সম্ভবত ২০২০ সালের কথা। সেই বছর ২০ মে আমফান সাইক্লোন হয়েছিল। আবার তখন করোনা অতিমারি চলছে। স্কুল বন্ধ। হাতে অঢেল সময়। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের ঘটনা। কনকনে শীত। সেদিন জলখাবার খেয়ে সকাল দশটা নাগাদ আমার বাহন সাইকেলটিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম ঘন্টা দেড়-দুয়েকের নিরুদ্দেশ যাত্রায়। কাকদ্বীপ শহর থেকে বেরিয়ে মুড়িগঙ্গা নদীর তীর বরাবর দক্ষিণে কিছুদূর এগিয়ে যাব—এই ছিল উদ্দেশ্য। তারপর দুপুরের আগেই ফিরে আসব বাড়িতে। বেশ কিছুটা পথ ধীরগতিতে সাইকেল চালিয়ে ময়নাপাড়ার কাছাকাছি পৌঁছে চোখটা আটকে গেল ডানদিকের একটা জমিতে। ওই জমিতে কিছুদিন আগেই ধান কাটা হয়েছে। ফলে মাঠভর্তি বড় বড় নাড়া। জমির এক প্রান্তে রাস্তার দিকে একটা ছোট ডোবা। গ্রামের ভাষায় এমন ছোট ডোবাকে বলে চৌকো। সেখানে হোগলাসহ আরও নানান জলজ আগাছা জন্মেছে। খুব বেশি জল নেই সেই চৌকোতে। আর সেই চৌকোর পাশেই সম্ভবত একটা ইউক্যালিপটাস গাছ উপড়ে পড়ে আছে। মনে হয় আমফানের সময় গাছটা উপড়ে পড়েছিল। তারপর শুকিয়ে গেলেও কেউ গাছটাকে সরিয়ে নেয়নি। চোখটা আটকে গেল ওই গাছে। একটা অদ্ভুত পাখি ওই গাছের ওপর বসে বিচিত্র শব্দ করে ডাকছে, যেন বলছে ‘চেকু চেকু চেকু চেকু চেকু চেকু’। লক্ষ্য করলাম শব্দ করার সময় অস্বাভাবিক লম্বা চঞ্চুটা ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। আর প্রতিটা ‘চেকু’ শব্দের সাথে ছোট্ট লেজটা উপরে উঠছে এবং গলা সামান্য ফুলে উঠছে। তাছাড়া এমন পাখি আমার নজরেও কখনও আসেনি। দূর থেকে মোবাইল ক্যামেরায় ছবি তুললাম বটে কিন্তু স্পষ্ট হল না। আর একটু এগোতেই পাখিটির নজরে পড়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গেই সে ফুরুৎ করে উড়ে বেশ কিছুটা দূরে ওই মাঠের আল পেরিয়ে দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেল।
সাইকেলটা রাস্তার পাশে একটা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে আল ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলাম যদি আরও দু’একটা ওই পাখি দেখা যায়। কিছুটা এগোতে ওই মাঠের উল্টো দিকের মাঠে একই রকম কিন্তু আকারে কিছুটা বড় একটা চৌকো নজরে এল। তাতে মনে হল জল একটু বেশি আছে, পাড়ের দিকে সামান্য কচুরিপানা রয়েছে, আর ঘাসের পরিমাণও তুলনামূলক ভাবে কম। একটু কাছাকাছি হতেই দেখলাম একটা পাখি জলের মধ্যে লম্বা চঞ্চু ডুবিয়ে খাবার খুঁজছে। থমকে গেলাম। একই পাখি। আপন মনে জলকাদার মধ্যে চঞ্চু ডুবিয়ে খাবার খুঁজছে। তবে ধরনটা একটু আলাদা। কাদার মধ্যে চঞ্চুটাকে অন্যান্য জলচর পাখিদের তুলনায় একটু বেশি সময় ধরে রেখে খাবার খুঁজছে। মনে হচ্ছিল কাদার মধ্যে দিয়ে চঞ্চুটাকে ঠেলে কিছুটা সামনে নিয়ে যাচ্ছে। পরক্ষণেই চঞ্চুটাকে জলের উপর তুলে নিচ্ছে। তারপর আবার একইভাবে খাবার খোঁজার পালা। বার দুয়েক ব্যর্থ হওয়ার পর কিছু একটা খাবার পেয়েই চঞ্চুটাকে তুলে টুক করে গলায় চালান করে ফের খোঁজাখুঁজি। খাবার খোঁজার ধরনটা দেখে আমার কেন জানি না বুকে স্টেথোস্কোপ ঠেকিয়ে ডাক্তারের শ্বাস পরীক্ষা করার দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল।
ডাক্তারবাবু স্টেথোস্কোপের চেস্টপিস বুকের উপর এক জায়গায় কয়েক সেকেন্ড চেপে ধরে আবার পাশের একটা জায়গায় সরিয়ে নিয়ে চেপে ধরেন। এইভাবে বুক আর পিঠের নানা জায়গায় চেস্টপিসকে থমকে থমকে সরান। আর কোথাও সন্দেহজনক কিছু বুঝলে একটু বেশি সময় সেখানে চেস্টপিস ঠেকান। পাখিটাও তার চঞ্চুকে সামনে বামে ডাইনে জল কাদার মধ্যে সরিয়ে সরিয়ে খোঁচা দিচ্ছিল। আবার কোথাও চঞ্চুটাকে একটু বেশি সময় চেপে ধরেও খোঁচা দিচ্ছিল। ব্যাপারটা দেখতে আমার বেশ লাগছিল। ছবি তোলার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। তারপর যখন হুঁশ এল পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে তাক করতে যাব ঠিক সেই সময় ওর নজরে পড়ে গেলাম। ভগ্নাংশ সেকেন্ড মাথা তুলে আমাকে দেখল। আর তারপর ডানা মেলে উড়ে গেল আগেরটি যেদিকে পালিয়েছিল সেদিকে। ওড়ার গতি বেশ দ্রুত। আর সোজা না উড়ে যেন ডাঁয়ে বাঁয়ে বেঁকে উড়ল। যখন উড়ে গেল তখন মনে হল পেটের রং সাদা আর ডানার নিচের রং ধূসর।
পাখিটাকে বেশ ভালভাবেই লক্ষ্য করেছিলাম। মাথার মাঝখান আর দুই চোখ বরাবর মোট তিনটি লম্বা সাদা ডোরা চঞ্চুর গোড়া থেকে মাথার পিছন দিক পর্যন্ত বিস্তৃত। চোখের নিচেও রয়েছে প্রায় অনুরূপ একটি সাদা ডোরা দাগ। তারপর পিঠ ও ডানার উপরেও রয়েছে একই রকম লম্বা ডোরা দাগ। ডোরা দাগ বাদ দিলে পেট বাদে সারা গায়ে সাদা ও গাঢ় বাদামি বা খয়েরি ছোপ। ডানার রং অপেক্ষাকৃত বেশি গাঢ়। লেজটা ছোট। আর ডানার প্রান্তে পেছনদিকে ছোপবিহীন কয়েকটা বাদামি পালক। তবে উল্লেখযোগ্য হল চঞ্চু। দেহের তুলনায় চঞ্চুটা অনেক লম্বা এবং সরু ও সোজা। চঞ্চুর রং কালো। কাদাখোঁচা লম্বায় প্রায় ২৫ থেকে ২৭ সেন্টিমিটার আর চঞ্চুর দৈর্ঘ্য ৫.৫ থেকে ৭ সেন্টিমিটার।
খাবার সন্ধানের জন্য এদের চঞ্চুর আগা নাকি ভীষণ সংবেদনশীল। চঞ্চু অনেকটা লম্বা হলেও দুটো পা কিন্তু অপেক্ষাকৃত ছোট এবং পায়ের রং সবজে ধূসর। প্রায় সারা দেহজুড়ে কালো, বাদামি ও সাদা ছোপ ওদের জলাভূমি ও ঘাসের মধ্যে শত্রুর থেকে দৃষ্টি আড়াল করতে খুব সাহায্য করে। আর ওরা এই যে ডাঁয় বাঁয় বেঁকে ওড়ে এতে ওদের কোনও খাদক পাখি ওদেরকে ধরতে পারে না। পরে অবশ্য এদের বকখালিতে গিয়েও দেখেছি। আরও অনেক জলচর পাখির সাথে ওরা খাবার খুঁজছিল। তখন ওদের উড়ে এসে জলে নামার দৃশ্যটাও নজরে পড়েছে। জলে নামার ঠিক আগে ওরা দুটো ডানার সঞ্চালন বন্ধ করে দিয়ে অল্প কিছুক্ষণ বাতাসে ভাসে। এই সময় ওদের ছোট্ট লেজের পালকগুলোকে ফোল্ডিং হাতপাখার মতো ছড়িয়ে দেয়।
প্রথমবার যখন দেখেছিলাম তখন ওদের শনাক্ত করতে পারিনি। বাড়ি ফিরে প্রথমে সালিম আলির শরণাপন্ন হয়েছিলাম। ‘বার্ডস অফ ইন্ডিয়া’-র বাংলা সংস্করণ “সাধারণ পাখি” খুঁজে তেমন কিছু পাইনি। অগত্যা স্টুয়ার্ট বেকারের বই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি। হ্যাঁ, পেয়ে গেলাম। জানলাম ইংরেজিতে এরা হল ‘Common Snipe’ বা ‘Fantail Snipe’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Gallinago gallinago’। ইংরেজিতে ‘Fantail’ বলার কারণটাও মালুম হল, ওই যে উড়ন্ত অবস্থা থেকে অবতরণ করার সময় লেজটা ফোল্ডিং হাত পাখার মতো খুলে যায় বলে। বাংলা নামটাও জানলাম। এদের বলে কাদাখোঁচা। এই নামটার কারণও বুঝে গেলাম। বাংলা নামটা দেখেই মনে হল সাধারণ পাখি বইতে এই নামটা দেখেছি। ফের “সাধারণ পাখি” বইটাতে খুঁজলাম। দেখি বাংলা নাম একই হলেও ইংরেজিতে অন্য নাম রয়েছে, আর বর্ণনার সাথেও মিলছে না। মনে হয় বাংলা নামের ক্ষেত্রে অনুবাদের সময় কোনও গোলমাল হয়েছে। সে যাইহোক ইংরেজি বইয়ের বর্ণনা থেকে নিশ্চিত হলাম যে এই পাখি হল কাদাখোঁচা।
কাদাখোঁচাদের প্রধান খাবার হল কেঁচো। খুব ভালোবাসে কেঁচো খেতে। তাই এদের ধান জমিতেও দেখা যায়। আমার প্রথম দেখা তো ধান জমিতেই। কেঁচো ছাড়াও বিভিন্ন মাছির লার্ভা, অন্যান্য পোকামাকড়, শামুক, ছোট চিংড়ি, ছোট কাঁকড়া ইত্যাদি এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে। আবার কখনও কখনও বিভিন্ন উদ্ভিদের বীজ ও নরম উদ্ভিদ খেয়ে থাকে।
কাদাখোঁচা পাখিদের পরিযায়ী পাখি বলেছেন পক্ষিবিদ স্টুয়ার্ট বেকার। তাঁর লেখা “The Fauna of British India, Including Ceylon and Burma: Birds” বইতে বলা হয়েছে এরা উত্তর ও উত্তর মধ্য ইউরোপ থেকে সাইবেরিয়া – এই অঞ্চলে বসবাস করে। আর আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস জুড়ে এরা ভারত ও শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে পরিযান করে।। নিশ্চিতভাবে সুন্দরবন অঞ্চল এদের খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য উপযুক্ত এলাকা আর তাই এই অঞ্চলে এদের যথেষ্ট পরিমাণে আজও দেখতে পাওয়া যায়। তবে বিভিন্ন পক্ষিপ্রেমীদের লেখা থেকে আমার ধারণা সমস্ত কাদাখোঁচা পাখিরা তাদের প্রজননভূমিতে ফিরে যায় না। তাই সারা বছরই অনেক প্রকৃতিপ্রেমী সুন্দরবন অঞ্চলে এদের দেখা পেয়ে যান।
কাদাখোঁচা পাখিদের প্রজননকাল হল মার্চ থেকে জুলাইয়ের শেষের দিক। একটি পুরুষ ও স্ত্রী কাদাখোঁচার জোড় বছরে দু’বারও প্রজনন করতে পারে। প্রজনন ঋতুতে স্ত্রী কাদাখোঁচার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য পুরুষ কাদাখোঁচা দারুণ অঙ্গভঙ্গি ও শব্দ করে। প্রথমে এরা সাঁ করে উপরে উঠে যায়, তারপর নিচের দিকে ঝাঁপ দেওয়ার ভঙ্গিতে নেমে আসে। এই সময় এদের লেজের পালক হাতপাখার মতো খুলে দিয়ে এমনভাবে নাড়ায় যাতে ঢাক পেটানোর মতো আওয়াজ হয়। এটাই হল স্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের কৌশল। জলাভূমির কাছাকাছি মাটির উপর ঘাসের মধ্যে সামান্য গর্ত করে তার মধ্যেই স্ত্রী ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার আগে স্ত্রী ও পুরুষ মিলে ঘাসগুলোকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে বাসাটাকে মনোমতো তৈরি করে নেয়। সাধারণত চারটে ডিম পাড়ে। ডিমের রঙ হালকা হলুদ বা হালকা সবুজ। আর ডিমের ওপরে হালকা বাদামি রঙের ছিট দেখা যায়। এই ধরনের রঙ হওয়ায় ডিম শত্রুর দৃষ্টিকে ফাঁকি দিতে পারে। বাবা ও মা পাখি পালা করে ডিমে ১৮ থেকে ২১ দিন তা দেয়। কোথাও কোথাও স্ত্রী পাখি বেশি সময় তা দেয়, আর তখন পুরুষ পাখির পাহারার দায়িত্ব থাকে। বাচ্চাদের বয়স ১০ থেকে ২০ দিনের মধ্যে হলে তারা উড়তে শেখে।
শীতের সময় সুন্দরবন অঞ্চলে কাদাখোঁচাদের জলাভূমির আশেপাশে বা সমুদ্র ও নদীতীরবর্তী অঞ্চলে এখনও যথেষ্ট পরিমাণে দেখা যায়। আই.ইউ.সি.এন তালিকাতেও এরা বিপন্ন নয় বলা হয়েছে। তবে অতীতে এদের খুব সহজে গুলি করে শিকার করা হত বলে জেনেছি। এখনও চোরাগোপ্তা হয় কিনা জানি না। তাছাড়া সুন্দরবনের পরিবেশও ক্রমশঃ বদলে যাচ্ছে উন্নয়নের চাপে। তাই কাদাখোঁচাদের সুন্দরবনে আরও বেশি দিন বেশি বেশি করে দেখতে হলে সুন্দরবনকে রক্ষা করতেই হবে।—চলবে।
● সব ছবি ছবি সংগৃহীত।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com