
এই সেই স্বপ্নের পথ।
সিউয়ার্ডে কখনও গাড়িতে করে যাওয়ার সময় দেখি মাইলের পর মাইল শুধু বালুরাশি। যতদূর চোখ যায় সমুদ্রের নামগন্ধও নেই। আবার কখনও গাড়ি চালাতে চালাতে দেখি পাশে জল থই-থই করছে আর তাতে উথাল পাথাল ঢেউ। এই জলরাশির এক পাশে প্রথমেই রেলগাড়ির রাস্তা, আর তার পরেই গাড়ি যাওয়ার রাস্তা। আর গাড়ির রাস্তার পাশেই পাহাড়। পাহাড়গুলো একদম রাস্তার গা থেকেই উঠে গিয়েছে।
একদিকে জল, একদিকে পাহাড়—সবমিলিয়ে এই রাস্তাটা যেন একেবারেই স্বর্গদ্বার। এখানে গাড়ি চালাতে চালাতে প্রায়শই আমরা একটু বিহ্বল হয়ে পড়ি। এত সুন্দর চারিদিক যে কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। প্রায় পঞ্চাশ ষাট মাইল পর সমুদ্রটা আরো দূরে সরে গিয়ে আর দেখা যায় না রাস্তার পাশে। তখন চারিদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে এসেছে ছোট ছোট নীল হিমবাহ। এই পাহাড়ের ধার ঘেঁষে খানিকক্ষণ পরে শুরু হয় একটা সবুজ রঙের নদী। মানে পাহাড়ের ঘন গাছপালার প্রতিফলনে তাকে সবুজ মনে হয়। সেটা বহুক্ষণ ধরে রাস্তার বাঁ পাশ ধরে চলতে থাকে। তারই ধারে পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্যে ক্বচিৎ-কদাচিৎ একটি কি দুটি পাহাড়ি ধাঁচের বাড়ি।
আরও পড়ুন:

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৪: অ্যাঙ্করেজের সঙ্গে সিউয়ার্ডকে জুড়েছে পৃথিবীখ্যাত সিউয়ার্ড হাইওয়ে

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৫: কিশোরীর মেঘবেলা

আকাশ এখনও মেঘলা/৪১

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৭: বিলেতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের অস্ত্রোপচার
রাস্তা থেকে যেটুকু দেখা যায়, তাতে মনে হয় কি অপার্থিব শান্তি সেখানে। এই নদীটা শেষ হলেই সামনে চলে আসে বিশাল পোর্টেজ হিমবাহ। সেটাও একটা পাহাড় থেকেই নেমে এসেছে। আর তার নীচেই রয়েছে একটা হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ। আমরা এর আগে এই হিমবাহের কাছাকাছি রাস্তায় বাঁক নিয়ে এই হ্রদের ধারে বসে থেকেছি অনেকক্ষণ, কোনও উদ্দেশ্য ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। আবার সেখান থেকে উঠে গাড়ি চালিয়ে ফিরে এসেছি বাড়ি।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৩: সুন্দরবনের পাখি: বাটান

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়
এর পরেই শুরু হয়ে যায় শুধুই পাহাড়। সেই পাহাড়ের গা বেয়ে গাড়ির রাস্তা। মাঝে মাঝে দেখা যায় সমুদ্র। কখনও বা রাস্তার ধার থেকে ছোট ছোট হিমবাহ গলে ঝরে পড়ছে ঝর্ণা। তাদের সামনে দাঁড়িয়েও সময় কেটে যায় ভালোই। এক একটা জায়গা আছে যেখানে কিনা রাস্তার একধারে সমুদ্র, অন্য ধারে পাহাড় আর সেই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে মাঝারি মাপের ঝর্ণা এসে পড়ছে একেবারে রাস্তার ওপরেই। মাঝে মাঝে মনে হয় যেন কোনও বড় শিল্পীর ছবির মধ্যে আমি ঢুকে সেখানেই হারিয়ে গিয়েছি। আর সব থেকে যেটা সুবিধাজনক ব্যাপার এই সিউয়ার্ড হাইওয়েতে সেটা হল রাস্তার ধারে চওড়া গাড়ি দাঁড়ানোর জায়গা অর্থাৎ শোল্ডার আছে। এটি রিচার্ডসন হাইওয়ের মত নয়। আবার পর্যটনের খাতিরে মাঝে মাঝেই ছোট ছোট বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা করা আছে। যেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে মনোরম দৃশ্য অবলোকন করা করা যায়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৫: মহর্ষি নারদের প্রশ্নচ্ছলে উপদেশগুলি যেন রাজনীতির পাঠ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৮: আপৎকালীন পরিস্থিতি
এখন অবশ্য এসবের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকার চারিদিক। পঞ্চাশ ষাট মাইল পেরোনো গেল। কিন্তু এর পরে যখন চারিদিকে পাহাড় শুরু হল সেখানে একটা কথা আমার জানা ছিল না যে ওই রাস্তায় প্রচুর ধস নামে। সেই সঙ্গে পাহাড় থেকে ছোট বড় পাথর গড়িয়ে এসে পড়ে রাস্তায়। আমরা সবাই খুব আনন্দে গাড়ি চালাচ্ছি। বেশ কয়েকবছর পরে বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। অনেক পুরোনো স্মৃতি।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৮: দুর্গম গিরি কান্তার ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১২ : স্বপ্নের নায়ক, নায়কের স্বপ্ন
রাস্তা প্রায় ফাঁকা। তাই অত দেখে শুনে চালাতে হচ্ছে না। সমস্যা হলো সেখানেই। হঠাৎ রাস্তার একদম সামনে দেখি একটা বেশ বড় কালো পাথর। তার উচ্চতাটা হবে মোটামুটি গাড়ির বাম্পার এর মাঝামাঝি পর্যন্ত। অর্থাৎ ইঞ্জিনের একদম নিচ থেকে শুরু করলে তার ওপরে পাঁচ ইঞ্চি মতো। আর বেশ খানিকটা চওড়া। একদম রাস্তার মাঝখানে পড়ে আছে। কালো রাস্তায় অন্ধকারের মধ্যে এমন ভাবে কালো পাথরটা পড়ে আছে যে দূর থেকে বোঝাই যাচ্ছে না। যখন হঠাৎ দেখলাম তখন আর গাড়ি ধীরে করার সময় নেই। আমার মাথার মধ্যে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ খেলে গেল। ওই রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছি প্রায় সত্তর মাইল প্রতি ঘণ্টায়। এই গতিবেগে যদি ওই বড় পাথরের ওপরে কোনওভাবে গাড়ির একটা চাকা উঠে যায় তাহলে অবশ্যম্ভাবী গাড়ি উল্টে ছিটকে পড়ে যাবে।—চলবে।
* রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা (Mysterious Alaska) : ড. অর্ঘ্যকুসুম দাস (Arghya Kusum Das) অধ্যাপক ও গবেষক, কম্পিউটার সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি অব আলাস্কা ফেয়ারব্যাঙ্কস।


















