
প্রথম গুলিটা চালাল সুদীপ্ত। যদিও সে জানে, আত্মসমর্পণ করতে না-বলে সরাসরি গুলি চালানোর ব্যাপারটা নিয়ে জলঘোলা হবে, কিন্তু সে নিজে জানে বাস্তব সম্পুর্ণ আলাদা। ওরা রামকথা শোনার লোক নয়, তার চেয়ে গুলিগোলার ভাষাই ভালো বোঝে। আর সে তো আগেই ঠিক করেছে, প্রাণে মারবে না, আহত করবে শুধু। তার টার্গেট পা। হাতে-টাতে মেরে লাভ নেই, অনেক দুষ্কৃতির কইমাছের প্রাণ, ওই অবস্থায় বেপাত্তা হয়ে যেতে পারে চোখের নিমেষে। কিন্তু পায়ে লাগলে চেষ্টা করলেও বেশিদূর যেতে পারে না। এই কারণেই সে ভালবাসে পায়ে হিট করতে। ট্রেনিং-পিরিয়ডে তার হিটস্কোর ছিল নব্বই শতাংশের ঘরে। আর অভ্রান্ত লক্ষ্যে সে হিট করতে পারত চোখ বন্ধ করেও। যদিও সে-সব দিন এখন অতীত। চাকরিতে জয়েন করে সে দেখেছে, ওপরওয়ালারা বিপদে পড়েও সচরাচর ফায়ারিং-এর নির্দেশ দেন না। তাতে দুষ্কৃতি পালিয়ে গেলেও না। মনে-মনে ভারি রাগ হত প্রথম-প্রথম। তারপর বুঝেছে, এই চাকরির এটাই দস্তুর। আগে দুষ্কৃতিকে হাতে পেতে তাকে শ্রীরামপাঁচালি শোনাও, তারপর বিদ্যাসাগরের প্রথম ভাগ, তারপরে না শুনলে কাকুতি-মিনতি, বিশেষ বেগড়বাঁই করলে তবে গায়ের আশেপাশে গুলি চালাও। ধুলো ওড়াও। দুষ্কৃতি ভয় পেয়ে বলবে, “আমি আপনার শরণ নিচ্ছি জাহাঁপনা!” আজ অবশ্য এই মিশনে সেই লিডার। অতএব গুলি চালানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সে দেরি করেনি। পরে যা জবাবদিহি করতে হয় দেখা যাবে। শাক্য সিংহ হুনহাল অফিসার, ঠিক সামলে নেবেন।
ওরা দু’জন টর্চ জ্বেলে খুঁজছিল। জায়গাটা যদিও ফ্যাকাশে নিয়ন আলোয় অনেকটাই স্পষ্ট। তবে আশেপাশে ঝোপঝাড়, বড় গাছ যেগুলি আছে, সেগুলির দিকেই ওরা ফোকাস করছিল। আর সেটুকু আলোই যথেষ্ট ছিল সুদীপ্তর পক্ষে। সে একেবারে ডিরেক্ট হিট করল। গুলিটা অব্যর্থ লক্ষ্যে দু’জনের একজনের পায়ের ডিমের মাংস ভেদ করে ঢুকে গেল। “উঃ! কৌন বে মাদার***!” বলে লোকটা মাটিতে বসে পড়ে গোঙাতে লাগল।
ওরা দু’জন টর্চ জ্বেলে খুঁজছিল। জায়গাটা যদিও ফ্যাকাশে নিয়ন আলোয় অনেকটাই স্পষ্ট। তবে আশেপাশে ঝোপঝাড়, বড় গাছ যেগুলি আছে, সেগুলির দিকেই ওরা ফোকাস করছিল। আর সেটুকু আলোই যথেষ্ট ছিল সুদীপ্তর পক্ষে। সে একেবারে ডিরেক্ট হিট করল। গুলিটা অব্যর্থ লক্ষ্যে দু’জনের একজনের পায়ের ডিমের মাংস ভেদ করে ঢুকে গেল। “উঃ! কৌন বে মাদার***!” বলে লোকটা মাটিতে বসে পড়ে গোঙাতে লাগল।
সুদীপ্ত জানে এর পরের টার্গেটকে হিট করাই কঠিন হবে। কারণ, সেই লোকটি এখন জেনে গিয়েছে, শত্রু তার সামনে নেই, পিছনে আছে এবং তারাও সশস্ত্র শুধু নয়, তা ব্যবহার করতেও পিছপা নয়। এটা জেনে যাওয়া মানে লোকটির মনে বিচিত্র প্রতিক্রিয়া হয়। প্রথমেই সে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে ভয় দেখাতে চায়। এক্ষেত্রে তার টার্গেট বেছে হিট করার কোনও সুযোগ বা সময় থাকে না বলে সে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে গুলি চালাতে থাকে। এতে অবশ্য উল্টোদিকের লোকজনের আহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই কারণেই জঙ্গিদের চেজ্ করার প্রথাম দিকে জঙ্গিরা এলোপাথাড়ি গুলি চালায় এবং দু’একজন শহীদ হন। ফলে এই প্রথম অবস্থাটায় উল্টোদিকে যাঁরা থাকেন, তাঁদের প্ল্যানমাফিক এগোতে হয়। তা না হলে মুশকিল। দ্বিতীয়ত, কোনওভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে সেই সুযগে সে নিজে পালাতে চায়। এইসময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি উল্টোদিকের কেউ ঘায়েলও হয়, আক্রমণকারী দুষ্কৃতি কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকবে না। সে পালাতেই ব্যস্ত থাকবে। ফলে তার নজর আহত কিংবা মৃত শত্রুর দিকে থাকে না তখন। এই অবস্থায় উল্টোদিকের সদস্যদের কেউ তাকে টার্গেট করে কিন্তু অনেক সহজেই হিট করতে পারেন। তৃতীয়ত, এই কাজ করতে গিয়ে তার মাথা গোলমাল হয়ে যায়, অতএব ভুল করে ফেলে। খুব হার্ডকোর ক্রিমিন্যাল ছাড়া পাতি ক্রিমিন্যালদের অনেকেই এই ভুল করে বলেই ধরা পড়ে যায় অনেকসময়েই।
এই কারণেই সুদীপ্ত আফজল আর শিবম্ মুন্ডাকে আলাদা-আলাদা ভাবে দুটি ঝোপের আড়ালে প্রস্তুত হয়ে থাকতে বলেছিল। যদি শরুপক্ষ কোনভাবে তাকে আহত করে কিংবা মেরেও ফেলে, তাহলে আফজল আর শিবম্ দু’জনে মিলে যাতে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। সে নিজেও প্রথমবার হিট করেই শরীরটাকে কিছুটা ছুঁড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে একটু বাঁ-দিকে গড়িয়ে গেল। লোকটা যথারীতি গুলি চালাল সুদীপ্তর আগের অবস্থানেই।
এই কারণেই সুদীপ্ত আফজল আর শিবম্ মুন্ডাকে আলাদা-আলাদা ভাবে দুটি ঝোপের আড়ালে প্রস্তুত হয়ে থাকতে বলেছিল। যদি শরুপক্ষ কোনভাবে তাকে আহত করে কিংবা মেরেও ফেলে, তাহলে আফজল আর শিবম্ দু’জনে মিলে যাতে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। সে নিজেও প্রথমবার হিট করেই শরীরটাকে কিছুটা ছুঁড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে একটু বাঁ-দিকে গড়িয়ে গেল। লোকটা যথারীতি গুলি চালাল সুদীপ্তর আগের অবস্থানেই।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫১: সাইকেল মাহাতো অ্যান্ড কোং

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৪ : যেখানে স্বর্ণমুদ্রার ঝনঝনানি, সেখানে সন্তানের চিতার আগুনও ম্লান

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২১ : পরশপাথর— ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে…
আফজল ঝোপের আড়ালে থেকে হাত কামড়াচ্ছিল। তার টার্গেট ভালো নয়। আর একটু কাছাকাছি যেতে পারলে সে হয়ত লোকটিকে আহত করতে পারত। কিন্তু গুলি চালাতে সে ভয় পাচ্ছিল, বেমক্কা অন্য কোথাও লেগে গিয়ে লোকটা জাহান্নামে চলে গেলে, সুদীপ্ত স্যারই তাকে আস্ত রাখবেন না। বার বার বলে দিয়েছেন, “জানে মারবে না আফজল। কেবল পায়ে হিট করবে, একান্ত না পারো হাতে! যেভাবেই হোক ওই কালপ্রটিদের জ্যান্ত ধরতে হবে! তারপর জেল-কাস্টডিতে নিয়ে আইন রক্ষা করেই কীভাবে রগড়াতে হয়, তা আমার জানা আছে!”
লোকটা আবারও গুলি চালাল। এবার অবশ্য বাঁ-দিকেই। যদিও সুদীপ্ত তখন সেখানে ছিল না। সে দেহটাকে রোলিং করে আরও তফাতে সরে গিয়েছিল। উঠে দাঁড়িয়ে অবস্থান চেঞ্জ করার মতো মূর্খামি সে করল না। তাহলে যেচে বন্ধুকের নলের মুখের গ্রাস হতে হবে। সেই অবস্থাতেই সে আড়চোখে দেখল, নাহ্, আফজল কিংবা শিবম্ কাউকেই দেখতে পাল না। ভরসা জাগল তার। এই সুযোগে আফজল যদি কোনভাবে শত্রুর পিছনে চলে যেতে পারে, তাহলেই কেল্লা ফতে। একদিকে সে, আর একদিকে আফজল, অন্যদিকে হেলথসেন্টারের দেওয়াল, নিচে পড়ে থাকা জখম সঙ্গী। লোকটার মাথা খারাপ হয়ে যাবে আরও। তারপরেই আরও ভুল করতে থাকবে সে। তাছাড়া তার কাছে তো আর মেশিনগান নেই যে ঝাঁকে-ঝাঁকে গুলি বেরুবে। এরা সচরাচর মুঙ্গের অঞ্চলের তৈরি বেআইনি দিশি পিস্তল নিয়ে কাজ করে। তাতে আর ক’টাই বা গুলি থাকে? সাধারণ নয় মিলিমিটার অটো পিস্তলে খুব বেশি হলে তেরো রাউন্ড থাকে। তবে এরা সাধারণ অপারেশনে যেগুলি ব্যবহার করে, তাতে পাঁচ থেকে আট রাউন্ড থাকে। তবে আধুনিক ফুল সাইজ হ্যান্ডগান হলে ষোলো থেকে আঠারো রাউন্ড থাকে। তবে এর পিস্তলের আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে না এটা মদার্ণ ফুল সাইজ হ্যান্ডগান বলে। আর তাছাড়া এরা সব ক’টি কার্তুজ কখনই ব্যবহার করবে না। কয়েকটি রেখে দেবেই পালানোর সময় আত্মরক্ষার কথা ভেবে। তার মধ্যেই যা করার করতে হবে।
লোকটা আবারও গুলি চালাল। এবার অবশ্য বাঁ-দিকেই। যদিও সুদীপ্ত তখন সেখানে ছিল না। সে দেহটাকে রোলিং করে আরও তফাতে সরে গিয়েছিল। উঠে দাঁড়িয়ে অবস্থান চেঞ্জ করার মতো মূর্খামি সে করল না। তাহলে যেচে বন্ধুকের নলের মুখের গ্রাস হতে হবে। সেই অবস্থাতেই সে আড়চোখে দেখল, নাহ্, আফজল কিংবা শিবম্ কাউকেই দেখতে পাল না। ভরসা জাগল তার। এই সুযোগে আফজল যদি কোনভাবে শত্রুর পিছনে চলে যেতে পারে, তাহলেই কেল্লা ফতে। একদিকে সে, আর একদিকে আফজল, অন্যদিকে হেলথসেন্টারের দেওয়াল, নিচে পড়ে থাকা জখম সঙ্গী। লোকটার মাথা খারাপ হয়ে যাবে আরও। তারপরেই আরও ভুল করতে থাকবে সে। তাছাড়া তার কাছে তো আর মেশিনগান নেই যে ঝাঁকে-ঝাঁকে গুলি বেরুবে। এরা সচরাচর মুঙ্গের অঞ্চলের তৈরি বেআইনি দিশি পিস্তল নিয়ে কাজ করে। তাতে আর ক’টাই বা গুলি থাকে? সাধারণ নয় মিলিমিটার অটো পিস্তলে খুব বেশি হলে তেরো রাউন্ড থাকে। তবে এরা সাধারণ অপারেশনে যেগুলি ব্যবহার করে, তাতে পাঁচ থেকে আট রাউন্ড থাকে। তবে আধুনিক ফুল সাইজ হ্যান্ডগান হলে ষোলো থেকে আঠারো রাউন্ড থাকে। তবে এর পিস্তলের আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে না এটা মদার্ণ ফুল সাইজ হ্যান্ডগান বলে। আর তাছাড়া এরা সব ক’টি কার্তুজ কখনই ব্যবহার করবে না। কয়েকটি রেখে দেবেই পালানোর সময় আত্মরক্ষার কথা ভেবে। তার মধ্যেই যা করার করতে হবে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৯: পরবাস প্রস্তুতি (শেষ)

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র
সুদীপ্ত গড়িয়ে একটা গাছের গুঁড়ির পিছনে এসে উঠে দাঁড়াল। তারপর পজিশন নিয়ে দ্বিতীয় গুলিটা চালাল। এটা অবশ্য লোকটির প্রায় গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। গিয়ে লাগল হেলথসেন্টারের দেওয়ালে। লোকটা আসলে অস্থিরভাবে এদিক-ওদিক করছিল, ফলে একটা গুলি মিসফায়ার হল। লোকটা অবশ্য এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে আক্রমণকারী অফিসারটি কোথায় লুকিয়ে আছে। কিন্তু তার মনে আর-একটা ভয় আছে। পুলিশের লোক একজন ছিল না। সঙ্গে আরও দু-তিনজন ছিল। তাদের অবস্থানও সে বুঝতে চাইছিল। গাছের গুঁড়ির আড়ালে যে লুকিয়ে আছে, সে একমাত্র পুলিশ নয়। ফলে সে থেকে-থেকে পিছনে তাকাচ্ছিল। কিন্তু লোকটি নেহাত বোকা নয়। ফলে সে জানে, এখন গুলি চালালেও গাছের গুঁড়ির বর্ম ভেদ করে পুলিশের লোককে ঘায়েল করতে পারবে না সে। একটু পাশে সরে গিয়ে গুলি চালালে তাহলেই সে হয়তো এই পুলিশটিকে ঘায়েল করতে পারবে। ফলে সে পজিশন বদলালো।
আফজল এবং শিবম্ তখন প্রায় হামাগুঁড়ি দিতে-দিতে ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে গেটের কাছে যেখানে আর-একটি লোক আহত হয়ে কাতরাচ্ছিল, তার পিছনে পৌঁছে গিয়েছে। আহত লোকটি নিজেই নিজের রুমাল দিয়ে ক্ষতস্থান বেঁধে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে তখন। আফজল বুঝতে পারছিল, লোকটিকে সে-কাজে তাদেরকেই সাহায্য করতে হবে। কারণ, তা না হলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে লোকটির প্রাণসংশয় হলে তাদেরই বিপদ। আজকাল পুলিশ আহত হলে কোন মানবাধিকার সংগঠন শোরগোল তোলে না, কিন্তু কোন অপরাধীর মৃত্যু হলে কিংবা গুরুতর আহত হলে অনেক সংগঠন মানুষের বেঁচে থাকার মৌল অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থানা ঘেরাও করতে দ্বিধাবোধ করেন না। যেন পুলিশদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। অপরাধীরা যখন হত্যা কিঙ্গা লুটপাট করে, তখন তাঁরা অপরপক্ষের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের হয়ে অপরাধীদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন না যে, সুস্থ-সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার সমস্ত মানুষেরই আছে।
আফজল অপেক্ষা করতে পারত। কিন্তু একে আহত লোকটির তাড়াতাড়ি একটা ব্যবস্থা করতে হবে, সেইসঙ্গে দেরি করলে সুদীপ্ত স্যার এবার বেকায়দায় পড়ে যাবেন, সুতরাং যা করার তাকে তাড়াতাড়ি করতে হবে। এই ভেবে সে তার সার্ভিস রিভলভার তুলে ধরল। শিবম্ মুণ্ডা রুদ্ধশ্বাস নেত্রে গোটা ব্যাপারটা এই আধো আলো-আধো অন্ধকারে যতটা দেখা যায়, দেখছিল। তার হাত-পা কাঁপছিল।
আফজল এবং শিবম্ তখন প্রায় হামাগুঁড়ি দিতে-দিতে ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে গেটের কাছে যেখানে আর-একটি লোক আহত হয়ে কাতরাচ্ছিল, তার পিছনে পৌঁছে গিয়েছে। আহত লোকটি নিজেই নিজের রুমাল দিয়ে ক্ষতস্থান বেঁধে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে তখন। আফজল বুঝতে পারছিল, লোকটিকে সে-কাজে তাদেরকেই সাহায্য করতে হবে। কারণ, তা না হলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে লোকটির প্রাণসংশয় হলে তাদেরই বিপদ। আজকাল পুলিশ আহত হলে কোন মানবাধিকার সংগঠন শোরগোল তোলে না, কিন্তু কোন অপরাধীর মৃত্যু হলে কিংবা গুরুতর আহত হলে অনেক সংগঠন মানুষের বেঁচে থাকার মৌল অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থানা ঘেরাও করতে দ্বিধাবোধ করেন না। যেন পুলিশদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। অপরাধীরা যখন হত্যা কিঙ্গা লুটপাট করে, তখন তাঁরা অপরপক্ষের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের হয়ে অপরাধীদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন না যে, সুস্থ-সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার সমস্ত মানুষেরই আছে।
আফজল অপেক্ষা করতে পারত। কিন্তু একে আহত লোকটির তাড়াতাড়ি একটা ব্যবস্থা করতে হবে, সেইসঙ্গে দেরি করলে সুদীপ্ত স্যার এবার বেকায়দায় পড়ে যাবেন, সুতরাং যা করার তাকে তাড়াতাড়ি করতে হবে। এই ভেবে সে তার সার্ভিস রিভলভার তুলে ধরল। শিবম্ মুণ্ডা রুদ্ধশ্বাস নেত্রে গোটা ব্যাপারটা এই আধো আলো-আধো অন্ধকারে যতটা দেখা যায়, দেখছিল। তার হাত-পা কাঁপছিল।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু!, পর্ব-১১৯: ডেসডিমোনার রুমাল / ১৮

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা
দ্বিতীয় লোকটি তার পিছনদিকে আফজল আর শিবমের উপস্থিতি টের পায়নি। পেলে সে হয়তো ঘুরে দুট গুলি আফজলদেরও উপহার দেওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু তার লক্ষ্য তখন সুদীপ্ত। সেই মুহূর্তে তার মাথায় একটাই কথা ঘুরছিল, যেভাবে হোক আহত করে কিংবা খতম করে পালিয়ে যাওয়া। যদিও এক মুহূর্তে তার মাথায় এল, তাহলে যে দুজন ভিতরে ঢুকেছে, তাদের কী হবে? সঙ্গীর পরিণামও সে জানে না। কিন্তু এখন আর কোনদিকে মাথা দিলে চলবে না। আগে ওই মাদার*** অফিসারটিকে ঘায়েল করা, তারপর ভাগলবা হলেই হল। বাকিদের কী হবে তা ভাবতে নারাজ সে। এমন লাফড়া হবে জানলে এই মিশনে সে আসতই না। অথচ বস বলেছিল, একেবারে মাখন কাটার মতো কাজ। শালা! বসের উদ্দেশে এই মুহূর্তে সে কিছু নোংরা খিস্তি প্রয়োগ করল। সামনের দিকে তাকাল সে। যে গাছটির পিছনে লুকিয়েছে পুলিশটি, সেখান পর্যন্ত আলো পৌঁছায়নি বলে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না জায়গাটা। সে টর্চের আলো ফেলল। লোকটার কাঁধের সামান্য অংশ বেরিয়ে আছে। ওইখানেই হিট করতে হবে, তারপর লোকপটা পড়ে গেলে তার উপর এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে এখান থেকে চম্পট দিয়ে সোজা পাশের রাজ্যে আপাতত আশ্রয় নেবে সে। সেখানকার শেল্টার আরও বড় আর নিরাপদ। সে পিস্তল তুলে রেডি হল শ্যুট করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তার পিস্তল চালানোর আগেই পিছন থেকে গুলি ছুটে এল। এবারের গুলিটা চালিয়েছে আফজল। তার টিপ খুব ভালো নয়। কিন্তু তা বলে মিসফায়ারও হয়নি। লোকটা কাঁধ চেপে বসে পড়ে একটা জুতসই কাঁচা খিস্তি দিল। তার হাত থেকে পিস্তলটা খসে পড়েছিল। কাছাকাছিই ছিটকে পড়েছিল সেটা, কিন্তু তা কুড়ানোর চেয়ে এখন কাঁধ চেপে ধরে রক্তক্ষরণটা বন্ধ করার চেষ্টা করছিল সে।
একটা ব্যাপার সুদীপ্তর অবাক লাগছিল। এই মধ্যরাতে, চারপাশ যখন নিস্তব্ধ, তখন গুলিগোলার আওয়াজ অনেক বেশি জোরে বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। সুতরাং সে-শব্দ হেলথসেন্টারের কর্মচারীদের কারুর কানে যায় নি, এটা হতে পারে না। আর এই পরিবেশে এমন শব্দ হলে লোকে যেটা আগে করে, সেটা হল, কী হয়েছে বেরিয়ে দেখা। কিন্তু এক্ষেত্রে কেউ বেরিয়ে এল না কেন? সকলেই এত গভীর ঘুমে মগ্ন যে, কেউ টের পাচ্ছে না? ডক্টর না-হয় সেন্টারে নেই, কিন্তু বাকিরাও সেই সুযোগে কি সেন্টার ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছে? নাকি…! তার মনে তৃতীয় একটি সন্দেহ দানা পালিয়ে উঠল। এদের দলের কেউ আগেই হেলথসেন্টারে ঢুকে সেন্টারের লোকজনকে ঘায়েল করা কিংবা কোনভাবে আটকে রাখেনি তো? তা যদি হয়, তাহলে এই দুই কালপ্রিটের ব্যবস্থা করে, তাদের এক্ষুনি ভিতরে ঢুকতে হবে। সেখানেও আর-এক চোট ঝাড়পিট অপেক্ষা করে আছে সম্ভবত!
আফজল বেরিয়ে এসেছিল। যে লোকটি আগে আহত হয়েছিল, তার কাঁধে থাবা বসিয়ে সে তাকে তুলে ধরল। তারপর তার হাত দু’টো পিছমোড়া করে ধরে শিবম্কে বলল, “শিবম, তুমি অন্য লোকটিকে নিয়ে এসো। হেলথসেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে যা-হয় দেখা যাবে। এদের রক্তপাত বন্ধ করা দরকার। তার আগেই টেঁসে গেলে মুশকিল।”
একটা ব্যাপার সুদীপ্তর অবাক লাগছিল। এই মধ্যরাতে, চারপাশ যখন নিস্তব্ধ, তখন গুলিগোলার আওয়াজ অনেক বেশি জোরে বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। সুতরাং সে-শব্দ হেলথসেন্টারের কর্মচারীদের কারুর কানে যায় নি, এটা হতে পারে না। আর এই পরিবেশে এমন শব্দ হলে লোকে যেটা আগে করে, সেটা হল, কী হয়েছে বেরিয়ে দেখা। কিন্তু এক্ষেত্রে কেউ বেরিয়ে এল না কেন? সকলেই এত গভীর ঘুমে মগ্ন যে, কেউ টের পাচ্ছে না? ডক্টর না-হয় সেন্টারে নেই, কিন্তু বাকিরাও সেই সুযোগে কি সেন্টার ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছে? নাকি…! তার মনে তৃতীয় একটি সন্দেহ দানা পালিয়ে উঠল। এদের দলের কেউ আগেই হেলথসেন্টারে ঢুকে সেন্টারের লোকজনকে ঘায়েল করা কিংবা কোনভাবে আটকে রাখেনি তো? তা যদি হয়, তাহলে এই দুই কালপ্রিটের ব্যবস্থা করে, তাদের এক্ষুনি ভিতরে ঢুকতে হবে। সেখানেও আর-এক চোট ঝাড়পিট অপেক্ষা করে আছে সম্ভবত!
আফজল বেরিয়ে এসেছিল। যে লোকটি আগে আহত হয়েছিল, তার কাঁধে থাবা বসিয়ে সে তাকে তুলে ধরল। তারপর তার হাত দু’টো পিছমোড়া করে ধরে শিবম্কে বলল, “শিবম, তুমি অন্য লোকটিকে নিয়ে এসো। হেলথসেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে যা-হয় দেখা যাবে। এদের রক্তপাত বন্ধ করা দরকার। তার আগেই টেঁসে গেলে মুশকিল।”
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮১ : খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
সুদীপ্ত ততক্ষণে দ্বিতীয় লোকটিকে ধরে এনেছিল। লোকটির কাঁধ দিয়ে দরদর করে রক্ত পড়ছে। ধরার সময় তার মধ্যেই লোকটি বেশ হুটোপাটি করতে চেয়েছিল, ফলে রক্তের দাগ সুদীপ্তর ড্রেসে লেগেছে, হাত দুটিতেও। তবে এইসব তার কাছে জলভাত। কিছু মনে হয় না তেমন। অনেকদিন আছে সে এ-লাইনে। আগে যা দেখে গা ঘিনঘিন করত, এখন সেইরকম অবস্থায় পাশে দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক দিতেও তার অসুবিধা হয় না। অবশ্য শুধু সে নয়, দু’-একজন ব্যতিক্রম ছাড়া পুলিশের সমস্ত লোকেরাই এ-ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এত খুনখারাপি-অপরাধ দেখতে হয় যে, তাদের আর ওই দেখে খারাপ লাগা-মন্দ লাগার কোন বোধ তৈরি হয় না।
আফজল এই অবস্থাতেও রগড় করতে ছাড়ল না, “আপনার তো দেখছি একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড। আপনাকে নিয়ে না রক্তবীজ ৩ বানায়!”
“ছেলেবেলায় সদাশিব পড়েছিলাম। পড়েছ তো? ব্যাপক লেখা। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ব্যোমকেশ বক্সী যাঁর লেখা। না পড়ে থাকলে পড়ে নিও সদাশিবের কাণ্ডকারখানা। তা সেই সদাশীবের একটি গল্পের নাম তিনি খসড়া খাতায় নোট রেখেছিলেন, সদাশিবের রক্তারক্তি কাণ্ড। তোমার কথা শুনে সে-রকম ফিল হচ্ছে ! কিন্তু এখন হাসিমশকরার সময় নয় অয়াফজল!” শেষের দিকে তার গলা সিরিয়াস হয়ে এল।
আফজল একটু অবাক হয়ে বলল, “স্যরি স্যার!”
“নো স্যরি আফজল। এই অবস্থায় যারা মাথা ঠাণ্ডা রেখে হাসিঠাট্টা করতে পারে, তারা মানসিক দিক থেকে যে খুব স্ট্রং হয়, তা বলাই বাহুল্য। আমি সে-জন্য বলিনি। আমার অনুমান, এরা দুজন কেবল নয়। এদের আরও কয়েকজন শাগরেদ হেলথসেন্টারের ভিতরে ঢুকেছে অলরেডি। অতএব আমাদের সেখানে ঢুকতে হবে। আজকের লড়াই জারি থাকবে বলাই বাহুল্য। আফজল তুমি আর হাত দিও না। রিভলভার হাতে রেডি রেখো। আমার যা অনুমান, তাতে এরা কেবল নয়, আরও আছে। তারা সম্ভবত ভিতরে ঢুকেছে। তুমি মালাকার স্যারকে খবরটা দিয়ে যতটা তাড়াতাড়ি পারেন আরও ফোর্স নিয়ে চলে আসতে বলো। আজকের এই রাতটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজনকেও পালাতে দেওয়া চলবে না! এরা শিকার করতে এসেছিল, দেখা যাক কে শিকার করে, আর কে শিকার হয়!”—চলবে।
আফজল এই অবস্থাতেও রগড় করতে ছাড়ল না, “আপনার তো দেখছি একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড। আপনাকে নিয়ে না রক্তবীজ ৩ বানায়!”
“ছেলেবেলায় সদাশিব পড়েছিলাম। পড়েছ তো? ব্যাপক লেখা। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ব্যোমকেশ বক্সী যাঁর লেখা। না পড়ে থাকলে পড়ে নিও সদাশিবের কাণ্ডকারখানা। তা সেই সদাশীবের একটি গল্পের নাম তিনি খসড়া খাতায় নোট রেখেছিলেন, সদাশিবের রক্তারক্তি কাণ্ড। তোমার কথা শুনে সে-রকম ফিল হচ্ছে ! কিন্তু এখন হাসিমশকরার সময় নয় অয়াফজল!” শেষের দিকে তার গলা সিরিয়াস হয়ে এল।
আফজল একটু অবাক হয়ে বলল, “স্যরি স্যার!”
“নো স্যরি আফজল। এই অবস্থায় যারা মাথা ঠাণ্ডা রেখে হাসিঠাট্টা করতে পারে, তারা মানসিক দিক থেকে যে খুব স্ট্রং হয়, তা বলাই বাহুল্য। আমি সে-জন্য বলিনি। আমার অনুমান, এরা দুজন কেবল নয়। এদের আরও কয়েকজন শাগরেদ হেলথসেন্টারের ভিতরে ঢুকেছে অলরেডি। অতএব আমাদের সেখানে ঢুকতে হবে। আজকের লড়াই জারি থাকবে বলাই বাহুল্য। আফজল তুমি আর হাত দিও না। রিভলভার হাতে রেডি রেখো। আমার যা অনুমান, তাতে এরা কেবল নয়, আরও আছে। তারা সম্ভবত ভিতরে ঢুকেছে। তুমি মালাকার স্যারকে খবরটা দিয়ে যতটা তাড়াতাড়ি পারেন আরও ফোর্স নিয়ে চলে আসতে বলো। আজকের এই রাতটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজনকেও পালাতে দেওয়া চলবে না! এরা শিকার করতে এসেছিল, দেখা যাক কে শিকার করে, আর কে শিকার হয়!”—চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।


















