রবিবার ১৪ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

বীরবিক্রম।

ত্রিপুরার রাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য তাঁর পূর্বপুরুষদের মতোই ছিলেন শিক্ষা ও সংস্কৃতির গভীর অনুরাগী। রাজ্যে শিক্ষা বিস্তারে তিনি যেমন বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তেমনই সাহিত্য সংস্কৃতিরও উদার পৃষ্ঠপোষকতা করে গিয়েছেন এই রাজা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ‘ভারত ভাস্কর’ উপাধি দিয়েছিলেন তিনি। কলকাতায় রবীন্দ্র মেলার উদ্বোধন করেছেন বীরবিক্রম। কবির অনুরোধে শান্তিনিকেতন সফরও করেছেন তিনি। সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকের পাশাপাশি রাজা নিজেও একজন গীতিকার ছিলেন। গদ্য রচনাতেও তাঁর প্রতিভার পরিচয় পাওয়া গিয়েছে।

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ। যুবরাজ বীরবিক্রমের বয়স মাত্র পনেরো। পড়াশোনা করছেন শিলং। হঠাৎ একদিন মৃত্যু ঘটল পিতা মহারাজ বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্যের। পিতার মৃত্যুর পর রাজ্যাধিকারী হলেন যুবরাজ বীরবিক্রম। কিন্তু রাজা নাবালক। তাই ভারত সরকারের নির্দেশে বীরবিক্রমের পক্ষে শাসন পরিচালনার জন্য একটি শাসন পরিষদ গঠিত হয়েছিল। রাজ্য পরিচালনার বিষয়ে সর্বাত্মক ক্ষমতা ছিল এই পরিষদের। কিন্তু যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইংরেজ পলিটিক্যাল এজেন্টের পরামর্শ ছিল অপরিহার্য। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে বিশ বছর বয়সে রাজ্যভার গ্ৰহণ করেন বীরবিক্রম।
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জানুয়ারি শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর রাজ্যাভিষেক ঘটে। রাজ্যভার গ্রহণের পর রাজা রাজ্যের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সংস্কারে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বীরবিক্রম ছিলেন এক কর্ম তৎপর আধুনিক মনস্ক নৃপতি। দেশ বিদেশ সফর করে তিনি নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে রাজ্যের উন্নয়নে তা কাজে লাগাতে সচেষ্ট ছিলেন। নিজ রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের বিভিন্ন শহর যেমন তিনি সফর করেছেন,তেমনই পারিষদবর্গ নিয়ে রাজা তিনবার বিদেশ সফরেও গিয়েছেন। তবে শুধু দেশ বিদেশ সফরই নয়, বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কার-সহ রাজ্যে বহুমুখী উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছিলেন রাজা। তিনি রাজ্যে নানা নির্মাণ কাজ করিয়েছেন, শিক্ষার সম্প্রসারণ সহ যোগাযোগ-শিল্প-কৃষির উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছেন। ব্রিটিশ বাংলার রেলপথের সঙ্গেও ত্রিপুরাকে জুড়ে দিতে চেয়েছিলেন রাজা। জুমিয়াদের জন্য তিনি সমতলে বিস্তীর্ণ ভূমি সংরক্ষণের আওতায় এনেছেন। আবার পূর্ববঙ্গ থেকে আসা দাঙ্গা দুর্গত বাঙালি শরণার্থীদেরও তিনি পরম মমতায় তাঁর রাজ্যে আশ্রয় দিয়েছেন। সব মিলিয়ে বীরবিক্রম ছিলেন অনন্য। ছিলেন এক দূরদর্শী রাজা। মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে ত্রিপুরার ভারতভুক্তির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬২: এক নির্বাসিত রাজপুত্রের কথা

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৮: একটি খালি বিয়ারের বোতল

বীরবিক্রম তাঁর রাজত্বকালে ত্রিপুরায় শিক্ষা সম্প্রসারণেও বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা,প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় স্হাপনের উদ্যোগ, শিক্ষায় উৎসাহদানের জন্য নানা রকম স্কলারশিপ-স্টাইপেন্ড ইত্যাদির প্রবর্তন-এ রকম বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছিলেন রাজা। শিক্ষাকে আরও ব্যাপক ও অর্থবহ করার জন্যও সচেষ্ট ছিলেন তিনি। এই উদ্দেশ্যে রাজা তাঁর দুই বৈমাত্রেয় ভাইকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় প্রদেশের (বর্তমান মধ্যপ্রদেশ) রাজকুমার কলেজে পাঠিয়েছিলেন। রাজ্যে বিভিন্ন স্তরের স্কুলের শিক্ষক সংখ্যাও বাড়িয়েছিলেন তিনি। বীরবিক্রম ১৯৩১ সালে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি আদেশপত্রের কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে—”… যেহেতু এ রাজ্যের প্রজা সাধারণের সর্ব্বাঙ্গীন কল্যাণ কামনায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রচলন করা এ পক্ষের অভিপ্রেত অতএব কার্য্যে পরিণত করা হউক, ইতি। সন ১৩৪১ ত্রিপুরাব্দ, তারিখ ২০শে ভাদ্র।”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৮: সত্যনিষ্ঠতার মাপকাঠি কী নাস্তিকতার নিরিখে বিচার্য?

সম্ভবত রাজার এই অভিপ্রায় সর্বত্র বাস্তব রূপ পেতে কিছু বিলম্ব ঘটেছিল। কারণ দেখা যাচ্ছে কয়েক বছর পরে ১৯৩৮ সালে সদর বিভাগে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রবর্তন বিষয়ে এক আদেশনামা জারি হয়েছিল। তাতে হাওড়া নদীর উপত্যকা ও বিভাগীয় শহর সমূহের কিছু সীমিত এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। এখানে সংশ্লিষ্ট আদেশ পত্রটি উল্লেখ করা হচ্ছে-
“রোবকারী দরবার শ্রী শ্রী যুত মহারাজ বীরবিক্রম কিশোর দেববর্ম্মা মাণিক্য বাহাদুর, এলাকে স্বাধীন ত্রিপুরা, রাজধানী আগরতলা, ইতি। ১৩৪৮ ত্রিপুরাব্দ, তারিখ ১৬ আশ্বিন যেহেতু এ রাজ্যের প্রজা সাধারণ মধ্যে দ্রুত গতিতে শিক্ষা বিস্তার কল্পে উপযুক্ত ব্যবস্থাদি প্রবর্ত্তন করা এ পক্ষের অভিপ্রেত, অতএব এতদ্বারা ঘোষণা করা যায় যে, আগামী বর্ষ হইতে আপাততঃ সদর বিভাগান্তর্গত হাওড়া নদীর উপত্যকা মধ্যে মফঃস্বলস্হ বিভাগীয় নগর সমূহে বিজ্ঞাপিত এলাকা মধ্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্ত্তন করা হউক, ইতি।”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৩: জলপিপি

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৯: নীল হ্রদের পারে, নীল আকাশের নিচে লাল রঙের হেলিকপ্টার অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল

রাজ্যে উচ্চ শিক্ষা প্রসারেও বীরবিক্রম বিরাট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৩৮ সালে গঠিত হয়েছিল বিদ্যাপত্তন গভর্ণিং কমিটি।বিদ্যাপত্তনের গৃহ নির্মাণ সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজের জন্য কমিটির কাছে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। দশজন উচ্চ পদস্থ রাজকর্মচারীকে নিয়ে গঠিত গভর্ণিং কমিটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাজমন্ত্রী(পরে প্রেসিডেন্ট হন প্রধানমন্ত্রী)। উল্লেখ করা যায় যে,শুধুমাত্র একটি কলেজ প্রতিষ্ঠাই নয়,রাজার পরিকল্পনা ছিল ‘বিদ্যাপত্তন’ প্রকল্পের অধীনে একটি গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় স্হাপন। তাঁর ইচ্ছা ছিল এই গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকবে সাধারণ ডিগ্রি কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ, কৃষি,চারুকলা ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। কিন্তু রাজার অকাল মৃত্যুর জন্য এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারেনি।তাঁর মৃত্যুর পর অবশ্য মহারাজা বীরবিক্রম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিদ্যাপত্তন প্রকল্পের কিছুটা বাস্তবায়িত হয়।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২: “জনৈক গণশত্রুর জবানবন্দি”

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৯: আশ্রমের ছাত্ররা বৃষ্টিতে ভিজলে কুইনাইন খাওয়ানো হত

বীরবিক্রম পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থায় উৎসাহী থাকলেও দেশীয় টোল,মক্তব ও মাদ্রাসা সমূহকে পর্যাপ্ত অনুদান দিয়েছিলেন তিনি। রাজ্যে এই সব প্রতিষ্ঠান তখন উল্লেখযোগ্য ভাবে সক্রিয় ছিল। রাজ্যে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের অন্যতম শর্ত ছিল মেধা।স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্যের মেধাবী তরুণরা তখন এই সার্ভিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। বীরবিক্রম যেমন তৃণমূল স্তরে শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগী ছিলেন, তেমনই শিক্ষাকে আরও কার্যকরী করার দিকেও তাঁর নজর ছিল। প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষার প্রসারেও যত্নবান ছিলেন তিনি। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার মধ্যেও রাজার এইসব উদ্যোগ আমাদের নজর কাড়ে। —চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content