শান্তিনিকেতনে আশ্রম-বিদ্যালয় স্থাপনের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছিল কবিজীবনের নতুন অধ্যায়। এদেশের শিক্ষা-ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর মনে খেদ ছিল। যেভাবে ছোটোদের শিক্ষা দেওয়া হয়, তা নিয়ে মনে ক্ষোভ ছিল। স্কুলকে তাঁর মনে হত ‘যন্ত্র’ যেন! পড়ানো হয় ‘যান্ত্রিক পদ্ধতি’তে। প্রাচীন ভারতে এমনটি ছিল না। তপোবনের আদর্শ রবীন্দ্রনাথকে প্রাণিত করত। আশ্রমিক পরিবেশে বিদ্যালয়ের স্থাপনের স্বপ্ন দেখতেন। স্বপ্নদর্শী রবীন্দ্রনাথের সেই স্বপ্নকথা লেখা আছে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের লেখায়। তিনি কবির সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের সাক্ষী। বিদ্যালয়-স্থাপনের এই ইচ্ছা রবীন্দ্রনাথের মধ্যে খুবই তীব্র হয়ে উঠেছিল, সে সময় প্রিয়জনকে লেখা নানা চিঠিতে এসেছে এই স্কুল-তৈরির প্রসঙ্গ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় বন্ধু আচার্য জগদীশচন্দ্রকে লিখেছিলেন, ‘শান্তিনিকেতনে আমি একটি বিদ্যালয় খুলিবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিতেছি। সেখানে ঠিক প্রাচীন কালের গুরুগৃহ-বাসের মতো সমস্ত নিয়ম। বিলাসিতার নাম-গন্ধ থাকিবে না—ধনী-দরিদ্র সকলকেই কঠিন ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত হইতে হইবে। উপযুক্ত শিক্ষক কোনও মতেই খুঁজিয়া পাইতেছি না।… অসংযত প্রবৃত্তি এবং বিলাসিতাই আমাদিগকে ভ্রষ্ট করিতেছে—দারিদ্র্যকে সহজে গ্রহণ করিতে পারিতেছি না বলিয়াই সকল প্রকার দৈন্যে আমাদিগকে পরাভূত করিতেছে। তুমি যদি ইতিমধ্যে একবার এখানে এস তবে তোমাকে লইয়া আমার এই কাজটি পত্তন করিতে হইবে।’
ত্রিপুরার মহারাজ রবীন্দ্রনাথকে কিশোর-বয়সে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ত্রিপুরার প্রতি রবীন্দ্রনাথের দুর্বলতা ছিল। দুর্গম পথ পেরিয়ে অন্তত সাতবার গিয়েছিলেন ত্রিপুরায়। মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্যকে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন, আশ্রম-বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা। কেমন হবে সে বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষকরা কীভাবে পড়াবেন, প্রতি ক্লাসে কতজন ছাত্র থাকবে, সেই সঙ্গে ব্যায়ামচর্চার ব্যবস্থা রাখতেও যে আগ্রহী, সবই ত্রিপুরার রাজাকে বিশদে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথও বিদ্যালয়-স্থাপনের ব্যাপারে উৎসাহ প্রকাশ করেছিলেন। ‘পিতাঠাকুর’কে রবীন্দ্রনাথ শুধু আশ্বস্ত করেননি, দ্রুত বিদ্যালয়-স্থাপনের জন্য তৎপরও হয়েছেন। মহর্ষি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হোক। ‘শীঘ্র বিদ্যালয়ের কার্য আরম্ভ না হইলে তাহার জীবিতকাল অতিক্রান্ত হয়, এই তাঁর আশঙ্কা’ —এমনতরো আশঙ্কা মহর্ষি পোষণ করায় রবীন্দ্রনাথ একটু তাড়াহুড়ো করেই বিদ্যালয়-প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মহর্ষি বিদ্যালয়ের গৃহনির্মাণের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দান করেছিলেন। সেই টাকাতে তৈরি করা হয়েছিল বিদ্যালয়ের একতলার গৃহ।
ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথের অকাল-মৃত্যুতে ব্রহ্মবিদ্যালয়ের সচলতা বিঘ্নিত হয়। নানা পারিবারিক বিপর্যয়, অসুস্থতার মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয় গড়ার কাজে আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়েছিলেন। পাশে পেয়েছিলেন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়কে। রবীন্দ্রনাথ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর ভূমিকার কথা বারবার বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজের পুত্রকন্যাদের এই বিদ্যালয়েই পড়িয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র রথীন্দ্রনাথের বয়স তখন তেরো, কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের পাঁচ। পাঁচজন ছাত্রকে সম্বল করে যে আশ্রম-বিদ্যালয়ের সূচনা হয়েছিল, তার প্রতি মানুষের আস্থা অচিরেই বেড়েছে। সন্তানকে ঘরের কাছে কোনো স্কুলে না ভরতি করে পাঠিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে, কবির স্কুলে পড়ার জন্য। পরম নির্ভরতাতেই পাঠিয়েছেন। ভেবেছেন প্রিয় সন্তান আশ্রমিক-পরিবেশে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠবে।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন জহুরি। জহর চিনত ভুল হয়নি তাঁর। নিবেদিত-প্রাণ বহু শিক্ষককে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন। আপাতভাবে অতি সাধারণ, ভিতরে অপরিসীম জ্ঞানের আলো, সেই আলো রবীন্দ্রনাথের ঠিক নজরে পড়ে যেত। তাঁকে সাদরে আদরে নিয়ে এসেছেন আশ্রমে, করেছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক। রবীন্দ্রনাথ কত বড়ো জহুরি, তা অচিরেই বোঝা গিয়েছে।
শিলাইদহে জমিদারি-সেরেস্তায় যোগ দেওয়ার পর জগদানন্দ রায় ম্যালেরিয়া জ্বরে এতই ভুগতেন যে, একসময় রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল, তাঁকে বাঁচানো শক্ত হবে। ফলে আর দেরি করেননি কবি, ডাক দিয়েছেন তাঁকে শান্তিনিকেতনে। শান্তিনিকেতনে এসে শিক্ষকতায় ব্রতী হয়েছিলেন জগদানন্দ রায়।
শিলাইদহ থেকে শান্তিনিকেতনে ফেরার মুখে একদিন হঠাৎই জগদানন্দকে কাছে ডেকে রবীন্দ্রনাথ জানতে চেয়েছিলেন, জমিদারি-কাজে তিনি থাকতে চান, নাকি যেতে চান শান্তিনিকেতনে। জগদানন্দ সানন্দে জানিয়েছিলেন মনের কথা, ‘আমি নায়েব হতে চাই না, যেতে চাই শান্তিনিকেতনে।’ শুনে গুরুদেব বলেছিলেন ‘তথাস্তু’। জগদানন্দের মনে হয়েছিল হাতে যেন স্বর্গ পেয়েছেন তিনি। শান্তিনিকেতনে জগদানন্দ শুতেন ডবল মশারির ভেতরে। তাঁর পিছু পিছু বুঝি মশককুলও পৌঁছে গিয়েছিল আশ্রমে।
আশ্রম-বিদ্যালয় জগদানন্দ রায়ের মতো বেশ কিছু কৃতী মানুষ পড়াতেন। মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কুঞ্জলাল ঘোষ, শিবধন বিদ্যার্ণব, সতীশচন্দ্র রায়, অজিতকুমার চক্রবর্তী— এমন আরও কয়েকজন নিবেদিত-প্রাণ মানুষ, আশ্রম বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা যাঁদের কাছে ছিল জীবনের ব্রত। এই শিক্ষক-তালিকায় রবীন্দ্রনাথও আছেন। শান্তিনিকেতনে উপস্থিত না থাকলে, আশ্রমের দৈনন্দিন কাজকর্ম, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নিয়ে তিনি কতখানি চিন্তায়, দুশ্চিন্তায় থাকতেন, সে উদাহরণ আছে বিভিন্ন জনের স্মৃতিচর্চায়, এমনকি প্রিয়জনকে লেখা কবির চিঠিপত্রে।
রবীন্দ্রনাথ লেখালেখি, দৈনন্দিন কাজ, জড়ো হওয়া সাক্ষাৎপ্রার্থী —সব সামলে নিয়মিত ক্লাসও নিতেন। খুব ভালো পড়াতেন, বোঝাতেন। ইংরেজি ক্লাস হোক বা বাংলা ক্লাস, সমান মনোযোগ দিয়ে ছাত্ররা পড়া শুনত। কখনোসখনো শিক্ষকরাও কেউ কেউ এসে শেষের দিকে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মুগ্ধ হয়ে গুরুদেবের পড়ানো শুনতেন।
ছাত্রদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক ছিল। নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন তাদের। মধ্যরাতে বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙলে সবার আগে তাঁর মনে হত, ছাত্রাবাসে খড়ের ছাউনি দিয়ে নিশ্চিত জল পড়ছে। ঘুমিয়ে থাকা ছোটো ছোটো ছেলেরা হয়তো ভিজে যাচ্ছে। এসব ভেবে তাদের সামলাতে মধ্যরাতেও ছাত্রাবাসের দিকে হাঁটা দিতেন তিনি।
ছাত্রদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের কী গভীর ভালোবাসা ছিল! সে ভালোবাসায় কোনো খাদ ছিল না, ভিতর থেকে উঠে আসা। আশ্রম-পড়ুয়া ছোট ছোট ছেলেদের কথা ভেবে তিনি কতখানি আকুল হতেন, তা ধরা আছে নানা স্মৃতিকথায়। আশ্রম বিদ্যালয়ে অনেক দূরের ছাত্র পড়ত। বীরভূমের আর ক-জন, বহুদূর থেকে কবির স্কুলে ছেলেরা আসত। ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনা করত। আশ্রম-বিদ্যালয়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র।
এই আশ্রম-বাস ছিল বড়ো আনন্দের। একজনের আনন্দে অংশীদার হত সক্কলে। মিলেমিশে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার শিক্ষাই দেওয়া হত আশ্রমে। মালদার এক জমিদার তাঁর শিশুপুত্রকে পরম নির্ভরতায় ভরতি করেছিলেন কবির স্কুলে। আশ্রমে পড়াশোনার পরিবেশ যে অন্যরকম, অন্য কোনো স্কুলের সঙ্গে মেলানো যায় না, জমিদারমশায় সব জানতেন। কবির প্রতি তাঁর গভীর আস্থা ছিল। কারণে অকারণে-আশ্রম থেকে ছেলেকে বাড়ি নিয়ে আসা যায় না। নিয়ে এলে তার পড়াশোনারও ক্ষতি হবে,এ সবই জানতেন তিনি।
এদিকে ছেলের জন্মদিন, কী করে ছেলের জন্মদিন পালন করবেন, তা নিয়ে ভাবতে বসে ছেলেটির বাবা চমৎকার এক পথ খুঁজে পেলেন। তাঁর প্রাণের বাছা স্কুলে সব ছেলেদের নিয়ে জন্মদিন পালন করুক। সবাই মিলে আনন্দ করুক। এমনই মনে হয়েছিল জমিদারমশায়ের।
সেই ভাবনা সত্যি হয়ে উঠল জন্মদিনে। লোকমারফত মালদা থেকে বীরভূমে এলো অনেক অনেক খাবারদাবার। দই-মিষ্টি, মণ্ডা- মিঠাই। একসঙ্গে এত মিষ্টি! ছোটোরা, বড়োরা সবাই খুব আনন্দ করে খেলো। আশ্রমে যাঁরা কাজ করতেন, তাঁরাও খুব খুশি হলেন। একসঙ্গে হইহই করে খাওয়ার আনন্দই আলাদা। আনন্দ গড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
পেট ভরে মণ্ডা-মিঠাই খেয়ে ছেলেরা চলে গেল শোওয়ার ঘরে। রবীন্দ্রনাথ কাছেই ছিলেন, সবই লক্ষ করেছিলেন। তখন তিনি থাকতেন ‘দেহলি’তে। শান্তিনিকেতনে নিজের মনের মতো করে বেশ ক-টা বাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। একটা বাড়ি ছিল সম্পূর্ণ মাটির। সে বাড়ির নাম ‘শ্যামলী’।
‘দেহলি’র বিছানায় দেহ এলিয়ে দিয়েছিলেন কবি। কিছুতেই সেদিন রাতে ঘুম আসছিল না তাঁর। কেমন যেন অস্বস্তিবোধ করছিলেন । যে ছেলেটির হৈহৈ করে জন্মদিন পালিত হল, সেই নিষ্পাপ মুখটি চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। কবি আর থাকতে পারলেন না। পায়ে পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ‘দেহলি’ ছাড়িয়ে পৌঁছোলেন শিশু-বিভাগের ছাত্রাবাসে। কোথায় সেই জমিদারপুত্র! খুঁজতে লাগলেন তাকে।
তখন গ্রীষ্মকাল, দরজা খোলা। রবীন্দ্রনাথ ঢুকে পড়লেন ঘরের ভিতর। বিছানার পর বিছানা। সযত্নে মশারি টাঙানো। ছেলেরা নিশ্চিন্তে ঘুমচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একটু পরেই মনে হল, কার যেন কান্নার শব্দ, কোনও একটি ছেলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। খুব নিচু স্বরে কাঁদছে, সে যে ফোঁপাচ্ছে, তা বুঝতে রবীন্দ্রনাথের অসুবিধা হল না। তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন গুরুদেব। কেন কাঁদছে, তা ভুলেও জিজ্ঞাসা করলেন না। বুঝতে পারলেন, জন্মদিনে সে অনেক দূরে, বাবা-মার কথা মনে পড়ছে, বাড়ির কথা মনে পড়ছে, তাই এভাবে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
রবীন্দ্রনাথ তার পাশে বসলেন। বসেই বুঝতে পারলেন, চোখের জলে বালিশ ভিজে গেছে। কবিরও মন খারাপ হয়ে গেল। তাকে আদর করলেন, গল্প শোনালেন। গল্প শুনতে শুনতে কখন ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পারার পর, রবীন্দ্রনাথ নিশ্চিন্ত হলেন। পায়ে পায়ে ফিরে এলেন নিজের বাড়িতে, ‘দেহলি’তে।
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com