বুধবার ১০ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
ঘাত-প্রতিঘাতময় জীবনে এমন কিছু ঘটনা কখনও ঘটে যায় যা সারাজীবন ভোলা যায় না, মনের গভীরে সেই দৃশ্যপট চিরকালের জন্য অনড় হয়ে থাকে। আর তা যদি সুখানুভূতি বয়ে নিয়ে আসে তাহলে তো কথাই নেই। এ গল্প সেরকমই, একটি কিশোরী কন্যার সাহসিকতার গল্প।

পরাধীন ভারতে আসামের অনেক জায়গায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিকেরা একসময় চা বাগানের পত্তন করে। ওরা বুঝেছিল চা চাষের উপযুক্ত ওই অঞ্চল। দরং জেলার মঙ্গলদৈ টি এস্টেটের আন্ডারে সেরকমই অসংখ্য ছোটবড় চা বাগান রয়েছে, যাদের একত্রে মঙ্গলদৈ চা জেলা বলা হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি হল ‘মঙ্গলম’ এবং ‘টোঙ্গানি টি এস্টেট’। ব্রহ্মপুত্রের উত্তর দিক বরাবর এই চা বাগানগুলির অবস্থান। এই চা বাগানগুলির চায়ের পৃথিবী জোড়া নাম, তার স্বাদ ও গন্ধের জন্য। প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আসে ভারতের আসাম প্রদেশের রপ্তানি যোগ্য এই চা থেকে।

আমার এক পিসেমশাই মঙ্গলম টি এস্টেটের প্রধান ম্যানেজার হয়ে এসেছিলেন ‘৬০ এর দশকের শুরুতেই, সেই সুবাদে ক’বছর বাদে পিসিমা এলেন মঙ্গলদৈতে। আপাতভাবে নির্জন, শান্ত, মনোরম পরিবেশ। সপ্তাহে একটিমাত্র দিন মঙ্গলবার হাট বসত। গ্রামের লোক কেনা-বেচা করতে আসতেন ওই দিন। ঘর-গেরস্থালির নানা প্রয়োজনীয় জিনিস, যেমন— তেল, নুন, মশলা, ফল, চিনি, গুড়, সাবান, দেশলাই, লোহার হাঁড়ি, কড়াই, চাদর, উল তারা কিনতেন এবং তাদের ঘরের হাঁস, মুরগির ডিম, আস্ত মুরগি, গরুর দুধ, ঘি, মাখন, কিংবা হাতেবোনা শীত-পোশাক, বেতের ঝুড়ি বা টুকরি, মাটির টব, বাসন, নানা জরিবুটি, মেয়েদের হাতে তৈরি আচার, বড়ি তারা হাটে বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসতেন। ওই দিন হাটে অনেক চেনাজানা মানুষের সঙ্গে দেখা হত। পথ চলতি মানুষ অন্যের কুশল খবর নিতেন। বাকি দিনগুলো নিস্তরঙ্গ।
মঙ্গলদৈ সেসময় বসতির বিচারে ছোট্ট জনপদ যদিও তার বিস্তার অনেকটা জায়গা জুড়ে। চা বাগানের একদিকে গুয়াহাটিগামী উঁচু পিচ ঢালা জাতীয় সড়ক যা এখন এনএইচ-২৭, তার পাশে জঙ্গল ঘেরা ছোট পাহাড়, অন্যদিকে সরু একটা শান্ত ঝোরা, বর্ষা ছাড়া অন্য সময় যাকে নালা বলে ভ্রম হয়। তার পরিষ্কার স্বচ্ছ জলে মাছেদের ওঠানামা, পাথরের খাঁজে তাদের লুকোচুরি চোখে পড়ে। ঝোরার উপরে বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে কিছুটা দূরে কুলি বস্তি। আর চা বাগানের পাশে বয়ে যাওয়া ঝোরার পুবদিকে কেয়ারি করা ফুলের বাগান ঘেরা অফিসার্স কোয়ার্টার। কেউ অসুস্থ হলে খুব সমস্যা হত। কাছাকাছি কোনও বড় হাসপাতাল সেসময় ছিল না। সবচেয়ে কাছের হাসপাতাল অন্তত বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরের সদর নওগাঁতে।
আরও পড়ুন:

শারদীয়ার গল্প-৩: নতুন পৃথিবীর সন্ধানে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫০: মধ্যরাতের বিপদ-আপদ

পিসিমা এই নিস্তরঙ্গ জীবনে হাঁফিয়ে উঠেছিলেন। পিসেমশাইয়ের অনুরোধে একজন আদিবাসী যুবক তার ১৫ বছর বয়েসি কন্যা দেবীকে ঘর গৃহস্থালির কাজে সাহায্যের জন্য পিসিমার কাছে পৌঁছে দিলেন। পিসিমার দুটি ছেলে, কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে, মূলত কাছেপিঠে ভালো স্কুল না থাকার জন্য তাদের হোস্টেলে রাখতে বাধ্য হয়েছেন পিসিমা, পিসেমশাই। ছুটিছাটায় তারা বাড়িতে আসত। পিসিমা সন্তানদের সান্নিধ্য না পাওয়ায় ভীষণ মনমরা থাকতেন। এমতাবস্থায় একজন সঙ্গী পেয়ে পিসিমা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। পিসিমা ওর চুল বেঁধে দিতেন, সুন্দর করে সাজাতেন, যত্ন করে সামনে বসে খাওয়াতেন, কেউ শহরে গেলে দেবীর জন্য নতুন ফ্রক কিনে আনাতেন। দেবীকে তিনি সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন। দেবী খুব ভোরবেলায় এসে পিসিমার পুজোর ফুল তুলে দিত। ফুল বাগানের পরিচর্যা করত। হাঁস, মুরগির দেখাশোনা করত।
আরও পড়ুন:

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৬: কুণ্টণি জাতক : ক্ষতির খতিয়ান

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র

বিকালবেলায় হাঁস মুরগিগুলোকে ফিরিয়ে আনত ঝোরা বা মাঠ থেকে। মাঝে মাঝে ঝোরা থেকে খুঁজে আনত হাঁসগুলির জন্য গেড়ি, গুগলি। কোনো কোনোদিন দেবী পিসেমশাইয়ের লাঞ্চ প্যাক পৌঁছে দিত ফ্যাক্টরিতে। দেবীর মা, বাবা দু’জনেই ছিলেন চা বাগানের কুলি। পিসিমার কাছে মেয়ে খুশিতে, আদরে আছে দেখে তাদের কোনও ভাবনা ছিল না। সন্ধ্যার আগেই ওকে ছেড়ে দিতে পিসিমার মন কেমন করত। অন্যের সন্তান তাই সন্ধ্যার আগেই ওকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হতেন পিসিমা। কিন্তু পরদিন না আসা পর্যন্ত খুব চিন্তায় থাকতেন। পিসিমা অবসরে দেবীকে লেখাপড়া শেখাতেন। দেবীও পিসিমাকে নাচ দেখাত, গান শোনাত। নানা বিষয় নিয়ে ওরা গল্প করত, হাসত, লুডো খেলত-সাপ আর সিঁড়ি ভাঙায় ওঠানামা করতে করতে ওরা ঝগড়া করত, এক কথায় দুটি অসমবয়সী মানুষের মধ্যে একটা সখ্য গড়ে ওঠে যেন দুই বন্ধু, যেন মা ও মেয়ে। দূরে মিশনারি স্কুলে কেবলমাত্র কারখানার মালিক পক্ষের ছেলেরা,পঞ্চায়েত প্রধানদের বাড়ির ছেলেরা ও গুটিকয়েক আদিবাসী ছেলে পড়তে যেত। কুলিকামিনদের বাচ্চারা লেখাপড়া শেখার তেমন সুযোগই পেতনা।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি পর্ব-৯২: অবিবেচনা যত দ্রুত সিদ্ধান্ত আনে, তত দ্রুত ধ্বংসও আনে

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৭: পরবাস প্রস্তুতি (তিন)

সন্ধ্যায় কোয়ার্টারগুলো ছাড়া চরাচর অন্ধকারে ঢেকে যেত। কোয়ার্টারগুলোতেই কেবল বিজলিবাতির আলো। সন্ধ্যা নামার আগেই দেবী ফিরে যায় ওদের বস্তিতে। রাতের বেলা মাদল, শিংগা বাজিয়ে আগুন জ্বালিয়ে আদিবাসী কুলিকামিনরা নাচ, গান করে। আগুনের ভয়ে ভয়াল জন্তুরা সাহস পায় না এগোতে, কিন্তু সুযোগের অপেক্ষায় তক্কে তক্কে থাকে। পিসেমশাই পুরোদস্তুর সাহেব মানুষ, রুটিন বাঁধা জীবন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আটটার মধ্যে ডিনার সেরে নেন।

গতানুগতিক জীবন। প্রহরে প্রহরে দূরে শিয়ালের ডাক শোনা যায়। বন্য পশুরা মাঝেমধ্যে হাঁস-মুরগি টেনে নিয়ে যায়। একবার এভাবে পরপর ক’দিন হাঁস মুরগি টেনে নিয়ে গেল কোনও অজানা জন্তুতে। সবাই আলোচনা করতে থাকে কিন্তু দিশা পায় না। এবার একটা দু’টো করে ছাগল বেপাত্তা হতে লাগল, একদিন আস্ত একটা বাছুরকে তুলে নিয়ে গেল কোনো পশু। গ্রামবাসীরা সতর্ক ছিল। জোরে একটা ঘষটানির আওয়াজ এবং বাছুরের ভয়ার্ত, ব্যাকুল হাম্বা ডাক শুনে তারা মশাল, লাঠি নিয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু অন্ধকারে তারা কিছু ঠাওর করতে পারল না। আন্দাজে এলোপাথাড়ি কিছু লাঠির বাড়ি মারে কিন্তু বুঝতে পারে না আঘাত কারো গায়ে লাগল কিনা। পরদিন বাছুরটার ভক্ষিত দেহের কিছু অংশ জঙ্গলের দিকে খুঁজে পাওয়া গেল। সবাই আতঙ্কিত। পিসেমশাই বনদপ্তরকে খবর পাঠালেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮০ : হাত বাড়ালেই বন্ধু

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

এই অবস্থায় পিসিমা সন্ধ্যায় দেবীকে বাড়ি ফিরতে বারণ করেন। কিন্তু সে আনমনা, মায়ের চিন্তায় পিসিমার কথা অমান্য করে বেরিয়ে পড়ে। রোজকার মতনই তার হাতে থাকে একটি লাঠি এবং একটি জ্বলন্ত হ্যারিকেন। শীতকাল, পিসিমা তাই একপ্রকার জোর করেই পিছন থেকে গায়ের চাদরটা ওর গলায় জড়িয়ে দেন। সাঁকোটা পার হতেই একটা উৎকট গন্ধ নাকে এসে লাগে। দেবী বোঝে বিপদ খুব কাছে। সে আরও সজাগ হয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় কিন্তু একটু থামতেই গন্ধটা যেন তার ডান পাশে অনুভূত হল, দুর্গন্ধে দেবীর গা গুলিয়ে উঠল, তখনই পশুটার জ্বলন্ত চোখ দেবীর নজরে আসে। সে মরিয়া, কোনও মতে নিজেকে সামলে তখুনি তার ডানদিকে তাক করে পশুটার গায়ে চাদরটা ছুঁড়ে দেয়। পশুটা চাদর থেকে যত বেরোতে চেষ্টা করে সেটা তার গায়ে মাথায় আরও পেঁচিয়ে যায়, পারে না বেরোতে। আর দেবী এই সুযোগটাই নেয়। সে হ্যারিকেনের কাচটা লাঠি দিয়ে ভেঙে কেরোসিন ঢেলে দেয় আন্দাজে পশুটাকে লক্ষ করে। সবই করে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায়। দেবীর চিৎকারে বনদপ্তরের লোকেরা এবং মশাল হাতে আদিবাসীরা ছুটে আসেন। আসলে প্রাণীটার পিছনের একটি পা কোনওভাবে সাংঘাতিক জখম হয়েছিল। ও খোঁড়াচ্ছিল। হয়তো আগের দিন জনতার লাঠির বাড়ি পড়েছিল ওই পশুটার দেহেই। তাই ও আরও হিংস্র হয়ে উঠেছিল। দেবীর ছোঁড়া চাদরে জড়িয়ে গিয়ে সে ধরা পড়ে। ভাগ্য প্রসন্ন ছিল। না হলে দেবীকেই সেদিন টেনে নিয়ে যেত পশুটা। বনকর্মীরা ঘুমপাড়ানি গুলিতে পশুটাকে নিস্তেজ করে তুলে নিয়ে যায়। তখনই জানা যায় সেটা একটা চিতাবাঘ।

এভাবেই ছোট্ট কিশোরীর উপস্থিত বুদ্ধিতে সে যাত্রায় অনেকেই বিপদমুক্ত হল। তারপর বহু বছর কেটে গিয়েছে। পিসিমা, পিসেমশাই গত হয়েছেন অনেক আগেই। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। দেবীর খবর জানা নেই কিন্তু এই গল্পটা বহুদিন পর্যন্ত লোকের মুখে মুখে ঘুরত।
* নেলী দাস (Neli das) প্রাক্তন শিক্ষিকা ও লেখক।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content