সোমবার ৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
গৌরী গাট্টাগোট্টা। খেলাধুলা করা শক্তিশালী শরীর। সুধার চেয়ে বছর তিনেকের বড়। দেখে মনে হয় অনেক বেশি। আর সুধা তুলতুলে পুতুল। গড়নটিও ছোট্ট, পাতলা। ওর দাদারা আদর করে ওকে পুতলি ডাকে। গৌরীকে পাওয়া যাচ্ছে না অনেকক্ষণ। বাড়ির হাজার কাজে বড়রা ব্যস্ত। কিন্তু সুধা ঠিক নজর রেখেছে। বলে—
—ফুলদিরে তো দেখছি নাই।
আঁতকে ওঠেন সুনীতি, ক’স কী, অ গোরা। হায় কপাল। গোরা কই, অ শঙ্কু দেখ, সে ডানপিইট্টা কোন আদার বাদার ঘুরে।
গৌরী সত্যিই বাদার ভেঙে দৌড়োচ্ছে। ডায়মন্ড হারবার নতুন জায়গা। ছুটে ছুটে নিজের মনে ও স্থান পরিদর্শন করছে। চিনে নিতে চাইছে চারপাশ। শুনশান উদোম বিল, ধুধু মাঠ। মাঠে বিলে চড়ে বাড়ানো ধুঁকো বকের দল। বিলের দূরান্ত ঘেঁষে জেলে বস্তি। বস্তির উঠোনে পেতে রাখা ঢাউস মাছের জাল। মজা হচ্ছে ওর। গৌরীর বয়সী বা একটু কম বয়সী ছেলে মেয়েরা সব রাস্তায় অলিতে গলিতে খেলে বেড়াচ্ছে। এদের বেশির ভাগই ওর সাগরেদ।

কী করবে, খেলা শুরু করবে, নাকি এখন থাক, বাড়িতে না বলে এসেছে, তার চেয়ে বরং মোহনা ঘুরে ফিরে যাবে আজ। নোনা জলের গন্ধ, ওই যে দূরে নীলের ঢেউ। ছুটছে গৌরী। পরম আনন্দে। পা দুটো ব্যথা করছে। বালির ঢিবিতে বসে পড়ল। আহা, সুন্দর, ছবির মতো চারপাশ। সামনে জল, ওপরে আকাশ। ফুরফুরে হাওয়া। মাথার উপর পাক খাওয়া গাঙচিলের দল। ঝুপঝাপ শব্দ। চিলেরা ডুব দিয়ে চান করছে। কী মজা! গৌরী ও পারে। সাঁতার কেটেই ওর দিন কেটে যেতে পারে। সুধা পারে না। ওর কলকাতা মন। হাঁড়ি কুরি খেলনা পুতুল, একলসেরে ঘরকুনো মেয়ে একখানা। যা পারে করুক।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১২: এ দিন যাবে, রবে না

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৭ : রাজা সাজা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪১: যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের সিদ্ধান্তে কেন কৃষ্ণের অনুমোদন প্রয়োজন?

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৬: বক্সনগরে আবিষ্কৃত হয়েছে বৌদ্ধ স্তুপ, চৈত্যগৃহ ও একটি মঠ

গৌরী এবার উঠবে। নয়ত মায়ের হাতে খুন্তি পিটুনি। এতক্ষণে চমকে ওঠে। সর্বনাশ! চিনতে পারছে না। ছুটে ছুটে চলে তো এসেছে বহুদূর। পথের নিশানা করেনি! এধার ওধার ছুটোছুটি করলো খানিকক্ষণ। আচ্ছা সামনের ওই নালাটা কি পার হয়েছিল? সামনে কাকচক্ষু জল। অনেকক্ষণ ধরে জলতেষ্টা পেয়েছে। মুখ নিচু করে দু’ আঁজলা জল ভরে খেয়ে তবে শান্তি। না কোথাও কিছু চেনা নজরে আসছে না তো, সুন্দর বিলটা কোথায় গেল কোথায়? জেলে বস্তির অস্তিত্বই তো নেই চারপাশে, বালিয়াড়ির মধ্যেখানে একলা গৌরী যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে বুঝলো, ও হারিয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩০: কাদাখোঁচা

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৮: আকাশ এখনও মেঘলা

এবার শুরু হল কান্না। আপন মনে বিন বিনিয়ে। কাঁদতে কাঁদতে ছুটছে গৌরী। সুধা মায়ের পাশে কি সুন্দর আছে। নিজের ওপরে এখন যথেষ্ট রাগ ধরছে। তার অমন শান্ত সুন্দর মা যে মধ্যে মধ্যে ওকে শুধু গালাগালি করে ‘বান্দর’ বলে, যেটা একশো ভাগ ঠিক। হেঁটে হেঁটে পায়ের শক্তি শেষ বুঝতে পারছে। ও চলছে উল্টো পথে। ক্রমশ এগিয়ে আসছে নীল। দু’ধারে কেমন নিবিড় হয়ে আসছে ঝোপ। দিনের তাপ বাড়ছে। খিদেয় নাড়ি ভুঁড়ি হজম হওয়ার উপক্রম। কোথায় যাবে গৌরী। বাঁদিকে গাছপালা শেষে ওটা কি একটা গুহা! জলের ধারে ভিজে শ্যাওলা ধরা পাথরের গুহা! তার পিছন সবুজ অন্ধকারে একটা যেন জাদুকরের আস্তানা। হিমভয় শিরদাঁড়া বেয়ে ওঠানামা করছে। ওই আশ্চর্য গুহা যেন ছায়া হাত বাড়িয়ে গৌরীকে ডাকছে। গুহার ভিতরের অন্ধকার টা হাসছে খল খল করে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৫: জরুরি একটি ফোন

পিতার ঔজ্জ্বল্য কখনও ম্লান হয়নি পুত্রের খ্যাতিতে

ওই তো দূরে একটা লোক সমুদ্র পারের রাস্তা ধরে সাইকেল চেপে আসছে। দু’ হাত তুলে হাত নাড়ছে গৌরী—
খাড়াও খাড়াও…।
সাইকেল কাছে আসে। লোকটা সুন্দর দেখতে। অবাক চোখে বলে,
—কে তুমি এখানে কী করছো?
—আমি হারায়ে গেছি। আমারে বাসায় পৌঁছে দ্যান
লোকটি হাসে।
—কোথায় তোমার বাড়ি?
সমুদ্রের বিপরীতে যতদূর হাত যায় তুলে বলে,
—হুই দূরে।
—দূরে আবার কী, ঠিকানা বল।
—জানি না ঠিক মতন।
—সে কি, বাবার নাম?
—আদিনাথ দাশগুপ্ত। আসলে আমরা গত মাসে আইসি কিনা, কইলকাতা থিক্যা।

লোকটা চোখ কপালে তুলে চুপ করে যায়। কিছুক্ষণ ভেবে বলে—
—বস, আমার সাইকেলের পিছনে, ঠিক করে সিট ধরে বসবে, যেন পড়ে না যাও।
ঝিল বিল ডাইনে বাঁয়ে ফেলে দিগন্ত জোড়া মাঠ আর সাগর পেছনে রেখে সাইকেল ছুটল সাঁই সাঁই। সাইকেলের ঘন্টি শুনে নির্জন বাঁধের ধারের অজস্র লাল কাঁকড়া ঢুকে পড়ল বালির গর্তে। কথা চলছে টুকটাক। লোকটা গৌরীর নাম জিজ্ঞেস করল। গৌরীও প্রশ্ন করেছে—
—আপনের নাম খান?’
—টুলু।
—হি হি হি হি।
—কী হল, হাসছ কেন?
—টুলু আবার কোনও বড় মানুষের নাম হয় না কি!
আমাগো দাদাদের কত্ত বড় বড় নাম, ধ্রুবতোষ দাশগুপ্ত, দেবব্রত দাশগুপ্ত, প্রিয়াংশু দাশগুপ্ত।
—আমারও নাম আছে। ভালো নাম।
—তয় শুনি।
—আমার নাম রঞ্জন মজুমদার।
—এইতো সোন্দর নাম, কিন্তু টুলু দাদা আমাগো।
বাড়ি এহন ও আসে না ক্যান?
—তুমি ঠিকানা বলতে পারছ না, আমিও তোমাদের চিনি না, তাই আগে চল আমাদের বাড়ি, তারপর সেখান থেকে যাওয়া যাবে।
গৌরী হঠাৎ চেঁচায়, বুঝছি বুঝছি। এইবার চিনছি।
টুলু দাঁড়ায়।
—কোথায়?
—এই যে খালপারের জেলে পাড়া আর ওধারে গঞ্জের দোকানপাট ছাড়ায়্যা আমি হারাইছিলাম। এর ধার ঘেইস্যা উই ডাইন দিকে খানিক আগান, আমাগো বাসা ওই স্থানে।

বাড়ির সামনে ততক্ষণে ছোট জটলা। বেশ কয়েকজন প্রতিবেশী চিন্তিত মুখে কথা বলছেন। আদিনাথ লাঠি হাতে রাস্তায় পায়চারি করছেন। খুকু গেটের কাছে হা ক্লান্ত মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে। হঠাৎই কোনও এক আগন্তুকের সাইকেলে চেপে মূর্তিমতীর আবির্ভাব। খুকু চেঁচিয়ে উঠল, মা মাগো গৌরী আইছে।

আদিনাথ লাঠি নিয়ে দ্রুত পায় এগিয়ে আসেন।
—আইজ ত’রে মাইরাই ফেলাইমু।
সুনীতিও ছুটে এসেছেন। কান মলে একটি চড় কষিয়েছেন। খুকু বোনের ওপর দুশ্চিন্তার তাপ ঝাড়তে গিয়ে হঠাৎই খেয়াল করে অচেনা সাইকেল আরোহীকে। ফিসফিস করে মাকে কিছু বলে। সুনীতিও ভাবছেন। দাঁড়ানো প্রতিবেশীরা অনেকেই ছেলেটির সঙ্গে চেনা সুরে কথা বলছে। মারের ভয়ে গৌরী এখন তাড়স্বরে কাঁদছে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৭ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: দেখা হবে চন্দনের বনে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৪: কবি-কন্যার প্রিয় বান্ধবী

সুনীতি ঘোমটা টেনে এগিয়ে আসেন। বলেন, বলেন তুমি কেডা বাবা?
টুলু হাসিমুখে মোটামুটি স্পষ্ট করে দেয় বিষয়। ইতিমধ্যে মানু শঙ্কু নবীন চারপাশ থেকে ঘেমে নিয়ে হাজির। ধুন্দুমার কাণ্ডের মধ্যে সুধা হঠাৎ আবিষ্কার করে—
—অ্যাই, ফুলদি ত’র জুতা জোড়া কই?
গৌরী ধরা পড়া চোরের মতো এতটুকু মুখ নিয়ে বলে—
—তাই তো কোথায় ফেলাইলাম!
ভয়ের চোটে বলে বটে কিন্তু আসলে গৌরী জানে ওর চটি হারিয়েছে নালার ধারে, জল খাবার সময়। ভিজে যাবে বলে চটিটা ঢিবির ধারে খুলে রেখেছিল। সেখান থেকেই লোপাট হয়েছে। মানু টিপ্পনি কাটে।
—ভালোই করছস হারাইছস নয়তো ওই জুতা ত’র পিঠে আছড়াইতাম।—চলবে।

* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content