শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
এত কাণ্ডের পরেও গৌরী খেলতে যাচ্ছে। ওকে ঘিরে অত হইচই, পিটুনি, আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বুদবুদের মতো মিশিয়ে দিল হাওয়ায়। প্রথম দুটো দিন ভিজে বেড়াল। আস্তে আস্তে স্বরূপ ধারণ। নিজের মতো গুছিয়ে সে এখন হাডুডু খেলায় ব্যস্ত।

হা-আ-আ-ডু-ডু-ডু-ডু। জেলেপাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ক্রীড়া প্রমত্ত গৌরী। ফুলদিকে নিয়ে চিন্তিত সুধা এখন আর তাকে একা ছাড়ে না। নিতান্ত অনিচ্ছায় সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে চটি ধরে বসে থাকে। ফুলদি সে-দিন একখানা চটি হারিয়েছে। এটা নতুন। সুন্দরদা কলকাতা থেকে কিনে এনেছে। খেলার মাঠে তার ফুলদিই সবচেয়ে যোগ্য এবং শক্তিশালী খেলোয়াড়। সুধা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে দেখে। দু’ দলে ভাগ হয়ে গিয়েছে ওরা। একদিকে মেয়েদের দল। ওদিকে ছেলেদের। পারছে না! পারছে না! ফুলদির দম আর স্পিডের কাছে ওরা হেরে ভূত।
দুটো গেম শেষ হতেই ছেলেদের মাথায় কুবুদ্ধি। সুধার দিকে ঘুরেছে চোখ। ছেলেদের বদবুদ্ধি মুহূর্তে টের পেয়েছে সুধা। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে এতটুকু। ফুলদির ছেড়ে যাওয়া জুতোজোড়া আর একটু আঁকড়ে অন্যদিকে তাকিয়ে। একটা ছেলে গৌরীর দিকে ধেয়ে গেল।
—এ গোরী হবেক লাই। তোর বোনকেও লিতে হবেক।
এই প্রথম গৌরীর থমকে যাওয়া মুখ। অপ্রস্তুত চাহনি। বোনকে নিলে পরাজয় নিশ্চিত। চেঁচায় তাড়স্বরে—অ্যাই ছোঁড়া চোট্টামি রাখ। খেলার গোড়ায় ক’স নাই ক্যান? আমার বোন খেলব না। আইজ তো নয়ই।

তিরকুটে ছেলেটা তেড়ে এসেছে।
—আইজ বললে হবেক লাই। কুনোদিনও ওকে খেলতি দেখি নাই। উয়াকে না নিলে আমরা খেলবক লা।
হইহই বেঁধে গিয়েছে। জেলে বস্তির ছেলেদের জোর বেশি। এরিয়া ওদের। মেয়েদের দলেও ভাঙন। গৌরী চটে আগুন। সহজে ছেড়ে দেবার পাত্রী সেও নয়। এমনিতে ফ্রক কমই পরে। লম্বা ইজেরের ওপর চড়িয়ে নেয় মণি বা রাম দাদার হাঁটু পর্যন্ত ঝোলা হাওয়াই শার্ট। অতগুলো ছেলের ভিড়ে দৌড়ে ঢুকে গিয়েছে। জামার আস্তিন গুটোনো।
—অ্যাই শুয়ার, ত’রা জানস না আমার বুন দুধ ভাত। অরে খেলায় নেওয়া মানা। অর শরীল দু’বলা! আমার লগে খেলতে ডর লাগে তাই চুয়াররা কইছে বুনকে না নিলে খেলবক লাই, কত্ত সাহস!
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৩: ডায়মন্ড হারবার, গৌরীর হারিয়ে যাবার দিন

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৮ : কুহক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৫: পোষা হরিণকে সাঁওতালপাড়ায় মারা হয়েছিল তির ছুঁড়ে

সুধা ভয় থরথর করে কাঁপছে। তার ফুলদি এসব গালি শিখল কোথায়! মা জানলে কি মারটাই যে খাবে! এদিকে ঝগড়া পেকে উঠেছে চূড়ান্ত। ফুলদির ভেঙচি কাটা মারমুখী মূর্তি দেখে খানিক পিছিয়ে গিয়েছে জেলে বস্তির ছেলেরা। এখন দু ‘একদিন কথা বন্ধ থাকবে। চলবে মুখ বাঁকাবাঁকি। তারপর বুড়ো আঙুলে বুড়ো আঙুলে ঠেকিয়ে ভাব হয়ে যাবে। সব জানে সুধা।ঝগড়ার পর পরিবেশ থমথমে। গৌরী ময়দান ছেড়ে চলে এসেছে বোনের কাছে। হাত ধরে টেনে তুলেছে।
—উঠ সুধা, উঠ, ছোটলোকগুলার সঙ্গে আমরা কোনোদিন খেলুম না। চল পেয়ারা গাছে চড়ি।

বুকটা ধরাস করে উঠল সুধার। একের পর এক দুঃসাহসী অভিযান। হাডুডু দলের মারপিট শেষ হতে না হতেই পেয়ারা গাছের মগডালে চড়া। অগত্যা চলল ফুলদির পেছু পেছু। মরমে মরে যাচ্ছে। ওরই অযোগ্যতার খেসারত দিতে ফুলদিকে ক্রীড়াঙ্গণ ছাড়তে হল।
ফলবতী পেয়ারা গাছ। ডাঁসা সবুজের সমাহারে জিভে জল আসে। কিন্তু এত উঁচু যেন আকাশের সঙ্গে লেগে। সুধা কাঁপা গলায় সাবধান করে।
—পারবিনা ফুলদি, চড়স না। পইড়্যা গ্যালে হাড়গোড় ভাঙবো।
—খাড়া তো মাইয়া, ভিতুর ডিম।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩১: সুন্দরবনের এক অনন্য প্রাণীসম্পদ গাড়োল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪২: রামায়ণে মহর্ষি অগস্ত্যের তপস্যালব্ধ শুভশক্তির আবেদন চিরন্তন

ইতিমধ্যে গৌরী চটি খুলে ফেলেছে। শার্টের বোতাম পটাপট খুলে ধরিয়ে দিয়েছে সুধার হাতে। হাঁ হাঁ করে উঠছে সুধা।
—আরে করো কী, করো কী। জামা খোলস ক্যান? বোঝস না হাঁদারাম, জামাটারে ঝুলি বানা, পেয়ারা ছুঁড়লে ভরবি।
গাছ বেয়ে তর তর করে উঠে যাচ্ছে ইজের পড়া উদলা গা ফুলদি। অসহায় সুধা আকস্মিক
বিস্ময়ে বাক্যহারা। জামার কোচড় রেডি করে বুক ঢিপঢিপিয়ে দাঁড়িয়ে। একটু পরেই শুরু হয়েছে পেয়ারা বৃষ্টি। মগডালে চেপে গৌরী পেয়ারা ফেলছে। দু’চারটে গড়িয়ে যাচ্ছে এদিক ওদিক। গৌরী উপর থেকে চেঁচাচ্ছে।
—আইচ্ছা গাধা তো, এই কামডাও ঠিক মতনপারে না!
সুধা ওপর দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে গৌরীকে নীচে নেমে আসবার জন্য আপ্রাণ অনুরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।
—অ ফুলদি আমার মাথা খা, নাইম্যা আয়। আমার দিব্যি, ক্যান নামিস না। সন্ধ্যা নামছে। ম্যাঘ ঘনাইছে। অ ফুলদি, গাছের মাথায় দত্যি আছে, ব্রহ্মদত্যি।
ব্রহ্মদৈত্যের কথাটা আগে ভেবে দেখা হয়নি। এদিকে ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছে সন্ধ্যে। ফল্গুর বালিতে কেমন গরম হাওয়া উঠেছে। পাশের শিমুল গাছে হঠাৎই ধবধব করে ডানা ঝাপটা দিয়ে একটা ভয়ালমুখো শকুন কোটর থেকে বেরিয়ে এলো। এ মগডালে গৌরী, ওই মগডালে শকুন। স্থির অপলক চোখে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৯

দশভুজা, অন্য লড়াই: এই স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করিনি

মেরুদণ্ড চুঁইয়ে আতঙ্ক নামছে। গলাটা কেন যেন কেঁপে গেল সুধাকে ডাকতে গিয়ে। শকুনের দিক থেকে চোখ ফেরালে যদি ঝাঁপিয়ে আসে। সন্তর্পণে শব্দহীন সরীসৃপের মতো গাছ বেয়ে নেমে আসছে গৌরী। এদিকে হাওয়া বাড়ছে। গম্ভীর টানা শঙ্খ ধ্বনির মতো হাওয়ায় যেন দৈত্যের গর্জন। নামতে গিয়ে বুঝতে পারছে অন্ধকার হাতড়ে নেমে আসাটা কি কঠিন! পা ছড়ে গেল। নরম চামড়ায় রক্তের আঁচড়। নীচে জমাট কালো ঝড় উঠেছে। কাছেই সমুদ্র। সমুদ্রের নাভি থেকে জলোচ্ছ্বাসের মতো হাওয়ার স্রোত আছড়ে পড়ছে চারপাশে। আদিগন্তে ঢেউ তুলছে বিপুল বৃক্ষ দল।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৭ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: দেখা হবে চন্দনের বনে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৬: সেফ শেলটার

গাছ থেকে নামতেই সুধা গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিয়ে বলে
—ফুলদি জামাখান গায়ে তোল। পেয়ারা-সহ আমরা চলতে পারুম না।
থমকে দাঁড়িয়ে বোনের কথাকে মান্যতা দিল গৌরী। পেয়ারাগুলো দূরে ছুঁড়ে ফেলল। জামা গলিয়ে দু’হাতে দু’জনে গোটা ছয়েক পেয়ারা নিয়ে এবার উর্ধ্বশ্বাসে ছুট ছুট ছুট। সুধা গৌরীর সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে কেন!
—পারস না! অ সুধা, পারস না ক্যান?
—ফুলদি রে চিনতে পারবি তো?
কান্নার ধাক্কায় সুধার গলা বুক বুজে যাচ্ছে।
—আরে হ রে মাইয়া দৌড়া। চিনতে পারব না ক্যান, ওই তো আমাগো জেলেপাড়া, হুই দূরে ফটিকপাড়া, দেখস না!—চলবে।

* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content