মঙ্গলবার ১৬ জুন, ২০২৬


ছবি: প্রতীকী।

 

কাকোলূকীযম্‌

চিরঞ্জীবী বললেন, হে দেব! এ পরিস্থিতিতে সন্ধি-বিগ্রহ প্রভৃতি কূটনীতির ছ’টি উপায়ের মধ্যে আমার মনে হয় ‘সংশ্রয়’ অবলম্বন করাই শ্রেয়। অন্য শক্তিশালী ও পরাক্রমী রাজার কাছে আশ্রয় নেওয়াকেই কূটনীতির পরিভাষায় বলা হয় ‘সংশ্রয়’। কারণ, অত্যন্ত তেজস্বী এবং পরাক্রমী হলেও সহায়হীন একলা ব্যক্তি শত্রুরাজার প্রবল প্রতিরোধের সামনে কিই বা করতে পারে? অর্থাৎ বায়ুহীন স্থানে জ্বলন্ত অগ্নি যেমন নিজের থেকেই নিভে যায়, তেমনই যথেষ্ট তেজস্বী হলেও সহায়হীন হলে পরাক্রমী ব্যক্তির তেজও নিস্তেজ হয়ে যায়। মানুষের একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা, বিশেষত স্বজাতীয়দের সঙ্গে মিলেমিশে থাকাটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। চাল যেমন ভুসির থেকে আলাদা হলে অঙ্কুরিত হতে পারে না, তেমনই সজাতীয় লোকেদের থেকে আলাদা হলে মানুষ নিজেও উন্নতি করতে পারে না।

এই পরিস্থিতে কথক হিসেবে দু-চার কথা বলতে চাই। মিত্রভেদ খণ্ডে আমরা একাধিকবার দেখেছি, কেমন করে ব্যবসা করে স্বাধীন হওয়ার কথা পঞ্চতন্ত্রকার সেখানে বারবার শুনিয়েছেন। যাঁরা অন্যের অধীনে চাকরী করেন, তাঁদের অবস্থা যে কতোটা বিপন্ন হতে পারে সে কথাও আমরা শুনেছি। ব্যবসায় উন্নতি করতে গেলে সজাতীয় লোকেরা কিভাবে সহায়ক হতে পারে একটি ব্যবসায়ী পরিবার কিন্তু সেটা জানেন। আমাদের বাঙালিরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অন্যের অধীনে চাকরি করতে করতে সে কথা ভুলে গিয়েছি। একটি সাধারণ একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটাকে বুঝে নেওয়া যাক। ধরা যাক পরিবারের একজন কেউ চায়ের দোকান করল। সেটি চলতেও থাকল বেশ ভালো ভাবে। কিন্তু তাঁর রোজগার এবং উন্নতি দেখে পরিবারের অন্য লোকে কেউ তাঁর ক্ষতি করার জন্য পাশে কিন্তু আরেকটা চায়ের দোকান করে না।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৯: সময় বুঝে প্রত্যাঘাতের জন্য রাজনীতিতে অনেক সময় পিছিয়েও দাঁড়াতে হয়

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৫: গেমপ্ল্যান

ব্যবসায়ী পরিবার বরং দেখে ব্যবসা যেন পরিবারের মধ্যে থাকে এবং তাতে পরিবারেরই উন্নতি হয়। পরিবারের একজন নির্দিষ্ট কোনও ব্যবসায় কৃতকার্য হলে সে তখন পরিবারের অপরজনকে বলে, ভাইরে চায়ের দোকান তো ভালোই চলছে, কিন্তু রোজ আমাকে চায় দেওয়ার জন্য মাটির খুড়ি কিনতে হচ্ছে অন্যের কাছ থেকে। তুমি বরং মাটির খুড়ি বানিয়ে আমাকে দাও, আমি রোজ নির্দিষ্ট পরিমানে কিছু কিনবো আর তুমি সেই সুযোগে উদ্বৃত্ত কিছু যদি থাকে তখন তুমি সেটা বাইরেও অন্য কাউকে বিক্রি করে ব্যবসা বাড়াও। সেই পরিবারের অন্য আরেকজনকে হয়তো বলবে, রোজ তো আমার অনেক চাপ পাতা লাগে, রোজ সেটা আমি অন্যের কাছ থেকে কিনি। তুমি বরং চায়ের ব্যবসা শুরু করো, আমি রোজ তোমার কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমান চা-পাতা কিনবো আর বাড়তি যদি কিছু থাকে তাহলে সেটা তুমি অন্য কাউকে বিক্রি করে ব্যবসা বাড়াও।

একটা ব্যবসায়ী পরিবারে কিন্তু সজাতীয়রা এইভাবে পাশাপাশি একসঙ্গে থেকে একে অপরকে সাহায্য করে। অন্যের উন্নতিতে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে তার ক্ষতি না করে, তাকে অবলম্বন করে গোটা পরিবারটা কিন্তু উন্নতি করবার চেষ্টা করে। তাই কোথাও না গিয়ে এখানেই অন্য পরাক্রমশালী কোনও ব্যক্তির সহায়তা নেওয়াটা শ্রেয়, যে এই বিপদ থেকে আমাদের ত্রাণ করতে পারবে। যদি আপনি নিজের এই স্থান ছেড়ে অন্যত্র কোথাও চলে যান, তাহলে কেবল আপনার অনুরোধে কেউ আপনাকে সহায়তা করতে এখানে আসবে না। পণ্ডিতেরা বলেন—
বনানি দহতো বহ্নেঃ সখী ভবতি মারুতঃ।
স এব দীপনাশায কৃশে কস্যাস্তি সৌহৃদম্‌।। (কাকোলূকীযম্‌, ৪৫)
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৯: সারদা মায়ের রোগ নিরাময়ের প্রচেষ্টা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা

জঙ্গলে যখন আগুন লাগে তখন হাওয়া পর্যন্ত তাকে সহায়তা করে। হাওয়া যতো চলে, জঙ্গলে আগুনও ততোই বাড়ে। কিন্তু সেই হাওয়াই আবার প্রদীপের মৃদু অগ্নিশিখাকে নিভিয়ে দেয়। জগতে দুর্বলের সঙ্গে কেউ বন্ধুত্ব করে না —সকলেই চায় সবলের সঙ্গে থাকতে। এমনকি জাতশত্রুও যদি সবল হয়, তবুও মানুষ তার সঙ্গে বিরোধে না গিয়ে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে চায়। হম্বিতম্বি মানুষ দুর্বলের উপরেই করে। কিন্তু এইরকম পরিস্থিতিতে যে সবসময় বলবানেরই আশ্রয় নিতে হবে এমনও ভাববার কোনও কারণ নেই। অনেক দুর্বল ব্যক্তিরা বা একাধিক দুর্বল রাজারাও যদি সঙ্ঘবদ্ধ হন তাহলে তাঁদের আশ্রয়ও কিন্তু একজন নির্বলের কাছে রক্ষা কবচের মতো কাজ করে। আমাদের চারিদিকে তাকালেও এমন অনেক দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাবো। ঠাসাঠাসি করে বেড়ে ওঠা বাঁশঝাড়ের মধ্যে থাকা একটা ছোট বাঁশের লাঠিকেও কাটতে গেলে আশেপাশের সব বাঁশকে কাটতে হবে। তেমনই ভাবে দুর্বল রাজা যদি শক্তিশালী কোনও রাষ্ট্রের সহায়তা নাও বা পান, তাহলেও বহু দুর্বল শক্তির আশ্রয়ে সেও কিন্তু শক্তিশালী হয়ে উঠতে।

তবে শক্তিশালী শ্রেষ্ঠলোকের আশ্রয় বা সমর্থন যদি পাওয়া যায় তাহলে তো আর কোনও কথাই নেই। এই রকম মানুষের সমর্থন সকলেরই উন্নতির সাধন হয়। জড়-প্রকৃতিতেও সেই একই নিয়ম দেখা যায়, ঠিক যেমন পদ্মপাতাতে পড়া জলবিন্দুগুলিও সেখানে মুক্তোর মতন শোভা পায়। ফলে উপযুক্ত শক্তিশালী রাজার আশ্রয় না নিলে আপাতত এই বিপদ থেকে প্রতিকারের কোনও সম্ভাবনা নেই। সুতরাং আমার মতে সংশ্রয়ই হল এখন একমাত্র উপায়। এইভাবে চিরঞ্জীবী ‘সংশ্রয়’-এর পক্ষে মত দিলেন।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৭: রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার হতে চেয়েছিলেন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৫: অগ্নির কি শুধুই দহনজ্বলা? মহর্ষি মন্দপালের অগ্নিস্তুতিতে অগ্নির কোন সদর্থকতার ইঙ্গিত?

সকল মন্ত্রীদের কাছ থেকে সব কথা শুনে বায়সরাজ মেঘবর্ণ তাঁর পিতার আমলের বৃদ্ধ মন্ত্রী দীর্ঘজীবীর কাছে এলেন। দীর্ঘজীবন লাভ করলেও তিনি এখন বৃদ্ধ। তাঁর মতো রাজনীতিশাস্ত্রে পারঙ্গম ব্যক্তি জগতে দ্বিতীয়টি নেই বললেই চলে। দীর্ঘজীবীর কাছে এসে তাঁকে প্রণাম করে মেঘবর্ণ বললেন, হে তাত! আপনি এখানে উপস্থিত থাকলেও আমি যে এই মন্ত্রীদেরকে আলাদা আলাদা করে জিজ্ঞাসা করলাম সেটা তাঁদের পরীক্ষা নেওয়ার জন্যেই। আমার মন্ত্রীরা সঠিক পরামর্শদানে কতোটা সুদক্ষ হয়ে উঠেছেন সেইটাই দেখা ছিল আমার উদ্দেশ্য। আপনি সবকিছুই শুনলেন। এবার আপনি যা উচিত মনে করবেন আমাকে আদেশ করুন।

বৃদ্ধমন্ত্রী দীর্ঘজীবী বললেন, বত্স! এই সকল মন্ত্রীরাই রাজনীতিশাস্ত্র মন্থন করেই তোমাকে যথার্থ পরামর্শ দিয়েছেন। প্রত্যেকটি পরামর্শই যুক্তিযুক্ত এবং এই সময়ের জন্য যথার্থ। কিন্তু এই সময়টা হচ্ছে দ্বৈধীভাবের নীতি গ্রহণের সময়। শাস্ত্রে বলে—
অবিশ্বাসং সদা তিষ্ঠেৎ সন্ধিনা বিগ্রহেণ চ।
দ্বৈধীভাবং সমাশ্রিত্য নৈব শত্রো বলীযসি।। (ঐ, ৬১)


অর্থাৎ শত্রু যদি বলবান হয় তাহলে নীতিজ্ঞ পুরুষের উচিত সেই শত্রুকে বিশ্বাস না করে তার সঙ্গে দ্বৈধীভাব বজায় রাখে চলা। অর্থাৎ ছলনার আশ্রয় নিয়ে শত্রুর সঙ্গে বাইরে বন্ধুত্ব দেখিয়ে সব সময় তাকে কিভাবে শেষ করা যায়, সেই চিন্তা মাথায় রাখা উচিত এবং সেই অনুসারেই প্রয়োজন মতন সন্ধি এবং প্রয়োজন মতন যুদ্ধের পথে হাঁটা কর্তব্য। তাই শত্রুকে কখনো বিশ্বাস না করে, বরং শত্রুর কাছে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিপন্ন করে, সুযোগ বুঝে তাকে সমূলে বিনষ্ট করে দেওয়াটাই বুদ্ধিমান পুরুষের কাজ। রাজনীতিশাস্ত্র বলে, নীতিনিপুণ রাজার তাঁর বিনাশযোগ্য শত্রুকে একবার হলেও বাড়াবাড়ি করবার সুযোগ দেওয়া উচিত। কারণ গুড় খাইয়ে কফের বৃদ্ধি ঘটালেও সহজেই যেমন তাকে নষ্ট করে দেওয়া যায়, তেমনই বিজিগীষু রাজার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে শত্রু যদি বাড়াবাড়িও করে, তাকেও কিন্তু সহজেই তখন নষ্ট করে দেওয়া যায়। তাছাড়া এ সংসারে যে পুরুষ স্ত্রী, পুত্র, দুষ্টবন্ধু এবং বিশেষ করে বেশ্যাদের সঙ্গে সরলসিধা ব্যবহার করে সে পুরুষ বেশি দিন বেঁচে থাকে না।
আরও পড়ুন:

গীতা: সম্ভবামি যুগে যুগে, পর্ব-২৩: বন্ধু হে আমার…

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০১: ছিট ঘুঘু

পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে এই শ্লোকটির অর্থ কিন্তু প্রসঙ্গ বুঝে করতে হবে। কারণ এখানে পঞ্চতন্ত্রকার মূলতঃ রাজার তিন পুত্রকে রাজনীতি এবং কূটনীতি শিক্ষা দেওয়ার জন্যেই পঞ্চতন্ত্র গ্রন্থটির পরিকল্পনা করেছেন। সেক্ষেত্রে রাজার একাধিক স্ত্রী’র একাধিক সন্তানদের মধ্যে রেষারেষি থাকতো পরবর্তী রাজপদের উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের বিনয়াধিকরণে ১৮শ সংখ্যক অধ্যায়ে অবরুদ্ধ রাজপুত্রদের থেকে কিভাবে রাজা নিজেকে সাবধানে রাখবেন সে সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা পাওয়া যায়। সেই অবরুদ্ধ রাজপুত্ররা, যাদের রাজা বঞ্চিত করে দূরে কোনো কাজে নিযুক্ত করেছেন তাঁরা কিভাবে সামন্তরাজাদের থেকে শক্তি সঞ্চয় করে অপসর্প বা গুপ্তচরদের সহায়তায় কাঠ বা লোহার কাজ করার অজুহাতে ধাতুশিল্পী, চিত্রশিল্পী বা গায়ক-অভিনেতার ছদ্মবেশে বা চিকিত্সক প্রভৃতি সেজে রাজাকে অস্ত্র বা বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করবে সে বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা আছে।

অনেক সময়ে রাজার সপত্নীরাও রাজাকে বিষ বা অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে। রাজার অঙ্কশায়িনী বেশ্যার মাধ্যমে বিষকন্যা প্রয়োগ করেও রাজাকে হত্যা করা হতো। সে কারণেই রাজাকে তাঁর স্ত্রী, পুত্র, দুষ্ট আত্মীয়-বন্ধু এবং বেশ্যার সঙ্গে সরলসোজা ভাবে না মিশতে বলা হয়েছে। তাই কূটনীতিশাস্ত্র বলে— দেবতা, ব্রাহ্মণ, গুরু এবং নিজের জন্যে কোনো কাজ করবার ক্ষেত্রে একেবারে অকপটচিত্তে ফাঁকি না দিয়ে দ্বিধাহীন মনে করা উচিত। কিন্তু অন্যান্য মানুষের জন্য কোনো কাজ করতে গেলে সবসময় মনের মধ্যে দ্বৈধীভাব রাখা উচিত। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে মনের মধ্যে সংশয় রেখে কি করলে কি হতে পারে বা কি কাজের কি সুফল বা কুফল— এইসব কার্যকারণ চিন্তা করে কাজ করা উচিত। তবে ঈশ্বরের উপাসক শুদ্ধচিত্ত যতিদের সঙ্গে সবসময় নিষ্কপট আচরণ করলেও স্ত্রীব্যসনে আসক্ত কোনো পুরুষ এবং বিশেষতঃ রাজাদের সঙ্গে কখনই সরল শুদ্ধ মনে কথাবার্তা বলা বা আচার-ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ রাজনীতি কখন সরলপথে চলে না— সে হল বক্রপন্থা।—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content