শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

উড়ন্ত জলপিপি। ছবি: সংগৃহীত।

“জলপিপি চ’লে গেলে বিকেলের নদী কান পেতে
নিজের জলের সুর শোনে…”
(জীবনানন্দ দাশ / “খেতে প্রান্তরে”)


মধ্যাহ্নভোজন সেরে প্রায় দু’সপ্তাহ পর লিখতে বসেছি। মনে মনে স্থির করে রেখেছি জলপিপি পাখি নিয়ে লিখব। ড্রয়িং রুমে বসে সবে কম্পিউটার খুলেছি। সঙ্গে সঙ্গে কানে এল তীব্র ‘চিঅ্যাঁ চিঅ্যাঁ চিঅ্যাঁ’ শব্দ। একবার না, বেশ কয়েকবার। আমার বাড়ির সামনে রাস্তার ওপারে পুকুর থেকেই শব্দটা আসছে। এ ডাক আমার খুব চেনা। তিন-চার মাস ধরে খুব শুনছি, প্রতিদিনই। সঙ্গে সঙ্গে আমার দৃষ্টি জানালার গ্রিল ভেদ করে চলে গেল পুকুরের দিকে। যা ভেবেছি ঠিক তাই। ডোবার মাঝে ভেসে থাকা আগাছার একটা ‘ভেলা’-র উপর একটা জলপিপি। কী অদ্ভুত সমাপতন!
জলপিপিটি মাঝে মাঝে দুটো ডানা মেলে পরক্ষণেই বন্ধ করছে আর চঞ্চু দিয়ে ঘাসের উপর কিছু একটা করছে। ওর মাথা আমার দিকে। টিঙটিঙে দুটো পা একটু বেশি ফাঁক করে স্থির হয়ে আছে। আর আগাছা নাড়াচাড়া করার ফাঁকে ফাঁকে ওইরকম শব্দ করে ডাকছে। ভালোভাবে লক্ষ্য করে মনে হল ও বাসা বানাচ্ছে ওই ভেলাটার উপর। জলে ভাসমান কাঠি, ঘাস চঞ্চু দিয়ে টেনে এনে বাসা বানাচ্ছে। একটু পরে দেখি পাশে ভাসমান একটা পলিথিন ব্যাগকে টানছে। অবশ্য শক্তিতে মনে হয় কুলল না বলে সামান্য দূর টেনে এনে ছেড়ে দিল। মিনিট দুয়েক পরেই দেখি তার পাশে এসে হাজির হল আর একটা জলপিপি। দ্বিতীয়টি আকারে সামান্য ছোট। যদিও ওরা দেখতে একইরকম। ফলে বোঝা মুশকিল কে পুরুষ আর কে স্ত্রী। খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। মনে হয় আমি বুঝতে পারলাম ছোটো আকারের পাখিটা পুরুষ।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৮: একটি খালি বিয়ারের বোতল

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০২: কণ্ঠী ঘুঘু

কী করে বুঝলাম? দ্বিতীয়টি এসে প্রথম জলপিপিটির কাজে সমস্যা তৈরি করতে লাগল। চেষ্টা করতে লাগল পেছন দিক দিয়ে প্রথমটির পিঠের ওপরে ওঠার। যখনই চেষ্টা করছে, প্রথমটি সরে গিয়ে তাকে সুযোগ দিচ্ছে না। কিছুক্ষণ এরকম চলার পর মনে হয় বিরক্ত হয়ে প্রথমটি উড়ে পালাল। আর তারপর দেখি ছোটটি একইভাবে বাসা তৈরির কাজে লেগে পড়ল। মিনিট দুয়েক পর কাজ বন্ধ রেখে কয়েক সেকেন্ড মাথা তুলে এদিক ওদিক দেখে কী ভাবল। তারপর যেদিকে বড়টি উড়ে গিয়েছিল সেদিকেই সে উড়ে গেল।
এই দৃশ্য দেখার পর জলপিপি নিয়ে যেভাবে লিখব বলে পরিকল্পনা করেছিলাম তা পরিবর্তন করতে মনস্থ করলাম। আর পর্যবেক্ষণ যখন করছি তখন আর একটু বেশি করিই না কেন! কম্পিউটার বন্ধ করে একটা কাজে বেরোলাম ঘন্টা দুয়েকের জন্য। ফিরলাম বিকেল পাঁচটা নাগাদ। মে মাসের ১৭ তারিখ, তখনও বাইরে প্রচন্ড গরম আর রোদের তেজ। যদিও পুরো পুকুর জুড়েই গাছেদের ছায়া। এবার আবার লেখা শুরু করবো বলে কম্পিউটার খুললাম। তারপর তাকালাম পুকুরের দিকে। দেখি এবার ওই ভেলার উপর রয়েছে ছোটো আকারের জলপিপিটি। এতক্ষণে আমি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছি যে এটি পুরুষ। নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। দেখি সে আগের মতোই কাঠি, ঘাস ইত্যাদি চঞ্চু দিয়ে টেনে এনে ওই ভেলার উপরেই বাসা বানাচ্ছে। বাসা বানানোর যৌথ ব্যবস্থাপনা দেখে মনটা খুশিতে ভরে উঠল।
কলকাতায় বৃষ্টি

বাড়ির সামনের পুকুরে খাবার খেতে ব্যস্ত জলপিপি। ছবি: লেখক।

আচ্ছা, ওর প্রেমিকাটি কোথায় গেল? পুকুরের এদিক-ওদিকে চোখ চালাতেই দেখি সে পুকুরে ঝুঁকে পড়া খয়রা গাছের নীচে জলে ভাসমান একটা শুকনো শাখার উপর দাঁড়িয়ে রূপচর্চায় ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পর সে সেখানেই খাবার সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এদিকে পুরুষটি কিন্তু বাসা বানিয়েই চলেছে। মাঝে মাঝে সে বাসার উপর দাঁড়িয়ে শরীরটাকে ওপর-নিচে দুলিয়ে কাঠিগুলোকে চেপে দিচ্ছে বুঝতে পারলাম। এই দৃশ্য দেখে হাসি পাচ্ছিল। কখনও কখনও সে নির্মীয়মান বাসার ওপরে বসে মনে হয় মাপজোক ঠিক হচ্ছে কিনা যাচাই করে নিচ্ছিল।

এভাবে মিনিট দশেক অতিবাহিত হওয়ার পর দেখি সে উড়ে চলে গেল প্রেমিকার পাশে। প্রেমিকাটি পাত্তা দিল বলে মনে হল না। মিনিট খানেক পর দেখি স্ত্রী জলপিপিটি উড়ে এসে বসল বাসার উপর। তারপর কাঠি সরিয়ে, নেচে-কুঁদে, বসে একই কায়দায় বাসা বানাতে লাগল। একঘেয়ে লাগছিল বলে ক্ষণিক বিরতি দিলাম জলপিপি দর্শনে। ঘণ্টাখানেক পরে দেখি পুকুরের উত্তর প্রান্তে রাস্তার কাছাকাছি ভাসমান সবচেয়ে বড় ভেলাটার পাশে দুজনেই খাবার সংগ্রহ করছে। ওদিকে তাদের বাসার কাছে ঝুঁকে পড়া সবেদা গাছের উপর থেকে একটা সাদা-বুক মাছরাঙা থেকে থেকে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে গুঁড়ি পানার উপর থেকে নিশ্চিত পোকা ধরে খাচ্ছে। মাছরাঙার উপস্থিতি জলপিপি জুটিকে সরে আসতে বাধ্য করল কিনা বুঝলাম না। মনে মনে স্থির করলাম আজ অন্ধকার নেমে আসা পর্যন্ত সব কাজ ফেলে ওদের কান্ডকারখানা দেখব।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৬: রাম যৌথ পরিবারের আদর্শনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ, তাঁর যেন এক ঘরোয়া ভাবমূর্তি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ

মোবাইলে তখন সময় দেখাচ্ছে সন্ধ্যে ৬-২১। মাছরাঙাটা তীব্র শব্দ করে উড়ে চলে গেল আমার জানালার পাশ দিয়ে। ঠিক তখনই দেখি জলপিপি দুটি বড়ো ভেলাটার উপরে উঠে ঘাসের মধ্যে ঢুকে পরষ্পরের মধ্যে প্রায় দু’ফুট দূরত্ব রেখে একেবারে স্থির হয়ে গেল। ভেলায় ঘাসের আড়ালের জন্য ওদের ভাল করে দেখা যাচ্ছিল না। ছাদে গেলাম। ওখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। যদিও অন্ধকারে তখন চারপাশ প্রায়াচ্ছন্ন, তাও বুঝতে পারলাম জলপিপি যুগল বসে পড়েছে ঘাসের ঝোপের ভিতর।

জলপিপিরা হল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলাভূমির পাখি। আর তাই সুন্দরবন অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। দেখতে খুবই ছোট্টখাট্টো হলেও রূপের দিক থেকে অনেক পাখিকেই টেক্কা দিতে পারে জলপিপি। মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত লম্বা হয় সর্বাধিক ১১ ইঞ্চি। এরমধ্যে প্রায় অর্ধেকটা গলা ও মাথা এবং বাকি অর্ধেকটা ধড়। ডানা মেললে আড়াআরি দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২১ ইঞ্চি। ওজনও খুব কম, মাত্র ৩৪০ গ্রামের মতো। আগেই বলেছি পুরুষেরা স্ত্রী জলপিপির তুলনায় আকারে সামান্য ছোট হলেও দেখতে একই রকম।

সবচেয়ে লক্ষণীয় হল জলপিপির দুটি ডানা। ডানার রং ব্রোঞ্জের মতো আর তার ওপর যেন হালকা সবুজের আভা। এদের মাথা, ঘাড়, বুক ও গলার রং ঝকঝকে নীলচে কালো। লেজটা খুব ছোট আর ইট-রঙা। লেজের নিচের দিকের রঙও এইরকম। জলপিপির অসাধারণ রূপের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল চোখের ওপর থেকে সাদা রঙের একটা চওড়া দাগ ঘাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। কালো রঙের মাথার উপর এই সাদা দাগ জলপিপিকে অনেক দূর থেকে চিনে নিতে সাহায্য করে। এদের চঞ্চু আর পা নিয়েও বলার মতো অনেক কিছু রয়েছে।
কলকাতায় বৃষ্টি

অপরিণত জলপিপি। ছবি: সংগৃহীত।

এদের চঞ্চুর রং হলুদ কিন্তু উপরের চঞ্চুর গোড়ায় রয়েছে লালচে বাদামি রঙের বর্মের মতো একটা আচ্ছাদন। আর দুই চঞ্চুর সংযোগস্থলে গোড়ার দিকে রয়েছে একটা ঝকঝকে লাল রঙের ছোপ। পাগুলো সরু ও খুব লম্বা। আর প্রতিটি আঙুলে রয়েছে অস্বাভাবিক লম্বা নখ। এই ধরনের পা ওদেরকে জলে ভাসমান আগাছা, ঘাস, পানা বা আবর্জনার উপর খুব সহজে চলাফেরা করতে সাহায্য করে। অপরিণত জলপিপির চোখের উপরে সাদা দাগ দেখা যায় না। আর তাছাড়া ডানা ও পিঠ ব্রোঞ্জ রঙের না হয়ে হলদে-বাদামি রঙের হয়। আর এদের মাথার চাঁদির রঙ হয় লালচে ও পেটের দিকে রঙ হয় সাদা। উপরের চঞ্চুর গোড়ায় বর্মের মতো আচ্ছাদনও এদের পুরোপুরি তৈরি হয় না। জলপিপি পাখিকে ইংরেজিতে বলে ‘Bronzed winged Jacana’। ডানার রঙের জন্যই যে ইংরেজিতে এমন নাম তা বলাবাহুল্য। এদের বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Metopidius indicus’। চঞ্চুর উপরে বর্মের মতো আচ্ছাদন আছে বলেই ল্যাটিন শব্দে গণ (Genus)-এর নাম হয়েছে Metopidius।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮১: সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য চালাতে গেলে নিজের লোকেদের পিছনেও চর নিয়োগ করতে হয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা

খাবারদাবারের ব্যাপারে জলপিপিদের খুব বেশি খুঁতখুতানি নেই। ওরা যেমন ভাসমান জলজ উদ্ভিদ ও জলজ উদ্ভিদের বীজ খায় তেমনই জলজ পোকামাকড়, লার্ভা, চিংড়ি, কাঁকড়া ইত্যাদি কবচি প্রাণী খায়। ছোট্ট পেট হলে কী হবে এরা একা একা জলাভূমির উপর ঘুরে ঘুরে খাবার দাবার সংগ্রহ করে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত। অবশ্য প্রজনন ঋতুতে জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে খাবার খেতে দেখা যায়, যেমন কিছুক্ষণ আগে আমি নিজেই দেখেছি। এরা হেঁটে হেঁটে ঘোরাফেরা করতেই পছন্দ করে। তবে প্রয়োজনে জলের ওপর যেমন কিছুক্ষণ সাঁতার দিতে পারে তেমনই অল্প দূরত্বে উড়েও যেতে পারে। আর যখন ওড়ে তখন মাথাসহ গলাটাকে লম্বা করে রাখে, আর দুটো পা নিচে ঝুলে থাকে। দেখে মনে হবে যেন পা দুটো ভেঙে গিয়েছে!
কলকাতায় বৃষ্টি

বাচ্চাদের সুরক্ষায় বাবা জলপিপি। ছবি: সংগৃহীত।

প্রজনন এবং সন্তান লালন পালনের ব্যাপারে জলপিপি সমাজে নিয়ম-কানুন পাখি সমাজের উল্টো। অপ্রজনন ঋতুতে স্ত্রী ও পুরুষ একা একা ঘুরে বেড়ালেও প্রজনন ঋতুতে একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী জলপিপির জোড় দেখা যায়। এই সময় ওদের ডাকাডাকিও বেড়ে যায়। স্ত্রী জলপিপি পুরুষদের ডাকাডাকির মাত্রা দেখে সঙ্গী নির্বাচন করে। জলপিপি সমাজে শান্তশিষ্ট পুরুষের কিন্তু একদমই কদর নেই! বেশি হাঁকাহাঁকি করা পুরুষদের স্ত্রীরা বেশি পছন্দ করে। সাধারণতঃ বর্ষা অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর হল এদের প্রজনন ঋতু। এই সময় একটি পুরুষ জলপিপি, একটি স্ত্রী জলপিপির সাথে জোড় বাঁধে। যদি কাছেপিঠে আরও পুরুষ থাকে তবে সে দ্রুত মাথা সামনে-পিছনে ঝাঁকিয়ে নিজের এলাকা রক্ষা করার বার্তা দেয়। যদিও বাসা বানানোর ক্ষেত্রে কেবল পুরুষ জলপিপির ভূমিকা রয়েছে—এমন কথাই পাখি বিশেষজ্ঞরা বলে এসেছেন কিন্তু আমার নজরে পড়েছে স্ত্রী জলপিপিও বাসা বানাতে সাহায্য করে। যৌন মিলনের পর স্ত্রী জলপিপি সাধারণত চারটে ডিম পাড়ে। ডিমের রঙ বাদামি এবং তার উপর কালো রঙের আঁকাবাঁকা দাগ থাকে। স্ত্রী জলপিপি ডিম পেড়েই পুরুষকে ত্যাগ করে অন্য কোনও পুরুষের সাথে জোড় বাঁধে আর তারপর সেই পুরুষের তৈরি করা বাসায় গিয়ে ডিম পাড়ে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৮: কবির ভালোবাসা, কবির জন্য ভালোবাসা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬১: বাংলা গদ্য-পদ্যের ইতিহাসে ত্রিপুরা

দেখা গিয়েছে একটি স্ত্রী জলপিপি কাছাকাছি থাকা আরও তিন-চারটে পুরুষের সাথে বহুগামিতায় লিপ্ত হয়। ডিম পেড়েই স্ত্রী জলপিপির দায়িত্ব শেষ। ডিমে তা দিয়ে ডিম ফোটানো, তারপর বাচ্চাদের লালন পালন করা – সব দায়িত্ব পালন করে বাবা জলপিপি। ২৯ দিন ডিমে তা দিতে হয়। তারপর আরও ১০ সপ্তাহ বাচ্চাদের লালনপালন করতে হয় বাবা জলপিপিকে। তবে পুরুষ জলপিপি কিন্তু ডিমে তা দেওয়ার ব্যাপারে খুব রক্ষণশীল। যদি বুঝতে পারে যে অন্য পুরুষের সাথে স্ত্রী জলপিপিটি যৌন মিলনের পর তার বাসায় এসে ডিম পেড়েছে তবে সেই ডিমে সে তা দেয় না। তখন ঠোক্কর দিয়ে বা বাসা থেকে ফেলে দিয়ে ডিম নষ্ট করে দেয়। বাচ্চাদের নিয়ে বাবা জলপিপি যখন ঘুরে বেড়ায় তখন যদি কোনও বিপদের গন্ধ পায় তখন বাচ্চারা বাবার দুই ডানার নিচে আশ্রয় নেয়। আবার পূর্ণাঙ্গ জলপিপি বিপদ বুঝলে জলে ডুবও দিতে পারে। জলপিপিদের প্রধান বিপদ কিন্তু বাসাতেই। বিভিন্ন শিকারি পাখি, সাপ, গোসাপ, কচ্ছপ বা বড় মাছ ওদের ডিম বা বাচ্চাকে খেয়ে নেয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

জলপিপি। ছবি: সংগৃহীত।

সত্যি কথা বলতে কি আমি আজন্ম সুন্দরবন অঞ্চলে বাস করলেও আমার বাড়ির আশেপাশে কোথাও কোনওদিন জলপিপি দেখিনি। অথচ প্রচুর ডাহুক দেখেছি। ডাহুক ও জলপিপি সাধারণত একই পরিবেশে বসবাস করে। তাই আমার সচক্ষে প্রথম জলপিপি দেখার সুযোগ আসে আজ থেকে মাত্র ২৯ বছর আগে। আমার স্কুলের তিনদিকে ঘিরে রয়েছে স্কুলেরই পুকুর। সেখানে প্রচুর কচুরিপানা জন্মায়। তখন কিছুদিন হল শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছি। একদিন পুকুরের পাড়ে শিক্ষকদের শৌচাগারে যাওয়ার সময় দেখি দুটো অদ্ভুত দেখতে পাখি কচুরিপানার উপর হেঁটে হেঁটে খাবার খাচ্ছে। আগে জলপিপির ছবি দেখেছিলাম। আর তাই চোখের উপরে টানা সাদা দাগ দেখেই বুঝে যাই এরা জলপিপি যুগল। তার পর থেকে ওদের নিয়মিত লক্ষ্য করতাম। একদিন আমার সস্তার ক্যামেরা দিয়ে ওদের ছবিও তুলেছিলাম। আমার স্কুলের পুকুরে পানার উপর কিন্তু এখনও জলপিপি দেখতে পাই। ট্রেন-যাত্রার সময় নামখানা- শিয়ালদা ট্রেন লাইনের দু’পারে আগাছা ভরা নয়ানজুলি ও জলাজমিতে প্রচুর জলপিপি দেখা যায়। আর এখন শহরের মধ্যে আমার বাড়ির সামনের পুকুরে জলপিপি দেখছি কেবল কয়েকমাস। এর আগে কিন্তু একটা জলপিপিও ওই পুকুরে দেখিনি।

এসব থেকে বোঝা যাচ্ছে যে সুন্দরবনে জলপিপিরা কিন্তু মোটেই নিরাপদে নেই। জলাভূমি ভরাট করে ঘরবাড়ি গড়ে তোলার কারণে ওরা যে বাসস্থান হারিয়ে সঙ্কটে পড়েছে তা বোঝার জন্য গবেষণা না করলেও চলে। নগরায়ণের বিষময় ফলের অন্যতম শিকার হল জলাশয়-সুন্দরী জলপিপি। অদূর ভবিষ্যতে আরও সমস্ত জলাভূমির মতো আমার বাড়ির সামনের পুকুরটিও নিশ্চিত ভরাট হওয়ার পর সেখানে মাথা তুলবে কংক্রিট-দানব। তখন কোথায় যাবে আজ দেখা জলপিপি যুগলের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content