শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

নিঃশব্দ রাত—জোনাকি ঝাড়ের ম্লান আলোতে অন্ধকার যেন আরও গভীরভাবে নেমে এসেছে। প্রাচীন সেই বটবৃক্ষের নিচে, শুকনো পাতার স্তূপের উপর পড়ে কপট অভিনয় করে পড়েছিলেন স্থিরজীবী। যেন তাঁর ডানাদুটো ভেঙে গিয়েছে, পালক ঝুলে—সারা শরীরে রক্তমাখা আর কাদার দাগ; অল্প-আলোর মাঝেও তার অবস্থা ভয়ানক, করুণ দেখাচ্ছে। চারিদিকে সমবেত পেঁচার দল তাঁকে ঘিরে ধরলো — তাঁদের চকচকে নীল বা হলুদ চোখে নিষ্ঠুর কৌতূহল জ্বলে উঠছে।

স্থিরজীবীর অভিনয় করছিলেন নিশ্বাস আটকে; তিনি একবার মাথা তুলতে চাইলেন—কিন্তু শরীরে যেন তাঁর কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। তবুও যেন খুব কষ্টে শরীরের সবটুকু শক্তি জড়ো করে বেদনা ভরা কণ্ঠে ফিসফিস করে বললেন, “শোনো… শোনো আমার কথা। আমি… আমি বায়সরাজ মেঘবর্ণের মন্ত্রী—স্থিরজীবী। আমাকে—এই দশা করেছে সেই বিশ্বাসঘাতক মেঘবর্ণই।”

পেঁচার চোখে যেন বিদ্যুতের খেলা হল। স্থিরজীবী আঙুল নিয়ে অন্ধকারের দিকে ইশারা করে বললেন, “তোমরা আমার বার্তা মহান উলূকরাজ অরিমর্দনের কাছে পৌঁছে দাও। বলো—আমার তাঁর সঙ্গে জরুরি কথা আছে; বহু গোপন কথা আছে।”

পেঁচারা গিয়ে তত্ক্ষণাৎ গিয়ে জানালো সে বার্তা উলূকরাজ অরিমর্দনকে। বার্তা পেয়েই ছুটে এলেন উলূকরাজ; তাঁর বিশাল ডানার ছোঁয়ায় বাতাসে যেন ঝাঁঝালো সঙ্গীত উঠল। স্থিরজীবীর চেহারা দেখে তাঁর চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। “কে করল আপনাকে এমন?”—বিস্ময় আর ক্রোধের মিলিত সুরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন স্থিরজীবীকে।
স্থিরজীবী আগাম তাঁর সমস্ত কথা সাজিয়ে রেখেছিলেন। কাতর স্বরে তিনি বললেন — “হে দেব, আমার এই রকম অবস্থা হওয়ার কারণ শুনুন। দিন কয়েক আগেই আমাদের রাজা, সেই দুষ্ট মেঘবর্ণ, আপনাদের দ্বারা হত্যা হওয়া কাকেদের পীড়া সহ্য করতে না পেরে শোকে ও ক্রোধে আবিষ্ট হয়ে আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে চলেছিলেন। তখন আমি তাঁকে বাধা দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম—হে রাজন, উলূকরাজ অরিমর্দন বলবান, আর আমরা নির্বল; বলেছিলাম—‘বলীযসা হীনবলো বিরোধং ন ভূতিকামো মনসাঽপি বাঞ্ছেৎ…’ অর্থাৎ, যে বুদ্ধিমান সে কখনোই বলশালী শত্রুর সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত হয় না। আমি বলেছি—বুদ্ধি ও কূটকৌশল নিয়েই শান্তি করা উত্তম; প্রাণ বাঁচলে ধনসম্পদ আবার লাভ করা যায়। এই সমাজে যাঁরা বৈতসী বৃত্তি মানে জলের স্রোতে বেতলতা যেমন ঝুঁকে পড়ে সেই রকম আচরণ করে, মানে শত্রুর সামনে নত হয় আবার শত্রু চলে গেলে ঘুরে দাঁড়ায় তারাই বেঁচে থাকে, কিন্তু যাঁরা পতঙ্গবৃত্তি ধারণ করে আগুনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পরে বলবান শত্রুকে মূর্খের মতন আক্রমণ করতে যায় তারা নিশ্চিতভাবে মারা পড়ে।

কিন্তু মেঘবর্ণ আমার উপদেশ মানলেন না। বরং অন্য মন্ত্রীর পরামর্শে প্ররোচিত হয়ে তাঁরা আমাকে আপনাদের গুপ্তচর ভেবে প্রতিহিংসায় আক্রান্ত করেছে। আমার পা ভেঙে দিয়েছে, পালক ছিঁড়ে ফেলেছে, এ অরণ্যের কোণে ফেলে রেখে গেছে মরার জন্য।” স্থিরজীবীর কণ্ঠে যেন এখন একটি কপট ক্ষোভের আঁচ লাগলো, চোখে জ্বলে উঠল সোনালি ঝিলিক।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৫: কিশোরীর মেঘবেলা

আকাশ এখনও মেঘলা/৪১

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৭: বিলেতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের অস্ত্রোপচার

একটু থেমে তিনি কণ্ঠস্বরে আরও কিছুটা দৃঢ়তা এনে বললেন, “কিন্তু মহারাজ, আমি মরিনি—বেঁচে আছি। বাঁচার একটাই কারণ আছে—প্রতিশোধ। আমি জানি কাকেদের লুকোনোর জায়গা। আমাকে বিশ্বাস করুন—আমি আপনাকে সেদিকে নিয়ে যাব। যেদিন আমি আবার হাঁটতে পারব সেদিন আপনাকে তাদের আস্তানায় নিয়া গিয়ে সমস্ত কাকদের নিশ্চিহ্ন করে দেব — যাবদহং প্রচলিতুং শক্নোমি তাবৎ ত্বাং তস্য আবাসে নীত্বা সর্ববাযসক্ষযং বিধাস্যামি।”

স্থিরজীবীর এই কথায় দরবারে নেমে এল নীরবতা; অরিমর্দন ফিরে দাঁড়ালেন এবং তাঁর পাঁচজন মন্ত্রী—রক্তাক্ষ, ক্রূরাক্ষ, দীপ্তাক্ষ, বক্রনাস ও প্রাকারকর্ণ—পাশেই দাঁড়িয়ে, প্রত্যেকের চোখে লুকিয়ে আছে অন্ধকার কামনা ও কৌশলের শীতল দ্যুতি। অরিমর্দন ধীর কণ্ঠে রক্তাক্ষের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বলুন, মন্ত্রীবর—এই ক্ষতবিক্ষত শত্রুর বৃদ্ধ মন্ত্রীকে নিয়ে আমাদের এখন কী করা উচিত? —তৎ কিং ক্রিযতাম্‌? এটি কি একটি সুবর্ণসুযোগ, না কি মৃত্যুবাঁধা ফাঁদ?”

নিশ্চল বাতাসে রক্তাক্ষের কণ্ঠ ধ্বনিত হল যেন খড়্গের ঝনঝনানি। “মহারাজ!”—তাঁর দৃষ্টি অরিমর্দনের দিকে নিবদ্ধ — “এত সংশয়ের কী আছে? এতটুকু সময় নষ্ট না করে, কোনও বিচারব্যবস্থা ছাড়া এখনই একে হত্যা করা উচিত—অবিচারিতমযং হন্তব্য!”

সভাকক্ষ স্তব্ধ। রক্তাক্ষের কথার ধারালো প্রান্তগুলো শূন্যে যেন আঁচড় কাটে। রক্তাক্ষ বলে চললেন “কূটনীতিশাস্ত্রের অমোঘ সত্য স্মরণ করুন”। তিনি এগিয়ে এলেন, তাঁর পদচারণায় যেন যুদ্ধের দামামা বাজছে— “দুর্বল শত্রুকে তত্ক্ষণাৎ হত্যা করতে হবে, যেন সে ভবিষ্যতে শক্তি সঞ্চয় করে বলবান হয়ে না উঠতে পারে; তাঁকে প্রাণ ফিরে পাবার কোনও সুযোগই দেওয়া যাবে না। আজ যে পতঙ্গ, সে-ই যে কাল ভয়ঙ্কর ভুজঙ্গে পরিণত হবে না তার কোনও নিশ্চয়তা আছে কি?”
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৩: সুন্দরবনের পাখি: বাটান

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১২ : স্বপ্নের নায়ক, নায়কের স্বপ্ন

রক্তাক্ষ কিছুক্ষণ নীরব থেকে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন, যেন ভবিষ্যতের সব সম্ভাবনার খেলা মনের চোখে দেখছেন। তারপর আবার মুখ খুললেন, কিন্তু এবারের স্বর তাঁর একটু নরম, তবে আরও গুঢ়। বললেন, “কিন্তু মহারাজ, লোকপ্রবাদও তো মনে করিয়ে দেয়—বিজয়শ্রী লক্ষ্মীদেবী যদি স্বয়ং কারও দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হন, তাঁকে ফিরিয়ে দিলে তিনি অভিসম্পাত দেন। আপনি এদের দুর্গ জয় করেছেন, বায়সরাজদের বাসহীন করেছেন। বিজয়লক্ষ্মী তো আপনারই পাশে। আর এখন?” তাঁর কণ্ঠে খেলার সুর—“এই পরাজিত শত্রুপক্ষের মন্ত্রীও আপনারই শরণাপন্ন! সে তার পূর্ববর্তী স্বামীর আচরণে ক্ষিপ্ত, প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছে আর তাকে ধ্বংস করতে আপনাইর সাহায্য চাইছে। এ তো একটা বড় সুযোগ মহারাজ, বারবার আসে না।”

হঠাৎ তাঁর চোখ দু’টি সংকুচিত হয়ে এলো সাপের ফণার মতো। বললেন “কিন্তু স্মরণ রাখবেন, এ ব্যক্তি শত্রুর মন্ত্রী। এর চরিত্র হতে পারে সর্পের মতোই খল। সেই আহত সাপের গল্পটা জানেন তো? যে চাষীর ছেলেকে দংশন করবার পর বলেছিল—
চিতিকাং দীপিতাং পশ্য ফটাং ভগ্নাং মমৈব চ।
ভিন্নশ্লিষ্টা তু যা প্রীতির্ন সা স্নেহেন বর্ধতে।। (কাকোলূকীয়ম্‌, ১৩২)


অর্থাৎ, তোমার পুত্রের ওই জ্বলন্ত চিতা এবং আহত আমার এই ভগ্ন ফণার দিকে তাকাও। এখন তুমি আমার প্রতি স্নেহ প্রকট করলেও সেই স্নেহ এখন আর বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তোমার সঙ্গে সেই সম্পর্ক আমার চিরতরে বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে।”
অরিমর্দন বললেন— “কথমেতৎ? ব্যাপারটা ঠিক কী রকম?”
রক্তাক্ষ বলতে শুরু করলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৫: মহর্ষি নারদের প্রশ্নচ্ছলে উপদেশগুলি যেন রাজনীতির পাঠ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৮: আপৎকালীন পরিস্থিতি

০৬: ব্রাহ্মণ ও সাপের গল্প

কোনও এক শান্ত, সবুজে ঘেরা গ্রামে বাস করতেন এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ—নাম তাঁর হরিদত্ত। জন্মে ব্রাহ্মণ হলেও জীবিকা ছিল কৃষিকাজ। প্রতিদিন ভোরে তিনি নিজের ক্ষেতে যেতেন, রোদে-জলে খেটে মরতেন, তবু ফসল হত না তেমন কিছুই। বছরের পর বছর তাঁর জীবনে যেন অভাবই যেন ছিল একমাত্র ধ্রুব সত্য।

একদিন প্রচণ্ড গ্রীষ্মের দুপুরে হরিদত্ত ক্ষেতে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। শরীরের সমস্ত শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। তীব্র রোদ মাথার উপর জ্বলছে, ঘামে ভিজে উঠেছে তাঁর শরীর। একটু বিশ্রামের আশায় তিনি ক্ষেতের মাঝখানে একটি বিশাল ছায়াঘেরা গাছের নিচে বসলেন। ঠান্ডা ছায়া পেয়ে চোখ বুজে এলেই যেন প্রাণটা জুড়িয়ে গেল।

ঠিক তখনই তাঁর চোখ পড়ল গাছের গোড়ার কাছে—একটি উঁইয়ের ঢিবির উপর ফণা তুলে বসে আছে এক ভয়ঙ্কর বিষধর সাপ! মুহূর্তের মধ্যে তাঁর শরীর কেঁপে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মনে এক অদ্ভুত চিন্তা উদয় হল—
“আহা! এ নিশ্চয়ই আমার ক্ষেতের ক্ষেত্রদেবতা! আমি তো কখনও এই দেবতাকে পুজো করিনি। হয়তো সেই কারণেই আমার এত পরিশ্রমেও ফল হয় না!”

আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৮: দুর্গম গিরি কান্তার ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৪: অ্যাঙ্করেজের সঙ্গে সিউয়ার্ডকে জুড়েছে পৃথিবীখ্যাত সিউয়ার্ড হাইওয়ে

সেই মুহূর্তেই তাঁর মন ভরে উঠল ভক্তিতে। তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, “আজ থেকে প্রতিদিন আমি এই ক্ষেত্রদেবতাকে পুজো করব।”

তারপর আশেপাশে কারো কাছ থেকে চেয়ে চিন্তে মাটির পাত্রে দুধ ভরে আনলেন এবং তা উঁইয়ের ঢিবির পাশে রেখে বললেন—
“হে ক্ষেত্রদেবতা! আপনি যে এখানে অধিষ্ঠিত, তা আমি জানতাম না। এই কারণেই আপনাকে এতদিন কোনও আপনাকে কোনও পূজা নিবেদন করতে পারিনি। আমাকে ক্ষমা করুন।”
এই বলে হরিদত্ত শ্রদ্ধাভরে প্রণাম করে ঘরে ফিরে গেলেন।

পরদিন সকালে যখন তিনি আবার ক্ষেতে এলেন, তখন দেখলেন—যে মাটির পাত্রে তিনি দুধ রেখে গিয়েছিলেন, তার উপরে একটি ঝকঝকে স্বর্ণমুদ্রা রাখা! বিস্ময়ে তাঁর চোখ বড়ো হয়ে গেল। তিনি ভাবলেন, “এ নিশ্চয়ই ক্ষেত্রপতি নাগদেবতার আশীর্বাদ!” ভক্তিসহকারে তিনি সেই স্বর্ণমুদ্রাটি তুলে নিলেন এবং সেদিন থেকেই নিয়ম করে প্রতিদিন দুধ রেখে যাওয়া শুরু করলেন।

অদ্ভুতভাবে প্রতিদিনই সেই পাত্রে তিনি একটি করে সোনার মোহর পেতে লাগলেন। দিন যেতে লাগল, ভাগ্য যেন হঠাৎ তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠল। সংসারে সুখ ফিরল, তাঁর মুখে হাসি ফুটল। কিন্তু সুখের দিন তো কখনওই স্থায়ী হয় না। ভাগ্যের চাকা যেন হঠাৎ ঘুরে যায়।—চলবে।

* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content