বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্য।

মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব এবং তাঁর অবিশ্বাসী, কূটিল চরিত্রের কথা আমরা কে না জানি! কিন্তু ঔরঙ্গজেব কন্যা জেবুন্নিসা বেগমের কথা? কেউ কেউ জানলেও বেশিরভাগই জানেন না এই জেবুন্নিসা ছিলেন তদানীন্তন মোগল ভারতের এক বিশিষ্ট কবি। একদিন এই কবির জীবনে নীরবে এসেছিল প্রেম। হতভাগ্য লাহোরের শাসনকর্তা আকিল খাঁ! সম্রাট দুহিতার সঙ্গে গোপন প্রণয়ের পরিণতিতে নির্মম ভাবে মৃত্যু ঘটেছিল তার।

জেবুন্নিসা ছিলেন মোগল অন্তঃপুরের এক দৃঢ়চেতা রমণী। তিনি ছিলেন কবি, সংস্কৃতি মনস্ক এবং অসাধারণ শিল্পবোধ সম্পন্ন। কিন্তু তাঁর জীবনে বারংবার নেমে এসেছিল বিপর্যয়। পিতা ঔরঙ্গজেব। মহলের দেয়ালকেও যেন তাঁর প্রবল অবিশ্বাস।একদা পিতার অবিশ্বাসের কোপানলে পড়ে সলীমগড় দুর্গে অবরুদ্ধ ছিলেন জেবুন্নিসা। লিখে চলেছেন কবিতা—”….যখন হইতে পায়ে বেড়ি পরিয়াছি সেই দিন হইতেই/মন উন্মাদগ্রস্ত হইয়াছে/যাহারা আমার বন্ধু ছিল তাহারাও শত্রু হইয়াছে এবং/প্রিয়জনও এখন আমার অপরিচিত হইয়া গিয়াছে।…”
অবরুদ্ধ এই সম্রাট দুহিতার কথা হয়তো নাড়া দিয়েছিল এক নির্বাসিত রাজকুমারকে। তিনি লিখলেন জেবুন্নিসাকে নিয়ে। ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের পুত্র বড় ঠাকুর সমরেন্দ্র চন্দ্র সেসময় ত্রিপুরার বাইরে। অবস্হান করছিলেন আগ্ৰায়। জেবুন্নিসা তখন ইতিহাস। মোগল সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে অনেক আগেই। কিন্তু মোগল ইতিহাসের এই অতুলনীয়া রমণী জেবুন্নিসা বেগমের কাব্য প্রতিভা আর তাঁর বিপর্যস্ত জীবন কাহিনি কেন জানি নির্বাসিত রাজপুত্র সমরেন্দ্র চন্দ্রকে প্রবল ভাবে আকৃষ্ট করেছিল। আগ্ৰায় অবস্হানের আরও কয়েক বছর পরে সমরেন্দ্র চন্দ্র একদিন সেই গল্পই করছিলেন এক আড্ডায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। তখন অবনীন্দ্রনাথ জেবুন্নিসাকে নিয়ে একটি বই লিখতে তাঁকে অনুরোধ করলেন। ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালের মোগল ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে জেবুন্নিসা উঠে এলেন সমরেন্দ্র চন্দ্রের কলমে—’জেবুন্নিসা বেগম’।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬১: বাংলা গদ্য-পদ্যের ইতিহাসে ত্রিপুরা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৬: রাম যৌথ পরিবারের আদর্শনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ, তাঁর যেন এক ঘরোয়া ভাবমূর্তি

প্রায় শত বর্ষ আগে, ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বইটির ভূমিকায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন—”আমি আমার বন্ধু প্রবরের মুখে দিনের পর দিন এই সব মোগল অন্তঃপুরবাসিনী শাহজাদি ও সম্রাজ্ঞী গণের কাহিনি ও কবিতা শুনে কেবলি ভেবেছি কে এসব রমনীয় রচনা ও কাহিনি তর্জ্জমা করে সাধারণ পাঠকদের কাছে দেবে। অপরিচিত ভাষার বাধা সরিয়ে, বিস্মৃতির অবগুণ্ঠন অপসারণ করে দিয়ে এই ক্ষুদ্র পুস্তিকায় আমার সে আশা বন্ধুবর অনেকটাই পূর্ণ করেছেন।”

যাই হোক, এবার মোগল কাহিনি থেকে দেশীয় রাজ্য ত্রিপুরার দিকে চোঁখ ফেরানো যাক। ত্রিপুরার রাজপরিবারে সাহিত্য চর্চার ধারা যেমন ছিল, তেমনই রাজনৈতিক ডামাডোলও কম ছিল না! ইতিহাসের নানা পর্যায়ে ছিল ষড়যন্ত্রের নানা অধ্যায়ও। মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের পুত্র বড়ো ঠাকুর সমরেন্দ্র চন্দ্র সে যুগের একজন বিশিষ্ট লেখক ছিলেন। তাঁর ‘আগ্ৰার চিঠি’, ‘ভারতীয় স্মৃতি’, ‘ত্রিপুরার স্মৃতি’, ‘জেবুন্নিসা বেগম’ গ্ৰন্হ সমূহ পাঠকদের উচ্চ প্রশংসা লাভ করেছিল। বাংলা, সংস্কৃতের মতো আরবি, ফার্সি ও ইংরেজিতেও সমরেন্দ্র চন্দ্রের ভালো দখল ছিল। তাঁর ‘ত্রিপুরার স্মৃতি’ গ্ৰন্হটি ত্রিপুরার বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিবরণের এক মূল্যবান গ্ৰন্হ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।রাজ্যের পাঠকদের কাছে আজও তার বিপুল জনপ্রিয়তা। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রকাশন সংস্হা এই গ্ৰন্হটির বিভিন্ন সংস্করণ প্রকাশ করেছে। সমরেন্দ্র চন্দ্র তাঁর ‘ত্রিপুরার স্মৃতি’ গ্ৰন্হটি উর্দুতে অনুবাদ করে সেদিন ভারতের বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে ত্রিপুরার কথা পৌঁছে দিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৭: আপাতত পরিত্রাণ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ

এবার সাহিত্য থেকে রাজন্য যুগের রাজনীতির কথায় আসা যাক। মহারাজা বীরচন্দ্রের জীবদ্দশাতেই তাঁর পুত্র যুবরাজ রাধাকিশোর এবং বড়ো ঠাকুর সমরেন্দ্র চন্দ্রের মধ্যে মতান্তর ঘটতে শুরু করেছিল। যদিও যুবরাজ রাধাকিশোর জ্যেষ্ঠ পুত্র, চতুর্থ পুত্র সমরেন্দ্র, তবু পিতা মহারাজা বীরচন্দ্রের স্নেহের পরশ দিনকে দিন বেশি পেতে শুরু করেছিলেন সমরেন্দ্র। এমনকি যুবরাজ রাধাকিশোরকে না পাঠিয়ে মহারাজা বিদেশ সফরেও পাঠিয়েছিলেন সমরেন্দ্র চন্দ্রকে। ঐতিহাসিক কৈলাসচন্দ্র সিংহ এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, “আমরা দিব্যচক্ষে দর্শন করিতেছি যে ইহার অভ্যন্তরে কূটনীতির উপাসক মহারাজ বাহাদুরের একটি কূট অভিসন্ধি লুক্কায়িত রহিয়াছে।” অবশ্য সেই অভিসন্ধি কী ছিল তা জানা যায় নি। কিন্তু কৈলাসচন্দ্র এটা উল্লেখ করেছেন যে, সমরেন্দ্র ছিলেন বীরচন্দ্রের প্রিয়তমা মহিষী ভানুমতির সন্তান।

যাইহোক, বীরচন্দ্রের মৃত্যুর পর রাজা হলেন রাধাকিশোর। কিছু দিন পর তিনি পুত্র বীরেন্দ্র কিশোরকে যুবরাজ পদে নিয়োগ করলেন। আর তার পর থেকেই সমরেন্দ্র চন্দ্রের সঙ্গে রাজা রাধাকিশোরের মতবিরোধ তীব্র আকার ধারণ করতে থাকে। বড় ঠাকুর সমরেন্দ্র যুবরাজ পদটি দাবি করে ব্রিটিশ আদালতে এ বিষয়ে আবেদন করেন। কিন্তু তাঁর আবেদন খারিজ হয়ে যায়। ১৯০৪ সালের জুন মাসে ব্রিটিশ সরকার একটি সনদের মাধ্যমে রাজার সিদ্ধান্ত অনুমোদনক্রমে ঘোষণা করে যে তাঁর আত্মীয়দের উত্তরাধিকারী নির্বাচনে ত্রিপুরার রাজার ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে। তবে এই নির্বাচনে সরকারের সমর্থন থাকতে হবে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮০: রাজনীতিতে সবাই চায় সবলের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে, দুর্বলরা সব সময়ই একা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০২: কণ্ঠী ঘুঘু

সমরেন্দ্র চন্দ্র ও রাধাকিশোরের মধ্যে মতবিরোধ তীব্র আকার ধারণ করলেও তা সাধারণ্যে তেমন একটা প্রকাশ পায় নি। দুই ভাইই পারষ্পরিক ক্ষোভ ও দ্বন্দ্বকে রাজকীয় গাম্ভীর্যে চেপে রেখেছিলেন বুকের মধ্যেই। কিন্তু যুবরাজ নিয়োগের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। শেষপর্যন্ত মহারাজা রাধাকিশোর সমরেন্দ্র চন্দ্রকে ত্রিপুরা থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৩১৪ ত্রিপুরাব্দের(১৯০৪ খ্রীঃ) ১১ আষাঢ় বের হলো রাজকীয় আদেশ—”নানা কারণে এইক্ষণ শ্রীমান সমরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্ম্মণের এ রাজ্যে বাস করা সঙ্গত নহে। অতএব আদেশ করা যায় যে উক্ত শ্রীমান আগামী ২১শে আষাঢ় মঙ্গলবারের মধ্যে এ রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া স্হানান্তর যায়।স্হানান্তরে গিয়া জানাইলে তাহার খরচাদির জন্য মাসিক অনধিক এক হাজার টাকা করিয়া তাহাকে দেওয়া যাইবে।…”

শুধু রাজ্য থেকে বহিষ্কারই নয়, পৃথক একটি রোবকারী মূলে সমরেন্দ্র চন্দ্রের বড়ঠাকুর পদও বাতিল করে দিয়েছিলেন রাধাকিশোর। নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই সমরেন্দ্র তাঁর পরিবার পরিজনসহ রাজ্যত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন। রাধাকিশোরের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ, প্রকট ভ্রাতৃবিদ্বেষ ইত্যাদি ছাড়াও সমরেন্দ্র চন্দ্রকে বদমেজাজি ও স্বার্থান্ধ বলেও উল্লেখ করেছেন কোনো কোনো ঐতিহাসিক। আবার রাধাকিশোরের জীবনস্মৃতির উল্লেখ করে কেউ বলেছেন, সমরেন্দ্র চন্দ্র ছিলেন অবিনীত, ক্ষুদ্রাত্মা, নির্মম, স্বেচ্ছাচারী। ইংরেজ কর্তৃপক্ষের কাছে যুবরাজ রাধাকিশোরকে অপরিচিত রাখার প্রয়াসী ছিলেন তিনি। এমনকি কলকাতায় অসুস্হ মহারাজা বীরচন্দ্রের শারীরিক অবস্থার খবরাখবরও নাকি রাধাকিশোরের কাছে চেপে রাখতেন সমরেন্দ্র চন্দ্র।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৮: কবির ভালোবাসা, কবির জন্য ভালোবাসা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬১: বাংলা গদ্য-পদ্যের ইতিহাসে ত্রিপুরা

যাইহোক, এসব সত্ত্বেও সমরেন্দ্র যে কি করে একজন সুদক্ষ চিত্রকর ও ভালো লেখক হলেন সে বিষয়ে ঐতিহাসিকরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।রাজ্যান্তরে রাজপুত্রের দিন গুলো কি ভাবে কাটছিল সেবিষয়ে তথ্যাদি না থাকলেও তখনই যে তিনি একেরপর এক গ্ৰন্হ রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি সংগ্রহ করছিলেন তাতে অবশ্য সন্দেহের অবকাশ নেই। কলকাতায় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির কারো কারো সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরতো ছিলেন বন্ধুপ্রতিম। ‘বদমেজাজি’ বলে চিত্রিত সমরেন্দ্র চন্দ্র,রাজার সঙ্গে তাঁর সংঘাত, সিংহাসনের দাবি, শেষে রাজ্যান্তরে নির্বাসন ইত্যাদি সবই যেন চাপা পড়ে যায় তাঁর সৃষ্টি সম্ভারের কাছে। তাঁর ‘ত্রিপুরার স্মৃতি’তে নিঃসন্দেহে দীর্ঘদিন ধরা থাকবে ত্রিপুরার ইতিহাস আর পুরাতত্ত্বের বিবরণ। উজ্জ্বল হয়ে থাকবে এক নির্বাসিত রাজপুত্রের সৃষ্টি।—চলবে।

তথ্যঋণ: জেবুন্নিসা বেগম, সমরেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মা,/আগরতলার ইতিবৃত্ত,ড.জগদীশ গণ চৌধুরী/রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস, কৈলাস চন্দ্র সিংহ/ রাজগী ত্রিপুরার সরকারি বাংলা, শিক্ষা অধিকার, ত্রিপুরা
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content