রবীন্দ্রনাথের বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ পশুপাখিদের ভালোবাসতেন। ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথও। শান্তিনিকেতনের আশ্রম-বিদ্যালয়ের কেউ নিষ্ঠুর আচরণ করলে দ্বিজেন্দ্রনাথ অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ হতেন। হাওয়াই তো স্বাভাবিক। নিজের হাতে যিনি পাখিদের খাওয়াতেন, কাঠবেড়ালি যাঁর বুকে, কাঁধে ঘুরে বেড়াত, তিনি যদি পশু-পাখিদের ওপর নিষ্ঠুরতা দেখেন, তবে তো ক্ষুণ্ণ হবেনই, হতেনও। বকাঝকা করে জানতে চাইতেন, ব্যাপারটা ‘রবি’ জানেন কিনা। রবীন্দ্রনাথ যে নিষ্ঠুরতা বরদাস্ত করবেন না, তা ভালো করেই জানতেন দ্বিজেন্দ্রনাথ।
শান্তিনিকেতন আশ্রমে দুটো হরিণ ছিল। দুটো ময়ূর ছিল। ময়ূর দুটোকে ছাত্রাবাসের দক্ষিণ দিকে রাখা হয়েছিল। ময়ূর দুটোর থাকার জায়গা ঘিরেও দেওয়া হয়েছিল জাল দিয়ে। হরিণ দুটো আশ্রমে ইতস্তত ঘুরে বেড়াত। একদিন একটা হরিণকে অনেকগুলো কুকুর তাড়া করে। তাড়া খেয়ে হরিণটা আশ্রমের বাইরে বেরিয়ে পড়ে। দৌড়াতে থাকে। কোথায় যে গেল, কে জানে! আশ্রমের সকলেই ভাবনায় পড়লেন, কেউ কেউ এদিক-সেদিক খুঁজে হতাশ হয়ে শেষে ফিরে আসেন।
হাজার খোঁজাখুঁজি করেও কোত্থাও পাওয়া গেল না। শেষে খবর আসে, দিশেহারা হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে হরিণটা ঢুকে পড়েছিল সাঁওতালপাড়ায়। নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিল সে, সেখানে যে তার জন্য মৃত্যু অপেক্ষা করছে, তা কি আর জানত! সাঁওতালদের ছোঁড়া তিরের আঘাতে মৃত্যু হয় তার।
দুটো থেকে একটা হল, যে হরিণটা বেঁচে রইল, চোখে চোখে রাখা হত তাকে।আর সে মনের আনন্দে আশ্রমে ঘুরে বেড়াতে পারত না। ব্যবস্থা হল বেঁধে রাখার। সবে তখন শিং বের হয়েছে। নতুন শিংয়ের সুড়সুড়ানি, সবাইকে সে গুঁতোতে চায়। গুঁতোয়ও। দ্বিজেন্দ্রনাথ এসব খবর রাখতেন না। প্রতিদিনই একবার করে গোটা আশ্রমে চক্কর মারতেন তিনি। এ ছিল তাঁর দৈনন্দিন রুটিন। এইরকমই একদিন হাঁটছিলেন, হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নজরে পড়ে, কে যেন হরিণটাকে বেঁধে রেখেছে। আহা রে, বেচারার কী কষ্ট! এভাবে কে বেঁধে রেখেছে! ভাবতে ভাবতে নির্বিকারভাবেই এগিয়ে যান হরিণটার দিকে।
পায়ে পায়ে একেবারে কাছে চলে গিয়েছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। দূর থেকে সে দৃশ্য দেখে যে ছেলেরা মাঠে খেলছিল, আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। চেঁচিয়ে বাধা দেওয়ারও চেষ্টা করে। দ্বিজেন্দ্রনাথ শুধু কাছে যাননি, পরম মমতায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। গুঁতিয়ে দেবে ভেবে সবাই ভয় পেলেও শেষ পর্যন্ত কিচ্ছুটি করেনি হরিণটা। শান্ত হয়ে বসে থাকে। আদর খায়। ভালোবাসায় পশুপাখি যে বশ হয়, তা ভালোকরেই জানতেন দ্বিজেন্দ্রনাথ।
দ্বিজেন্দ্রনাথের অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন সুধাকান্ত রায়চৌধুরী। আশ্রম-শিক্ষক সতীশচন্দ্র রায়ের ভাগ্নে তিনি। শান্তিনিকেতনেই পড়াশোনা। সে পড়াশোনা শেষ না করে মাসিক পাঁচ টাকা মাইনেতে যোগ দিয়েছিলেন আশ্রমের কাজে। মূলত অশিক্ষক কর্মী। একসময় তিনি ছিলেন ছাত্রাবাসের পরিদর্শনের দায়িত্বে,পরে করতেন আশ্রমের রান্নাঘর দেখাশোনার কাজ। রবীন্দ্রনাথের শেষজীবনে কিছুকাল ছিলেন একান্ত সচিবের দায়িত্বও পালন করেছেন। দ্বিজেন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি স্মৃতিকথাধর্মী বই লিখেছিলেন সুধাকান্ত। সেই বইতে আছে এই ঘটনাটির বিশদ বিবরণ। তিনি দ্বিজেন্দ্রনাথকে বলতেন, ‘বড়োবাবু’। সম্ভ্রম দেখিয়ে এমন সম্বোধন করে তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন আশ্রমিকরা অনেকেই। সুধাকান্ত যেমন প্রতিদিন বড়োবাবুর কাছে যেতেন, তেমনই গিয়েছিলেন সেদিন সকালে। বলার জন্য যেন অপেক্ষা করছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ, যাওয়ামাত্র ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা অমন শান্ত হরিণটিকে গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে কেন কষ্ট দাও। ও স্বাধীনভাবে আশ্রমে ঘুরে বেড়াক, এটা কি তোমাদের সহ্য হয় না! রবি (রবীন্দ্রনাথ) কি এই কাণ্ড দেখেছেন! তিনি যদি দেখেন হরিণকে তোমরা বেঁধে কষ্ট দিচ্ছ হরিণ পোষার শখ মেটাবার জন্যে, তা হলে মজা টের পাবে। রবি এ-সব মোটেই পছন্দ করেন না। এ হচ্ছে নিষ্ঠুর শখ।’
দ্বিজেন্দ্রনাথ যে যথেষ্ট উত্তেজিত, সঙ্গত কারণেই ক্রুদ্ধ, তা বুঝতে সুধাকান্তর দেরি হয়নি। নিজের মতো করে বুঝিয়ে পরিস্থিতি সহজ করার চেষ্টা করেছিলেন। সুধাকান্তর যুক্তিতে দ্বিজেন্দ্রনাথ সন্তুষ্ট হননি। সুধাকান্ত বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, হরিণটা কতখানি বদ! তার স্বভাব ভালো নয়। সুধাকান্তর যুক্তি খণ্ডন করে দ্বিজেন্দ্রনাথ আসল কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। বলেছিলেন, একটুও আদর-যত্ন পায়নি। পেলে এমন করত না। গুঁতনোর জন্য নিশ্চয়ই মারধর করা হয়েছে। রেগে গিয়েছে। সে কারণেই এমন আচরণ করেছে।
দ্বিজেন্দ্রনাথকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন রবীন্দ্রনাথ। মাঝেমধ্যেই কবি চলে আসতেন দ্বিজেন্দ্রনাথের গুরুপল্লীর বাড়িতে। দাওয়ায় বসে অগ্রজের সঙ্গে গল্পগাছা করতেন। অগ্রজের মতো তিনিও পাখিদের খাঁচায় রাখার, গৃহপালিত পশুকেও বেঁধে রাখার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। সুধাকান্তের রচনাতে একটি ঘটনার কথা আছে। মন ছুঁয়ে যাওয়া সে ঘটনার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি-মানুষটিকে চিনে নেওয়া যায়। একবার কবি বোটে করে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণ। টানা ক-দিন জলযাত্রা। রবীন্দ্রনাথ রাতে বোটের বড়োসড়ো ঘরটিতে ঘুমোতেন। যে ঘরটি ছিল অপেক্ষাকৃত ছোটো, সে ঘরে ছিল টেবিল-চেয়ার আর ছোটো একটা খাট। চেয়ারে হেলান দিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রায় সারাদিন বসে থাকতেন। বসে থাকলেও কখনো দিবানিদ্রা দিতেন না। পড়তেন, লিখতেন, কখনো দেখতেন চারপাশের দৃশ্যাবলি। নৌকার মাঝি-মাল্লাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই গল্প জুড়ে দিতেন। ভাগ নিতেন তাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার। সেবার সঙ্গে ভৃত্য বনমালীও ছিল। বনমালী যেন তাঁর কবিতার ‘পুরাতন ভৃত্য’। অত্যন্ত অনুগত, সহজেই ভরসা করা যায়। কবিও ভরসা করতেন। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে তার ডাক পড়ত।
কখনও বই পড়ে, কখনও লিখে কখনো বা আলাপচারিতায় বেশ লাগছিল রবীন্দ্রনাথের। জলপথে যেতে যেতে একদিন তিনি নৌকোর এক মাঝিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গতকাল ধরা বড়ো মাছটা তোমাদের কেমন লাগল?’ রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন জমিয়ে রান্না করা হয়েছে, খাওয়াও হয়ে গিয়েছে। তাঁর ধারণা যে ভ্রান্ত একটু পরেই বুঝতে পারেছেন, প্রিয় ভৃত্য বনমালী জানিয়েছে, মাছটা দিব্যি জ্যান্ত আছে। সঙ্গে থাকা সুধাকান্তবাবু এক কাণ্ড করেছেন। মাছের কানকোর ফাঁক দিয়ে একটা সরু দড়ি ঢুকিয়ে তার গলায় বেঁধে নদীতে ছেড়ে দিয়েছেন। লম্বা দড়ি, দড়ির এক দিক বোটের সঙ্গে বাঁধা আছে। এসব বলেই বনমালী থামেনি, কবিকে আশ্বস্ত করেছে, মাছটা জ্যান্তই আছে, দড়ি ধরে টানলেই ঘাই মারছে।
সেকথা শুনে রবীন্দ্রনাথ সেদিন খুব রেগে গিয়েছিলেন তিরস্কার করে বলেছিলেন, ‘একি করেছিস, এ নিষ্ঠুরতা কেন, জল হল মাছের রাজ্য, তার রাজ্যেই তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিস, যা এখনই ওটাকে ছেড়ে দে, আর না হয় তো কেটেকুটে খেয়ে ফেল। একটা জীবকে কষ্ট দিয়ে এ কেমন আনন্দ।’ কবির কথা শিরোধার্য। তিনি ছেড়ে দিতে বলেছেন, নয়তো মাছটাকে কষ্ট না দিয়ে রেঁধে খেয়ে ফেলতে বলেছেন।
ছাড়া হয়নি, কবির দ্বিতীয় পরামর্শ গৃহীত হয়েছে। আর বিলম্ব নয়, তখনই মাছটাকে জল থেকে তুলে কেটেকুটে রান্নার ব্যবস্থা করেছে নৌকোর মাঝিমাল্লারা। রবীন্দ্রনাথ মাছ-মাংস-ডিম সবই খেতেন। মাঝিরা আনন্দ করে সেদিন মাছ রেঁধেছিল বটে, রবীন্দ্রনাথ সে মাছ খাননি। ওইভাবে জলে জিইয়ে রাখার ফলে আহা বেচারার খুব কষ্ট হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের এমনটি মনে হয়েছিল। অন্যদিন মাছ খেলেও সেদিন ছুঁয়েও দেখেননি। কষ্ট পাওয়া মাছটার জন্যও কবির মন কাতর হয়েছিল। এমন কাতরতা ক-জন দেখাতে পারেন!
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com