শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
প্রথমে জনঅরণ্য ছবির একটি দৃশ্য আজ। পোড়খাওয়া ‘মিডলম্যান’ বিশুবাবুর অফিসে ব্যবসায় নামার হালচাল জানার জন্য পৌঁছে গিয়েছে সোমনাথ। সে মেধাবী ছাত্র, গ্রাজুয়েশনের পর সিস্টেমের পাকেচক্রে খানিক জব্দ হয়েই ভাবছে ব্যবসা করবে। কীসের ব্যবসা? সেটাই বুঝিয়ে দেন জীবনে হঠাৎ করেই দেবদূতের মতো হাজির হওয়া বিশুবাবু। বিশ্বনাথ বোস। তো বিশ্বনাথবাবু যেখানে বসেন, সেই অফিসে হাজির হয় সোমনাথ। বিরাট অফিস এককালে পুরোটাই বিশুবাবুর ছিল, এখন ভাড়া দেন। অফিস মানে টেবিল। যত টেবিল ততো অফিস। প্রতি টেবিলে দুটি অফিস, সকালে ও রাতে। টেবিলের অধিকারীরা অফিস থেকে মাছ অর্থাৎ খরিদ্দার ধরতে বেরিয়ে গেছে। ব্যবসা করতে চাইলে প্রথমে তিনমাস বিনামূল্যে, তারপর স্থিত হলে মাসে অষ্ট আশি টাকা।

এ ভাবেই বিশুবাবু বন্ধুকৃত্য করবেন। বুঝিয়ে দেন এই ব্যবসা আলপিন থেকে এলিফ্যাণ্টের, কুলুঙ্গিতে শোভমান ওই বক্রতুণ্ড বিনায়ক গণেশের কৃপাদৃষ্টির জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে অনুঘটক হয়ে থাকা ‘মিডলম্যান’ বা ‘দালাল’ হয়ে উপার্জন। ব্যবসাটি অর্ডার সাপ্লাইয়ের। যেমন একবার বোম্বাইয়ের ফিল্ম কোম্পানি হাতি নিয়ে ফিল্ম করল। তাদের আর হাতি লাগবে না। জনৈক অবাঙালি ব্যবসায়ী হাতিটি কিনলেন। দালাল তাঁকে বুঝিয়েছিল যে কোনও সার্কাস কোম্পানি তা লুফে নেবে। শেষে, কিছুই হল না।
চারমাস ধরে হাজার হাজার টাকার হাতির খোরাকি দিতে দিতে তিনি যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় তখন বাঙালি দালাল বিশুবাবু দশদিনের মধ্যেই দশ পার্সেন্ট কমিশনে এই হাতির গল্পের সুষ্ঠু সমাধান করে নোটের তাড়া পকেটে পুরলেন। হস্তিনী হলে এতদিন প্লেনে চেপে সে বিদেশ পাড়ি দিতো। কিন্তু এটা ছিল জরদ্গব গ্র্যান্ডফাদার, তাও তার গতি হয়েছিল কিছু একটা। এই হল মিডলম্যানের মাহাত্ম্য। অর্ডার সাপ্লাই। ঘুরে ঘুরে অর্ডার জোগাড় করতে হবে। কোটেশন দিতে হবে। তার জন্য কোম্পানি খুলতে হবে। কোম্পানির নাম দিতে হবে। তার জন্য ভিজিটিং কার্ড, বিলবই, লেটারহেড ইত্যাদি লাগবে। সঙ্গে আরও দুটো কোম্পানি খুলতে হবে। তাদের নাম দিতে হবে। তাদের-ও কার্ড, বিল থাকবে। একটা আসল, দুটো ফাঁকি। আসলের দর কমিয়ে রেখে বাকিদের দর চড়িয়ে রাখতে হবে। তবে অর্ডার মিলবে। এসব হিসেব রাখার জন্য প্রথমে ডায়েরি মেনটেইন করতে হবে, ক্রমে ব্যবসা বাড়লে খাতা থাকবে। সেই খাতায় গণ্ডগোল রুখতে, সেলস ট্যাক্সের ‘প্রেমপত্র’ অর্থাৎ নোটিশ মোকাবিলা করতে উকিল-ও মজুত আছেন বৈকী।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২১ : পরশপাথর— ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে…

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৮: শূন্যতা ও পূর্ণতার প্রতীক, রামের প্রিয় অপরূপ হেমন্ত

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৪ : গরুর পালে বাঘ

এই দেশ এই মাটি, পর্ব-৯৩: কৈলাসচন্দ্রের কাছে রাজবংশের কাহিনি শুনে ত্রিপুরার প্রতি আকৃষ্ট হন রবীন্দ্রনাথ

সব মিলিয়ে এঁদের ভরসাতেই সোমনাথ এই ব্যবসাটিতে পা দেবে। যে টেবিল তার জন্য বরাদ্দ হয়েছে, তার অধিকারীটি দুমাস হল নিরুদ্দেশ, তাই টেবিল ফাঁকা। স্টেশনারি জিনিসপত্র, অর্থাৎ অফিসের প্রয়োজনীয় কাগজ, খাম ইত্যাদি নিয়ে পরিচিতদের সূত্র ধরে তাদের অফিসে সাপ্লাই দেওয়ার অর্ডার পাওয়াই এখন হবে তার লক্ষ্য। তবে বিশুবাবু তাঁকে পাখিপড়া করাবেন না, তিনি ওভাবে থাকবেন না মোটেই। তিনি হলেন লঞ্চিং প্যাড। বারুদ ভরে রকেট ছেড়ে দিলেন, এবার কি রকেট চাঁদে যাবে? কী তার লক্ষ্য? চাঁদের কাছাকাছিই, চাঁদি, অর্থ, রূপালি ঝকঝকে টাকা।

এবার, আবার, সোনার কাছে ফেরা যাক। পরশপাথর। জনঅরণ্যে পণ্যায়িত বিশ্বে “মালের” আদান-প্রদানের নেপথ্যে ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে থাকা ঐন্দ্রজালিক মিডলম্যান দালালের ভূমিকাটি দেখায়। এই বিচিত্র জগতে রাষ্ট্র থেকে সমাজ নিমেষেই মানুষকে এমন মধ্যসত্বভোগী করে তোলে, নিমেষেই মানুষ-ও হয়ে ওঠে পণ্য, বিক্রয়যোগ্য, হস্তান্তরযোগ্য, জীবন তখন মূল্যমানে কিনে নেওয়া যায়, বেচে দেওয়া যায়। এখানে মানুষই ক্রেতা, মানুষই বিক্রেতা, মানুষই পণ্য, মানুষই দালাল। সকলেই ছুটছে ওই চাঁদ কিংবা চাঁদির লক্ষ্যে। এমন-ই পণ্যবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে হলুদ ধাতু সোনা। তার ওঠাপড়াতেও ওই চাঁদ আর চাঁদির জগতে আলোড়ন পড়ে যায়।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১২১: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২১: বিবাহ সংবাদ, আদিনাথ-গোরা

আমরা দেখেছি, পরশপাথরের পরম স্পর্শে পরেশবাবু সোনা তৈরি করে, আর তা বেচে কেষ্টবিষ্টু হয়ে উঠেছিলেন। তারপর একদিন সেই বার্তা রটে গেল দিগ্বিদিক। কেমন করে, তা তো আমরা দেখেছি আগের পর্বে। তবে এই অনৈসর্গিক কিংবা অসামাজিক, বেআইনি কাজে প্রতিফল পুলিশ, হাজত, অপমান ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তার চেয়ে বড় অঘটন ঘটে যেতে পারে ওই পণ্যবিশ্বের দুনিয়ায়। সোনা অক্ষয়, অমূল্য এই বিশ্বাস যদি একটিবার টলে যায়, তবে সমাজের সকল স্তরের মানুষ তাদের সংগ্রহে থাকা দুর্মূল্য সোনা বেচে দেবে। কেন? কারণ যা অমূল্য, তা-ই আধিক্যবশত এখন মূল্যহীন। পরশপাথরের ছোঁয়ায় সোনা তৈরি করা যাচ্ছে যে! তবে আরও বড় ধাক্কা আসে শেয়ার মার্কেটে, সোনার মূল্যের সঙ্গে তার যে অচ্ছেদ্য বন্ধন। সোনায় চড়ে তার ওঠা-পড়া। এই ভাবরাজ্যে আলোড়ন উঠলে সেই গজদন্তমিনার পড়তে কতক্ষণ? তাই জলের দরে সোনা বেচে লুটিয়ে পড়ে গরীব, শেয়ারে টাকা হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে ধনকুবের। তাহলে? পরশপাথরের ছোঁয়ায়, মধ্যস্থতায় এই পণ্যবিশ্বের নিয়ন্ত্রক সোনা হয়ে ওঠে লোহার মতো সুলভ ধাতু। পরেশবাবুও এমন করেই জনসাধারণের মধ্য থেকে অসাধারণ হয়েছেন। লোহা যেমন করে সোনা হয়। তাই ডালহৌসির অফিসপাড়ায় ক্যামেরা দূর থেকে বহুজনের মাঝে তাকে দেখাতে থাকে, ক্রমে ক্রমে তিনি এক, অদ্বিতীয় হন। যেমন করে সোনা হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রক। তবে এই “হয়ে ওঠার” ভিত্তিমূল অসত্য, অপার্থিবের মায়াবৃত। তাই তা থাকে না, ভেঙে পড়ে, ছবিটি দেখায় সেই সম্ভাবনার ক্ষেত্রটিকে, যা হতে পারে, তাকে। যা রূঢ় বাস্তব, সেটিকেও। জীবন সেই অসত্যের মায়াজাল থেকে মুক্তি পায়, পরশপাথর বিলীন হলেই আবার নকল সোনা হয়ে ওঠে লোহা। যা প্রকৃত-ই অমূল্য তা অটুট থাকে, কেবল টুটে যায় মোহ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৯: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — চিতল হরিণ

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী

পরশপাথরে পণ্যবিশ্বে যে আঘাত ঘনীভূত হতে বসেছিল তা এক সঙ্কেত কেবল। শূন্য ও অযথার্থের নিয়ন্ত্রণ ক্ষণস্থায়ী। পরশপাথরের ছোঁয়া যেমন লোহাকে সোনা করে, তেমনই তথাকথিত “মিডলম্যানের” মধ্যস্থতায়, দালালিতে পণ্য হয়ে ওঠে বিক্রয়যোগ্য। সেখানে মূল্যমান, গুণমান ইত্যাদি প্রভৃতি সকলই আপেক্ষিক। কেবল সত্য হল পণ্য হয়ে ওঠা, পণ্য করে তোলা। দালাল তাই নিজেও এই ব্যবস্থাপনার একটা অংশ নয় কেবল, সেও পণ্য-ই। দরকারে বেচে দেয় বিবেক, বুদ্ধি, সম্মান। পরশপাথর যে মতিভ্রম ঘটিয়েছিল তা থেকে পরেশবাবু বেরিয়ে আসতে পারলেও সোমনাথ পারে কি? মনে হয়, না। পণ্যের গ্রাসে গ্রস্ত হয়ে উত্তরণের পথটিই আর থাকে না, যদি সেই জগতে উত্তরণের আপাত সামাজিক ধারণাটি গ্রাহ্য হয়ে থাকে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

ছবির শেষে সেই গভীরতর অন্ধলোকে প্রবেশটি দেখা যায়, মানুষ থেকে সে হয়ে ওঠে দালাল, পণ্যের দুনিয়ায় বুঝি সার্থক হয় সে। গত শতাব্দীর ছয়ের দশক ও সাতের দশকে নির্মিত পরশপাথর ও জনঅরণ্য কমবেশি দশ বছরের ব্যবধানে মানুষের বোধ ও বিবেকের জগতে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনটি ধরতে চেয়েছে। কেন্দ্রে কোনও না কোনও ভাবে থেকে যায় উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বের সঙ্কট, যা জীবনবোধ, শিক্ষা, বৃত্তি, প্রতিষ্ঠা, অর্জন, উপার্জন সকল কিছুর দিকে ছুড়ে দেয় প্রশ্ন, বিদ্রূপ। সোনার ক্ষণিক বিচলন তুফান তোলে চাঁদের, চাঁদির, পণ্যের জগতে। পরশপাথর সেই রহস্যলোকের সঙ্কট থেকে মুক্তির কথা বললেও জনঅরণ্যে সেই শ্বাপদসঙ্কুল পণ্যবিশ্বের আগ্রাসনটিই মুখ্য, একমাত্র লক্ষ্য, মোক্ষ, পরিণাম ও সত্য। সুচেতনা কি সেখানে দূরতর দ্বীপের গল্প হয়েই থেকে যায়?—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content