শুভ্রাংশু মুখার্জির দিল্লির যোগাযোগ বজায় ছিল। তিনি মোটা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে দিল্লিতে বড়সড় উকিলের সঙ্গে কথা বলে ফেললেন। গোয়েন্দা প্রধান ভূপতি চক্রবর্তীর মৃদু আপত্তি সত্ত্বেও তাঁরই অনুমতিক্রমে শুভ্রাংশু মুখার্জীর মোবাইল ফোন ট্যাপ করা হয়েছিল। তবে তিনি মোবাইলে অত্যন্ত স্বাভাবিক অথচ সচেতন ভাবে কথা বলেছেন। ফোন ট্যাপ হতে পারে এটা কি তিনি আন্দাজ করেছিলেন? সেখানেও তার কণ্ঠস্বরের মধ্যে কোথাও কোনও নার্ভাসনেস নেই।
দিল্লির এক বেশ নামী আইনজীবীকে তিনি ফোনে বললেন, কুড়ি বছর আগে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় তার স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন। গাড়ির দরজা খুলে তিনি ছিটকে পড়েন রাস্তায় এবং অজ্ঞান হয়ে যান। পরে পুলিশের গাড়ি তাঁদের উদ্ধার করে। তাঁর স্ত্রী ঘটনাস্থলেই মারা যান। আর শুভ্রাংশবাবুকে সামান্য চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশ এবং আশপাশের লোকজন সকলেই দেখেছিল এটা একটা দুর্ঘটনা। শুভ্রাংশুর শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনও তখন মেনে নিয়েছিলেন। আজ এতদিন পর কোনও এক অজানা কারণে তাঁর স্ত্রী নয়না মুখার্জির ছোটভাই নীলাঞ্জন ব্যানার্জি আদালতের কাছে এই মৃত্যু অস্বাভাবিক হিসেবে উল্লেখ করেন।
নীলাঞ্জন কেন এই দাবি নিয়ে আবার তদন্ত চেয়েছেন, সেটা তিনি জানেন না। আদালত আবেদন গ্রহণ করেছে, কিন্তু এ নিয়ে কোনও রকম মন্তব্য করেননি। জানা গিয়েছে, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালত থেকে কুড়ি বছর আগেকার কেসডায়েরি এবং সব প্রমাণাদি চেয়ে পাঠানো হয়েছে। অকারণে যাতে আদালতের সময় নষ্ট না হয় তাঁর জন্য কাজ এগিয়ে রাখার সাধু প্রচেষ্টা! পাহাড়গঞ্জ পুলিশ স্টেশন থেকে শুভ্রাংশু মুখার্জিকে কলকাতায় ফোন করা হয়েছিল। শুভ্রাংশুবাবু আশঙ্কা করছেন, তাঁকে কলকাতা থেকে সমন করে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হতে পারে। তাই তিনি উকিলের কাছ থেকে আইনত সাহায্য চাইছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।
একেবারে সাদামাটা জলের মতো স্পষ্ট কথোপকথন। এর থেকে কোনওভাবেই শুভ্রাংশু মুখার্জিকে কুড়ি বছর আগেকার সেই দুর্ঘটনার চক্রান্তকারী বলে জড়িয়ে দেওয়া যাবে না। ধৃতিমান এবং শ্রেয়া দু’জনেই বেশ দমে গেল। আসলে অনুমানের সিঁড়িভাঙা অঙ্কে পরপর স্টেপগুলো মিলে যাচ্ছিল। আনন্দ পালের ক্ষেত্রে সন্দেহ করা হয়েছে। পোস্টমর্টেমে পাওয়া গিয়েছে যে, মৃতের শরীরে ঘুমের ওষুধের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। যথেষ্ট পরিমাণ অ্যালকোহলের অস্তিত্বও মিলেছে। আনন্দ পালের গলার টিস্যু এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরীক্ষা করার পর ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে, গলায় ফাঁস লেগে আত্মহত্যা করার সম্ভাবনা নেই! মদ এবং সম্ভবত মদে মেশানো ঘুমের ওষুধ খেয়ে অচেতন হবার পর আনন্দ পালের গলায় ফাঁস লাগিয়ে তাকে অন্তত দুজন আততায়ী শ্বাসরোধ করে মেরেছে। তারপর মৃতদেহ গলায় ফাঁস লাগিয়ে টেনে হিঁচড়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু কুড়ি বছর আগে যদি একই ঘটনা ঘটে থাকে। যদি কোনও ঠান্ডা পানীয়ের ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে নয়নাকে অসুস্থ অবস্থায় গাড়ি চালাতে বসানো হয় এবং কোন ট্রাকের ধাক্কায় দুর্ঘটনা ঘটানো হয়, তাহলে বলতে হবে শুভ্রাংশু মুখার্জি একজন ভয়ংকর ঝুঁকি নিতে পারা নির্দয় অপরাধী। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, এই ট্রাক দুর্ঘটনাটা সাজানো এবং ঠিক কোথায় কীভাবে অ্যাক্সিডেন্টটা হবে, তা আগেভাগে জেনে নিজেকে বাঁচাতে শুভ্রাংশু গাড়ির দরজা খুলে বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এসব যদি সত্যিও হয়, তাহলে ঘটনাটা অনেকভাবে হতে পারতো। নয়না যদি মারা না যেতেন, তাহলে তিনি বলতে পারতেন যে, শুভ্রাংশু আগেই গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়েছিল।
নয়নার শরীরের কোনওরকম পোস্টমর্টেম করা হয়নি। দেহকে সরাসরি শ্মশানে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে গাফিলতির জন্য যাঁদের শাস্তি পাওয়া দরকার, সেই দয়ারাম আজ আর বেঁচে নেই। কুড়ি বছর আগে যে নার্সিংহোমে শুভ্রাংশ মুখার্জির যৎসামান্য যা চিকিৎসা হয়েছিল এবং নয়না মুখার্জির মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেই নার্সিংহোম বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যে ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন তারও কোনও হদিস নেই। কুড়ি বছর আগে কোন শ্মশানে গিয়ে নয়না মুখার্জির মৃতদেহ দাহ করা হয়েছিল থানার খাতাপত্রে তার কোনও রেকর্ড নেই। নীলাঞ্জন ও তাঁর মা সেই মুহূর্তে হরিদ্বারে গিয়েছিলেন। তাঁরা দিল্লি ফিরে আসার আগেই সব শেষ হয়ে গিয়েছে। ঘটনাটা এতই মর্মান্তিক ছিল যে, দিদির মৃত্যুর মধ্যে যে অন্যরকম কোনওদিক থাকতে পারে সেটা সেদিন তাঁরা ভাবতেই পারেনি। এটা ঠিক যে, দিদি এবং জামাইবাবুর মধ্যে বনিবনার অভাব ছিল। সেই অভাবের মূলকারণ সন্তানহীনতা। স্বামী-স্ত্রীর দু’জনের মধ্যে ঠিক যে কার অক্ষমতার জন্য কী অভাব তৈরি হয়েছিল সেটা জানা যায়নি।
কিন্তু সারিতা খান্নার অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও নীলাঞ্জনের জমা দেওয়া আবেদনের স্বপক্ষে কোনও যুক্তি খুঁজে না পাওয়ায় মামলা খারিজ হয়ে গেল। শুভ্রাংশু মুখার্জিকে সমন করা হয়েছিল। তিনি দিল্লিতে গিয়েওছিলেন। কিন্তু তার নামী উকিল এই মামলাকে এগোতেই দিলেন না।
কিন্তু প্রবাদে বলে যে, অপরাধী শতচেষ্টা করেও কৃত অপরাধের রেশ বাঁচাতে পারেন না। শুভ্রাংশু মুখার্জির মোবাইলে যে যে ফোন এসেছিল সেগুলো ট্রেস করেছিল পুলিশ। সবকটি ফোনেরই হদিস পাওয়া গিয়েছে। শুধু তিনটে অজানা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল বিহারের বেগুসরাই এলাকা থেকে করা ফোন। আর এই ফোনেই সূত্র পেয়ে গেল গোয়েন্দা দফতর।—চলবে।
h3>
আনন্দ পাল হত্যা রহস্য পরবর্তী পর্ব প্রকাশিত হবে আগামী বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি ২০২৬।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com