
পুত্রশোকের দগদগে ঘা বুকে নিয়েও পরদিন প্রভাতে লোভী ব্রাহ্মণ হরিদত্ত একবাটি দুধ হাতে পুনরায় সেই বল্মীকস্তূপের সামনে উপস্থিত হলেন। পুত্রের মৃত্যু শোকের চেয়েও তাঁর কাছে তখন প্রবল হয়ে উঠেছে স্বর্ণমুদ্রার লোভ। তিনি সেই গর্তের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে সর্পরাজকে আহ্বান করতে লাগলেন, কণ্ঠে তাঁর সেই পুরাতন স্তবগান।
প্রথমদিকে বল্মীকস্তূপের ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলল না। কিন্তু হরিদত্ত নাছোড়বান্দা, বারবার আর্তনাদ করে তিনি সর্পরাজকে ডাকতে থাকলেন। দীর্ঘক্ষণ পর গর্তের অন্ধকার থেকে সর্পের হিসহিসে কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “ওহে ব্রাহ্মণ! তুমি বড়ই নির্লজ্জ। সদ্যমৃত পুত্রের চিতার আগুন এখনো নেভেনি, অথচ তুমি শোক ভুলে কেবল অর্থের লোভে আমার কাছে ছুটে এসেছ? যে আমি তোমার পুত্রের হন্তা, আজ তুমি এসেছ আমারই সঙ্গে সন্ধি করতে? জেনে রেখো, পূর্বের সেই মিত্রতা আর আমাদের মধ্যে সম্ভব নয়।”
প্রথমদিকে বল্মীকস্তূপের ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলল না। কিন্তু হরিদত্ত নাছোড়বান্দা, বারবার আর্তনাদ করে তিনি সর্পরাজকে ডাকতে থাকলেন। দীর্ঘক্ষণ পর গর্তের অন্ধকার থেকে সর্পের হিসহিসে কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “ওহে ব্রাহ্মণ! তুমি বড়ই নির্লজ্জ। সদ্যমৃত পুত্রের চিতার আগুন এখনো নেভেনি, অথচ তুমি শোক ভুলে কেবল অর্থের লোভে আমার কাছে ছুটে এসেছ? যে আমি তোমার পুত্রের হন্তা, আজ তুমি এসেছ আমারই সঙ্গে সন্ধি করতে? জেনে রেখো, পূর্বের সেই মিত্রতা আর আমাদের মধ্যে সম্ভব নয়।”
ব্রাহ্মণ কোনও উত্তর দিতে পারলেন না, কেবল নতমস্তকে দাঁড়িয়ে রইলেন। গর্তের ভিতর থেকে সর্পরাজ পুনরায় শ্লোক আবৃত্তি করলেন—
“চিতিকাং দীপিতাং পশ্য ফটাং ভগ্নাং মৈব চ।
ভগ্নশ্লিষ্টা তু যা প্রীতির্ন সা স্নেহেন বর্ধতে।। [কাকোলূকীযম্, ১৩৩]
অর্থাৎ হে বিপ্র! শ্মশানে তোমার পুত্রের জ্বলন্ত চিতা আর আমার এই ভগ্ন দ্বিধাবিভক্ত ফণাটির দিকে তাকাও। তোমার পুত্র আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল, আর আত্মরক্ষার্থে আমি তাকে দংশন করেছি। এই ঘটনা আমরা কেউ ভুলতে পারব না। আমার এই ভগ্ন ফণার মতোই আমাদের বন্ধুত্বেও আজ চিড় ধরেছে। ভাঙা প্রেম যেমন জোড়া দিলেও দাগ থেকে যায়, তেমনই আমাদের হৃদয়ে একে অপরের প্রতি যে অবিশ্বাস ও বৈরিতা জন্ম নিয়েছে, তা কোনো স্নেহের প্রলেপেই আর সারবে না। আমি যেমন আমার ভগ্ন মস্তকের কথা ভুলব না, তুমিও তেমনই পুত্রের হন্তারককে মন থেকে ক্ষমা করতে পারবে না। অবচেতনে এই প্রতিহিংসার আগুন আমাদের পুড়িয়ে মারবে। তুমি তো এসেছো আমার কাছে স্বর্ণমুদ্রার লোভে, আসলে যেখানে স্বর্ণমুদ্রার ঝনঝনানি, সেখানে সন্তানের চিতার আগুনও ম্লান হয়ে যায়।”
এই পরম সত্য উচ্চারণের পর, সাপটি গর্তের ভিতর থেকে একটি বহুমূল্য হীরকখণ্ড ব্রাহ্মণের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “অতঃপরং পুনস্ত্বয়া ন আগন্তব্যম্— এরপর তুমি আর কখনও এখানে এসো না। এই আমাদের শেষ সাক্ষাৎ।” ব্রাহ্মণ সেই হীরকখণ্ডটি হাতে নিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি দেখলেন, সাপটি ধীরে ধীরে বল্মীকস্তূপের গহীন অন্ধকারে চিরতরে হারিয়ে গেল।
“চিতিকাং দীপিতাং পশ্য ফটাং ভগ্নাং মৈব চ।
ভগ্নশ্লিষ্টা তু যা প্রীতির্ন সা স্নেহেন বর্ধতে।। [কাকোলূকীযম্, ১৩৩]
অর্থাৎ হে বিপ্র! শ্মশানে তোমার পুত্রের জ্বলন্ত চিতা আর আমার এই ভগ্ন দ্বিধাবিভক্ত ফণাটির দিকে তাকাও। তোমার পুত্র আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল, আর আত্মরক্ষার্থে আমি তাকে দংশন করেছি। এই ঘটনা আমরা কেউ ভুলতে পারব না। আমার এই ভগ্ন ফণার মতোই আমাদের বন্ধুত্বেও আজ চিড় ধরেছে। ভাঙা প্রেম যেমন জোড়া দিলেও দাগ থেকে যায়, তেমনই আমাদের হৃদয়ে একে অপরের প্রতি যে অবিশ্বাস ও বৈরিতা জন্ম নিয়েছে, তা কোনো স্নেহের প্রলেপেই আর সারবে না। আমি যেমন আমার ভগ্ন মস্তকের কথা ভুলব না, তুমিও তেমনই পুত্রের হন্তারককে মন থেকে ক্ষমা করতে পারবে না। অবচেতনে এই প্রতিহিংসার আগুন আমাদের পুড়িয়ে মারবে। তুমি তো এসেছো আমার কাছে স্বর্ণমুদ্রার লোভে, আসলে যেখানে স্বর্ণমুদ্রার ঝনঝনানি, সেখানে সন্তানের চিতার আগুনও ম্লান হয়ে যায়।”
এই পরম সত্য উচ্চারণের পর, সাপটি গর্তের ভিতর থেকে একটি বহুমূল্য হীরকখণ্ড ব্রাহ্মণের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “অতঃপরং পুনস্ত্বয়া ন আগন্তব্যম্— এরপর তুমি আর কখনও এখানে এসো না। এই আমাদের শেষ সাক্ষাৎ।” ব্রাহ্মণ সেই হীরকখণ্ডটি হাতে নিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি দেখলেন, সাপটি ধীরে ধীরে বল্মীকস্তূপের গহীন অন্ধকারে চিরতরে হারিয়ে গেল।
৬ষ্ঠ কাহিনি সমাপ্ত
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি পর্ব-৯২: অবিবেচনা যত দ্রুত সিদ্ধান্ত আনে, তত দ্রুত ধ্বংসও আনে

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২০ : চারুলতা-মহানগর — বীক্ষণযন্ত্র

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫০: মধ্যরাতের বিপদ-আপদ
কাহিনি শেষ করে মন্ত্রী রক্তাক্ষ মহারাজের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহারাজ, এই গল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে আমার সুচিন্তিত অভিমত হল, বায়সরাজ মেঘবর্ণের এই মন্ত্রী স্থিরজীবীকে অবিলম্বে হত্যা করা উচিত। কারণ, এখন আপনারা মুখে বন্ধুত্বের কথা বললেও, অন্তরে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারবেন না। আপনি ভুলতে পারবেন না যে আপনি বায়সকুলকে ধ্বংস করেছেন, আর স্থিরজীবীও ভুলবেন না যে তাঁর স্বজাতি নিধনের জন্য আপনিই দায়ী। সাপের সেই ভগ্ন ফণার মতোই ভাঙা বিশ্বাস আর জোড়া লাগে না। তাছাড়া একে হত্যা করলে আপনার রাজ্য নিষ্কণ্টক হবে, ভবিষ্যতে আর কোনো উপদ্রবের সম্ভাবনা থাকবে না।”
মন্ত্রী রক্তাক্ষের এই কঠোর যুক্তি শুনে উলূকরাজ অরিমর্দন খানিক ভাবিত হলেন। তারপর তিনি অপর মন্ত্রী ক্রূরাক্ষকে প্রশ্ন করলেন, “ভদ্র!ত্বন্তু কিং মন্যসে? — হে ভদ্র! এ বিষয়ে আপনার কী মতামত?”
ক্রূরাক্ষ কিছুক্ষণ মৌন থেকে ধীরস্বরে বললেন, “হে রাজন! আমি মন্ত্রী রক্তাক্ষের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। তাঁর পরামর্শ মেনে এই বৃদ্ধ মন্ত্রীকে হত্যা করলে তা হবে অত্যন্ত নির্দয় ও কাপুরুষোচিত কাজ। আমাদের শাস্ত্রে বলে, শত্রুই হোক বা মিত্র—শরণাগতকে কদাচ হত্যা করতে নেই। শরণাগতো ন বধ্যতে। এ প্রসঙ্গে প্রাচীন একটি নীতিকথা প্রচলিত আছে—
শ্রূযতে হি কপোতেন শত্রুঃ শরণমাগতঃ।
পূজিতশ্চ যথান্যাযং স্বৈশ্চ মাংসৈর্নিমন্ত্রিতঃ।। (ঐ, ১৩৪)
শোনা যায়, কোনও এক কপোত (পায়রা) তার পরম শত্রু এক ব্যাধকে নিজের বাসায় আশ্রয় দিয়েছিল। কেবল তাই নয়, সেই শত্রুর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে নিজের দেহের মাংস দিয়ে তার ক্ষুধা নিবৃত্ত করেছিল।”
মহারাজ অরিমর্দন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কথমেতৎ? — সে কী রকম ব্যাপার?”
ক্রূরাক্ষ তখন বলতে শুরু করলেন—
মন্ত্রী রক্তাক্ষের এই কঠোর যুক্তি শুনে উলূকরাজ অরিমর্দন খানিক ভাবিত হলেন। তারপর তিনি অপর মন্ত্রী ক্রূরাক্ষকে প্রশ্ন করলেন, “ভদ্র!ত্বন্তু কিং মন্যসে? — হে ভদ্র! এ বিষয়ে আপনার কী মতামত?”
ক্রূরাক্ষ কিছুক্ষণ মৌন থেকে ধীরস্বরে বললেন, “হে রাজন! আমি মন্ত্রী রক্তাক্ষের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। তাঁর পরামর্শ মেনে এই বৃদ্ধ মন্ত্রীকে হত্যা করলে তা হবে অত্যন্ত নির্দয় ও কাপুরুষোচিত কাজ। আমাদের শাস্ত্রে বলে, শত্রুই হোক বা মিত্র—শরণাগতকে কদাচ হত্যা করতে নেই। শরণাগতো ন বধ্যতে। এ প্রসঙ্গে প্রাচীন একটি নীতিকথা প্রচলিত আছে—
শ্রূযতে হি কপোতেন শত্রুঃ শরণমাগতঃ।
পূজিতশ্চ যথান্যাযং স্বৈশ্চ মাংসৈর্নিমন্ত্রিতঃ।। (ঐ, ১৩৪)
শোনা যায়, কোনও এক কপোত (পায়রা) তার পরম শত্রু এক ব্যাধকে নিজের বাসায় আশ্রয় দিয়েছিল। কেবল তাই নয়, সেই শত্রুর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে নিজের দেহের মাংস দিয়ে তার ক্ষুধা নিবৃত্ত করেছিল।”
মহারাজ অরিমর্দন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কথমেতৎ? — সে কী রকম ব্যাপার?”
ক্রূরাক্ষ তখন বলতে শুরু করলেন—
০৮. পায়রা আর ব্যাধের কথা
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৫: রাজসূয় যজ্ঞের সূচনায় মতবিনিময়ে নিহিত বৈচিত্র্যময় মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র
সে বহু কাল আগের কথা। এক গহন অরণ্যে বাস করত এক দুরাচারী ব্যাধ। জীবিকা তার পশুপাখি শিকার, কিন্তু স্বভাবে সে ছিল বড়ই নিষ্ঠুর ও ক্রূর। অরণ্যের নিরীহ প্রাণিকুলের কাছে সে ছিল সাক্ষাৎ দ্বিতীয় যমরাজ, এক জীবন্ত মৃত্যুর দূত। তার এই হৃদয়হীন আচরণের জন্য কেউ তাকে পছন্দ করত না, এমনকি তার এই পৈশাচিক জীবিকাকে আত্মীয়-পরিজনও সমর্থন করতে পারেনি। একে একে সকলেই তাকে পরিত্যাগ করে চলে গিয়েছিল।
বাস্তবিকই, যে ব্যক্তি অত্যন্ত কঠোর এবং দুরাচারী, যে নিজের উদরপূর্তির জন্য অন্যের প্রাণ হরণ করতে কুণ্ঠিত হয় না, লোকে তাকে বিষধর সর্পের মতোই ভয় পায়। তাকে বিশ্বাস করা তো দূরের কথা, তার ছায়াও কেউ মাড়াতে চায় না। সেই বন্ধুহীন, স্বজনহীন ব্যাধ ছিল জগতে বড়ই একা।
প্রতিদিনের অভ্যেসমতো সেদিনও সে হাতে একটি খাঁচা আর যমদণ্ডের মতো এক বিশাল লাঠি নিয়ে শিকারের সন্ধানে অরণ্যের গভীরে প্রবেশ করল। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ তার নজরে এল একটি কপোতী (স্ত্রী-পায়রা)। শিকারি চোখের পলকে সেই অসহায় পাখিটিকে ধরে নিজের খাঁচায় বন্দি করল। শিকার হাতে পাওয়ার পর সে যখন আরও কিছু পাওয়ার লোভে পুনরায় বিচরণ শুরু করল, ঠিক তখনই প্রকৃতির রূপ পালটে গেল।
অকস্মাৎ গগনমণ্ডল কালমেঘে আচ্ছন্ন হয়ে এল। সেইসঙ্গে শুরু হল ঝড়ের প্রলয়ঙ্কর তাণ্ডব। মুহূর্তের মধ্যে দিনের আলো নিভে গিয়ে নেমে এল অমানিশার ঘোর অন্ধকার। ঝড়ের দাপটে অরণ্যের মহীরূহরা উন্মত্তের মতো দুলতে শুরু করল—সমগ্র অরণ্য যেন এক ভয়াবহ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হল। পরক্ষণেই আকাশ ভেঙে নামল মুষলধারে বৃষ্টি। প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তি দেখে সেই পাষাণহৃদয় ব্যাধও আজ ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গেল। প্রাণভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে আশ্রয়ের খোঁজে চারদিকে দিশাহারা হয়ে তাকাতে লাগল।
বাস্তবিকই, যে ব্যক্তি অত্যন্ত কঠোর এবং দুরাচারী, যে নিজের উদরপূর্তির জন্য অন্যের প্রাণ হরণ করতে কুণ্ঠিত হয় না, লোকে তাকে বিষধর সর্পের মতোই ভয় পায়। তাকে বিশ্বাস করা তো দূরের কথা, তার ছায়াও কেউ মাড়াতে চায় না। সেই বন্ধুহীন, স্বজনহীন ব্যাধ ছিল জগতে বড়ই একা।
প্রতিদিনের অভ্যেসমতো সেদিনও সে হাতে একটি খাঁচা আর যমদণ্ডের মতো এক বিশাল লাঠি নিয়ে শিকারের সন্ধানে অরণ্যের গভীরে প্রবেশ করল। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ তার নজরে এল একটি কপোতী (স্ত্রী-পায়রা)। শিকারি চোখের পলকে সেই অসহায় পাখিটিকে ধরে নিজের খাঁচায় বন্দি করল। শিকার হাতে পাওয়ার পর সে যখন আরও কিছু পাওয়ার লোভে পুনরায় বিচরণ শুরু করল, ঠিক তখনই প্রকৃতির রূপ পালটে গেল।
অকস্মাৎ গগনমণ্ডল কালমেঘে আচ্ছন্ন হয়ে এল। সেইসঙ্গে শুরু হল ঝড়ের প্রলয়ঙ্কর তাণ্ডব। মুহূর্তের মধ্যে দিনের আলো নিভে গিয়ে নেমে এল অমানিশার ঘোর অন্ধকার। ঝড়ের দাপটে অরণ্যের মহীরূহরা উন্মত্তের মতো দুলতে শুরু করল—সমগ্র অরণ্য যেন এক ভয়াবহ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হল। পরক্ষণেই আকাশ ভেঙে নামল মুষলধারে বৃষ্টি। প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তি দেখে সেই পাষাণহৃদয় ব্যাধও আজ ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গেল। প্রাণভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে আশ্রয়ের খোঁজে চারদিকে দিশাহারা হয়ে তাকাতে লাগল।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫২: আকাশ এখনও মেঘলা

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৭: পরবাস প্রস্তুতি (তিন)
অবশেষে সে একটি বিশাল বনস্পতির নিচে এসে উপস্থিত হল। সেই মহাবৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় নেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ঝড়বৃষ্টির বেগ কমল। মেঘ সরে গিয়ে আকাশ আবার নির্মল হয়ে উঠল, ফুটে উঠল অগণিত নক্ষত্র। তখন গভীর রাত্রি। ব্যাধ চিন্তা করল, এই দুর্যোগপূর্ণ রাতে এমন ঘন অরণ্যের পথ অতিক্রম করে বাড়ি ফেরা অসম্ভব। তাই এই বৃক্ষতলই হোক আজ আমার রাত্রিবাসের স্থান।
শীতে কম্পমান ও ক্ষুধায় মূর্ছিতপ্রায় সেই ব্যাধ তখন সেই মহাবৃক্ষের উদ্দেশ্যে কৃতাঞ্জলিপুটে এক করুণ প্রার্থনা জানাল—
“এই বৃক্ষে যে দেবতা বা প্রাণীই অবস্থান করছেন, আজ এই ঘোর বিপদের দিনে আমি তাঁরই শরণাগত হলাম। শীতে ও ক্ষুধায় আমি আজ মৃতপ্রায়, তিনি যেন আমাকে এই সংকট থেকে রক্ষা করেন—তস্যাঽহং শরণং প্রাপ্তঃ স পরিত্রাতু মামিতি।।”
ভাগ্যক্রমে সেই বৃক্ষেরই শাখায় বহু কাল ধরে বাস করত এক কপোত (পুরুষ পায়রা)। সেই মুহূর্তে সে তার স্ত্রী অর্থাৎ কপোতীর অবর্তমানে গভীর শোকে মগ্ন হয়ে বিলাপ করছিল— “হায়! সেই যে সে গেল, আর তো ফিরল না! ঝড় থামল, বৃষ্টি থামল, কিন্তু আমার প্রিয়া তো ফিরে এল না! তার কোনো অনিষ্ট হলো না তো? তাকে ছাড়া আজ আমার এই ঘর যে বড়ই শূন্য। আমার সেই পতিব্রতা পত্নী নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসত আমাকে। সারাদিন তার কেবল একটাই চিন্তা ছিল—কীসে তার স্বামীর মঙ্গল হবে। এমন গুণবতী স্ত্রীর পতি হয়ে আমি সত্যই ধন্য হয়েছিলাম।”
কপোত শোকাতুর কণ্ঠে আরও বলল— “পণ্ডিতরা যথার্থই বলেন—
ন গৃহং গৃহমিত্যাহুঃ গৃহিণী গৃহমুচ্যতে।
গৃহস্তু গৃহিণীহীনমরণ্যসদৃশং মতম্।।” [ঐ, ১৩৯]
অর্থাৎ: ইট-কাঠ-পাথরের তৈরি ঘরকে প্রকৃতপক্ষে ‘গৃহ’ বলা যায় না, ঘরের গৃহিণীই হলেন আসল ‘গৃহ’। যে ঘরে গৃহিণী নেই, সেই ঘর তো অরণ্যেরই সমান। ভার্যাশূন্য গৃহে বাস আর বনবাস—উভয়ই সমান যন্ত্রণাদায়ক।”
শীতে কম্পমান ও ক্ষুধায় মূর্ছিতপ্রায় সেই ব্যাধ তখন সেই মহাবৃক্ষের উদ্দেশ্যে কৃতাঞ্জলিপুটে এক করুণ প্রার্থনা জানাল—
“এই বৃক্ষে যে দেবতা বা প্রাণীই অবস্থান করছেন, আজ এই ঘোর বিপদের দিনে আমি তাঁরই শরণাগত হলাম। শীতে ও ক্ষুধায় আমি আজ মৃতপ্রায়, তিনি যেন আমাকে এই সংকট থেকে রক্ষা করেন—তস্যাঽহং শরণং প্রাপ্তঃ স পরিত্রাতু মামিতি।।”
ভাগ্যক্রমে সেই বৃক্ষেরই শাখায় বহু কাল ধরে বাস করত এক কপোত (পুরুষ পায়রা)। সেই মুহূর্তে সে তার স্ত্রী অর্থাৎ কপোতীর অবর্তমানে গভীর শোকে মগ্ন হয়ে বিলাপ করছিল— “হায়! সেই যে সে গেল, আর তো ফিরল না! ঝড় থামল, বৃষ্টি থামল, কিন্তু আমার প্রিয়া তো ফিরে এল না! তার কোনো অনিষ্ট হলো না তো? তাকে ছাড়া আজ আমার এই ঘর যে বড়ই শূন্য। আমার সেই পতিব্রতা পত্নী নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসত আমাকে। সারাদিন তার কেবল একটাই চিন্তা ছিল—কীসে তার স্বামীর মঙ্গল হবে। এমন গুণবতী স্ত্রীর পতি হয়ে আমি সত্যই ধন্য হয়েছিলাম।”
কপোত শোকাতুর কণ্ঠে আরও বলল— “পণ্ডিতরা যথার্থই বলেন—
ন গৃহং গৃহমিত্যাহুঃ গৃহিণী গৃহমুচ্যতে।
গৃহস্তু গৃহিণীহীনমরণ্যসদৃশং মতম্।।” [ঐ, ১৩৯]
অর্থাৎ: ইট-কাঠ-পাথরের তৈরি ঘরকে প্রকৃতপক্ষে ‘গৃহ’ বলা যায় না, ঘরের গৃহিণীই হলেন আসল ‘গৃহ’। যে ঘরে গৃহিণী নেই, সেই ঘর তো অরণ্যেরই সমান। ভার্যাশূন্য গৃহে বাস আর বনবাস—উভয়ই সমান যন্ত্রণাদায়ক।”
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮০ : হাত বাড়ালেই বন্ধু

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
বিধাতার কী অমোঘ লীলা! সেই গাছের নিচেই শিকারির খাঁচায় বন্দি ছিল তার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী, যার জন্য গাছের ডালে বসে কপোত হাহাকার করছিল। নিঝুম রাতে পতির এই করুণ বিলাপ খাঁচাবন্দি কপোতীর কানে পৌঁছল। স্বামীর মুখে নিজের প্রতি এমন গভীর অনুরাগ ও প্রশংসা শুনে বন্দি অবস্থাতেও সে পরম তৃপ্তি লাভ করল।
তখন খাঁচার ভিতর থেকে সাধ্বী কপোতী তার স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলল, “স্বামী! আমি এখানেই আছি। আমার জন্য ভেবো না। শাস্ত্রে বলে, যে স্ত্রীর আচরণে তার পতি সন্তুষ্ট নন, তার স্ত্রী হওয়ার কোনো যোগ্যতাই নেই। পতি প্রসন্ন হলেই স্ত্রীর ওপর সমস্ত দেবতারা প্রসন্ন হন। পতিই নারীর একমাত্র গতি। পতির ভালোবাসা যার ভাগ্যে জোটে না, তার জীবন দাবানলে দগ্ধ পুষ্পহীন লতার মতোই শুষ্ক ও নিরর্থক—সে সমাজে বেঁচে থেকেও যেন মৃতপ্রায়। ভেবে দেখো—পিতা, ভ্রাতা বা পুত্র, এঁরা নারীকে যা দান করেন তার একটা সীমা আছে; কিন্তু একমাত্র পতিই পারেন তাঁর সহধর্মিণীকে অসীম সুখ ও ঐশ্বর্যে ভরিয়ে দিতে। তাই এমন কোন নারী আছে, যে এই পরম হিতকারী পতিদেবতাকে পুজো না করে থাকতে পারে? কিন্তু এখন ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের সময় নয়।”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সেই কপোতী আবার বলল, “হে প্রিয়তম! আমি এখন তোমাকে যে হিতকারী কথাগুলো বলছি, তা মন দিয়ে শোনো। নিচে যে ব্যাধ আশ্রয় নিয়েছে, সে এখন আর আমাদের শত্রু নয়, সে তোমার অতিথি। শাস্ত্রের বিধান হলো—“নিজের প্রাণ দিয়ে হলেও শরণাগত ব্যক্তিকে রক্ষা করা ধর্ম।—প্রাণৈরপি ত্বয়া নিত্যং সংরক্ষ্যঃ শরণাগতঃ।”
সে আরও বুঝিয়ে বলল, “শীতে ও ক্ষুধায় কাতর হয়ে এই ব্যাধ তোমার ঘরের আঙিনায় এসে পড়েছে। তুমি একে সাদরে গ্রহণ করো, যথাসাধ্য সেবা দিয়ে একে সুস্থ করে তোলো। কারণ পণ্ডিতরা বলেন—
যঃ সায়মতিথিং প্রাপ্তং যথাশক্তি ন পূজয়েৎ।
তস্যাসৌ দুষ্কৃতং দত্ত্বা সুকৃতঞ্চাপকর্ষতি।। [ঐ, ১৫৪]
অর্থাৎ দিন শেষে ঘরে আগত অতিথিকে যে গৃহস্থ নিজের সাধ্যমতো সৎকার বা আপ্যায়ন করে না, সেই অতিথি নিজের সমস্ত পাপ সেই গৃহস্থকে দিয়ে, গৃহস্থের অর্জিত সমস্ত পুণ্য হরণ করে নিয়ে চলে যায়। অতএব, ধর্মরক্ষা করতে হলে তুমি অবিলম্বে এই অতিথির সৎকার করো।”—চলবে।
তখন খাঁচার ভিতর থেকে সাধ্বী কপোতী তার স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলল, “স্বামী! আমি এখানেই আছি। আমার জন্য ভেবো না। শাস্ত্রে বলে, যে স্ত্রীর আচরণে তার পতি সন্তুষ্ট নন, তার স্ত্রী হওয়ার কোনো যোগ্যতাই নেই। পতি প্রসন্ন হলেই স্ত্রীর ওপর সমস্ত দেবতারা প্রসন্ন হন। পতিই নারীর একমাত্র গতি। পতির ভালোবাসা যার ভাগ্যে জোটে না, তার জীবন দাবানলে দগ্ধ পুষ্পহীন লতার মতোই শুষ্ক ও নিরর্থক—সে সমাজে বেঁচে থেকেও যেন মৃতপ্রায়। ভেবে দেখো—পিতা, ভ্রাতা বা পুত্র, এঁরা নারীকে যা দান করেন তার একটা সীমা আছে; কিন্তু একমাত্র পতিই পারেন তাঁর সহধর্মিণীকে অসীম সুখ ও ঐশ্বর্যে ভরিয়ে দিতে। তাই এমন কোন নারী আছে, যে এই পরম হিতকারী পতিদেবতাকে পুজো না করে থাকতে পারে? কিন্তু এখন ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের সময় নয়।”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সেই কপোতী আবার বলল, “হে প্রিয়তম! আমি এখন তোমাকে যে হিতকারী কথাগুলো বলছি, তা মন দিয়ে শোনো। নিচে যে ব্যাধ আশ্রয় নিয়েছে, সে এখন আর আমাদের শত্রু নয়, সে তোমার অতিথি। শাস্ত্রের বিধান হলো—“নিজের প্রাণ দিয়ে হলেও শরণাগত ব্যক্তিকে রক্ষা করা ধর্ম।—প্রাণৈরপি ত্বয়া নিত্যং সংরক্ষ্যঃ শরণাগতঃ।”
সে আরও বুঝিয়ে বলল, “শীতে ও ক্ষুধায় কাতর হয়ে এই ব্যাধ তোমার ঘরের আঙিনায় এসে পড়েছে। তুমি একে সাদরে গ্রহণ করো, যথাসাধ্য সেবা দিয়ে একে সুস্থ করে তোলো। কারণ পণ্ডিতরা বলেন—
যঃ সায়মতিথিং প্রাপ্তং যথাশক্তি ন পূজয়েৎ।
তস্যাসৌ দুষ্কৃতং দত্ত্বা সুকৃতঞ্চাপকর্ষতি।। [ঐ, ১৫৪]
অর্থাৎ দিন শেষে ঘরে আগত অতিথিকে যে গৃহস্থ নিজের সাধ্যমতো সৎকার বা আপ্যায়ন করে না, সেই অতিথি নিজের সমস্ত পাপ সেই গৃহস্থকে দিয়ে, গৃহস্থের অর্জিত সমস্ত পুণ্য হরণ করে নিয়ে চলে যায়। অতএব, ধর্মরক্ষা করতে হলে তুমি অবিলম্বে এই অতিথির সৎকার করো।”—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।


















