
মা দুর্গা।
শ্রীশ্রীচণ্ডীর মূল গ্রন্থ অর্থাৎ দুর্গা সপ্তশতী পাঠের পূর্বে সকলেই দেবীকবচ পাঠ করেন। শ্রীশ্রীচণ্ডীকা দেবীর প্রীতির জন্য পাঠ করা হয়। যেখানে ঋষি মার্কণ্ডেয় সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে জগতের পরম গোপনীয় অথচ মঙ্গলকারক আদি শক্তি, সর্বজীবের রক্ষাকর্তী মহামায়ার কীর্তি, জয়গাথা শোনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। কবচ শব্দের অর্থ বর্ম; যা পরিধানে শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষা করা যায়। ব্রহ্মা বলছেন, যে দেবীর অতি গুহ্য, পুণ্য কবচই শ্রবণে, মননে সকল জীবের উপকার সাধিত হয়, সমস্ত ভয় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ত্রিতাপের নাশ হয়। শ্রীদেবী যখনই ভক্তের আর্তি শুনেছেন, তখনই ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে তাঁকে রক্ষা করেছেন। তিনি জগতের পালনকারি যোগীরা সর্বদা ধ্যান করেন মোক্ষসুখ লাভের জন্য।
চরম সার্থককারী দেবীর নাম শ্রবণে ও মননে, সর্বদা চিন্তার কারণে ভক্ত সর্বদা সমস্ত ভয় থেকে মুক্ত হয়ে অবশেষে দেবীকেই প্রাপ্ত হয়। এমনকি দেবতারাও অসুর বিজয়কালে প্রার্থনার দ্বারা তাঁকে প্রীত করেন, তাঁর শক্তিতে বিজয়ী হন; অহংকার থেকে মুক্ত হন, পুনরায় তাদের অধিকার ফিরে পান। এই দেবী আদ্যাশক্তি, বারবার যে রূপ ধারণ করেন, তাঁর প্রথম দুর্গা রূপ, শৈলপত্রী। কুর্ম পুরাণ অনুসারে দেবী শৈল অর্থাৎ হিমালয়ের প্রার্থনায় প্রীত হয়ে করুণায় কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করেন। তার নন্দী বাহন। তিনি ত্রিশূল ও পদ্ম ধারণ করেন। দেবী ধৈর্য, শক্তি, স্থিরতার প্রতীক। তাঁর চিন্তায় ভক্তের মনে দৃঢ়তা আসে।
আরও পড়ুন:

অনন্ত এক পথ পরিক্রমা, পর্ব-৮৯: দুর্বলেরা কখনও সত্য লাভ করতে পারে না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩১: যে পালিয়ে বেড়ায়

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩১: মহর্ষি চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে মৃত্যু

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৩৩: আকাশ এখনও মেঘলা
দ্বিতীয় দুর্গা ব্রহ্মচারিণী। তিনি যোগিনীর বেশে, তপস্বিনী ব্রহ্মচর্য পালনকারিণী। জপের মালা ও কমণ্ডলু ধারণ করে আছেন। ভক্তকে ব্রহ্মজ্ঞান প্রদান করেন। ভক্তিতে প্রীত হয়ে ব্রহ্মজ্ঞান প্রদান করাই তার স্বভাব। ত্যাগ, ভক্তি, সাধনার প্রতীকজ্ঞান, বৈরাগ্য, শক্তি দান করেন।
তৃতীয় দুর্গা চন্দ্রঘন্টা। তিনি চন্দ্রবৎ অতিশয় নির্মল, ঘন্টা যাঁর ভূষণ। তিনি চন্দ্র অপেক্ষা লাবণ্যবতী ও আহ্লাদকারিণী। সিংহবাহিনী, কপালে অর্ধচন্দ্রাকার ঘন্টা সুশোভিত। তিনি ভক্তদের ভয় মোচন করেন ও দুঃখ বিপদ দূর করেন।
তৃতীয় দুর্গা চন্দ্রঘন্টা। তিনি চন্দ্রবৎ অতিশয় নির্মল, ঘন্টা যাঁর ভূষণ। তিনি চন্দ্র অপেক্ষা লাবণ্যবতী ও আহ্লাদকারিণী। সিংহবাহিনী, কপালে অর্ধচন্দ্রাকার ঘন্টা সুশোভিত। তিনি ভক্তদের ভয় মোচন করেন ও দুঃখ বিপদ দূর করেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩০: অলৌকিকতার আবরণে লৌকিক-অনুভবের পরশ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ
চতুর্থ দুর্গা কুষ্মাণ্ডা। কু অর্থাৎ কুৎসিত, উষ্ম অর্থাৎ সন্তাপ ত্রয়কে নাশ করেন। সেই রূপ সংসারকে তিনি অণ্ডে অর্থাৎ উদরে ধারণ করেছেন। গুপ্তবতী টীকা মতে, ত্রিবিধতাপ যুক্ত সংসারকে ভক্ষন করেন, জীবকে পরিত্রান করেন মাতা কুষ্মাণ্ড। এ জগত সৃষ্টি কর্ত্রীয়। মহাশক্তি যিনি সূর্য মন্ডলে অধিষ্ঠিত। স্বাস্থ্য, সম্পদ ও শক্তি প্রদান করেন। পঞ্চম দুর্গা স্কন্দ মাতা। সনৎকুমারের অন্য নাম স্কন্ধ। তিনি তাদের মাতা বলে স্কন্ধ মাতা। অপর মতে, কার্ত্তিক অর্থাৎ স্কন্ধের মাতা স্কন্ধমাতা। দেবী মাতার প্রতীক স্বরূপা। মাতৃত্ব, দয়া ও করুণা দান করেন। তাঁর কৃপায় ভক্ত শান্তি লাভ করেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৭: আবাবিল
ষষ্ঠ দুর্গ কাত্যায়নী। যখন অসুরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেবতারা ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে উপস্থিত হয়ে একযোগে দেবীকে আহ্বান করেন এবং দেবী, ঋষি কাত্যায়ণের আশ্রমে রূপ পরিগ্রহ করেন ও কন্যাত্ব স্বীকার করেন তখন দেবী নামে কাত্যায়নী নামে খ্যাত হন। ইন্দ্রাদি দেবগণ মহিষাসুর, শম্ভু আদি অসুর বধ কালে, দেবীকে আহ্বান ও স্তুতি করেন। দেবী সিংহবাহিনী, শক্তি ও ন্যায় রক্ষা করেন বলে এরূপে বিখ্যাত।
সপ্তম দুর্গা কালরাত্রি। তিনি সর্বপ্রকার কালের নাশ করেন। মহাপ্রলয়ের সময় কালেরও নাশ হয়। তিনি কাল, পক্ষ, এ সব সৃষ্টির নব বীজ বপন করেন। দেবী কালরাত্রির রূপ ভয়ঙ্কর। অশুভ বিনাশিনী। (দুর্গাপ্রদীপ টীকা।) খড়্গ ও বর্শা ধারণ করে ভয় ও বিপদ নাশ করেন।
সপ্তম দুর্গা কালরাত্রি। তিনি সর্বপ্রকার কালের নাশ করেন। মহাপ্রলয়ের সময় কালেরও নাশ হয়। তিনি কাল, পক্ষ, এ সব সৃষ্টির নব বীজ বপন করেন। দেবী কালরাত্রির রূপ ভয়ঙ্কর। অশুভ বিনাশিনী। (দুর্গাপ্রদীপ টীকা।) খড়্গ ও বর্শা ধারণ করে ভয় ও বিপদ নাশ করেন।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
অষ্টম দুর্গা মহাগৌরী। তিনি শুম্ভু, নিশুম্ভ ও ধুম্রলোচন দুষ্ট দৈত্যদের নাশকালে ও ত্রিলোকের রক্ষার জন্য ও দেবগন উপকারের জন্য দেবী মহাগৌরী রূপ ধারণ করেন। তিনি শুভ্র বর্ণা, কোমল শান্তরূপা, ত্রিভুবনের আধার স্বরূপিনী, মহা শক্তি, অপূর্বা মহা সরস্বতী, মহালক্ষ্মী ও ভয়ঙ্কর রূপে মহাকালী। তিনি পবিত্রতা, দয়া, শান্তি প্রদান করেন।
নবম দুর্গা সিদ্ধিদাত্রী। যিনি সিদ্ধি ও আধ্যাত্মিক শক্তি প্রদান করেন। দেবী সিংহ ও পদ্মাসনে আসীন। যিনি ভক্তের প্রার্থনায় সিদ্ধি অর্থাৎ মোক্ষ প্রদান করেন। দেবীর এ সকল উপাখ্যান বেদেও উক্ত হয়েছে। যারা বিষম বিপদে পতিত হয়ে দেবীর শরণাগত হন তাদের কোন রূপ অশুভ হয় না। শোক ও বিপদ থেকে বিমুক্ত হয়।
এই নব দুর্গা রূপ ছাড়াও দেবী ব্রাহ্ম্যাদি একাদশ মাতৃকা, দশদিকপাল রূপেও দেবীর কীর্তি বর্ণিত হয়েছে। দেবী দেহের অন্তরে বাহিরে সকল অঙ্গে বিরাজিতা। জগতের সকল স্থানে ও সর্ববস্তুতে অধিষ্ঠিত হয়ে তাঁর ভক্তদের রক্ষা করেন। দেবীর সর্বব্যাপীত্ব এখানে প্রতিষ্ঠিত। যে দেবীকে সকল সময় সকল ক্ষেত্রে স্মরণ করে , সে সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যায়।— চলবে
নবম দুর্গা সিদ্ধিদাত্রী। যিনি সিদ্ধি ও আধ্যাত্মিক শক্তি প্রদান করেন। দেবী সিংহ ও পদ্মাসনে আসীন। যিনি ভক্তের প্রার্থনায় সিদ্ধি অর্থাৎ মোক্ষ প্রদান করেন। দেবীর এ সকল উপাখ্যান বেদেও উক্ত হয়েছে। যারা বিষম বিপদে পতিত হয়ে দেবীর শরণাগত হন তাদের কোন রূপ অশুভ হয় না। শোক ও বিপদ থেকে বিমুক্ত হয়।
এই নব দুর্গা রূপ ছাড়াও দেবী ব্রাহ্ম্যাদি একাদশ মাতৃকা, দশদিকপাল রূপেও দেবীর কীর্তি বর্ণিত হয়েছে। দেবী দেহের অন্তরে বাহিরে সকল অঙ্গে বিরাজিতা। জগতের সকল স্থানে ও সর্ববস্তুতে অধিষ্ঠিত হয়ে তাঁর ভক্তদের রক্ষা করেন। দেবীর সর্বব্যাপীত্ব এখানে প্রতিষ্ঠিত। যে দেবীকে সকল সময় সকল ক্ষেত্রে স্মরণ করে , সে সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যায়।— চলবে
* অনন্ত এক পথ পরিক্রমা (Ananta Ek Patha Parikrama) : স্বামী তত্ত্বাতীতানন্দ (Swami Tattwatitananda), সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মিশন, ফিজি (Fiji)।


















