বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


ছবি: প্রতীকী।

আমাদের মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহঙ্কার সীমিত। দেহ বেষ্টিত মন, কালাতীত ও সীমাহীন বিরাটকে ধারণ করতে পারে না। মন সর্বদা তিনগুণ সম্পন্ন এবং সংস্কার বসত কর্ম করতে থাকে। অথচ ভুলে যায় বিরাটই তার স্বরূপ এবং তার অংশও। যেমন সমুদ্রের সঙ্গে তরঙ্গের সম্পর্ক। সর্বদা সমুদ্র থেকে উৎপন্ন ও অবস্থান; সমুদ্রের ঢেউ ওঠে, সমুদ্রে মিলিয়ে যায়। ঢেউ যেমন সমুদ্রের অংশ আবার তেমন সমুদ্রের বিকৃত রূপ ছাড়া কিছু নয়। জলই ঢেউ আবার ঢেউয়েই জল। মাটির তাল আর মাটির পাত্রের সম্পর্ক।
মোটকথা, অনবরত স্বরূপকে স্মরণ করা ও তাঁর সঙ্গে একাত্মবোধ করতে থাকা। সব কাজে ঈশ্বরের ইচ্ছা বা তাঁর অঙ্গুলি নির্দেশে হচ্ছে এই বোধ তৈরি করা। তাহলে আমাদের পৃথক সত্তাকে মুছে ফেলতে পারব। আমরা যত পূজা, উপাসনা করি, সবকিছুর পিছনে যেন সেই পৃথক সত্তাকে হারিয়ে ফেলার চেষ্টা করি। ঈশ্বর আর মানুষের মধ্যে পার্থক্য কী? সীমাহীন পরমা এবং নিরবিচ্ছিন্ন সত্ত্বা ঈশ্বর।
আরও পড়ুন:

অনন্ত এক পথ পরিক্রমা, পর্ব-৮১: শক্তি অক্ষয়, চির শাশ্বত

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৫: গেমপ্ল্যান

মানুষ, সীমিত সত্ত্বা এবং ক্ষুদ্র অহংকার যুক্ত। যে কারণেই সে পৃথক ঈশ্বর থেকে। সংস্কারমুক্ত অখণ্ড জ্ঞানই ঈশ্বর, আর খণ্ডিত জ্ঞান কর্ম ও সংস্কারযুক্ত মানুষ। এই সীমা বা বন্ধনের বাইরে যাওয়াই উপাসনার লক্ষ্য। এ জগৎ, যা পরিব্যপ্ত হয়ে আছে তা জড়। যদি বলি তবে প্রশ্ন জড় থেকে জড় উৎপন্ন হতে পারে কী করে? না, তবে এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনও সজীব সত্ত্বা রয়েছে। আবার সজীব সত্ত্বা কী করে জড় উৎপন্ন করবে? যতক্ষণ পর্যন্ত এই চৈতন্য সত্ত্বা পিছনে রয়েছে জগতকে চৈতন্য সজীব মনে হবে।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৯: সারদা মায়ের রোগ নিরাময়ের প্রচেষ্টা

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৯: সময় বুঝে প্রত্যাঘাতের জন্য রাজনীতিতে অনেক সময় পিছিয়েও দাঁড়াতে হয়

ঠাকুর বলছেন, “একটি হাঁড়িতে ভাত চড়িয়েছ, আলু, বেগুন সব ভাতে দিয়েছ; খানিক পরে আলু, বেগুন, চাল লাফাতে থাকে, যেন অভিমান করছে ‘আমি নড়ছি’, ‘আমি লাফাচ্ছি।’ ছোট ছেলেরা ভাবে আলু, পটল, বেগুন ওরা বুঝি জীয়ন্ত, তাই লাফাচ্ছে। যাদের জ্ঞান হয়েছে তারা কিন্তু বুঝিয়ে দেয় যে, এইসব আলু, বেগুন, পটল ওরা জীয়ন্ত নয়, নিজে লাফাচ্ছে না। হাঁড়ির নিচে আগুন জ্বলছে, তাই ওরা লাফাচ্ছে। যদি কাঠ টেনে লওয়া যায়, তাহলে আর নড়ে না। জীবের ‘আমি কর্তা’ এই অভিমান অজ্ঞান থেকে হয়।” (কথামৃতঃ ৯৬৭) “কায়মনবাক্যে আমাদের এই সত্যকে উপলব্ধি করা। এই সত্য জানলে সমস্ত বন্ধন থেকে আলাদা হয়ে যায়। ঠিক পাকা বিশ্বাস সেটা অনুভূতি (Realisation) না হলে হয় না। একবার যদি তাঁর দর্শন হয়, অনুভূতি হয়, তবে ঠিক ঠিক বিশ্বাস হয়। তার পূর্বে সেই বিশ্বাসের খুব কাছাকাছি একটা হয়। খুব জোর করে বিশ্বাস আনতে হয়। পরে পরে এই রকম করতে করতে বিশ্বাস দৃঢ় হয়। অবিশ্বাস করতে নেই। যখন সন্দেহ উপস্থিত হবে তখন ভাবতে হয়-ভগবান সত্য; আমার অদৃষ্ট দোষে আমার অশুভ সংস্কারের ফলে তাকে বুঝতে পারছি নি। যখন তাঁর কৃপা হবে তখন হবে।”
(ধর্ম প্রসঙ্গে স্বামী ব্রহ্মানন্দ পৃঃ ১৩৪)।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৭: রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার হতে চেয়েছিলেন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৫: অগ্নির কি শুধুই দহনজ্বলা? মহর্ষি মন্দপালের অগ্নিস্তুতিতে অগ্নির কোন সদর্থকতার ইঙ্গিত?

মন যত সুক্ষ্ম হয় তত মন থেকে রাগ, মোহ, দ্বেষ, বিদ্বেষ সরতে থাকে, আর পরমাত্মার অনুভূতির স্তরে আসতে থাকে। স্থুল শরীরের বাধা রোগ, শোক, ইন্দ্রিয় প্রকৃতির আঘাত। তেমন সূক্ষ্ম শরীরকে আকাঙ্খা, ক্রোধ, ঈর্ষা, বিদ্বেষ-আদি দূষিত করে আর কারণ শরীরকে তেমনই অহঙ্কার দূষিত করে। আমাদের অজান্তেই আমরা বদ্ধ হয়ে পড়ি। যেমন বিছের স্বভাব দংশন করা, তেমন অহংকার-এর স্বভাব মন, বুদ্ধি, চিত্তকে দংশন করে বিক্ষেপ সৃষ্টি করা। সোজা সরল বোধে অনুভূতির দিকে এগোতে দেয় না।
আরও পড়ুন:

গীতা: সম্ভবামি যুগে যুগে, পর্ব-২৩: বন্ধু হে আমার…

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০১: ছিট ঘুঘু

ইন্দ্রিয় বিষয়কে দংশন করে তার রূপ রস ভোগে মত্ত হয় কিন্তু তার পরিবর্তে ইন্দ্রিয়গুলি ভোগ্য হয়ে পড়ে। জরাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন আর সোজা হয়ে দাঁড়ানোর অবস্থা থাকে না। “যে ‘আমি’ তে সংসারী করে, কামিনী কাঞ্চনে আসক্ত করে, সেই ‘আমি’ খারাপ। জীব ও আত্মার প্রভেদ হয়েছে, এই ‘আমি’ মাঝখানে আছে বলে। জলের উপর যদি একটা লাঠি ফেলে দেওয়া যায়, তাহলে দুটো ভাগ দেখায় বস্তুত এক জল; লাঠিটার দরুন দুটো দেখাচ্ছে।” (কথামৃত পৃঃ ১২১) পূর্ণ অভিমান শূন্যতায় পূর্ণ জ্ঞানের লক্ষণ। সর্বব্যপী অহংকার পূর্ণ করে তোলে মানব জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি, যা পেলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।—চলবে।
* অনন্ত এক পথ পরিক্রমা (Ananta Ek Patha Parikrama) : স্বামী তত্ত্বাতীতানন্দ (Swami Tattwatitananda), সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মিশন, ফিজি (Fiji)।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content