
ছবি: লেখক।
ভোরের মিঠে বাতাস তখনও রোদের গন্ধটুকু পায়নি। ডায়মন্ড হারবারে খুকুদের বাড়ির উঠোনে, বারান্দায়, টিনের চালে সবে বিছিয়ে পড়েছে মিহি কমলা আলো। খানিক আগে শুরু হয়েছে পাখালির মাতন। গুনগুনিয়ে গান ধরেছে খুকু। বুকের ভিতর এই সময় অকারণ সুখের কাঁপন ওঠে। রোজদিন। তবে আজ তো সেই আমেজ নিয়ে গড়িমসি করলে চলবে না। কাজ পড়ে আছে বিস্তর। মা গতকাল ভোরবেলা সুধাকে নিয়ে কলকাতায় গিয়েছেন। গুরুদেবের কাছে। এতগুলো মানুষের রান্নাবান্না, ঘরদুয়ার পরিষ্কার সবকিছুর দায়িত্ব একলা খুকুর। বিছানা ছেড়েই কাজে লেগে পড়েছে। উনুন নিকিয়ে ধরানো। ভাতের জল চাপিয়ে ঘরদোর মোছা। উঠোনে গোবর জলের ছড়া। তার উপর ভাইদের ডাই করা কাপড়চোপড়। চাপা কল টিপে জল তুলবার খাটনি অনেক বেশি। চৌবাচ্চার জমা জলও এখন খরচ করবে না খুকু। বাবা স্নান সারবেন। তারপরে বাকিরা। ছাড়া পোশাকগুলো নিয়ে তাই সে গেল দিঘির ঘাটে। ওখানে বসে পাড়ার বউ ঝিরা রোজই গালগল্প করে কাচাকাচি সারে। খুকুর একদম ভালো লাগেনা ওসবে যোগ দিতে। অহং এ ভারি বাঁধে। তাই পারতপক্ষে পুকুর ঘাটে যায় না খুকু। দরকার হলে জল নিয়ে আসে সুধা বা গৌরী।
খুকু ষোল পূর্ণ করে সবে সতেরোয় পা দিয়েছে। ডায়মন্ডহারবার আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ের ক্লাস নাইনের ছাত্রী। লালপাড় সাদা শাড়ি আর দুটো মোটা বিনুনি ঝুলিয়ে খুকু যখন ইস্কুলে যায় অচেনা পথচারীরাও না তাকিয়ে পারে না। কোনও সাজ নেই। একটা টিপ পর্যন্ত না। শুভ্র ত্বকের নীচ থেকে তবু জ্যোতি বেরোয়। ছেলেবেলা থেকে এমন কথাই শুনেছে ও মায়ের কাছে। বাবা নাকি তাই ওর ভালো নাম রেখেছিলেন প্রভাময়ী। ডাকেন প্রভা বলে।
নস্কর কাকিমা পুকুরের একপ্রান্ত থেকে খুকুকে ডাকছেন। ইশারায়। ভিতরটা ভয়ে থমথম করে উঠল। খুকু জানে উনি কি বলবেন। ওঁর ভাইপো নির্মলদাকে পুলিশ খুঁজছে। চোখে হালকা ব্যান্ডেজ নিয়ে সোনাদা বাড়িতে শোওয়া। বলেছিল শিয়ালদা স্টেশনে নাকি ধাক্কা লেগে একটু চোট পেয়েছে। বাবা বিশ্বাস করেননি। অপরিসীম সংকোচে মাথা নিচু করে নীরবে জল ভরতে থাকে খুকু। ওদিকে কথাবার্তা চলছে উচ্চ গ্রামে। সকলের বিরুদ্ধ কণ্ঠ কেমন একজোট। ভীষণ কান্না পাচ্ছে খুকুর। আর অসহায় লাগছে। তাড়স্বরে হাঁক দিলেন নস্কর কাকিমা—
হ্যাঁগা এই যে খুকুরানি, একবার ইদিকে এসো দিকিনি মা।
মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে পায়ে পায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে যায় খুকু। কাকিমা বলেন—
তোমার দাদা রত্নটি একন কোতায়। তিনি কি কবিতা লিকচেন না বংশি বাজাচ্চেন?
খুকু বলে, ঘুমাইতেছে।
অ, তা ভালো, উনি ঘুমুবেন, আর আমাদের ঘরের ছেলে পিলে সব হাজত বাস করবে।
জমিদারের পো এয়েচে সব। ইদিকে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।
ঠিক বলেচ দিদি। আবাগীর দল, তা এলি কেন গা নিজেদের দেশ ছেড়ে হাড় হাভাতে বাঙালের পাল সব।
নস্কর কাকিমা পুকুরের একপ্রান্ত থেকে খুকুকে ডাকছেন। ইশারায়। ভিতরটা ভয়ে থমথম করে উঠল। খুকু জানে উনি কি বলবেন। ওঁর ভাইপো নির্মলদাকে পুলিশ খুঁজছে। চোখে হালকা ব্যান্ডেজ নিয়ে সোনাদা বাড়িতে শোওয়া। বলেছিল শিয়ালদা স্টেশনে নাকি ধাক্কা লেগে একটু চোট পেয়েছে। বাবা বিশ্বাস করেননি। অপরিসীম সংকোচে মাথা নিচু করে নীরবে জল ভরতে থাকে খুকু। ওদিকে কথাবার্তা চলছে উচ্চ গ্রামে। সকলের বিরুদ্ধ কণ্ঠ কেমন একজোট। ভীষণ কান্না পাচ্ছে খুকুর। আর অসহায় লাগছে। তাড়স্বরে হাঁক দিলেন নস্কর কাকিমা—
হ্যাঁগা এই যে খুকুরানি, একবার ইদিকে এসো দিকিনি মা।
মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে পায়ে পায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে যায় খুকু। কাকিমা বলেন—
তোমার দাদা রত্নটি একন কোতায়। তিনি কি কবিতা লিকচেন না বংশি বাজাচ্চেন?
খুকু বলে, ঘুমাইতেছে।
অ, তা ভালো, উনি ঘুমুবেন, আর আমাদের ঘরের ছেলে পিলে সব হাজত বাস করবে।
জমিদারের পো এয়েচে সব। ইদিকে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।
ঠিক বলেচ দিদি। আবাগীর দল, তা এলি কেন গা নিজেদের দেশ ছেড়ে হাড় হাভাতে বাঙালের পাল সব।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৪: কথা বলা অতীত

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৭: জীবনখাতার প্রতি পাতায়

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৫: সুস্থ থাকলে কেউ কি কবিতা লেখে?

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’
খুকুর চোখ একদম ঝাপসা। এই কণ্ঠস্বর নস্কর কাকিমার নয়। অন্য অন্য কারও। একজনের নয় বহুর। সকলে একজোটে বাক্য শ্লেষের চাবুক মারছে খুকুকে। অকারণ আর অফুরন্ত। বেতস লতার মত নুব্জ আনত কিশোরী অবয়ব ঘিরে যেন সমবেত মহিলা মহলের প্রেতনৃত্য চলছে। অন্তিমে হুমকি দেন সান্যাল খুড়ি। উনি গ্রামের কত্তা মা। প্রধানের স্ত্রী। বলেন, অ্যই মেয়ে শোন, তোর মাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবি। আজই। সন্ধ্যেবেলা।
নতমস্তকে ঘাড় হেলায় খুকু। ও জানে এরা সদলবলে তার মাকে অসম্মান করবে। আর সে সমস্ত লজ্জা আর বেদনা দলা পাকিয়ে নিজের একলার বুকে চেপে রাখবে মা। পুরোটাই অব্যক্ত থাকবে। কাউকে কোনদিন জানতে দেবে না। জামা কাপড়ের বালতি হাতে পায়ে পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে খুকু। শুনতে পায়, নবাব নন্দিনী দেমাগ দেকিয়ে চলচে দ্যাকো একবার।
নতমস্তকে ঘাড় হেলায় খুকু। ও জানে এরা সদলবলে তার মাকে অসম্মান করবে। আর সে সমস্ত লজ্জা আর বেদনা দলা পাকিয়ে নিজের একলার বুকে চেপে রাখবে মা। পুরোটাই অব্যক্ত থাকবে। কাউকে কোনদিন জানতে দেবে না। জামা কাপড়ের বালতি হাতে পায়ে পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে খুকু। শুনতে পায়, নবাব নন্দিনী দেমাগ দেকিয়ে চলচে দ্যাকো একবার।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২২: সুন্দরবনের পাখি: ডোরা-লেজ জৌরালি

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১২ : স্বপ্নের নায়ক, নায়কের স্বপ্ন
নিঝুম রান্নাঘরে রুদ্ধশ্বাসে কাঁদছে খুকু আর সারছে তার বরাদ্দ কাজ। এখনই বাবা উঠবেন ঘুম থেকে। তাঁকে মুখ ধোবার উষ্ণ জল আর ত্রিফলার শরবত দিতে হবে। হাপুস নয়নে খুকু ভাত উপুড় দেয়। এমন সময় গৌরী ঘুম চোখে হাজির রান্না ঘরের দরজায়। দিদির শব্দহীন কান্না দেখেই চিৎকার শুরু করেছে।
এই দিদিরে আমারে ক তর কি হইছে, তুই কান্দস ক্যান, আমারে ক।
উত্তর না পেয়ে এক দৌড়ে উঠোনে।
ও সোনাদা, ও মনিদা, উঠ উঠ দেখ দিদি কান্দে!! দাদাদের সাড়াশব্দ না পেয়ে ছুটে আবার রান্না ঘরে।
ততক্ষণে খুকু চোখমুখ মুছে নিজেকে সামলেছে। কিন্তু গৌরীর মুখ বন্ধ হয়নি। তার সেই এক কথা।
দিদি রে আমারে ক তর কি হইছে। মায়ের তরে মন খারাপ করে? যাইতে সাধ হয় কইলকাতায়? আমারও তো হয় রে দিদি, কিন্তু সুধাটা যা সেয়ানা।
হইছে, সর্বদা মায়ের লগে লগে ঘুরতে আছে!
এই দিদিরে আমারে ক তর কি হইছে, তুই কান্দস ক্যান, আমারে ক।
উত্তর না পেয়ে এক দৌড়ে উঠোনে।
ও সোনাদা, ও মনিদা, উঠ উঠ দেখ দিদি কান্দে!! দাদাদের সাড়াশব্দ না পেয়ে ছুটে আবার রান্না ঘরে।
ততক্ষণে খুকু চোখমুখ মুছে নিজেকে সামলেছে। কিন্তু গৌরীর মুখ বন্ধ হয়নি। তার সেই এক কথা।
দিদি রে আমারে ক তর কি হইছে। মায়ের তরে মন খারাপ করে? যাইতে সাধ হয় কইলকাতায়? আমারও তো হয় রে দিদি, কিন্তু সুধাটা যা সেয়ানা।
হইছে, সর্বদা মায়ের লগে লগে ঘুরতে আছে!
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৪: রামের অমল মহিমা, অরণ্যবাসের সাধুসঙ্গ

আকাশ এখনও মেঘলা/৪০
গম্ভীর খুকু চায়ের কাপ থালায় সাজিয়ে বোনকে হুকুম দেয়, সোনাদা আর ভাইডিরে দিবি, নিজে খাবি। বার্লিটা রামকে দিবি। আমি বাবার ঘরে যাইতাছি।
দিদির এই শান্ত গাম্ভীর্যকেই সব থেকে ভয় পায় গৌরী। তার মানে ওর উপরেই রাগ করেছে দিদি। আর দুঃখ পেয়েছে অঢেল। পাবেই তো, মা নাই সব কাজ একা একা সারতে হচ্ছে দিদিকে। সত্যিই গৌরীর হাত লাগানোর কথা ছিল। যাই হোক, এবার সে সব সামলে দেবে। এক ছুটে চলে যায় জলের কলসির কাছে।
দিদি আগে জলটা আইনা থুই?
না, একদম না। কঠিন স্বরে নিষেধ খুকুর।
চমকে ওঠে গৌরী। এতটা রাগ করবার মতো তো সে কিছু করেনি। এবার ওর ছোট্ট মাথায় অন্য দুশ্চিন্তার বিদ্যুৎ খেলে।
দিদি, আমারে সত্যি কইরা একখান কথা কবি?
কী?
দিঘির ড়ে ত’রে কেউ পিটাইছে?
দিদির এই শান্ত গাম্ভীর্যকেই সব থেকে ভয় পায় গৌরী। তার মানে ওর উপরেই রাগ করেছে দিদি। আর দুঃখ পেয়েছে অঢেল। পাবেই তো, মা নাই সব কাজ একা একা সারতে হচ্ছে দিদিকে। সত্যিই গৌরীর হাত লাগানোর কথা ছিল। যাই হোক, এবার সে সব সামলে দেবে। এক ছুটে চলে যায় জলের কলসির কাছে।
দিদি আগে জলটা আইনা থুই?
না, একদম না। কঠিন স্বরে নিষেধ খুকুর।
চমকে ওঠে গৌরী। এতটা রাগ করবার মতো তো সে কিছু করেনি। এবার ওর ছোট্ট মাথায় অন্য দুশ্চিন্তার বিদ্যুৎ খেলে।
দিদি, আমারে সত্যি কইরা একখান কথা কবি?
কী?
দিঘির ড়ে ত’রে কেউ পিটাইছে?
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৫: ইন্দ্রধনু আর ‘ইন্দ্রাণী’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৪: অ্যাঙ্করেজের সঙ্গে সিউয়ার্ডকে জুড়েছে পৃথিবীখ্যাত সিউয়ার্ড হাইওয়ে
এত কষ্টের মধ্যেও খুকু হেসে ফেলে। তার একরত্তি গাট্টাগোট্টা বোন। সারাদিন হাডুডু, ডাঙ্গুলি, ব্যায়াম, লাঠি খেলা, সাঁতার নিয়ে মত্ত। হুল্লোর আর হুল্লোর। এখানকার যত কচিকাঁচা ছেলেমেয়ে সব ওর শাগরেদ। পড়াশোনাতেও ভারি আগ্রহ। নিয়ম করে বাবার পায়ের কাছে বসে অংক ইংরেজি শেখে।
গভীর ভালোবাসায় বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে হাসিমুখে খুকু বলে—
কিচ্ছু হয় নাই রে গৌরী, এমনি মাথাটা ধরছে। বড় ওস্তাদ হয়েছো না তুমি, সারাদিনডা জুইড়া কেবল পালোয়ানি!
ব্যস, আহ্লাদ পেয়ে মুহূর্তে গৌরী দিদির মাথায় উঠে গেল। বকবক করে বোঝাতে লাগল নিজের কৃতিত্বের কাহিনি। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় সে আলোচনায় উঠে এলো সুধার অক্ষমতার কথাও।
দিদি জানস গোটা পাড়ায় আমারে কি কয় ক্যাপ্টেন! সুধাটা কিচ্ছু পারে না, বিকালে মাঠে ওরে সক্কলে ‘দুধ ভাত’ ডাকে। ধাক্কা মারে। আমার সয়না দিদি! আমিও বলি ওরে না নিলে আমি খেলুম না। বাস, টিমের মুখ চুন! তখন ওরা বাধ্য হইয়া সুধারে ন্যায়। কিন্তু কি কমু দিদি, বোনটা আমার নটর নটর কইরা এদিক-ওদিক করে, লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায়!
খুকু বলে, বুঝছি বোন সবটা বুঝছি, এবার তুই থাম।
আরও কিছু বলবার ছিল গৌরীর। তবু বাধ্য হয়ে থামে। আজ আর দিদিকে সে জ্বালাতন করবে না। শুধু সুধার জন্য মনটা হঠাৎ টনটন করে ওঠে। বোনটা তার খেলাধুলা পারে না বটে কিন্তু গৌরী যখন খেলে তখন গৌরীর জামা চটি সব গুছিয়ে শিরিষ গাছের নিচে ঠায় বসে থাকে। জানে তার ফুলদি একটু অগোছালো, নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে পারেনা, খোয়া যায়, তাই ফুলদির জামা চটির দায়িত্ব সুধার। এটাই গৌরী ঠিক পারে না। এই গুছানিপনা। আর সেই কারণে মা সুধাকে বেশি ভালোবাসে। সুধা মায়ের উনুন ধরায়। গোবর মাখে। ঘুঁটে দেয়। মা যা করবে ও তাই করবে। যেন মায়ের দেহরক্ষী! অথচ দেখো পড়ায় মন নাই। বাবার ধারে কাছে ঘেঁষে না! পাঠশালায় যেতে চায় না! দাদারা ওকে তাই খুড়ি মা বুড়িমা এসব বলে ক্ষেপায়। ঠিক করে।—চলবে।
গভীর ভালোবাসায় বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে হাসিমুখে খুকু বলে—
কিচ্ছু হয় নাই রে গৌরী, এমনি মাথাটা ধরছে। বড় ওস্তাদ হয়েছো না তুমি, সারাদিনডা জুইড়া কেবল পালোয়ানি!
ব্যস, আহ্লাদ পেয়ে মুহূর্তে গৌরী দিদির মাথায় উঠে গেল। বকবক করে বোঝাতে লাগল নিজের কৃতিত্বের কাহিনি। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় সে আলোচনায় উঠে এলো সুধার অক্ষমতার কথাও।
দিদি জানস গোটা পাড়ায় আমারে কি কয় ক্যাপ্টেন! সুধাটা কিচ্ছু পারে না, বিকালে মাঠে ওরে সক্কলে ‘দুধ ভাত’ ডাকে। ধাক্কা মারে। আমার সয়না দিদি! আমিও বলি ওরে না নিলে আমি খেলুম না। বাস, টিমের মুখ চুন! তখন ওরা বাধ্য হইয়া সুধারে ন্যায়। কিন্তু কি কমু দিদি, বোনটা আমার নটর নটর কইরা এদিক-ওদিক করে, লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায়!
খুকু বলে, বুঝছি বোন সবটা বুঝছি, এবার তুই থাম।
আরও কিছু বলবার ছিল গৌরীর। তবু বাধ্য হয়ে থামে। আজ আর দিদিকে সে জ্বালাতন করবে না। শুধু সুধার জন্য মনটা হঠাৎ টনটন করে ওঠে। বোনটা তার খেলাধুলা পারে না বটে কিন্তু গৌরী যখন খেলে তখন গৌরীর জামা চটি সব গুছিয়ে শিরিষ গাছের নিচে ঠায় বসে থাকে। জানে তার ফুলদি একটু অগোছালো, নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে পারেনা, খোয়া যায়, তাই ফুলদির জামা চটির দায়িত্ব সুধার। এটাই গৌরী ঠিক পারে না। এই গুছানিপনা। আর সেই কারণে মা সুধাকে বেশি ভালোবাসে। সুধা মায়ের উনুন ধরায়। গোবর মাখে। ঘুঁটে দেয়। মা যা করবে ও তাই করবে। যেন মায়ের দেহরক্ষী! অথচ দেখো পড়ায় মন নাই। বাবার ধারে কাছে ঘেঁষে না! পাঠশালায় যেতে চায় না! দাদারা ওকে তাই খুড়ি মা বুড়িমা এসব বলে ক্ষেপায়। ঠিক করে।—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।


















