
ছবি: প্রতীকী।
প্রাচীন বাংলা গদ্য সাহিত্য সৃষ্টির ইতিহাসের সঙ্গে কোচবিহারের নাম শুনে আসছি আমরা। সেই ষোড়শ শতকে দোর্দ্দন্ড প্রতাপ কোচ নৃপতি নরনারায়ণ আহোম রাজা চুকামফা স্বর্গদেবকে যে পত্র দিয়েছিলেন সেটাই বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রাচীনতম দলিল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। কিন্তু এই পত্র লেখার বহু বছর আগে, এমনকি ত্রিপুরায় বহুকথিত বহু চর্চিত ধর্ম্ম মানিক্যের আমলের ‘রাজমালা’ সৃষ্টিরও অনেক আগেই নাকি বাংলা গদ্যে লেখা হয়ে গিয়েছিল ‘ত্রিপুরা রাজাবলী’। একদা এই গ্ৰন্হ আবিষ্কৃত হয়েছিল এশিয়াটিক সোসাইটির পুস্তকালয়ে। আর আবিষ্কারকর্তা প্রত্নতত্ত্ববিদ রাজেন্দ্রলাল মিত্র নিরূপণ করেছিলেন ‘ত্রিপুরা রাজাবলী’ই বাংলা ভাষার প্রথম গদ্য গ্ৰন্হ।
ত্রিপুরার ‘রাজমালা’-কেও বাংলা পদ্যে এক প্রাচীন সৃষ্টি হিসেবে উল্লেখ করে আসা হচ্ছে। তবে রাজমালার রচনাকাল নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। আছে ভাষা নিয়ে মতবিরোধও। কেউ বলেছেন, মহারাজা ধর্ম্ম মানিক্যের আমলে (১৪৩১-৬২ খ্রিস্টাব্দ) ‘রাজমালা’ সৃষ্টি হয়েছিল বাংলা পয়ার ছন্দে। কেউ বলেছেন তা ছিল সংস্কৃতে ‘রাজরত্নাকর’। পরবর্তী সময়ে তাকে ভিত্তি করেই রচিত হয় বাংলা ‘রাজমালা’। তবে প্রচলিত ধারণা এই যে, মহারাজা ধর্ম্ম মানিক্যের পৃষ্ঠপোষকতায় চন্তাই দুর্লভেন্দ্রের সহায়তায় পণ্ডিত শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর বাংলা পয়ারে ‘রাজমালা’ রচনা করেছিলেন। আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর সুবিখ্যাত গ্ৰন্হ ‘বৃহৎ বঙ্গ’-এ (২য় খণ্ড) লিখেছেন— “… অগত্যা ধর্ম্ম মানিক্য চন্তাই দুর্লভেন্দ্রের শরণাপন্ন হইলেন। ইনি ত্রিপুর ভাষায় রচিত ইতিহাস হইতে বাঙ্গলা করিয়া যে কাহিনী শুনাইলেন,তাহাই শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর বাঙ্গলা পয়ারে অনুবাদ করিয়া লইলেন।…”
ত্রিপুরার ‘রাজমালা’-কেও বাংলা পদ্যে এক প্রাচীন সৃষ্টি হিসেবে উল্লেখ করে আসা হচ্ছে। তবে রাজমালার রচনাকাল নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। আছে ভাষা নিয়ে মতবিরোধও। কেউ বলেছেন, মহারাজা ধর্ম্ম মানিক্যের আমলে (১৪৩১-৬২ খ্রিস্টাব্দ) ‘রাজমালা’ সৃষ্টি হয়েছিল বাংলা পয়ার ছন্দে। কেউ বলেছেন তা ছিল সংস্কৃতে ‘রাজরত্নাকর’। পরবর্তী সময়ে তাকে ভিত্তি করেই রচিত হয় বাংলা ‘রাজমালা’। তবে প্রচলিত ধারণা এই যে, মহারাজা ধর্ম্ম মানিক্যের পৃষ্ঠপোষকতায় চন্তাই দুর্লভেন্দ্রের সহায়তায় পণ্ডিত শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর বাংলা পয়ারে ‘রাজমালা’ রচনা করেছিলেন। আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর সুবিখ্যাত গ্ৰন্হ ‘বৃহৎ বঙ্গ’-এ (২য় খণ্ড) লিখেছেন— “… অগত্যা ধর্ম্ম মানিক্য চন্তাই দুর্লভেন্দ্রের শরণাপন্ন হইলেন। ইনি ত্রিপুর ভাষায় রচিত ইতিহাস হইতে বাঙ্গলা করিয়া যে কাহিনী শুনাইলেন,তাহাই শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর বাঙ্গলা পয়ারে অনুবাদ করিয়া লইলেন।…”
‘রাজমালা’র সার সংকলক রেভারেন্ড জেমস্ লঙ এই কাব্য গাঁথাকে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বাংলা ভাষার নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এটি ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ ও কৃত্তিবাসী রামায়ণেরও আগেকার। তিনি বলেছেন, কাশ্মীরের ‘রাজতরঙ্গিনী’র সংকলনের মতো এটা একজন প্রত্যক্ষদর্শীর লেখা।এর প্রথম অংশ পঞ্চদশ শতকে লেখা। পরবর্তী অংশ অবশ্য আধুনিক কালের।
এদিকে ‘রাজর্ষি’র ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্রকে যে পত্র দিয়েছিলেন তার উত্তরে রাজা কবিকে লিখেন—”…’রাজরত্নাকর’ নামে ত্রিপুর রাজবংশের একখানা ধারাবাহিক সংস্কৃত ইতিহাস আছে।এই গ্ৰন্হ ধর্ম্ম মানিক্যের রাজত্ব সময়ে সঙ্কলিত হইতে আরম্ভ হয়।… উক্ত ‘রাজরত্নাকরে’ আর একখানা প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় লিখিত ‘রাজমালা’র উল্লেখ আছে; সেই প্রাচীন রাজমালা এখন কোথাও অনুসন্ধানে পাওয়া যায় না।’রাজমালা’ বলিয়া যাহা প্রচলিত তাহা রাজরত্নাকর হইতে সংক্ষিপ্ত ও সংগৃহীত এবং বাংলা পদ্যে লিখিত। সাধারণে পাঠ করিয়া যেন অনায়াসে বুঝিতে পারে এই অভিপ্রায়েই দ্বিতীয় ‘রাজমালা’ রচিত হইয়াছে।…”
তাহলে দেখা যাচ্ছে, মহারাজা বীরচন্দ্রের এই অভিমত যে,ধর্ম্ম মানিক্যের সময়ে ত্রিপুর রাজবংশের ধারাবাহিক ইতিহাস সংস্কৃতে লিপিবদ্ধ হয়েছিল। পঞ্চদশ শতকে আদৌ বাংলায় রাজমালা লেখা হয়েছিল কিনা এই প্রশ্নের উত্তর আজ তাই ধোঁয়াশার মধ্যে। কথিত সেই প্রাচীন রাজমালার অস্তিত্ব কোথাও খোঁজে পাওয়া যায় না।
এদিকে ‘রাজর্ষি’র ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্রকে যে পত্র দিয়েছিলেন তার উত্তরে রাজা কবিকে লিখেন—”…’রাজরত্নাকর’ নামে ত্রিপুর রাজবংশের একখানা ধারাবাহিক সংস্কৃত ইতিহাস আছে।এই গ্ৰন্হ ধর্ম্ম মানিক্যের রাজত্ব সময়ে সঙ্কলিত হইতে আরম্ভ হয়।… উক্ত ‘রাজরত্নাকরে’ আর একখানা প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় লিখিত ‘রাজমালা’র উল্লেখ আছে; সেই প্রাচীন রাজমালা এখন কোথাও অনুসন্ধানে পাওয়া যায় না।’রাজমালা’ বলিয়া যাহা প্রচলিত তাহা রাজরত্নাকর হইতে সংক্ষিপ্ত ও সংগৃহীত এবং বাংলা পদ্যে লিখিত। সাধারণে পাঠ করিয়া যেন অনায়াসে বুঝিতে পারে এই অভিপ্রায়েই দ্বিতীয় ‘রাজমালা’ রচিত হইয়াছে।…”
তাহলে দেখা যাচ্ছে, মহারাজা বীরচন্দ্রের এই অভিমত যে,ধর্ম্ম মানিক্যের সময়ে ত্রিপুর রাজবংশের ধারাবাহিক ইতিহাস সংস্কৃতে লিপিবদ্ধ হয়েছিল। পঞ্চদশ শতকে আদৌ বাংলায় রাজমালা লেখা হয়েছিল কিনা এই প্রশ্নের উত্তর আজ তাই ধোঁয়াশার মধ্যে। কথিত সেই প্রাচীন রাজমালার অস্তিত্ব কোথাও খোঁজে পাওয়া যায় না।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬০: কবিগুরুর শিলং সফর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৬: বিপদে মোরে রক্ষা করো
যাই হোক, প্রাচীন গ্ৰন্হ সংস্কৃত ‘রাজরত্নাকর’ ও কথিত সেই বাংলা ‘রাজমালা’ ছাড়াও আরও কয়েকটি বাংলা রাজমালা রয়েছে। দুর্গামনি উজিরের রাজমালা রচিত হয়েছিল ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে। কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে একটি রাজমালা পুঁথি পাওয়া গিয়েছিল যা রচিত হয়েছিল দুর্গামনির আগেই। কারণ দুর্গামনি বঙ্গীয় পরিষদের রাজমালাকে অনুসরণ করেই তাঁর রাজমালা রচনা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বঙ্গীয় পরিষদের পুঁথিটিতে রচয়িতা ও রচনাকালের কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট গবেষকগণ বলেছেন, বঙ্গীয় পরিষদের রাজমালাটি অষ্টাদশ শতকের কোনো এক সময়ে রচিত। তাহলে দেখা যাচ্ছে পরিষদে প্রাপ্ত রাজমালাই এ পর্যন্ত প্রাপ্ত রাজমালা পুঁথি সমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন।
সমগ্ৰ রাজমালা অবশ্য একসঙ্গে রচিত হয় নি।ধর্ম্ম মানিক্যের পরও বিভিন্ন রাজাদের রাজত্বকালে রাজাদেশে রাজসভাকবিগণ তা রচনা করেছেন। ছয় পর্যায়ে তা ক্রমে ক্রমে রচিত হয়েছে। সেই অনুসারে ‘রাজমালা’কে ছয় খণ্ডে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন প্রথম খণ্ড ধর্ম মাণিক্যের (১৪৩১-৬২ খ্রি:) আদেশে রচিত। ২য় খণ্ড মহারাজা অমর মাণিক্যের (১৫৭৭-৮৬ খ্রি:) আদেশে, তৃতীয় রাম মাণিক্যের (১৬৭৩-৮৫ খ্রি:) শাসনকালে, ৪র্থ রামগঙ্গা মাণিক্যের (১৮১৩-২৬ খ্রি:) আদেশে, ৫ম খণ্ড কাশীচন্দ্রমাণিক্যের (১৮২৬-২৯ খ্রিঃ) সময়ে এবং ষষ্ঠ খণ্ডটি রচিত হয় মহারাজা কৃষ্ণ কিশোর মাণিক্যের (১৮৩০-৪৯ খ্রি:) রাজত্বকালে।
সমগ্ৰ রাজমালা অবশ্য একসঙ্গে রচিত হয় নি।ধর্ম্ম মানিক্যের পরও বিভিন্ন রাজাদের রাজত্বকালে রাজাদেশে রাজসভাকবিগণ তা রচনা করেছেন। ছয় পর্যায়ে তা ক্রমে ক্রমে রচিত হয়েছে। সেই অনুসারে ‘রাজমালা’কে ছয় খণ্ডে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন প্রথম খণ্ড ধর্ম মাণিক্যের (১৪৩১-৬২ খ্রি:) আদেশে রচিত। ২য় খণ্ড মহারাজা অমর মাণিক্যের (১৫৭৭-৮৬ খ্রি:) আদেশে, তৃতীয় রাম মাণিক্যের (১৬৭৩-৮৫ খ্রি:) শাসনকালে, ৪র্থ রামগঙ্গা মাণিক্যের (১৮১৩-২৬ খ্রি:) আদেশে, ৫ম খণ্ড কাশীচন্দ্রমাণিক্যের (১৮২৬-২৯ খ্রিঃ) সময়ে এবং ষষ্ঠ খণ্ডটি রচিত হয় মহারাজা কৃষ্ণ কিশোর মাণিক্যের (১৮৩০-৪৯ খ্রি:) রাজত্বকালে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৭: রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার হতে চেয়েছিলেন

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৯: সারদা মায়ের রোগ নিরাময়ের প্রচেষ্টা
‘রাজমালা’র সেই সব পুঁথি অবশ্য অনেককাল আগে থেকেই লুপ্ত কিংবা দুষ্প্রাপ্য। অপেক্ষাকৃত আধুনিককালে ‘রাজমালা’ মুদ্রণের ইতিহাসও কিন্তু শতাব্দীকালেরও বেশি পুরনো। মহারাজা রাধাকিশোর মানিক্যের (১৮৯৬-১৯০৯ খ্রি:) আদেশে রাজসভা পণ্ডিত চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদের সম্পাদনায় ৬ খন্ডে সম্পূর্ণ ‘রাজমালা’ মুদ্রিত হয়। কিন্তু তাও কালক্রমে লুপ্ত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে মহারাজা বীরবিক্রমের (১৯২৩-৪৭ খ্রি:) পৃষ্ঠপোষকতায় এবং পন্ডিত কালীপ্রসন্ন সেন বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায় ‘শ্রীরাজমালা’র ১ম, ২য় ও ৩য় লহরের প্রকাশ ঘটে ১৯২৬ থেকে ১৯৩১ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ৪র্থ লহরের পান্ডুলিপি সম্পূর্ণ করা ও মুদ্রণের আগেই কালীপ্রসন্ন সেন মহোদয়ের মৃত্যু ঘটে। স্বাভাবিক ভাবেই তখন বন্ধ হয়ে পড়ে ‘শ্রীরাজমালা’ সম্পাদনার কাজও।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৯: সময় বুঝে প্রত্যাঘাতের জন্য রাজনীতিতে অনেক সময় পিছিয়েও দাঁড়াতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৫: অগ্নির কি শুধুই দহনজ্বলা? মহর্ষি মন্দপালের অগ্নিস্তুতিতে অগ্নির কোন সদর্থকতার ইঙ্গিত?
বাংলা পদ্যে রচিত ‘রাজমালা’র প্রাচীনত্ব নিয়ে আলোচনা কিংবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে বলে সঙ্গত ভাবেই ধারণা করা যায়। কিন্তু বাংলা গদ্যে ‘ত্রিপুরা রাজাবলী’? ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত শীতল চন্দ্র চক্রবর্তী বিদ্যানিধি প্রণীত ‘ত্রিপুরার প্রাচীন ইতিহাস ‘ গ্ৰন্হের মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন—”… সবিশেষ বিস্ময়ের বিষয় এই যে,’রাজমালা’ অপেক্ষাও প্রাচীন ‘ত্রিপুরা রাজাবলী’ নামে ত্রিপুরার রাজবংশের ইতিবৃত্ত মূলক একখানা গদ্য গ্ৰন্হ প্রত্নতাত্ত্বিক চূড়ামণি রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র কর্ত্তৃক এশিয়াটিক সোসাইটির পুস্তকালয়ে আবিষ্কৃত হইয়াছিল। তৎকর্ত্তৃক ইহা ৯০০ বৎসরের প্রাচীন এবং বাঙ্গালা ভাষার প্রথম গদ্য গ্ৰন্হ বলিয়া অবধারিত হইয়াছে।…”
গ্ৰন্হকার এই মুখবন্ধে মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত প্রসন্ন চন্দ্র বিদ্যারত্ন মহোদয়ের ‘সাহিত্য প্রবেশ ব্যাকরণ’ গ্ৰন্হের ‘বাঙ্গলা ভাষার ইতিহাস’ অধ্যায়ের কিছু অংশ উদ্ধৃত করেছেন—”… ইতঃপূর্বে কথিত হইয়াছে যে, ‘ত্রিপুরা রাজাবলী’ নামক বাঙ্গালা গদ্য পুস্তকখানা ৯০০ বৎসরের পুরাতন। প্রত্নতত্ত্ববিদ ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র ‘বিবিধার্থ সংগ্ৰহ’ নামক পুরাতন মাসিক পত্রে বঙ্গ ভাষার উৎপত্তি বিষয়ক প্রবন্ধে উক্ত পুস্তকের নাম নির্দ্দেশ করিয়াছিলেন। কোনও অনির্বচনীয় কারণে এশিয়াটিক সোসাইটির পুস্তকালয় হইতে ইহা অদৃশ্য হইয়াছে বলিয়া কথিত। বস্তুতঃ অনেক চেষ্টা করিয়াও ঐ পুস্তকখানি আমরা দেখিতে পারি নাই।”
গ্ৰন্হকার এই মুখবন্ধে মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত প্রসন্ন চন্দ্র বিদ্যারত্ন মহোদয়ের ‘সাহিত্য প্রবেশ ব্যাকরণ’ গ্ৰন্হের ‘বাঙ্গলা ভাষার ইতিহাস’ অধ্যায়ের কিছু অংশ উদ্ধৃত করেছেন—”… ইতঃপূর্বে কথিত হইয়াছে যে, ‘ত্রিপুরা রাজাবলী’ নামক বাঙ্গালা গদ্য পুস্তকখানা ৯০০ বৎসরের পুরাতন। প্রত্নতত্ত্ববিদ ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র ‘বিবিধার্থ সংগ্ৰহ’ নামক পুরাতন মাসিক পত্রে বঙ্গ ভাষার উৎপত্তি বিষয়ক প্রবন্ধে উক্ত পুস্তকের নাম নির্দ্দেশ করিয়াছিলেন। কোনও অনির্বচনীয় কারণে এশিয়াটিক সোসাইটির পুস্তকালয় হইতে ইহা অদৃশ্য হইয়াছে বলিয়া কথিত। বস্তুতঃ অনেক চেষ্টা করিয়াও ঐ পুস্তকখানি আমরা দেখিতে পারি নাই।”
আরও পড়ুন:

গীতা: সম্ভবামি যুগে যুগে, পর্ব-২৩: বন্ধু হে আমার…

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০১: ছিট ঘুঘু
মহারাজা বীরবিক্রমের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত “শ্রীরাজমালা”র (১ম লহর) সম্পাদক কালীপ্রসন্ন সেন লিখেছেন, ‘রাজাবলী’ নামে ত্রিপুরার এক প্রাচীন ইতিহাস গ্ৰন্হ ছিল। ৮০০ বছর আগে বাংলা গদ্যে তা রচিত হয়েছিল। এখন আর তার অস্তিত্ব নেই। তিনি আরও জানিয়েছেন যে, পণ্ডিত রামগতি ন্যায়রত্ন মহোদয়ের “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাবে” এই পুঁথির উল্লেখ রয়েছে।
প্রাচীন গ্ৰন্হ, ভাষা, সাহিত্য নিয়ে গবেষণা থেমে নেই। নতুন তথ্য আবিষ্কারে নয়া দিগন্ত উন্মোচিত হয়। সেই আমলের বিশিষ্ট পন্ডিত শীতল চন্দ্র চক্রবর্তী ও কালীপ্রসন্ন সেনের লেখা অনুসারে দেখা যাচ্ছে বাংলা গদ্য সাহিত্যে ত্রিপুরা কোচবিহারের চেয়েও প্রাচীনত্বের দাবিদার। কারণ আমরা জানি, কোচবিহারের রাজার পত্রটিই বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রাচীনতম দলিল।
১৪৭৭ শকাব্দের (১৫৫৫ খ্রি:) আষাঢ় মাসে কোচ নৃপতি নরনারায়ণ আহোম রাজা চুকামফা স্বর্গদেবকে (খোঁড়া রাজা) বাংলা গদ্যে লেখা যে পত্রটি দিয়েছিলেন তার কিছু অংশ হল—”…লেখনং কার্য্যঞ্চ। এথা আমার কুশল। তোমার কুশল নিরন্তরে বাঞ্ছা করি। অখন তোমার আমার সন্তোষ সম্পাদক পত্রাপত্রি গতায়াত হইলে উভয়ানুকূল প্রীতির বীজ অঙ্কুরিত হইতে রহে। তোমার আমার কর্ত্তব্যে বার্দ্ধতাক পাই পুষ্পিত ফলিত হইবেক। আমরা সেই উদ্যোগত আছি।…”
কোচবিহারের রাজদরবার থেকে আহোম রাজার কাছে প্রেরিত এই ঐতিহাসিক পত্রটিকে প্রাচীন বাংলা গদ্য রীতির প্রথম প্রামাণ্য নিদর্শন হিসেবে গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তারও পাঁচ শতাধিক বছর আগে বাংলা গদ্যে লেখা হয়েছিল ‘ত্রিপুরা রাজাবলী’? কেমন ছিল সেই গদ্যের রূপ? গদ্য বা পদ্য যাই হোক না কেন, বাংলা সাহিত্যের আদি ইতিহাসের সঙ্গে ত্রিপুরার যে এক গৌরবময় সংযোগ রয়েছে সে ব্যাপারে পণ্ডিতরা ইঙ্গিত করেছেন। আরও নতুন গবেষণা, ব্যাপক অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনাগত দিনে কোনও নতুন তথ্য আবিষ্কার করতে পারে কিনা কে জানে! —চলবে।
প্রাচীন গ্ৰন্হ, ভাষা, সাহিত্য নিয়ে গবেষণা থেমে নেই। নতুন তথ্য আবিষ্কারে নয়া দিগন্ত উন্মোচিত হয়। সেই আমলের বিশিষ্ট পন্ডিত শীতল চন্দ্র চক্রবর্তী ও কালীপ্রসন্ন সেনের লেখা অনুসারে দেখা যাচ্ছে বাংলা গদ্য সাহিত্যে ত্রিপুরা কোচবিহারের চেয়েও প্রাচীনত্বের দাবিদার। কারণ আমরা জানি, কোচবিহারের রাজার পত্রটিই বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রাচীনতম দলিল।
১৪৭৭ শকাব্দের (১৫৫৫ খ্রি:) আষাঢ় মাসে কোচ নৃপতি নরনারায়ণ আহোম রাজা চুকামফা স্বর্গদেবকে (খোঁড়া রাজা) বাংলা গদ্যে লেখা যে পত্রটি দিয়েছিলেন তার কিছু অংশ হল—”…লেখনং কার্য্যঞ্চ। এথা আমার কুশল। তোমার কুশল নিরন্তরে বাঞ্ছা করি। অখন তোমার আমার সন্তোষ সম্পাদক পত্রাপত্রি গতায়াত হইলে উভয়ানুকূল প্রীতির বীজ অঙ্কুরিত হইতে রহে। তোমার আমার কর্ত্তব্যে বার্দ্ধতাক পাই পুষ্পিত ফলিত হইবেক। আমরা সেই উদ্যোগত আছি।…”
কোচবিহারের রাজদরবার থেকে আহোম রাজার কাছে প্রেরিত এই ঐতিহাসিক পত্রটিকে প্রাচীন বাংলা গদ্য রীতির প্রথম প্রামাণ্য নিদর্শন হিসেবে গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তারও পাঁচ শতাধিক বছর আগে বাংলা গদ্যে লেখা হয়েছিল ‘ত্রিপুরা রাজাবলী’? কেমন ছিল সেই গদ্যের রূপ? গদ্য বা পদ্য যাই হোক না কেন, বাংলা সাহিত্যের আদি ইতিহাসের সঙ্গে ত্রিপুরার যে এক গৌরবময় সংযোগ রয়েছে সে ব্যাপারে পণ্ডিতরা ইঙ্গিত করেছেন। আরও নতুন গবেষণা, ব্যাপক অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনাগত দিনে কোনও নতুন তথ্য আবিষ্কার করতে পারে কিনা কে জানে! —চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















