বুধবার ১০ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

মাধুরীলতা।

রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ সন্তান মাধুরীলতা। দু-বছর পর কবির পুত্র-সন্তানের জন্ম। বলাই বাহুল্য, তিনি রথীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ পিতা হিসেবে যেমন ছিলেন স্নেহময়, তেমন দায়িত্বপরায়ণ। মাধুরীলতা প্রথম সন্তান, তাঁর প্রতি কবির বোধহয় একটু বাড়তি স্নেহকাতরতা ছিল। আদর করে তাঁকে বলতেন ‘বেলা’। কবি-পত্নী তখন প্রায় কিশোরী, তেরোও পূর্ণ হয়নি। নিতান্তই ছেলেমানুষ, নবীন-মাতা কি শিশুসন্তানকে ঠিকঠাক সামলাতে পারবেন, রবীন্দ্রনাথের মেজবউঠান জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর তা নিয়ে সংশয় ছিল। তিনি তখন জোড়াসাঁকো ছেড়ে থাকতেন পার্ক স্ট্রিটের ৪৯ নম্বর বাড়িতে। জন্মের মাসখানেক পরে নবীন-মাতা মৃণালিনী শিশুসন্তানকে নিয়ে জ্ঞানদানন্দিনীর আহ্বানে চলে আসেন পার্কস্ট্রিটের বাড়িতে।

প্রথমদিকে রবীন্দ্রনাথ না আসলেও নবজাতকের টানে মাসতিনেক পরে চলে এসেছিলেন বউঠানের বাড়িতে। ওখানেই সে সময় থাকতেন। নিজের হাতে দায়িত্ব পরায়ণ পিতা সদ্যোজাত কন্যাকে স্নান করিয়ে দিতেন। অন্নপ্রাশনের আগে অবশ্য রবীন্দ্রনাথ মৃণালিনী ও মাধুরীলতাকে নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন জোড়াসাঁকোয়। সেখানেই হয়েছিল অন্নপ্রাশন-অনুষ্ঠান। সে অনুষ্ঠান উপলক্ষে কবি একটি গানও লিখেছিলেন, ‘ওহে নবীন অতিথি, তুমি নূতন কি তুমি চিরন্তন।’
জমিদারি সামলানোর দায়িত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে কখনও-সখনও দূরে থাকতে হয়েছে। মাধুরীলতার তখন কতই বা বয়স, চারের বেশি নয়। ওই বয়সেই আকূল হয়ে বাবাকে চিঠি লিখতেন। সেচিঠি পেয়ে রবীন্দ্রনাথ ফিরে আসতে চেয়েছেন জোড়াসাঁকোয়। রবীন্দ্রনাথ নিজের মতো করে মাধুরীলতাকে গড়েছেন। লেখাপড়া থেকে সংগীতচর্চা সবদিকেই ছিল কবির মনোযোগ। শুধু মাধুরীলতা নয়, অন্যান্য সন্তান-সন্ততিদের ক্ষেত্রেও সমান মনোযোগী ছিলেন। হয়তো মাধুরীলতার ক্ষেত্রে তাঁর মনোযোগ একটু বেশিই ছিল। রথীন্দ্রনাথ ‘পিতৃস্মৃতি’ বইতে তো লিখেইছেন, ‘আর সব ছেলেমেয়েদের চাইতে বাবা দিদিকে বেশি ভালোবাসতেন। আমরা সেটা খুবই জানতুম, কিন্তু তার জন্যে কোনোদিন ঈর্ষা বোধ করিনি…।’
কলকাতায় বৃষ্টি

মৃণালিনী দেবী।

কবি মাধুরীলতাকে চোখে চোখে রাখতেন। তাঁর মধ্যে সূক্ষ্ম অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছিলেন। গরিব মানুষের জন্য মাধুরীলতা সবসময়ই কাতর হতেন। নিষ্ঠুরতা তাঁকে বিচলিত করত। কোমল মনের অধিকারিণী। জীবকুলের প্রতি, এমনকি সামান্য পিঁপড়ের জন্যও কাতর হতেন তিনি। পিঁপড়ে মারা নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে কত বিবাদও করেছেন। সেসব দেখে রবীন্দ্রনাথ নিজের ছেলেবেলার কথা ভেবেছেন। তিনিও এমনই ছিলেন। ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকে লিখেছিলেন, ‘আমার ছেলেবেলায় ঠিক ওইরকম ভাব ছিল, কীটপতঙ্গকেও কষ্ট দেওয়া আমি সহ্য করতে পারতুম না।’
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৭: আকাশ এখনও মেঘলা

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১২: এ দিন যাবে, রবে না

পিতার ঔজ্জ্বল্য কখনও ম্লান হয়নি পুত্রের খ্যাতিতে

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৬: বক্সনগরে আবিষ্কৃত হয়েছে বৌদ্ধ স্তুপ, চৈত্যগৃহ ও একটি মঠ

মাধুরীলতাকে বিয়ে দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে কম বিপন্ন হতে হয়নি। অপমানিত হতে হয়েছে, পাত্রপক্ষের অর্থ-তৃষ্ণায় বিপন্ন হয়েছেন। খুব কষ্ট করেই সেই অর্থতৃষ্ণা মেটাতে হয়েছে। সে এক নিদারুণ অভিজ্ঞতা। নিজের মানসিকতার সঙ্গে মেলাতে পারেননি, বিশ্বাস করে ঠকেছেন। সব গ্লানি নীরবে সহ্য করেছেন। কবি বিহারীলাল সরকারের পুত্র শরৎকুমারের সঙ্গে হয়েছিল এই বিবাহ।

শরৎকুমার ওকালতি করতেন মজঃফরপুরে। বিয়ের পর তিনি সেখানেই ফিরে গিয়েছিলেন। মাধুরীলতা রয়ে গিয়েছিলেন পিতৃগৃহে। মাসখানেক পর রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিলেন স্বামী-গৃহে, মজঃফরপুরে। মজঃফরপুরে পরিচয় হয় অনুরূপা দেবীর সঙ্গে। তখনও তিনি সুখ্যাত লেখিকা হয়ে ওঠেননি। সাহিত্যজগতে পদচারণা অবশ্য শুরু করেছেন। অচিরেই কবি-কন্যার সঙ্গে তাঁর ‘সখিত্ব’ গড়ে ওঠে। অকৃত্রিম বন্ধুত্ব। সে বন্ধুত্বে চির ধরেনি কখনও।
কলকাতায় বৃষ্টি

রেণুকা।

এই বন্ধুত্বের সূত্রে অনুরূপা দেবী রবীন্দ্রনাথকে কাছ থেকে দেখেছেন, মিশেছেন, স্নেহলাভ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সব পরিচয় তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। অনুরূপার কাছে তিনি ছিলেন শুধুই ‘মাধুরীর বাবা’। অনুরূপা লিখেছেন, ‘তাঁর বহুতর বিচিত্রতর সম্মানের বড় বড় বিশেষণগুলি অকস্মাৎ একদা আমার কাছে সহজ সাধারণ হইয়া গিয়া তাঁর মস্ত বড় একটিমাত্র পরিচয় পৌঁছিয়াছিল।’

ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে অনুরূপা দেবীর পারিবারিক যোগসূত্র ছিল। অনুরূপার পিতামহ ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের হৃদ্যতা ছিল। তাঁদের চুঁচুড়ার বাড়ির পাশেই গঙ্গাতীরে মহর্ষিদেব বায়ুপরিবর্তনের জন্য ঘরভাড়া নিয়ে কিছুকাল ছিলেন। রবীন্দ্রনাথও এসেছেন এই চুঁচুড়ার বাড়িতে। অনুরূপা তখন ছোটো। কবিকে দেখার স্মৃতি তাঁর তেমন কিছুই মনে ছিল না। ভাইয়ের কাছে গল্প শুনেছিলেন, ঘাটে বাঁধা বজরার ছাদে বসে জোছনা-রাতে রবীন্দ্রনাথ সারেঙ্গি বাজিয়ে মাঝিদের সঙ্গে গান করতেন। অনুরূপার মা ও বাড়ির অন্য মহিলারা পাঁচিলের ধারে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে কবির গান শুনতেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩০: কাদাখোঁচা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৬ : মায়ামৃগ

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অনেক দূরের মানুষ, হঠাৎ করে হয়ে উঠলেন অতি কাছের। যাঁর সঙ্গে কবি-কন্যার বিবাহ হয়, সেই শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী ছিলেন অনুরূপা দেবীর স্বামীর সহপাঠী ও বন্ধু। তিনি জানতেন, কবি-কন্যার সঙ্গে তাঁর বন্ধুর বিবাহ-আয়োজনের কথা। অনুরূপাকে তাঁর স্বামী খানিক বিস্মিত হয়ে এসংবাদ দিলেও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন,‘শরৎবাবুর ইচ্ছা নয় যে এখনই লোকজানাজানি হয়।’

পিতা যখন মাধুরীলতাকে নিয়ে এলেন মজঃফরপুরে, তখন অনুরূপা দেবী সেখানে ছিলেন না। গিয়েছিলেন পিতৃগৃহে, ভাগলপুরে। স্বামী তাঁকে চিঠি লিখে জানাতেন বন্ধুপত্নীর গুণপনার কথা। তাঁকে নিয়ে মজঃফরপুরে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। ঠাকুরবাড়ির কন্যাকে দেখার জন্য কৌতূহলী মানুষের ভিড় হত যথেষ্ট। কতই বা বয়স তাঁর! বছর চোদ্দোর বেশি নয়। এই বয়সেই সকলের মন জয় করেছিলেন। অনুরূপা দেবীর লেখায় আছে, ‘মাধুরীলতা বলিতে লোকে গলিয়া পড়ে, তার প্রশংসায় সকলে পঞ্চমুখ হয়।’

মা মৃণালিনী দেবী তাঁর কন্যাকে এটা-সেটা কত কিছু পাঠাতেন। পাঠাতেন পার্শেল করে। নানা ধরনের আচার, জেলি, নারকোলের খাবারদাবার। মাধুরীলতা সবাইকে দিয়ে তবেই সেসব খেতেন। বাড়িতে নিমন্ত্রণ লেগেই থাকত। স্বামীর বন্ধুরা আসতেন। তাঁদের নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতেন। রান্না করে, খাইয়েই ছিল তাঁর যত আনন্দ।
কলকাতায় বৃষ্টি

অনুরূপা দেবী।

প্রথম অনুরূপার সঙ্গে মাধবীলতার দেখা হয় এক চৈত্র-দুপুরে। পরে যতই অন্তরঙ্গতা হোক না কেন, প্রথম দিনের স্মৃতি মনের মণিকোঠায় সজীব হয়ে রয়ে গিয়েছিল। মাধুরীলতাকে নিয়ে ‘প্রবাসী’তে অনুরূপা দেবী যে স্মৃতিকথা লিখেছিলেন, সে লেখায় আছে, ‘আমার সঙ্গে তার যেদিন প্রথম দেখা, সেদিনের সেই বিশেষ সন্ধ্যাটির কথা আমার জীবন-খাতার একটি পুরা পৃষ্ঠা ভরিয়া আজিও তেমনই উজ্জ্বল অক্ষরে লিখিত রহিয়াছে। চৈত্র-অপরাহ্ণের স্নিগ্ধোজ্জ্বল রশ্মিচ্ছটায় সমুদ্ভাসিতা মাধুরীলতাকে বাস্তবিক একটি দেবকন্যার মতোই অপরূপ বলিয়া মনে করিয়াছিলাম। রূপ যে আমি দেখি নাই তা নয়। ঘরে বাহিরে গায়ের বর্ণ, মুখের শ্রী, অঙ্গের সৌষ্ঠব সবই যথেষ্ট দেখিয়াছি।… তাকে সেদিন যে দৃষ্টি, যে হৃদয় লইয়া দর্শন করিলাম, একেবারে যেন অন্তরের অন্তরঙ্গ করিয়া নিজের কাছেই পাইলাম, ঠিক তেমনটি তো আর কোথাও হয় নাই।’

পরস্পরের ভালোলাগা এতই গভীর হয়ে ওঠে যে, দু-দিন দেখা না হলেই দু-জনে ব্যাকুল হতেন। মাধুরীলতার স্বামী শরৎকুমার অনুরূপার স্বামীকে মজার ছলেই বলেছিলেন, ‘ভাগ্যে তোমার স্ত্রী পুরুষমানুষ নন; আমার গিন্নিরও তো ঠিক ওই রকমই নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দু-দিন না গেলেই বলেন, অনেক দিন ওদের বাড়ি যাওয়া হয়নি। আজকে যাবে?’
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৫: জরুরি একটি ফোন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪০: রামের সত্যরক্ষা, প্রবাদপ্রতিম রামরাজ্যের স্রষ্টার বৈরাগ্যের রূপ

মাধুরীলতা অকালে প্রয়াত হন। তাঁর স্মৃতি সযত্নে মনের কোণে রেখে দিয়েছিলেন অনুরূপা দেবী। সেই স্মৃতির গায়ে ধুলো জমেনি, ফিকে হয়ে যায়নি। তাঁদের মধ্যে কত গভীর বন্ধুত্ব ছিল, তা বোঝা যায় অনুরূপা দেবীর এই আন্তরিক উচ্চারণে, ‘সেই সব দিনের কথা মনে আসিয়া অনেক দিনই অনেক চোখের জল ঝরিয়াছে; আজও এই জীবনসায়াহ্নে ঊষর মরুভূমির মতোই প্রায় শুষ্ক-হইয়া-যাওয়া চিত্তকে নববর্ষার প্লাবনের মতোই প্লাবিত করিয়া দিয়া অশ্রু-উৎস ছুটিয়া আসে। জীবনের সবচেয়ে সুখের দিনগুলির মধ্যে প্রিয়বান্ধবীর মধুর স্মৃতি তাদের গায়ে যেন সোনালি জরির মিহি কারুকার্যের মতোই সুশোভন হইয়া আছে। কালের হাত আজও তাদের স্পর্শ করিতে পারে নাই। কত গ্রীষ্ম-সন্ধ্যার, কত বসন্ত-সায়াহ্নের, কত শীত-দ্বিপ্রহরের হাস্য রহস্যভরা কর্মকুশলতা-তৎপর দিনগুলি স্মৃতির ভাণ্ডারে আজও যেন অক্ষয় হইয়া রহিয়াছে; যার মাঝখানে জাগিয়া আছে মাধুরীর সুন্দর মুখ, সুমিষ্ট বাণী, স্নিগ্ধ হাস্য!’
কলকাতায় বৃষ্টি

শরৎকুমার চক্রবর্তী।

বিহারে তখন মেয়েরা ছিল পুরোপুরি পর্দানশিন। অনুরূপা দেবীর লেখাতেই আছে, কারও বাড়িতে গাড়িতে গেলে, গাড়ির দু-দিকে চাদর ধরে রাখা হত। গাড়ি থেকে নামার সময় তো বটেই, গাড়ির ভেতরে বসে থাকার সময় কাচের গায়ে চাদর ঝুলিয়ে দেওয়া হত। মাধুরীলতাও এভাবে যাতায়াত করতেন। তবে অনুরূপা ও মাধুরীলতা কেউই পর্দানশিন থাকতেন না। অনুরূপা একটি স্কুল চালানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সে দায়িত্ব সফল করার ক্ষেত্রে মাধুরীলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। দু-জনে বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিক্ষার্থী জোগাড় করতেন। শিক্ষার্থী জোটাতে গিয়ে, বিদ্যালয়-উন্নয়নের জন্য চাঁদা চাইতে গিয়ে তাঁদের কম বিদ্রূপ সইতে হয়নি! বিদ্রূপ ছিল, প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা ছিল। তারপরও তা ছিল বড়ো আনন্দের সময়। অনুরূপা সেই আনন্দ-যাপনের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন, ‘সেই পথের দু’ধারে বসন্তের উপবনে ফুল ফোটার বিরাম ছিল না।’ মজঃফরপুরে দুই বান্ধবীর সেই আনন্দময় দিনগুলির মাঝে বারবার দুঃখ এসে হানা দিয়েছে। মাধুরীলতার জীবন দুঃখে ভরে উঠেছিল। অকালে মা মারা গেছেন, পরে বোন রেণুকা। নিরালায় বসে শুধুই তিনি চোখের জল ফেলেছেন। সেই দুঃখের দিনগুলিতে বান্ধবী অনুরূপা পাশে থেকেছেন, সান্ত্বনা দিয়েছেন তাঁকে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৭ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: দেখা হবে চন্দনের বনে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৩: মাঝ-রাতে আশ্রমে একটি বালক কাঁদছিল কেন?

আনন্দ-সুখের মাঝে কখনো দুঃখের ছোঁয়া। দুই বান্ধবীর এভাবেই কাটছিল দিনগুলি। হঠাৎই ছন্দপতন। শরৎকুমার ব্যারিস্টার হতে বিলেতে গিয়েছেন। মাধুরীলতা বাপের বাড়িতে গিয়ে বসবাস শুরু করেছেন। অনুরূপা দেবী কখনও কলকাতায় এলে ঠিক পৌঁছে যেতেন জোড়াসাঁকোয়। তাঁকে জোড়াসাঁকোয় দেখে রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমিই বেলার সবচেয়ে বড় বন্ধু? তোমার কথা ওর কাছে ঢের শুনেছি।’

কাছের বান্ধবী মাধুরীলতা তখন অনুরূপার দূরের বান্ধবী। পত্রে অব্যাহত থেকেছে যোগাযোগ। মাধুরীলতা লিখেছেন,’বন্ধুহারা মম বন্ধ ঘরে/থাকি বসে অবসন্ন মনে।’
কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তখন কি আর অনুরূপা দেবী ভাবতে পেরেছিলেন, তাঁর ভালোবাসার বন্ধুকে কালব্যাধি ধরবে! যক্ষ্মা-কীট কুরে কুরে খেয়েছিল তাঁকে। মাধুরীলতার মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অনুরূপা দেবীর দেখা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ শুয়েছিলেন ইজিচেয়ারে। অনুরূপাকে দেখেই হারানো কন্যাকে মনে পড়েছে তাঁর। বিমর্ষ-বিপন্ন রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘তুমি তাকে দেখেছিলে? কি সুন্দর ছিল সে! কি বুদ্ধি ছিল তার।’ অনুরূপার মনে হয়েছে,‘একটা গভীর শোকের ছায়া চলন্ত মেঘের মতোই ক্ষণকালের জন্য যেন মধ্যাহ্ন ভাস্করকে আড়াল করিয়া দিল।’ খানিক চুপ করে থেকে কবি তাঁকে বলেছেন, ‘বেলা তোমায় বড্ড ভালোবাসত। তোমার দেখাদেখি ইদানীং গল্প লিখতে আরম্ভ করেছিল। বেঁচে থাকলে হয়তো তোমার মতো লিখতে পারত।’

সেদিন কবির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বেদনায় ভরে উঠেছিল অনুরূপা দেবীর মন। বন্ধু হারানোর এই বেদনা সারা জীবন তিনি বহন করেছেন। প্রিয় বান্ধবী মাধুরীলতা মনের কোণে রয়েই গিয়েছিলেন।

* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content