড়াত। অনেকটা (সত্যজিৎ রায় পরিচালিত) ‘নায়ক’ ছবির অরিন্দমের বন্ধু লেবার লিডার এর সাথে সংলাপের মতো।
আসলে সাহিত্যের দাবি অনুযায়ী সব সময় নিজেকে ভেঙেচুরে ফেলাটা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। আর কিছুদিনের মধ্যেই উত্তমবাবু ‘শেষ অঙ্ক’ বলে একটি ছবিতে অভিনয় করবেন যেখানে দিনের শেষে প্রকাশিত হবে ধীরোদাত্ত নায়ক আসলে একজন অপরাধী। প্রকৃত অপরাধী অপরাধকে ঢাকার জন্য যদি কোন রকম ভনিতা ছাড়া ভালো মানুষের অভিনয় করেন তাও তাঁকে মাপা যায়। কিন্তু উত্তমবাবুর ‘শেষ অঙ্ক’ ছবির ‘সুধাংশু’ চরিত্র দর্শকদেরকে তা মাপতে দেয়নি। সময়ের সঙ্গে পিংপং বল খেলা খেলোয়াড়ের সেটাই ছিল জয়।
এমন নয় যে উত্তম কুমার ‘মায়ামৃগ’ ছবিতে যদি শুভ্র চরিত্র করতেন তাহলে ওই পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করার মতো সে সময়ের বাংলা ছবিতে কেউ ছিলেন না! সবার আগে ছিলেন অসিতবরণ। তার ওপরে ছিলেন জহর গাঙ্গুলীর মত শক্তিমান অভিনেতা। কিন্তু পরিচালকের দাবী সম্পূর্ণরূপে হজম করে আগামী দিনের আর একজন রোমান্টিক নায়ককে রেকমেন্ড করার মতো শিল্পদক্ষতাও ওঁর ছিল। কারণ তিনি জানতেন মূল কেন্দ্রীয় চরিত্রে উনি না থাকলেও পার্শ্ব চরিত্রের অভিনেতা হিসেবেও দর্শকের মনোযোগ উনিই টেনে নেবেন। হাজারটা বিশ্বজিত এলেও তাদের অধরা থাকবে। তবে একথা বলা যুক্তিযুক্ত নয় যে বিশ্বজিতের অভিনয় খারাপ হয়েছিল। বিশ্বজিৎ ছিলেন ছবিতে পরিচালকের গুড বয় হিসাবে। আর উত্তম বাবু ছিলেন দর্শকদের চোখের চরম আকর্ষণের বিন্দু হিসাবে।
এখানে যেন বিশ্বজিৎকেও উত্তমবাবু, নিজের সিনেম্যাটিক দক্ষতার একটা দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করলেন। খুব ভালো করে ছবিটার ফ্রেম টু ফ্রেম যদি আলোচনা করা যায় বা বিশ্লেষণ করা যায় আমরা দেখব ছবিটির মুহূর্তগত ক্লান্তি, লাঘব করে দিচ্ছে উত্তমবাবুর উপস্থিতি। ছবির কাহিনী অত্যন্ত মনোজ্ঞ। ঘরোয়া আটপৌরে মানুষদের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে একটি মনোগ্রাহী কাহিনীর বুনন করেছিলেন কাহিনীকার নীহার রঞ্জন গুপ্ত মহাশয়।
চিত্রনাট্য লিখেছিলেন বিখ্যাত মনি বর্মা। উত্তমবাবু চিত্রনাট্যের বুনন শুনে প্রথমে দুর্বল হলেও নিছকই দাদার কর্তব্য করে ফেলার একটি ক্ষেত্র থেকে বা আগামী দিনের এক সম্ভাবনাময় নায়ককে তুলে আনার তাগিদে। বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে রেকমেন্ড করেন এবং সহঅভিনেতা হবার প্রস্তাব দেন। এ যেন অনেক বড় ছবিতে চরিত্রাভিনেতার আত্মত্যাগ। এর পরবর্তী অনেক ছবিতেই উত্তম কুমার প্রযোজক পরিচালকদের বোঝাতে চেয়েছেন চরিত্র অনুযায়ী প্লেয়ার কাস্টিং করতে। যার কারণে দেবদাসের চরিত্রে উনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে রেকমেন্ড করেছিলেন।
ছবিটির মস্ত বড় সম্পদ চিত্ত বসু-র প্লেয়ার কাস্টিং। যাঁকে যে রোলে দিলে ফুটবে সে ধরনের রোল তিনি বেছে বেছে তৈরি করেছিলেন। তুলসী চক্রবর্তীর মতো একজন ক্ষণজন অভিনেতাকেও এক অকিঞ্চিৎকর চরিত্রে অভিনয় করিয়ে ছবির মান অনেক বাড়িয়ে নিয়েছেন। সাথে ছিল ছবি বিশ্বাসের রাশভারী অ্যাপিয়ারেন্স। অভিনেতা বিকাশ রায়ের মতো সিরিয়াস অভিনেতার এ ধরনের রোল পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার যেখানে সত্যের জয়গান করবেন বলে উনি মরিয়া হয়ে নিজের সমস্ত চাওয়া পাওয়াকে দূরে ফেলে দিচ্ছেন।
সুনন্দা দেবী একজন বনেদি ঘরের গৃহবধূ হিসাবে যে পরিচয় দিয়েছেন তা সকল অভিনেত্রীদেরকে ম্লান করে দিয়েছেন। আসলে ছবিটির প্লেয়ার কাস্টিং এমন ভাবে হয়েছিল, এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায়। সন্ধ্যা রায়ের মতো নবাগতা নায়িকা শুধুমাত্র চোখের চাহনিতে অভিনয়ের কোন মাত্রায় পৌঁছে যাওয়া যায় সেটা প্রত্যক্ষ করিয়েছিলেন।
এরপর আসি ছবিটির সাংগীতিক বিন্যাস নিয়ে। যেখানে উত্তম কুমার মানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, রবীন চট্টোপাধ্যায়,নচিকেতা ঘোষের যুগ চলছে। সেখানে এই ছবিতে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সুরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সুরেলা সাংগীতিক বিন্যাস ছবিটির পরম সম্পদ। ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মানববাবু মায়াবী হরিণের মতোই এ ছবির পূর্ণতা দিয়েছেন।
সবশেষে বলা যায় উত্তম কুমারের ফিল্মি ক্যারিয়ারে যে সমস্ত ছবিগুলো উজ্জ্বল হয়ে আছে এই ছবিও সেই অনন্যমার্গের একটা পথপ্রদর্শক। ঠিক যেমন “শোলে” ছবিতে জয় ও বীরুর পাশে ঠাকুর হিসেবে সঞ্জীব কুমারের চরিত্র।—চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com