
ছবি: লেখক।
যাবার দিন সকালবেলা জানতে পারলাম আমার মেয়ে সুমেধার কাছ থেকে, না কোনও হোটেল বুক করা হয়নি। আমরা বুক করেছি একটা হোম স্টে। জীবনে কখনও হোম স্টেতে থাকিনি। ভাবলাম নতুন অভিজ্ঞতা হবে। হোম স্টের নাম ‘আমানি হোম স্টে’। ভোর পাঁচটায় ট্রেন। বন্দে ভারত। আমরা যাবো চেন্নাই থেকে মাদুরাই। সেখান থেকে বাই রোড যাবো কোদাইকানাল। দু’ হাজার ফুট উঁচুতে এই হিলটাউন। নাম করা ছুটি কাটানোর জায়গা। বন্দে ভারত সুন্দর ট্রেন। ভালো চেয়ার কার। বিরাট জানালা। ভালো ব্রেকফাস্ট দিল। মাদুরাই পৌঁছোনোর কথা সাড়ে এগারোটায়। হঠাৎ কন্যা ফোন ঘেঁটে বলল, আমরা সামনের স্টেশন ডিন্ডিগুল নেমে যাবো। কোদাইকানাল এখান থেকে কাছে পড়বে। এই বয়সে এসব ভাবনা ইয়াং জেনেরেশনের উপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো। তাই তড়িঘড়ি ডিন্ডিগুল স্টেশনেই নামলাম। প্ল্যাটফর্ম থেকে বাইরে বেরোতে হবে। লিফট আছে। সেই লিফটে নামতে দেখা হয়ে গেল ডাক্তার রাধিকাকে। আডিয়ার ক্যানসার ইনস্টিটিউটের অঙ্কোসার্জন। ওঁকে তো কালকেই দেখেছি। অ্যাকুইট অ্যান্টেরিয়র ইউভিয়াইটিস। উনি এখানে কী করছেন? রাধিকা যাচ্ছেন তাঁর জন্মস্থানে। ওয়ার্ল্ড ইজ স্মল। সত্যিই খুব ছোট্ট জায়গা এই পৃথিবী।
ডিন্ডিগুল স্টেশনটা তত বড় নয়। বাইরে গাড়ি বেশি নেই। আর দরদামও করতে হয়। তা আমার এই তামিল দেশে বড় হওয়া মেয়ে খুব সহজেই ম্যানেজ করে নিল। আমি এই ফাঁকে ডাবের জল খেলাম প্ল্যাটফর্মের এক তাতার দোকান থেকে। না কাটারি দিয়ে ডাব কাটলেন না। তাতা ডাব কাটলেন একটি ছোট্ট কাটার মেশিন দিয়ে। প্রযুক্তি এখন তামিলনাডুর ছোট্ট শহরেও পৌঁছে গিয়েছে। ডিন্ডিগুল থেকে কোদাইকানাল ৯৫ কিলোমিটার। তার মধ্যে ৫২ কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা। সেটা ত্রিশ কিলোমিটার স্পিডের উপর যাওয়া যায় না। রাস্তা খুব সুন্দর। দু’ধারে ঘন জঙ্গল। গাঢ় নিস্তব্ধতা। শব্দ বলতে শুধু গাড়ির হর্ন। দু’পাশে সবুজ পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে আমাদের গাড়ি চলছে। অভিজ্ঞ চালক। পথে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামলো। ওয়াইপার ভালোই স্পিডে চলছে। তবু সামনের রাস্তা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তুখোড় গাড়ি চালক। আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছে দিল কোদাইকানাল লেকে। এখন একটু খিদে পাচ্ছিল। এবার লাঞ্চ করা দরকার। ওখানে হিলটপ রেস্টুরেন্ট বেশ ভালো লাগলো। ভেজ, নন-ভেজ দুটোই পাওয়া যায়। আমরা পরোটা আর মাংস নিলাম। বেশি দাম নয়। এবার আমাদের হোম স্টেটা খুঁজে বার করতে হবে। হোটেল খুঁজে বার করা কঠিন নয়। তবে হোম স্টে খুঁজে বের করা একটু কঠিন। বড় সাইন বোর্ড থাকে না। ম্যানেজারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে বলতে অনেকক্ষণ পরে পাহাড়ের গায়ে দেখতে পেলাম ছোট্ট একটা সাইন বোর্ড। লেখা আমানি। ইউরেকা ইউরেকা বলে চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছে করছিল। একটা ছোট্ট পাহাড়ের উপর সুন্দর কটেজ।
আরও পড়ুন:

ঈশ্বরের আপন দেশে

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৮: একটি খালি বিয়ারের বোতল
পাথরের সিঁড়ি বেয়ে খানিকটা উঠতে হবে। কটেজের পাশে সবুজ ঘাসের লন। নানারকম ফুলে ভরা। তাদের বেশ কিছুরই নাম জানা নেই। দরজার পাশেও ফুলের গাছ। সবাই যেন এসো এসো বলে ডাকছে। পুরোনো আমলের দরজা। ভিতরে ঢুকে তো অবাক। কে যেন যত্নে আমাদের জন্য সাজিয়ে রেখেছে সবকিছু। পুরোনো আমলের ফার্নিচার, দেওয়ালে পুরোনো মাদ্রাজের পেনসিল স্কেচ ছবি ফ্রেম করে বাঁধানো, পুরোনো আমলের ল্যাম্প। ফায়ারপ্লেসও রয়েছে। সুন্দর কাঠের ডাইনিং টেবিল। কিচেনে রান্না-বান্নার বন্দোবস্ত আছে। বড় দুটো বেড রুমের সঙ্গে পরিষ্কার বাথরুম। বাইরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। কী পাখি ওটা? এ বাড়িতে কারা থাকতেন? কে এখানে সেলাইয়ে ফুল তুলে বাঁধিয়ে রেখেছেন? সারা বাড়িতে একটা স্নিগ্ধ শান্ত সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। রিল্যাক্স করার সঠিক পরিবেশ। মোবাইল থেকে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত চালিয়ে দিলাম। “ মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না।” জয়তী চক্রবর্তী গাইছেন। এর সঙ্গে এক কাপ চায়ের দরকার। কিছুক্ষণের মধ্যেই কেয়ার টেকার ভদ্রমহিলা এসে গেলেন। মাঝবয়সী মহিলা। নাম সেলভি। এই কটেজের নীচেই থাকেন। চায়ের পাতা ছিল কিচেনে। চা বানিয়ে দিলেন। সন্ধ্যা নেমে আসছে। দূরের পাহাড় ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। রাতে কী খাবো? আমার কন্যা নীচে নামলো খাবার কিনতে। ওদের ফিরে আসার সময় একটা বাইসন বেরিয়ে এসেছিল। রাস্তার লোকজন সাবধান করে দিল ওদিক দিয়ে যাবেন না। কোনওক্রমে একটা জিপে এক ভদ্রলোক লিফট দিয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন। বিদেশে সজ্জনের অভাব হয় না। আমার মেয়ে পাস্তা এনেছিল। তাই দিয়ে সুন্দর খাবার বানালোও। বাইরে থেকে নিয়ে আসা হল নেপালি সুপ জাতীয় খাবার থুমপা। ওর সঙ্গে ব্রেড টোস্ট করে সুন্দর লাইট ডিনার করে নিলাম।

ছবি: লেখক।
আমি খুব ভোরে উঠি। ভোরের আলো ফুটছে। পাহাড়গুলো ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একটু কুয়াশা আছে। লনে তরতাজা রঙিন ফুল। তাদের অনেকেরই নাম জানা নেই। বড় বড় ধুতরো ফুল ফুটেছে। ধুতরো আবার গোলাপি হয় নাকি! সূর্য কুয়াশার ফাঁকে আটকে আছে। লনে একটা ছাতার নীচে কয়েকটা চেয়ার পাতা আছে। ওখানে বসে আবৃত্তি করতে শুরু করলাম, “সুন্দর তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে”। রবীন্দ্রনাথের কবিতা।
সকাল দশটায় ঠিক করলাম একটু ঘুরতে বেরোবো। কোকার্স ওয়াক প্রথমে পড়বে। পায়ে হাঁটা বাঁধানো রাস্তা খুবই সুন্দর। ওপাশে সুন্দর পাহাড়েরা দাঁড়িয়ে আছে। ঘন সবুজ পাহাড়। আকাশ তাকে চুম্বন করছে। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে কাপাসে সাদা মেঘ। একদিকটা স্টিলের রেলিং দেওয়া। অন্যদিকে সারি সারি দোকান, স্যুভেনিয়র, গরম ভুট্টো, কাঁচা কাটা আম, উলের জামা কাপড়। এসব দেখতে দেখতে আর তার ফাঁকে ছবি তুলতে তুলতে এক কিলোমিটার রাস্তা যে কখন শেষ হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। কোকার্স ওয়াক শেষ করে এবার আমরা যাবো পাম্বার ফলস। কিন্তু সেখানে যাবো কী করে? কী ভিড়, কি ভিড়। অসংখ্য গাড়ি, ট্রাভেল ভ্যান আর রংবেরংয়ের বাস। মনে হল সারা ভারত যেন কোদাইকানালে ছুটি কাটাতে এসেছে। এই ছোট্ট শহরে চারহাজার গাড়ির ই-পাস দেওয়া হয়। কুড়ি কিলোমিটারের এই শহরে সত্যি এত গাড়ি যাবার মতো চওড়া রাস্তা নেই। তবে আমরা গাড়িতে চারজন থাকায় কথা বলতে বলতে সময় কেটে যাচ্ছিল। তাড়া নেই আমাদের। হ্যাঁ, শেষ অবধি প্লাম্বার ফলস এল ঠিকই, তবে তার শীর্ণ করুণ দশা দেখে মন ভরলো না।
সকাল দশটায় ঠিক করলাম একটু ঘুরতে বেরোবো। কোকার্স ওয়াক প্রথমে পড়বে। পায়ে হাঁটা বাঁধানো রাস্তা খুবই সুন্দর। ওপাশে সুন্দর পাহাড়েরা দাঁড়িয়ে আছে। ঘন সবুজ পাহাড়। আকাশ তাকে চুম্বন করছে। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে কাপাসে সাদা মেঘ। একদিকটা স্টিলের রেলিং দেওয়া। অন্যদিকে সারি সারি দোকান, স্যুভেনিয়র, গরম ভুট্টো, কাঁচা কাটা আম, উলের জামা কাপড়। এসব দেখতে দেখতে আর তার ফাঁকে ছবি তুলতে তুলতে এক কিলোমিটার রাস্তা যে কখন শেষ হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। কোকার্স ওয়াক শেষ করে এবার আমরা যাবো পাম্বার ফলস। কিন্তু সেখানে যাবো কী করে? কী ভিড়, কি ভিড়। অসংখ্য গাড়ি, ট্রাভেল ভ্যান আর রংবেরংয়ের বাস। মনে হল সারা ভারত যেন কোদাইকানালে ছুটি কাটাতে এসেছে। এই ছোট্ট শহরে চারহাজার গাড়ির ই-পাস দেওয়া হয়। কুড়ি কিলোমিটারের এই শহরে সত্যি এত গাড়ি যাবার মতো চওড়া রাস্তা নেই। তবে আমরা গাড়িতে চারজন থাকায় কথা বলতে বলতে সময় কেটে যাচ্ছিল। তাড়া নেই আমাদের। হ্যাঁ, শেষ অবধি প্লাম্বার ফলস এল ঠিকই, তবে তার শীর্ণ করুণ দশা দেখে মন ভরলো না।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৮: সত্যনিষ্ঠতার মাপকাঠি কী নাস্তিকতার নিরিখে বিচার্য?
এখান থেকে যাবো আমরা গ্রিন ভিউ। সেখানেও রাস্তায় বেশ ভিড়। পৌঁছে দেখলাম বেশ ভিড়। আর রাস্তায় দু’পাশে দোকান আর দোকান। সেখানে কি না পাওয়া যাচ্ছে। বাণিজ্য যেন সৌন্দর্যকে গ্রাস করে ফেলেছে। আমরা দু’জনে আর ভিতরে গেলাম না। সুমেধা ঘুরে এলো। এবার আমরা যাবো পিলার রকে। এটা খুব সুন্দর আর অদ্ভুতও বটে। দুটো পাহাড় কুয়াশার মধ্যে দুটো লম্বা পিলারের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে তারা হারিয়ে যাচ্ছে কুয়াশা আর মেঘের ফাঁকে। যেন লুকোচুরি খেলছে। ক্যামেরায় ওদের দু’জনের একসঙ্গে ছবি তুলতে একটু কষ্ট করতে হল বইকি।
এর পরের গন্তব্য ছিল গুনা কেভস। এটার আরেকটা নাম ডেভিলস কিচেন। ১৯৯১ সালে এখানে কামাল হাসানের ছবি ‘গুনা’র শুটিং হয়। তাই থেকে এই কেভসটার নাম গুনা কেভস। গাছেরা সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। ছড়িয়ে আছে তাদের লম্বা শিকড়। গা ছম ছমে ভয়ের জায়গা। ছবি তোলার দারুণ জায়গা।
এর পরের গন্তব্য ছিল গুনা কেভস। এটার আরেকটা নাম ডেভিলস কিচেন। ১৯৯১ সালে এখানে কামাল হাসানের ছবি ‘গুনা’র শুটিং হয়। তাই থেকে এই কেভসটার নাম গুনা কেভস। গাছেরা সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। ছড়িয়ে আছে তাদের লম্বা শিকড়। গা ছম ছমে ভয়ের জায়গা। ছবি তোলার দারুণ জায়গা।

ছবি: লেখক।
গুনা কেভস ছেড়ে এবার আমাদের গাড়ি যাচ্ছে পাইন ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে। সারি সারি লম্বা লম্বা পাইন গাছ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে। একটা শান্ত নিস্তব্ধতা। এই পাইন ফরেস্টের মধ্যে কিছু পর্যটক প্রবেশ করেছেন। এই গাছগুলোকে একে থাকতে দিলেই বোধ হয় ভালো হত। বেলা তিনটে বেজে গিয়েছে। একটু একটু খিদে পাচ্ছে। রাস্তার পাশে অসংখ্য খাবার দোকান। ম্যাগি নুডলসেরই চল বেশি। চট জলদি খাবার। আমার কন্যা কলাপাতায় নুডলস নিয়ে এলো। এতটা পথ চলার পর সেটা যেন অমৃ্তের মতো মনে হল।
এবার আমাদের দেখতে হবে রোজ গার্ডেন। এটা কোদাইকানালের একটা বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পট। কেউ মিস করে না। আমরাও এসে দেখলাম ভুল করিনি। ১.৩ কিলোমিটার লম্বা এই রোজ গার্ডেন। কত রকমের গোলাপ, সুন্দর দেখতে এবং বেশ বড়। হলুদ, লাল, সাদা। বেগুনি রঙের গোলাপ দেখে তো বেশ অবাক হলাম। মনে হল গাই, “বল্, গোলাপ, মোরে বল্, তুই ফুটিবি, সখী, কবে।” গোলাপের বাগানের ব্যাকগ্রাউন্ডে কয়েকটা ছবি না তুলে পারলাম না। একটু বোকা বোকা অবশ্য।
এবার আমাদের দেখতে হবে রোজ গার্ডেন। এটা কোদাইকানালের একটা বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পট। কেউ মিস করে না। আমরাও এসে দেখলাম ভুল করিনি। ১.৩ কিলোমিটার লম্বা এই রোজ গার্ডেন। কত রকমের গোলাপ, সুন্দর দেখতে এবং বেশ বড়। হলুদ, লাল, সাদা। বেগুনি রঙের গোলাপ দেখে তো বেশ অবাক হলাম। মনে হল গাই, “বল্, গোলাপ, মোরে বল্, তুই ফুটিবি, সখী, কবে।” গোলাপের বাগানের ব্যাকগ্রাউন্ডে কয়েকটা ছবি না তুলে পারলাম না। একটু বোকা বোকা অবশ্য।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৩: জলপিপি

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৯: নীল হ্রদের পারে, নীল আকাশের নিচে লাল রঙের হেলিকপ্টার অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল
পাঁচটা বেজে গিয়েছে। এখনও লাঞ্চ হয়নি। এখন সব দোকানে লাঞ্চ বন্ধ। সাতটায় খুলবে। আমি ঠিক করলাম চাইনিজ খাবো। এই একটু হিমেল আবহাওয়ায় চাইনিই ভালো জমবে। সেভেন রোড জাংশনে পেয়েও গেলাম একটা ছোট্ট চাইনিজ রেস্তরাঁ। নাম কিমচি। খদ্দের বলতে আমরা শুধু চারজন। ওরা দেখেই বুঝল আমরা বাঙালি। ওয়েটার পরিষ্কার বাংলায় বললেন এখানে সব কম চাইনিজ এবং নেপালি খাবার পাওয়া যায়। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কোথাকার বাবা ধন’। উনি জানালেন, জলপাইগুড়ির। বললাম, এখানে তামিল ম্যানেজ করেন কী করে? বললেন, ওই চালিয়ে দিই। জনান্তিকে বলে রাখি, আমার এই দ্রাবিড় দেশে চল্লিশ বছর হয়ে গেল, এখনও তামিল সড়গড় করতে পারিনি। চিকেন স্যুপ, মোমো, মিক্সড ফ্রায়েড রাইস, হাক্কা নুডলস দিয়ে লাঞ্চ কাম ডিনার ভালো ভাবেই সেরে নিলাম। সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে আর এনার্জি ছিল না। হোম স্টেটে ফিরে বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম। উঠলাম যখন তখন সকাল সাতটা। পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে সূর্য উঠেছে। জানলা দিয়ে মিঠে রোদ। মনে হল আবৃত্তি করি, “আজি এ প্রভাতে রবির কর, কেমনে পশিল প্রাণের”।

ছবি: লেখক।
এবার উঠতে হবে। যাবার সময় হল বিহঙ্গের। একটু তাড়াতাড়ি বেরোলে পাঁচটার মধ্যে মাদুরাই পৌঁছে যাবো। ওখানে মীনাক্ষী টেম্পল দেখা যাবে। জাগ্রত দেবতা। আমাদের গাড়ির চালকের নাম জেরোম। ঠান্ডা মাথার লোক। ভালো ড্রাইভ করেন। কোদাইকানাল থেকে বেরোবার মুখে চকোলেট নিলাম অনেক। অ্যাসরটেড চকোলেট। খুব বিখ্যাত। সঙ্গে গিন্নি কিছু বাড়ির জন্য স্পাইসেস নিল। ইউক্যালিপ্টাস তেলও বেশ জনপ্রিয়। নিলাম না। বাড়িতে অনেক আছে, ব্যথা-ট্যাথায় বেশ কাজে লাগে। পথে পড়ল সিলভার ফলস। এই ফলসটা খুব সুন্দর। যুবতী নারীর মতো উচ্ছল। চটজলদি কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম ঝর্ণার। আমি একাই নেমেছি, একটা কোদাইকানালের ফ্রিজ ম্যাগনেট কিনে নিলাম। আমার ফ্রিজের গায়ে ম্যাগনেট লাগানোর বাতিক আছে। ওখানে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন আর ইয়াসিমিটির পাশে কোদাইকানাল বেশ মানিয়ে যাবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে শুভ্রারা চেঁচাচ্ছে। আমি কান না দিয়ে রাস্তার পাশ থেকে পঞ্চাশ টাকার কাঁচা আমের টুকরো, বিট, গাজর, মুলো, লঙ্কা দিয়ে মাখানো ঝাল মুড়ি নিলাম। টেরিফিক প্রিপারেশন। সারা রাস্তা খেতে খেতে এনজয় করলাম। রাস্তা ভালো। কয়েকটা ‘হেয়ার পিন বেন্ড’ আছে। সামলে চালাতে হয়। রাস্তায় অনেক টাটকা সবজির দোকান পড়ছিল। ভাবছিলাম কিনে নিয়ে যাব নাকি। ফিরছি তো ট্রেনে। পাহাড়ি রাস্তা শেষ করে যখন নীচে পৌঁছোলাম তখন বিকেল সাড়ে তিনটে। নীচে টেম্পল টপ রেস্টুরেন্ট খুব নামকরা। ভেজ, নন-ভেজ দুটোই পাওয়া যায়। আমরা বিরিয়ানি প্যালেসে ঢুকলাম। বিরিয়ানি আমার তেমন পছন্দ নয়। আমরা তাওয়া রুটি আর রোস্টেড চিকেন দিয়ে সুন্দর লাঞ্চ করে নিলাম।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২: “জনৈক গণশত্রুর জবানবন্দি”

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৯: আশ্রমের ছাত্ররা বৃষ্টিতে ভিজলে কুইনাইন খাওয়ানো হত
ওখান থেকে মাদুরাই পৌঁছতে দেড় ঘণ্টা লাগলো। মাদুরাই ঢোকার মুখে বৃষ্টি আর বৃষ্টি। আধ ঘণ্টা ধরে চলল বর্ষণ। রাস্তা জলে থই থই করছে। ওখানে নর্থ গেট হোটেল বুক করা হয়েছে। গুগল ম্যাপ যেখান দিয়ে পৌঁছে দিল সেখান থেকে গাড়ি যাওয়া অসম্ভব। অবশেষে গুগলকে গুলি মেরে অটোওয়ালার কাছ থেকে ডিরেকশন নিয়ে শেষ অবধি হোটেলে চেক ইন করা গেল। না বসা যাবে না। মীনাক্ষী টেম্পল যেতে গেলে এখনই বের হতে হবে। ন’টায় গেট বন্ধ হয়ে যাবে। মাদুরাইয়ে এসেছি মীনাক্ষী টেম্পল না দেখে যাব, তাই হয় নাকি। কিন্তু ঢুকে দেখি খুব ভিড়। লম্বা লাইন। শেষ দেখা যচ্ছে না। কোনও উপায় নেই। সবার সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। গুটি গুটি এগতে থাকল লাইন। গর্ভগৃহে পৌঁছোলাম। আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াবার পর।

ছবি: সংগৃহীত।
মাদুরাই মীনাক্ষী মন্দির আগেও কয়েকবার এসেছি। কিন্তু এত ভিড় পাইনি। কারা যেন বলাবলি করছিলেন, আজকের দিনটায় নাকি বিশেষ পুজো হবে। তাই এত ভিড়। প্রতিবারই কেউ না কেউ সঙ্গে ছিলেন। এবার আমরা নিজেরাই। একবার মন্দিরের ভিতরে ঢুকে যেতে আর খারাপ লাগলো না দাঁড়াতে। দু’পাশের দেওয়ালে বড় পাথরের দেবদেবীর মূর্তি। কীভাবে বানানো হয়েছিল এই মন্দির? কারা, কতদিন ধরে বানিয়েছিলেন? লাইনে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক হাজার লোক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এঁদের বিশ্বাস আর নিষ্ঠা আমাকে অবাক করে। মীনাক্ষী আম্মার মূর্তিটা তেমন বড় নয়। ভিতরে ছোট্ট আলো জ্বলছে। মহিমাময় মূর্তি। পিছনে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এরপর দেখলাম শিবের মূর্তি সুন্দরেশন। দাঁড়িয়ে আছেন অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে। বেশ গ্ল্যামারাস লাগলো। মন্দির খুব ভালো দেখা হল। কিন্তু বেরোতে বেরোতে রাত এগারোটা। টেম্পল বন্ধ হওয়ার মুখে। রাতে খাওয়া হয়নি কিছুই। মেয়ে সুইগিকে কল করে খাবার আনিয়ে নিল। প্লেন সাদা ভাত, ডাল, সব্জি আর একটু চিকেন কষা। ভালোই খাওয়া হল। কাল দুপুরে বন্দে ভারত ট্রেনে চেন্নাই। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরবে। ছুটি শেষ। মনে থাকবে আমানি হোম স্টে। পাহাড়ের উপর কটেজ। নাম না জানা ফুলে ভরা বাগান। ছিম ছাম সাজানো ঘর, পুরোনো আমলের ফার্নিচার আর দূরের সবুজ পাহার। সবাই বলছে আবার আসবে কিন্তু।
*ডাঃ জ্যোতির্ময় বিশ্বাস সাহিত্যের জগতে পদচারণা করেন ডাকনামে। ‘সবুজ বিশ্বাস’ নামে তিনি একাধিক সাহিত্যকেন্দ্রিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। বাচিক শিল্পেও তাঁর প্রবল আগ্রহ। এই মুহূর্তে বাচিকশিল্পে আমাদের রাজ্যে যাঁরা স্বনামধন্য, তাঁরা অধিকাংশই ডাঃ বিশ্বাসের বন্ধুস্থানীয়। ছাত্রজীবনে, এই শহরে এমবিবিএস পাঠকালে একসঙ্গে এ-মঞ্চে, সে-মঞ্চে কবিতা আবৃত্তি করেছেন। পরে পেশাগত কারণে বিদেশযাত্রা ও গবেষণাকর্মের শেষে শংকর নেত্রালয়ে যোগদানের ফলে সেই বাচিকশিল্পের সঙ্গে সেই যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে উঠেছে। চেন্নাই শহরের বাঙালিসমাজের যে কোনো অনুষ্ঠানে অবশ্য এখনো তিনি আবৃত্তি পরিবেশন করেন। ডাঃ বিশ্বাস চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বনামধন্য। ভারতের প্রথম শ্রেণির একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ। তিনি চেন্নাইয়ের শংকর নেত্রালয়ের অন্যতম ডিরেক্টর।


















