
শ্রীরামকৃষ্ণ।
কর্ম করলে চিত্তের বিক্ষেপ হওয়া স্বাভাবিক। উপাসকের তাহলে কর্ম করা অনুচিত। কিন্তু কর্ম না করে, চিত্তের বিক্ষেপ প্রতিরোধ করা কী সম্ভব? পতঞ্জল বলছেন, “যোগঃ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ”। বৃত্তিহীন মন সাধন ছাড়া উপার্জনক্ষম। কর্মফল বিনাশী বা সঞ্চয়কারী হলেও কর্ম সর্বদা পরিত্যক্ত নয়। শাস্ত্রবিহিত কর্ম চিত্ত স্বাভাবিক দুশ প্রবৃত্তি দূর করে ও নিষ্কাম কর্মের দ্বারা চিত্রশুদ্ধিকরণ হলে জ্ঞাননিষ্ঠার উপযোগী হয় সাধক।
বিচার, বৈরাগ্য তৈরি করে ঠিকই কিন্তু তার আগে কর্মানুষ্ঠান জনিত শুভ সংস্কার লাভ না করলে বৈরাগ্য উৎপন্ন হয় না। ঠাকুর যেমন বলেন, কর্ম করা না থাকলে বৈরাগ্য হয় না, ভোগ না হলে বৈরাগ্য হয় না। “তবে কি জানো? সময় না হলে কিছু হয় না। কারু কারু ভোগকর্ম অনেক বাকি থাকে তাই জন্য দেরিতে হয়।” (কথামৃত পৃঃ ১২৮)
আরও পড়ুন:

অনন্ত এক পথ পরিক্রমা, পর্ব-৮২: সংস্কারমুক্ত অখণ্ড জ্ঞানই ঈশ্বর

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৭: রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার হতে চেয়েছিলেন
কর্মীর দৃষ্টি মূলত বাইরের দিকে আবদ্ধ থাকে তাকে । অন্তরমুখী করতে উপাসনার সাধনের প্রয়োজন। সে কারণে কর্ম উপাসনার পারস্পরিক সম্পর্ক দেখা যায়।
অকুর্বন বিহিতং কর্ম নিন্দিতং চ সমাচরন্ প্রসজ্জংশ্চেন্দ্রিয়ার্থেষু নরঃ পতনমৃচ্ছতি।
শোধ্যমানং তু তচ্চিত্তমীশ্বরার্পিতকর্মভিঃ
বৈরাগ্যং ব্রহ্মলোকাদৌ ব্যনক্ত্যাশু সুনির্মলম্।।
(আনন্দগিরিধৃত শ্লোক)
মানুষের মনে স্থূল সংস্কার অতি প্রবল, তাই তাদের সকাম থেকে নিষ্কামের ধীরে ধীরে নিয়ে আসতে হয়। প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্তির পথে।
শোধ্যমানং তু তচ্চিত্তমীশ্বরার্পিতকর্মভিঃ
বৈরাগ্যং ব্রহ্মলোকাদৌ ব্যনক্ত্যাশু সুনির্মলম্।।
(আনন্দগিরিধৃত শ্লোক)
মানুষের মনে স্থূল সংস্কার অতি প্রবল, তাই তাদের সকাম থেকে নিষ্কামের ধীরে ধীরে নিয়ে আসতে হয়। প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্তির পথে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-১৯: আকাশ এখনও মেঘলা

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০০: অসুস্থ শরীরেও ভক্তদের দীক্ষাদান শ্রীমার
সৌন্দর্য উপভোগের পরিবর্তে, কামবাসনার প্রভাবে সৌন্দর্য সরে যায়; মন বিষয় ভোগে লিপ্ত হয়। সাধনার প্রবৃত্ত হতে হলে কিন্তু চিত্ত কামনার পরিত্যাগ হওয়া প্রয়োজন।
“স্থুলে নির্জিতমাত্মানং শনৈঃ সূক্ষ্ম ধিয়া নয়েৎ। ” ভাগবত ৫|২৬৷৩৯
স্থূল সংস্কার কাজে লিপ্ত আত্মা বা ব্যক্তিগত ধীরে উপাসনার দ্বারা সূক্ষ্মের দিকে যেতে পারে। উপাসনার ক্ষেত্রে তিন জিনিস আবশ্যক—উপাসক, উপাস্য বিষয় ও প্রত্যয় আবৃত্তি নিরন্তর ভাবনা। উপাসনার মূল রয়েছে বিশ্বাস। যেখানে বিচারের বিশেষ স্থান নেই বললেই চলে।
স্থূল সংস্কার কাজে লিপ্ত আত্মা বা ব্যক্তিগত ধীরে উপাসনার দ্বারা সূক্ষ্মের দিকে যেতে পারে। উপাসনার ক্ষেত্রে তিন জিনিস আবশ্যক—উপাসক, উপাস্য বিষয় ও প্রত্যয় আবৃত্তি নিরন্তর ভাবনা। উপাসনার মূল রয়েছে বিশ্বাস। যেখানে বিচারের বিশেষ স্থান নেই বললেই চলে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮০: রাজনীতিতে সবাই চায় সবলের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে, দুর্বলরা সব সময়ই একা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৬: রাম যৌথ পরিবারের আদর্শনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ, তাঁর যেন এক ঘরোয়া ভাবমূর্তি
উপাস্য তত্ত্ব, শাস্ত্রাদি ও গুরু মুখে অবগন্তব্য। নিজের ভাবনা বা কল্পনার কোনও তত্ত্ব নয়। উপাসনা হচ্ছে শাস্ত্র অনুমোদিত কোনও একটি আলম্বন বা ধ্যানের বিষয় অবলম্বন পূর্বক তাতে এরূপভাবে চিত্তবৃত্তির প্রবাহ উৎপন্ন করতে হবে, যে তার ভেতর আর ভিন্ন বিষয়ক প্রত্যয় বা জ্ঞান উঠে ব্যবধান সৃষ্টি না করে। নিরন্তর এক চিত্ত প্রবাহ, অন্য বিষয় জ্ঞান সৃষ্টি থেকে মন কে বিক্ষেপ শূন্য করে রাখবে। এক চৈতন্য প্রবাহে পূর্ণের সাথে অংশের যে বিচ্ছিন্নতা ছিল তা আর থাকবে না।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০১: ছিট ঘুঘু

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা
বেদের উপাস্য বিষয়ক অর্থবাদাংশে যেখানে ব্রাহ্মণ ও আরণ্যক ভাগে দেবতাদির স্বরূপ যেভাবে জ্ঞাপন করা হয়েছে, সেই ভাবে মনের দ্বারা তাকে গ্রহণ করে ও লৌকিক জ্ঞান তিরোহিত করে ততক্ষণ ওই বিষয়ে চিন্তা করতে হবে যতক্ষণ লৌকিক দেহাদি বিষয় আত্মাভিমানের ন্যায় সেই দেবতা দের স্বরূপে আত্মাভিমান জন্ম না হয়। অর্থ এই, দেহের অন্য সকল ইন্দ্রিয়ের প্রতি যেমন মমত্ত্ববোধ কাজ করে সেরূপ ধ্যায় দেবতার প্রতি মমত্ত্ববোধ হয়ে থাকে। শুধুমাত্র নাম-রূপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এক স্বরূপে তদাকার প্রাপ্ত হয়। সগুণ বা নির্গুণের উপাসনা একইভাবে করা যেতে পারে। —চলবে।
* অনন্ত এক পথ পরিক্রমা (Ananta Ek Patha Parikrama) : স্বামী তত্ত্বাতীতানন্দ (Swami Tattwatitananda), সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মিশন, ফিজি (Fiji)।


















