শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

উল্লাস ভাবতেই পারছিল না যে, পোঁটলার মধ্যে এ-সব থাকতে পারে। মঙ্গল মাহাতোকে সে যে ভালো চোখে দেখত, তা নয়; কিন্তু এতটাও ভাবেনি। এ যে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরোলো!
সে পোঁটলাটা সামান্য ফাঁক করে দেখতেই তার মধ্যে সাজিয়ে রাখা বেশ কয়েকটা পিস্তল দেখতে পেল। লোকাল মেড নয়। দেখেই মনে হচ্ছে, বিদেশি। অনেক দামি। সে চকিতে চারপাশে তাকাল। নাহ্, কেউ কোথাও নেই। কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে এসব জিনিস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি উচিত নয়। এখন কেউ নেই বলে যে-কোনও সময় কেউ চলে আসতে পারবে না এমন নয়। মঙ্গল এখানে কেন এগুলি রেখে গেল, তা সে বুঝতে পারছে না। সে কি কারুর জন্য রেখে গেল? না-কি কালাদেওর থান থেকে ফিরে নিজেই কোথাও নিয়ে যাবে? তা যদি হয়, তাহলে সে পোঁটোলাটা নিজের সঙ্গেই তো থানে নিয়ে যেতে পারতো! খামোকা এখানে রেখে যাওয়ার দরকার পড়ত না। কারণ, এই সন্ধ্যে হয়ে আসার মুহূর্তে থানের দিকে বিশেষ কেউ যায় না। তার উপর কালাদেও যখন-তখন যেখানে-সেখানে দেখা দিতে শুরু করায় এবং প্রাণহানি ঘটায়, আরই যাচ্ছে না। মোদো-মাতালেরাও এখন সতর্ক হয়ে গেছে। তারাও আর হুটহাট করে মদ খেতে সন্ধ্যের পরে বাইরে বেরুচ্ছে না। হয় সন্ধ্যে নামার আগেই খেয়ে ঘরে ঢুকে পড়ছে। না-হলে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে, ঘরের ভিতরে বসে খাচ্ছে।

কালাদেওর কথা মনে হওয়ায় একটু থমকে গেল উল্লাস। সন্ধ্যে নামবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। সঙ্গে আলো বলতে মোবাইলের টর্চ ভরসা। যদিও চেনা রাস্তা, তারার আলোতেও পথ চিনে গ্রামে ফিরতে অসুবিধা হবে না তার। কিন্তু অন্য অসুবিধা আছে। মঙ্গল একটু পরেই ফিরবে। সে দেখে ফেললে সর্বনাশ হবে। তার উপর তার পোঁটলাটা এখন উল্লাসের হাতে। সে থান থেকে ফিরে এসে যদি কোন কারণে ওটা খোঁজে আর না পায়, তাহলে নিশ্চিতভাবে খ্যাপা কুকুরের মতো হিংস্র হয়ে উঠবে। অন্য কারও জন্য রেখে গেলে, সে-ও পোঁটলা নির্দিষ্ট জায়গায় নেই দেখলে নিশ্চয়ই খুওজাখুঁজি শুরু করে দেবে। উল্লাসের মনে হচ্ছে কোন নির্দিষ্ট কারও জন্যই মঙ্গল এটা রেখে দিয়ে গিয়েছে।
কিন্তু সেই ব্যক্তিটি কে? কখনই বা আসবে? এখন না-কি তার নিজের সময়মতো? গ্রামের কেউ যে নয়, সে-ব্যাপারে উল্লাসের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তাহলে পোঁটলাটা এখানে না নিয়ে এসে, সেখানেই তাকে হ্যান্ডওভার করতো। কিন্তু তা যখন করেনি, তখন হয় অন্য গ্রামের কেউ, নচেৎ বাইরের কেউ। এই কথাটা কি সে লালবাজারের গোয়েন্দা-স্যারকে জানাবে? ভাবল উল্লাস। তারপরেই তার মনে হল, এখানে অস্ত্র পাওয়া গিয়েছে, সে-কথা তো সে আজ না হোক, কাল জানাবেই। কিন্তু এই অস্ত্র কে বা কারা নেবে, মঙ্গলের কাছেই বা এত অস্ত্র কোথা থেকে এল, সে-সমস্ত জোগাড় করা গেলে আরও ভালো হতো। গোয়েন্দা-স্যার খুশি হতেন। মানুষটিকে দু’দিন দেখেই তার বড় ভালো লেগে গিয়েছে। এত বড় অফিসার, কিন্তু কী অমায়িক। মাটির মানুষ। রূপবান এবং গুণবান মানুষ বোধহয় এদেরকেই বলে।

ইতস্তত করছিল উল্লাস। আর ঠিক তখনই দূর থেকে একটা বাইকের আওয়াজ পাওয়া গেল। কেউ আসছে। এখানে এখন দাঁড়িয়ে থাকা মানে যে বোকামি, তা উল্লাস জানে। যে আসছে সে মিত্র না শত্রুপক্ষ তা সে জানে না। কিন্তু তাকে এই নির্জন রাস্তার মাঝখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে যে সকলেরই সন্দেহ হবে, তাতে সন্দেহ নেই। তাছাড়া তার হাতে যেটি আছে, সেটি নিয়েও তাকে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হবে। অতএব তাকে লুকাতে হবে। এখন গ্রামের দিকে হাঁটা দেওয়া উচিৎ হবে না। যদি ওই পোঁটলাটির জন্যই আসে, তা না পেয়ে যে আসছে, সে নিশ্চয়ই খোঁজাখুঁজি শুরু করে দেবে। সঙ্গে বাইক আছে যখন, রাস্তা ধরে এগুলেই তো সে ধরা পড়ে যাবে। যারা অস্ত্র নিয়ে কারবার করে তারা খুব ভয়ঙ্কর হয়। কথায়-কথায় গুলি চালিয়ে দেয়। আর এখানে উল্লাস তাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিচ্ছে দেখলে তাকে নিশ্চয়ই জামাই-আদর করবে না।

উল্লাস এদিক-ওদিক তাকিয়ে যেদিক দিয়ে এসেছিল, সেদিকেই খানিক দৌড়ে গিয়ে একটা বড় গাছের গুঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। তাকে দেখতেই হবে, কে আসছে। এমন হতেই পারে, তাদেরই গ্রামের কেউ শহরে গিয়েছিল, কাজ সেরে ফিরছে এখন। আজকাল গ্রামে খেতে পাক বা না পাক, অনেকেরই দুটি জিনিস আছে—একটি হল মোবাইল, অন্যটি বাইক। কিছু করুক বা না-করুক, আধপেটা খেয়েও এই দুটি জিনিসের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে ইতিমধ্যেই অনেকে দক্ষ হয়ে উঠেছে। তাদের কেউ হলে কোনরকমে এটা-ওটা ভুজুংভাজাং দিয়ে ছাড় পেলেও পেতে পারে সে। কিন্তু অন্য কেউ হলেই বিপদ। অতএব গাছের গুঁড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে সে প্রার্থনা করছিল, যে-বা-যারা আসছে, তারা যেন উল্লাসকে দেখতে না পায়।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৯: শেফালিকার বিপদ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৭: কেমন আছেন সুনীতি, নদীর নরম ছেড়ে সমুদ্রের নুনে!

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। একটি সেকেলে বাইক এসে থামল রাস্তার এক পাশে। বাইকে যিনি বসেছিলেন, তাঁর শণের নুড়ির মতো চুল, মুখে দাড়ি, তাও পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে। অথচ শরীর কী টান-টান! লোকটির গায়ে একখানি সাধারণ ফতুয়া, কালো রঙের ট্রাউজার, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। লোকটি বাইক থেকে নেমে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল ভালো করে। তারপর যেন জলবিয়োগ করতে যাচ্ছে, এমন ভঙ্গি করে নেমে গেল যেখানে গাছের কোটরের মধ্যে অস্ত্রগুলি রেখে গিয়েছিল মঙ্গল মাহাতো।

শ্বাস বন্ধ করে প্রতীক্ষা করছিল উল্লাস। সে যেখানে লুকিয়ে আছে, সেখান থেকে সেই গাছের কোটরটি দেখা যায় না। তবে লোকটি যে সেই দিকেই গেল, তাতে কোন সন্দেহ নেই তার। এক্ষুনি একটা বিস্ফোরনের প্রতীক্ষা করছিল সে। লোকটি যখন দেখবে, সেখানে কিছুই নেই, তখন তার মুখের অবস্থা কী হবে, সেটা ভেবে উৎকণ্ঠা আর ভয়ে উল্লাসের মুখ শুকিয়ে গেল। লোকটি এদিকের কেউ নয়। চেহারা-চালচলন দেখলেই বোঝা যায়, বাইরের লোক। এদিকের মোটামুটি সব্বাইকে সে চেনে। চেনা বলতে মুখ চেনা। সবার সঙ্গে তো আর হৃদ্যতা হয় না। কিন্তু এই লোকটিকে কখন দেখেনি সে। তবে লোকটি যে এ-দিকে এই প্রথম আসেনি, সে তো বোঝাই যাচ্ছে। যেভাবে এদিক-ওদিক না গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গাতেই সে বাইকটাকে থামিয়েছে, তাতে বোঝা যায়, এর আগেও সে এখানে এসেছে এবং সম্ভবত ওই গাছের কোটরের হাত ধরে চোরাই অস্ত্রশস্ত্রের আদানপ্রদানেও অংশ নিয়েছে। তার একটাই অর্থ হয়, মঙ্গল মাহাতো এর আগেও এমন কাজ করেছে। এটাই সম্ভবত তার অস্ত্র রাখবার গোপন জায়গা। ভালো জায়গাই বেছেছে সে বলতে হবে। সবার চোখের সামনে থাকবে। রাস্তায় যেতে-যেতে জলবিয়োগের জন্য যে-কেউ থামতেই পারেন। সেই অছিলায় নির্দিষ্ট গাছের সামনে দাঁড়িয়ে জলবিয়োগের ভাণ করে গিয়ে অস্ত্রবোঝাই পোঁটলা বাগাতে আর কতক্ষণ ? এখন দেখার, আজ পোঁটলা না পেয়ে লোকটির কী প্রতিক্রিয়া হয়।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৫: সুন্দরবনের পাখি: বিলের বালুবাটান

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৫: ডেসডিমোনার রুমাল/৫

ভাবতে-না-ভাবতেই লোকটি উঠে এল রাস্তার ওপর। এদিক-ওদিক তাকাল একবার। লোকটি অস্থিরভাবে এদিক_ওদিক করল একবার। তারপর পকেট থেকে মোবাইল বার করে ডায়াল করতে লাগল। এতদূর থেকে অবশ্য তার চোখমুখের অবস্থা ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছিল না উল্লাস। কিন্তু সে-যে অস্থির হয়ে পড়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কাকে ফোন করছে লোকটি? মঙ্গলকে নিশ্চয়ই? মঙ্গল সম্ভবত ফোন ধরছে না। থানে কালাদেওর পূজায় ব্যস্ত থাকতে পারে। কালাদেওর পূজার সময় কথা বলা কিংবা অন্য কিছু করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সেই কারণেই হয়তো ফোনটা ধরতে পারছে না মঙ্গল। যতই অস্ত্রের কারবার করুক না কেন, কালাদেওর পূজারী হয়ে সে কালাদেওকে ভয় পাবে না? সমীহ করবে না?

লোকটা শূন্যে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুঁড়ল, তারপর মোবাইল নিয়ে কিছু করতে লাগল। মেসেজের আদানপ্রদান হচ্ছে নিশ্চয়ই। মঙ্গলকে হয়তো লোকটি জানাচ্ছে যে, কোন অস্ত্রশস্ত্র পায়নি সে নির্দিষ্ট জায়গায়। মঙ্গল কি রিং-ব্যাক করবে? লোকটি আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। আবার সেই গাছটির দিকে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরেও এল। সে হয়তো আশেপাশের গাছগুলির যেখানে-যেখানে গুঁড়িতে কোটর আছে, সেখানে খুঁজে এল। অন্য কিছুও হতে পারে। উল্লাস নিশ্চিত নয়। সে সতর্ক চোখে তাকিয়ে দেখতে লাগল লোকটি এরপর কী করে। সে ভেবেছিল, লোকটি এখানে মঙ্গলের জন্য অপেক্ষা করবে। কিন্তু নাহ্। লোকটি বাইকে উঠে বাইক স্টার্ট দিল। তারপর আস্তে-আস্তে যেদিক থেকে এসেছিল, সেদিকেই চলে গেল।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৩ : জনঅরণ্য: সরস্বতী না লক্ষ্মী?

লোকটি চলে যেতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল উল্লাস। ভাগ্যিস, লোকটি এদিক-ওদিক খোঁজ করেনি। করলে সে হয়ত ধরা পড়ে যেত। কিন্তু সে নিজে এখন কী করবে? মঙ্গলের জন্য অপেক্ষা? মঙ্গল ফেরার পথ ধরলে তার পিছু-পিছু নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ফিরে যাওয়াই যায়। কিন্তু সে জানে, থানের পূজা শেষ হলেই মঙ্গল মোবাইল দেখবে। যদি লোকটি মেসেজ পাঠিয়ে থাকে, তাহলে এটাও জানবে যে, গাছের কোটরে তার রেখে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্রের পোঁটলাটা নেই। সেই মেসেজ পেলে সে পড়ি-কি-মরি করে ছুটে আসবে। গাছটির কাছেও যাবে। তারপর এদিক-ওদিক খুঁজবে। মঙ্গল কিন্তু ওপর-ওপর খুঁজবে না। খ্যাপা কুকুরের মতো সে আশেপাশের সব কিছু তন্ন-তন্ন করে দেখতে পারে। যদিও সন্ধ্যে হয়ে যাবে, এবং জঙ্গলে সন্ধ্যের পরে বিপদ ওত পেতে থাকে। সুতরাং যতটা চাইবে, সেইভাবেই যে সে খোঁজ চালাতে পারবে এমন নয়। সেক্ষেত্রে সে ভোর-ভোর আবার এসে খুঁজবে। যদিও যে-ই নিক, সে নিশ্চয়ই ভোরবেলা পর্যন্ত এখানে অপেক্ষা করবে না। তবে এই মুহূর্তে উল্লাস এখানে থাকলে বিপদ তারই। এইজন্য সে আর দেরি করল না। চারপাশ একবার দেখে নিয়ে দ্রুত গাছের আড়াল রেখেই সাম্নায় কিছুদূর গিয়ে তারপর পাকা সড়কে উঠল।

অন্ধকার নেমে এসেছে ইতিমধ্যেই। একটার পর একটা তারা ফুটে উঠছে আকাশের গায়। জঙ্গলের নিজস্ব গন্ধ মেখে বাতাস বইতে শুরু করেছে মৃদু-মন্দ। সারাদিনের রৌদ্রদগ্ধ প্রকৃতি সান্ধ্যকালীন বেশে নিজেকে সাজিয়ে তুলছে। জোনাকিরা ঝোপে-ঝাড়ে প্রদীপ জ্বালতে তৎপর। কোথাও কোথাও ছাতিম গাছ আলো হয়ে আছে ফুলে-ফুলে। তারই মোহ-ধরানো গন্ধে সন্ধ্যা মাতাল হয়ে উঠছে যেন। ভারি মনোরম পরিবেশ। উল্লাসের অবশ্য এসব তাকিয়ে দেখার মতো সময় নেই। ইচ্ছেও নেই। সে এই জঙ্গলাকীর্ণ গাঁ-গঞ্জে মানুষ। এসব তার কাছে নতুন কিছু নয়। এ-সব তার মধ্যে আলাদা কোনও উন্মাদনা জাগিয়ে তোলে না। বরং অন্য কিছু তার মধ্যে উন্মাদনা জাগিয়ে তোলে। এই মুহূর্তে তার হাতে ধরা অস্ত্রভর্তি পোঁটলাটা যেমন। সেটা নিয়েই সে দ্রুত পায়ে প্রায় দৌড়ানোর মতো করে চলেছিল। প্রতি মুহূর্তে আর কারুর এসে পড়ার ভয়, মঙ্গল মাহাতোর ভয় তাকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, এখন একটু জল পেলে মন্দ হতো না। কিন্তু তা যে দুরাশা, তা উল্লাস জানে। তাছাড়া এখন তার লক্ষ্য তাড়াতাড়ি নিজের নিরাপদ বৃত্তের মধ্যে ঢোকা। আর তার নিরাপদ বৃত্ত মানে নিজের বাড়ি। অনেকদিন হল সে গাঁ ছেড়েছে। এখানে তার যে-সব বন্ধুবান্ধব ছিল, হয় তারা বন্ধুত্বের রাস্তা বদল করেছে, নয় তারাও আর গ্রামে থাকে না। কেউ অন্য রাজ্যে, কেউ কলকাতায় কামকাজ করে। অতএব আর কাউকে যে সে মনের উদ্বেগ, জমে থাকা ভয় ইত্যাদি বলে মনকে হালকা করবে, তার উপায় নেই। আর এই মুহূর্তে তার একমাত্র লক্ষ্য সুস্থভাবে বাড়িতে ফেরা। আর কিছু সে এখন ভাবছেই না।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৬: জীবন নিয়ে কৌতুক আর ‘যৌতুক’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

বাড়িতে ফিরে তাকে কয়েকটি কাজ করতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হল, কলকাতার সেই গোয়েন্দা-স্যারকে ফোন করবে। আর কিছু না-ই জানুক, এ-টূকু সে জানে যে, অস্ত্রভর্তী এই পোঁটলা নিজের কাছে রাখা বিপজ্জনক। আবার বিষয়টা এমনই সে আর কাউকে বলতে পারবে না, রেখেও আসতে পারবে না। পুলিশ জানলে তার কথাকে গালগপ্পো বলে মনে করে তাকে হাজতে ভরে দেবে। এই মুহূর্তে তাকে বাঁচাতে যদি কেউ পারে, তাহলে সুদীপ্তবাবু আর সেই গোয়েন্দা-স্যার। তাঁকে সব কথা খুলে বলবে উল্লাস। তারপর তিনি যা করতে পরামর্শ দেবেন, তেমনটাই করবে সে। তবে তাঁকে অনুরোধ করবে যেন বিষয়টা গোপন থাকে আর তার সুনাম যেন ক্ষুণ্ণ না হয়। তাহলে শহরে ফিরে গেলেও সে আর কাজ পাবে না। এ-সব ব্যাপার গাঁ-গঞ্জে ঘটছে বলে চল্লিশ মাইল দূরের সদরে পৌঁছাবে না, এমন ভাবাটাই মূর্খামি। তার চোখে অনেকঅনেক স্বপ্ন বাসা বেঁধে আছে। একদিন তার একটা স্পা হবে, সেখানে সে আরও কয়েকজন কর্মচারি একসঙ্গে কাজ করবে। তবে তার জন্য আগে সে কলকাতায় কিছুকাল ট্রেনিং নিতে চায়। এ-সব অঞ্চলে কলকাতার কারিগরী থেকে মিষ্টি পর্যন্তের খুব সুনাম। কলকাতায় আর সব থাকলেও যে আন্তরিকতা নেই, অন্যের কাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই, সে-কথা জানে না বলেই উল্লাস কলকাতায় যেতে চাইছে একবার হলেও, যেখানে সে কিছু স্পেশাল ট্রেনিং নিতে পারবে। স্পা আর ম্যাসাজের ব্যাপারে তাকে আরও কিছু শিখতে হবে। তারপর সে সদরে এসে জাঁকিয়ে বসবে। এই স্বপ্ন যার, এত আকাঙ্ক্ষা, সে কী বেঘোরে প্রাণ দেওয়ার জন্য রাজি হতে পারে। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, তাকে এখন এই অবস্থায় যদি কেউ দেখে, তাহলে উল্লাস যাকে বলে একেবারে ফিনিশড্ হয়ে যাবে। অতএব আরো জোরে, আরো জোরে হে ভগ্নদূত এগিয়ে চল…!

উল্লাস যখন দ্রুত এগোচ্ছিল, তখন তার ফেলে আসা জায়গায় এক অন্য নাটক অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। উল্লাস তা জানতেও পারল না। সন্ধাআর অন্ধকারে আর-একটি শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনা সন্ধ্যার সেই মাদকতাকে মুহূর্তের জন্য যেন ছিন্নভিন্ন করে দিল। পরের দিন খবরটা শুনে উল্লাস স্তম্ভিত হয়ে যাবে। বলবে, “হা ঈশ্বর! এর নাম জীবন?” —চলবে।

* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content