
ছবি: প্রতীকী।
ভিলেন বা প্রতিনায়ক যেকোনো কাহিনিতে একটা বিশেষ স্থান নিয়ে থাকে। সেই রামায়ণ মহাভারতের যুগ থেকে আজকের সাহিত্য-সিনেমা-সিরিয়ালে নানারকম ভিলেন দেখা যায়। কাউকে দেখেই ভিলেন মনে হবে, কাউকে সুবোধ মনে হলেও সে আদ্যন্ত দুষ্ট ও খল। কেউ খল কিন্তু রসিক, কেউ খল এবং হাড়হিম করা আতঙ্কের। খলতার কিছু কিছু চেনা পথ আছে, আজকের শিল্প-সাহিত্য নতুন নতুন বদমাইশির গবেষণা দেখায়, যেগুলো কখনও রোমাঞ্চকর, কখনও অলীক। মোটকথা, দুষ্টস্বভাবের চরিত্রগুলি কাহিনীকে তথা জীবনকে সুস্থ থাকতে দেয় না। অনেকটা জ্বরজ্বালা রোগশোকের মতো এরা সুস্থ সম্পর্ক ও বিষয়কে ব্যস্ত করে। কেন করে?
কেউ বলবেন সমাজ ও প্রতিবেশ এর জন্য দায়ী, কেউ বা বলবেন স্বভাব। কেউ যেমন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এমন দুর্বৃত্ত হয়, কেউ কেউ আবার এমনটা না করতে পারলে বুঝি তৃপ্তি পায় না। কাহিনির শেষে সাধারণত দেখা যাবে এইসব নানারঙের খলচরিত্রগুলি পরাজিত হবে, সত্য ও শুভের জয় ঘটবে, অনেক দুষ্টুলোক আবার নিজের মন্দ কাজগুলির জন্য অনুশোচনা করবে। এই জাতককাহিনিও তেমন এক দুর্বৃত্ত খলের। গল্পসাহিত্যে শেয়াল এই ভিলেনের ভূমিকাটি একচেটিয়া অধিকার করে রাখে।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২৫: সংবরজাতক— কে পাবে রাজ্যভার?

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৫: গেমপ্ল্যান
বোধিসত্ত্ব সেবার বারাণসীর এক অরণ্যের বৃক্ষদেবতা। অর্থাৎ, অরণ্যের রক্ষক, অরণ্যের সকল ভালোমন্দের দর্শক। সেই অরণ্যে একটি পার্বত্যগুহায় একটি বাঘ ও একটি সিংহ পরস্পর মিত্রভাবে বাস করতো। বাঘের নাম সুবাহু, সিংহের নাম সুদন্ত। একটি শেয়াল তাদের পরিচর্যা করতো, তাদের উচ্ছিষ্ট খেয়ে দিব্য সুখে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে দিন কাটাতো। একদিন তার মনে হল, বাঘ আর সিংহের মাংস কেমন খেতে? তবে বাঘ আর সিংহকে মেরেই তাদের মাংস খাওয়া যাবে। এই ভেবে সে সিংহের মন বিষিয়ে দিতে গেল। দেখা যায়, খলচরিত্রগুলি খাবারে নুন অথবা বিষ দেয়, কান ভাঙায়, অথবা বিড়ালতপস্বী সেজে সকলের মনোহরণ করে, কিংবা হাসিমুখে ছুরি শাণায়। শেয়ালটা সিংহকে গিয়ে বলল “আপনার সঙ্গে বাঘের কিছু সংঘাত আছে নাকি? বাঘটাতো আড়ালে আপনার নিন্দেমন্দ করে, বলে সৌন্দর্যে, গাম্ভীর্যে, জাতিগৌরবে, বলবীর্যে সিংহ আমার নখের যোগ্য নয়। কী সাহস, তাই না!”
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৯: সারদা মায়ের রোগ নিরাময়ের প্রচেষ্টা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা
সিংহ তাকে হাঁকিয়ে দেয়। সে বুঝি শেয়ালের স্বভাব জানতো, তাই স্রেফ ঘাড় ধরে দূর করে দেয় শেয়ালকে। এবার শেয়াল একই কথা বাঘকে গিয়ে বলল। বাঘ সিংহের কাছে এসে জানতে চাইল “ভাই! তুমি এমন কথা বলেছো? তুমি বর্ণে প্রকৃষ্ট, আমার থেকে নাকি শ্রেষ্ঠ? আমার কিন্তু ভাই একথা বিশ্বাস হয় না!”
বাঘ না সিংহ কে বর্ণে বীর্যে বলে শ্রেষ্ঠ? এই কাল্পনিক শত্রুতা ও সংঘাতের কাহিনী নিয়ে বর্ণারোহ জাতক। কে কাকে বর্ণে অতিক্রম করে? বন্ধুভাবে থাকতে গেলে এই অহংবোধ ও আত্মরতি কি সঙ্গত?
বাঘ না সিংহ কে বর্ণে বীর্যে বলে শ্রেষ্ঠ? এই কাল্পনিক শত্রুতা ও সংঘাতের কাহিনী নিয়ে বর্ণারোহ জাতক। কে কাকে বর্ণে অতিক্রম করে? বন্ধুভাবে থাকতে গেলে এই অহংবোধ ও আত্মরতি কি সঙ্গত?
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৭: রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার হতে চেয়েছিলেন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৫: অগ্নির কি শুধুই দহনজ্বলা? মহর্ষি মন্দপালের অগ্নিস্তুতিতে অগ্নির কোন সদর্থকতার ইঙ্গিত?
সিংহ বলল, “তুমিও একথা আমাকে বলেছো আমি বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু ধূর্ত এক প্রাণীর কথা শুনে এখন যদি আমাকে এমন বলতে চাও তবে তো একসঙ্গে থাকাটা আর চলে না হে। যার-তার কথা বিশ্বাস করলে মিত্রভেদ হয়, বিচ্ছেদ হয়, শত্রুতা আসে। যে নিজের অনিষ্টের ভয়ে সদা ত্রস্ত হয়ে মিত্রের ছিদ্রান্বেষণ করে সে কখনো সুহৃদ্ হতে পারে না। আমি তাকে মানি না। সন্তান যেমন অটুট বিশ্বাসে মায়ের কোলে সুখে থাকে, তেমনই নিঃশঙ্ক বিশ্বাস যদি মিত্রদের হৃদয়ে থাকে তবেই তা সুখকারক হয়। দুটি হৃদয়ের এমন অচ্ছেদ্যবন্ধন থাকলে তবেই সেখানে কোনও আঘাত হানার সাধ্য কারো থাকে না।”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৯: সময় বুঝে প্রত্যাঘাতের জন্য রাজনীতিতে অনেক সময় পিছিয়েও দাঁড়াতে হয়

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০১: ছিট ঘুঘু
বাঘ অল্প হলেও শেয়ালের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিল। তার বিশ্বাস একটু হলেও টলেছিল বৈকী! সিংহ কিন্তু প্রথম থেকেই তার জাত চিনিয়েছে। তাই বাঘ লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাইল, তারপর দুজনে পরম মিত্রতায় বাস করতে লাগল। শেয়াল? সেখান থেকে পালিয়ে গেল।
আপনার আশেপাশে এমন লোকজন আছে? তবে সাধু সাবধান! —চলবে।
আপনার আশেপাশে এমন লোকজন আছে? তবে সাধু সাবধান! —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















